নভেরা হোসেনের কবিতা


ধূলিযুদ্ধ

সিংহের গর্জন ছেড়ে
কোথায় লুকাও তুমি
ধূলিযুদ্ধের নায়ক—

গোপনীয়তার গোপন কুঠুরিতে
ঘুমঘোরে—
কাপালিক যাদুকন্যা
নিমেষে হারিয়ে দেয় তোমাকে
আজ শ্রাবণের মেঘময় দিনে
ঢেকে যাও ঢেকে যাও
ধূলোর আস্তরণে

 

তমিস্রা

ম্রিয়মান দিনের গহ্বরে
বেয়ত্রিচ
দন্তহীন নারী এক।
শলাকাদণ্ড জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়
জ্বলে পুড়ে নাই হয়ে যায়!
অগ্নিদ্রোহ

অষ্টম সোপানে রাধিকা নাচে
গোপিনীরা সব ঘুমিয়ে রয়,
উরুসন্ধির বদ্ধ খাঁচে
অগ্নিদ্রোহ মন্থর বয়।
এ কোন মন্ত্র যন্ত্র ঘরে?
হীরক দেশের রাজা হন তিনি
শূন্য করতল ভরে ওঠে কার
অচিন বৃক্ষের রাবন গমনে?

 

সাইকিয়াট্রিস্ট

ধবধবে শাড়িতে বসে থাকে সাইকিয়াট্রিস্ট
টেবিলের ঐ-কোণে
এই কোণে তিন তিন মাথাওয়ালা তিনজন
কার কাছে এসেছেন? আপনি রোগী?
তিনজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে
বুঝতে পারে না প্রশ্নের মানে,
কে কার রোগী আর কোনজন সাইকিয়াট্রিস্ট—
ভীষণ দ্বন্দ্বে দেয়ালের ঘড়ি।

 

মৃত্যু উপত্যকা

মৃত্যু আসুক। আসুক সে মৃত্যু,
কারো কারো মৃত্যু কখনো কখনো
খুব কামনা করি সে মৃত্যু
হয়তো নিজের বা তোমার বা অন্য কারো…
কোনো যন্ত্রণার মৃত্যু, কোনো যন্ত্রের মৃত্যু
ক্লিশে শব্দ, শব্দাবলী—
হাতের একটা কড়ে আঙুলের মৃত্যু।
নয় এ কোনো অসুখ,
মজ্জার গোপন খেলা
ম্রিয়মাণ রোদ্দুর ঝরাক যত কুয়াশার ছায়া,
তবু আসুক সে মৃত্যু কারো জন্য
কারো কারো মৃত্যু হয়ে…

 

রাত্রি যখন দুপুর

ঘড়িতে এখন অনেক রাত প্রায় দুপুর
শুনশান শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর,
দুগ্ধপোষ্য শিশু শুয়ে থাকে
বিছানার মাঝ বরাবর,
দু’পাশে ঘুমন্ত নারী-পুরুষ
ঘন নিঃশ্বাস ওঠানামা করে
অকস্মাৎ মোবাইল ফোনের রিং টোনে
ধড়ফড়িয়ে ওঠে তক্ষকসকল।

 

২ অক্টোবর

অক্টোবরের শীতপ্রাসাদ দখলের কথাই শুধু
মনে পড়ছে আজ,
তারিখটা সাত কিংবা আট
ক্যালেন্ডারের নিউম্যারিক্যাল অক্ষর
নির্ঘুম তাকিয়ে সারারাত।
মাথায় দোলকের সূত্র ঘোরে;
দ্বিপদী সূচকের ভর,
সন্ধ্যার মৃদু আলোয়
দরজাহীন ঘরে
শূন্যে দোলে ধনেশের দুই পা
মোচড়ানো ঘাড় মাথা।

 

ওশনভিলা

তে’তলার ঘর
নির্জনে আঁকেন কবি
পুরোটাই আনকোরা
বাইজেন্টিয়ান ছবি
বর্তুলাকার চোখের গোলকে
প্রিয়তম বাদামি চাদর

 

বুড়িগঙ্গায় নৌভ্রমণ

জলের উপরে ভাসমান নৌকো
চেনাজানা দু’জন বসে থাকে
হালধর হাল ধরে রাখে,
কচুড়িদল ভাসতে ভাসতে নৌকায় এসে ঠেকে
দূরে বুড়িগঙ্গা ব্রীজ—
সবুজাভ আলোয় পাশাপাশি দুজন
একহাত ব্যবধান মাঝখানে
অথচ কেউ যেন কাউকে দেখেইনি কোনোদিন
তেমনটাই ভাবে অন্যজনা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *