কবিতার গ্রাফগদ্য


ফকির ইলিয়াস

নৃত্যবান্ধব নদী ও নামগুলোর এক্সিট

নৃত্যবান্ধব নদীর মুখ দেখে শুরু হয় আমার যাত্রা। এর আগে যারা চিনেছে দূরের পথ, তাদের ধূসর ছবি দেখে আমি থামিয়ে দিই প্লটযুদ্ধ। মাটির প্রয়োজন কমে যাবার পর আমারও মন ছুঁতে চেয়েছে কেবলই শূন্য আকাশের ভিত। আর খোপের জীবন ভালোবেসে নিজেকে বার বার সাজিয়েছি চিলেকোঠার সেপাই। পাই পাই করে জমানো পুঁজি দিয়ে কিনে নিয়েছি কৃত্রিম আঁধার। দিনের বেলায় ঝাড়বাতি জ্বালিয়ে মুখ দেখার গরল সংস্কৃতি! এভাবে হাঁটা যায় জানি, তবে পথ অতিক্রম করা যায় না। ‘সহজ’ নাকি ‘সঠিক’ এক্সিট চেয়ে নেবো– এমন প্রশ্নের মুখোমুখি সমর্পণ করেছি ভাঙা পাঁজর। কিভাবে জন্মজয়ন্তীর রাতে জমা রাখতে হয় অব্যাহত শপথ, তাও ভুলে গেছি খুব দ্রুত। মাঝে মাঝে অনেক কিছুই ভুলে যেতে হয়। ক্ষতের নিয়তি, ঝরা শ্রাবণের মন, আর পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার প্রস্থানদৃশ্য। এমনকি সেই শহরের নামও, যে শহরে প্রাক্তন স্মৃতিরা থাকে পেখম মেলে।

মাছির চোখ ও মানুষের স্কেচ

মাছগুলো তাকিয়ে থাকে মাছির চোখের দিকে। ভনভন আওয়াজে ঘুরতে থাকে রিকশার প্যাডেল। কে চালায় তা বুঝা যায় না। তবে নেপথ্যে কেউ নিয়ন্ত্রণ করে হাতের আঙুল, সে বিষয়ে আমরা সম্মত হই। এ পর্যন্ত আমরা আরো বেশ কিছু বিষয়ে পৌঁছে গেছি ঐক্যমতে। যত্রতত্র প্রয়োগ না করলেও আমরা সবাই মিথ্যা কথা বলতে জানি, কিংবা আষাঢ়ে নদীর চোখে রাখতে পারি নিজেদের চোখ– এমন বেশ কিছু সত্যকে মেনে নিয়েছি আমরা বেশ আগেই। আরো সম্মত হয়েছি, এখন থেকে বৃষ্টিতে নামতে গেলে বাদ দেবো ছাতার ব্যবহার। কারণ প্রকৃতির মাঝে ভিজে যাওয়ার যে আনন্দ তা পুকুর কিংবা বাথটাবে নেই।

ভিজে যাবার দৃশ্যাবলি স্মরণে এলেই আমার মনে পড়ে যায় সেন্ট্রাল পার্কের সেই স্কেচম্যানটির কথা। যে মাত্র দশ ডলারের বিনিময়ে আমার মুখাবয়ব এঁকে দিয়ে দিয়ে হেসেছিল উল্লাসের হাসি। আর বলেছিল আমার পূর্বপুরুষও নাকি ভিয়েতনামিজ ছিলেন! লোকটা কেন এমন বললো, তা খুঁজে পেতে কয়েকদিন সময় লেগেছিল আমার। আমার বাস্তুভিটে কোনো আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল কিনা, কিংবা আমার পূর্বপুরুষেরা মোহাজের হয়ে মাটি বদল করেছিলেন কিনা– এমন কিছু প্রশ্নের জবাব খুঁজেছিলাম আমি। কিন্তু অগ্রজ প্রজন্মের কারো দেখা না পাবার কারণে উত্তরগুলো থেকে গিয়েছিল অমীমাংসীত। আজ ভোরে দৈনিক কাগজগুলোতে চোখ বুলাতে বুলাতে সেসব প্রশ্নের কিয়দংশ জবাব পেলাম আমি। আমাদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট তার কায়রো ভাষণে মুসলিম নারী নেতৃত্বের প্রশংসা করে বাংলাদেশের নামোজ্জ্বল করেছেন। না তিনিও, মাছের চোখ নিয়ে মাছির দিকে তাকিয়ে থাকা সেদেশের ভুখা মানুষগুলোর কোনো প্রশংসাপত্রতে সম্মতি দেন নি।

মুচি অথবা সেলাই কারিগর

যারা জুতো সেলাই করে তাদেরকে মুচি আর যারা কাপড় সেলাই করে তাদেরকে দর্জি বলা হয় কেন– এই প্রশ্নটি যখন উত্থাপন করি তখন আমার বয়স পনেরো বছর। পিতার ধমক পেয়ে থেমে যাই। কারণ সে সময় একজন দর্জি আমার শার্টের মাপ নিচ্ছিলেন। মেপে মেপে কাপড় বানাতে হয় কিংবা বলতে হয় কথাবার্তাও, এমন ব্যাকরণ সে-সময় থেকেই আমার খুব অপ্রিয় হয়ে উঠে। সেই অপ্রিয় তালিকা আরো দীর্ঘ হয়, যখন এক স্বৈরশাসকের দালালেরা রাতের আঁধারে দখল করে নেয় আমাদের প্রতিবেশী মুচিদের ঘরবাড়ি। স্বৈরাচারী শাসকেরা জুতো সেলাই করতে জানেনা বলেই মুচিদের প্রতি তাদের এতো ঈর্ষা ছিল? প্রশ্নটি সে সময়ই ডায়েরির পাতায় টুকে রাখি।

সেলাই বিষয়ে একটা আগ্রহ আবারো প্রবল হয় যখন আমার বয়স চল্লিশ বছর। শার্টের বোতাম লাগাতে গিয়ে সুঁই-সুতো খেলা খেলতে খেলতে দেখি– সুতোর প্রস্থানদৃশ্য আমার আদেশ মানছে না। তখন আমার ধারণা আরো সুদৃঢ় হয়, দক্ষ  নির্দেশক না হলে সেলাই কাজ রপ্ত করা যায় না।

সেলাই সম্বন্ধ নিয়ে আরেকটা দুর্বলতা আছে আমার। দেববাড়ির শিবাদি ‘মনে রেখো’-সেলাই করা যে রুমালটি আমাকে দিয়েছিল তা যত্ন করে রেখেছিলাম অনেক বছর। নদীতে ফেলে দিয়েছিলাম বিয়ে করার একমাস পর। কারণ গৃহিনী বলেছিলেন, ওসব স্মৃতি আর মনে রাখতে নেই! সবুজ সুতোয় লেখা সাদা রুমাল! একটি জবাফুলও  আঁকা ছিল তাতে। লাল– আমার রক্তের রঙ। রঙ মিশাতে কে না ভালোবাসে! তবে সবাই পারে না। যারা পারে তাদেরকে মুচি অথবা দর্জি কিছুই বলি না আমি। বর্ণের বিশেষণে লিখিত ধারাপাতে রঙ দিয়েই লিখে রাখি উত্তাল সমুদ্রের অন্য এক নাম– সেলাই কারিগর।

বিলি হওয়া মাধ্যাকর্ষণ

ফরমালিন দেয়া চোখগুলো দেখি। জ্যোতি নেই। কোথায় গেলো জ্যোতি!
জানতে চাই। উত্তর পাই না। উড়ে গেছে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। পাঁজর ভেঙে
গেলে পাখিরাও ডানা ঝাপটায়। আর মানুষ, সে তো ধীর জীব। দাঁড়াবে
বলে পৃথিবীতে এসেছিল! আচ্ছা যারা কখনও-ই দাঁড়াতে পারে না, তাদের
গতি কোথায় গিয়ে ঠেকে? কেউ কি তাদেরকে এগিয়ে নেয়? না-নেয় না।
নিলে বিশ্বমণ্ডলটা অন্যরকম হতো। বদলে যাবার কিংবা বদলে দেবার কথা
সাজিয়ে রাখি আমরা ড্রয়িং রুমে। আর যারা জীবনকে ড্র করতে ছুটে
পোষ্টাপিসে তারা একটা সিলমোহর চায়। বিলি হতে চায়। এই মাটি ছেড়ে
অন্য কোথাও। একটা ডাইভার্সিটি ভোর। একটা দূরের বিলবোর্ড। যা
দুহাত বাড়িয়ে স্বাগত জানায় …… ওয়েলকাম টু লস এঞ্জেলেস।

জলের বিবেক দেখে পথচলা দিনের উজান

জলের বিবেক দেখে জেনে যাই, নদীরাও উৎসারিত হয়। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে কিছু হাড়গোড়। পৃথক করি মাটি ও হাড়ের দূরত্ব। কী এক অদম্য ঝড় এসে আমাকে উড়িয়ে নিতে চায়। এখন ফাল্গুন মাস। এমন ঝড় হবার কথা নেই। তবুও উড়ন্ত খড়ের তাঁবুর মতোই উড়ে আমার প্রাণ! এ কেমন উজানচিহ্ন আমাকে প্রতিঘাত করে! এ কেমন বেদনার লীলাভ্রান্তি! আমি আরেকটু এগিয়ে যাই। এখানে একটা চর জেগেছিল গেল বছর। এখন নেই। দেখে মনে হয়, সমতল চারাভূমি। খুব যতনে কেউ বুনেছে পাইজন ধানের স্তবক। একটা সদ্য কবরও শুয়ে আছে এর একটু দক্ষিণে। উত্তরের আকাশ ছোঁয়া কদম গাছটার ডালে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে এক উদ্ভ্রান্ত বালক। একটি বালিকা আরেকটি বাঁশি হাতে বসে আছে গাছটির নীচে। মেয়েটি, ছেলেটির প্রেমিকা হবে হয়তোবা। তবে কী সুর ও বৃক্ষের সাথে ওরা মেতেছে প্রেমের গম্ভীরায়! হতে পারে। নাও হতে পারে। আমি এসব ধারদেনার পসরা সাজাতে সাজাতে নদীটির উজানের উৎস খুঁজি। ভোর গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। আর কিছুক্ষণ পর জাগবে সকাল। তারপর দুপুরের দুরন্তপনা। কড়া রোদের তাতে আরেক সবুজের মিহিদানাঘ্রাণ। বুকে তুলে বিকেলের অপেক্ষায় বসে থাকবে তুমি– গাঁয়ের ওপারে। আমার আর ফেরা হবে কী না এই বেঘোরে, আমি করে যাবো কষ্টের উপাত্ত নির্মাণ।

ধানী জমির ধ্যানে মগ্ন যে জীবনের গান

তোমার প্রিয় তালিকায় আমার নাম নেই, তা আমি দেখেছি। কিংবা তোমার লিংক সাম্রাজ্যে নেই আমার নীড়ছবি। তাও অজানা নয় আমার। মেরুবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক সেরে ষ্টকহোম থেকে ফেরার পথে ওর সাথে নিবিড় দেখা হয়েছিল আমার। দেখতে ঠিক তোমার মতোই। বলেছিলো, বোষ্টনে যাচ্ছি। ঘুরতে। বলেছিলাম, ফেরার পথে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব ন্যাশনাল হেরিটেজ দেখে যাবার আমন্ত্রণ রইলো।

এর ঠিক তিনদিন পর বেজে ওঠে ফোন। সেই পরিচিত কণ্ঠ। সময় হবে  প্রশ্ন শুনে সেরে নিই প্রস্তুতি পর্ব। তারপর দেখা হয়ে যায়। আবারও শোনাই পাল তোলা নৌকোর গল্প। ধানী জমির ধ্যানে মগ্ন জীবনের গান। ও আমার গল্প শোনে তন্ময় হয়ে।

মানুষকে এভাবেই তন্ময় হয়ে যেতে হয়। আর পুঁজিতে জমা রাখতে হয় বেগার বেদনা। তালিকায় না থাকলেও যে সাথীকে মোছা যায় না কখনও, শব্দে ও শ্রমণে করে যেতে হয় সব লেনাদেনা।

……….

Facebook Comments

2 Comments:

  1. গদ্যধর্মী কবিতাগুলো বেশ লাগলো। বিষয় ও ইতিহাসের প্রক্ষেপণ
    চমৎকারভাবেই বর্ণনা করতে পেরেছেন কবি।
    -অবিনাশ ব্যানার্জী, ভিয়েনা।

  2. Fakir Elias er Kobitay Ekta Alada Amej Thake.
    ”তবে কী সুর ও বৃক্ষের সাথে ওরা মেতেছে প্রেমের গম্ভীরায়! হতে পারে। নাও হতে পারে। আমি এসব ধারদেনার পসরা সাজাতে সাজাতে নদীটির উজানের উৎস খুঁজি। ভোর গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। আর কিছুক্ষণ পর জাগবে সকাল। তারপর দুপুরের দুরন্তপনা। কড়া রোদের তাতে আরেক সবুজের মিহিদানাঘ্রাণ। বুকে তুলে বিকেলের অপেক্ষায় বসে থাকবে তুমি– গাঁয়ের ওপারে। আমার আর ফেরা হবে কী না এই বেঘোরে, আমি করে যাবো কষ্টের উপাত্ত নির্মাণ।”

    Khub sundor .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *