একগুচ্ছ কবিতা


মাজুল হাসান

জলাতঙ্ক

নগর সন্ত্রস্ত করতে একটা পাগলা কুকুরই যথেষ্ট—এই কথা জানে না
নগর-পুলিশের পুরোধা ব্যক্তি
অথচ কৃষ্ণচূড়ার লাল দেখে অনবরত হুইসেল বাজছে
দৌড়ে আসছে দমকলগাড়ি
জোড় ছাড়িয়ে সঙ্গমকে পোরা হচ্ছে ১৪ শিকের ভেতর…
আমি ভাই ঘরেলু মানুষ; ভাদ্রমাসে রাস্তায় মা-বোন নিয়ে
বেরুতে ভয় পাই। ভয় পাই শিমুল ফুলের পাশ ফিরে শোয়া
বিবেকের কথা যদি বলো—তবে বড়জোর—
রক্তের বোতল নিয়ে ওটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাটাকে
মনে হয় বায়েজিদ বোস্তামি
হে শহরশিশু, বলো—শেষ কবে বর্ষা নিয়ে দাঁড়িয়েছি শিওরে তোমার?
কবে বলেছি—ভোক্কাট্টা? কোথা থেকে—পুষ্পরাগ?
তবু রেণুসুর, কয়েলকাব্য ছিড়ে—গেল রবিবার—বৃষ্টির মুখে
চুমু খেতে গিয়ে আঁতকে উঠেছি…

পুতুলজুতো ফুল

বিকেলের ক্রসফায়ার হয়ে গেছে সমূহবিকেল। অদ্য ফুলকেলী
এখন কুয়াশাতলি ও বেলফুলের দিকে যেতে যেতে লালিমাভগ্ন
খুলির বস্তাসমেত ধরা পড়ছে রাজসভাসদ
দিকে দিকে টাইটার ভাষা, ফসিল, উঁচু নিচু ঢালাও নেতা—
বিশ্বাস করো—রাজনীতি এক কালাজাদু
—বড়ই শিশুতোষ
—আফিম ও আভা
এইসব রূপকথা ছিড়ে কোনো ইচড়েপাকা কিশোর বলবে কী
—বিশ্ববেহায়া হয়ে যাচ্ছে রূপের নাগর!
দ্যাখো—ভোরের সীনা ফেড়ে কেলিয়ে উঠছে দালান
উত্তরে দগদগে গুলির খোসা—দক্ষিণে ধাঁধাঁ
পুবে ফিসফাস সান্দ্র বাতাস—পশ্চিমে পুলসেরাতের চুল
প্রিয় সেপাই—কাটা রাইফেল ওরে—এইবার সামাল্ সামাল্
তোর পুতুলজুতো ফুল …

 

বিমলকাণ্ডা

পাকুড়ের ডালে ফাঁস লাগানো প্রেমিক ছায়াযুগল দেখে…

নিহত আচকান থেকে ময়ূরপুঞ্ছের হাসির মতো
সময়ের ১৭ গজ দূরে ভেজা বর্ষাতির মতো
অথবা রেটলস সাপ, ধরো কিশোরী, আলতাভাঙা শিশি
ওরা আছে। থাকে। ঝুলছে। পাকুড়ের ডালে
যেন ফুলের নাম রক্তকাঞ্চণ। কুন্তলা তার বোন।
দ্যাখো। তাকাও ওই গির্জার চাতালে—মুখোমুখি
ফাঁসলাগা পাখি
জাত বুঝে তার মন মজে নি, স্বাক্ষী এই রৌদ্রদীপ্তি
তাকাও রণবাজনা—তাকাও পূর্বাহ্ন আয়নার দিকে
এখন এই তোমার নিদ্রানাবিক—কর্পুটে অদৃশ্য ঢেউ
দুলো—দুলে ওঠো প্রিয়—প্রিয় ভুল—প্রিয় বসন্ত
ফুটির ঘ্রাণের মতো, মদারুর মদ্যপানের মতো
প্রেমিক তোমার বিমলকাণ্ডা—আমি বলি চিতাফুল…

 

কয়লাখনিতে

হরতালের আগে ওরা নভোচারীকে পুড়িয়ে মেরেছিল…

স্বদেশ আত্মা কথা বলে ইস্পতের ফলায়; যুদ্ধ-বিছানায়
যেমন প্রেমের জন্য জরুরী সেক্সট্যান্ট আর নৌচালনা বিদ্যা
জানি, কিছুই করার নেই—ফুঁসছে—
পিঠাগাছের শেকড় থেকে অন্তরীক্ষে—সেখানেও চাঁতক
রাজপথ থেকে স্টিলের ব্রা—ফুটে আছে লাল ডালিয়া
দ্যাখো—ভ্রান্তিবিলাস
দ্যাখো—অধোরুদ্ধশ্বাস, রুদ্র দারুণ
ওহে বন্ধু, তোমার হাতেও ডালিমহত্যার দাগ—ডালিমকুমার
পথে নামবে কী?
এসো—শান্ত হও—বসো দ্রোহের দেবদারুতলে
রূপোর টাকাগুলোকে রাখো রাজটীকার মেজাজ বরাবর
—তোমার মৃত্যুসভায় এসেছ তুমি। সামনে স্তুতি, ফলার-ফলাদি
—এই নাও ফুলমৃদঙ্গ—জন্ম হোক কয়লার মতো—সহস্রবর্ষে
—বিভৎস সুন্দর…

 

মাটিচিবুনো শিশুসিংহ

৩৬ ছাপড়া লেনে বসে আমি দারফুর নিয়ে কবিতা লিখছি। নিন্দুকেরা বলে
আমার গলিতে ফেরিঅলা আসে না—কেবল মহাশূন্য পোষাকে চন্দ্রযাত্রী…
ফলে প্রশ্ন ওঠে : আমি কি জানি ফেলাতা কোথায়?
ওদের গোত্রপতিরা মাদী ঘোড়া কতটুকু পছন্দ করে?
অথবা ঈদের দিন কী রাঁধে মাসালাত নারী?
চুপ যাও বিদ্যাপতি—বললাম তো জানি না আমি। তবু লিখি
পৃষ্ঠাজুড়ে; যেমন যথেচ্ছ দাগে নির্ধারিত হয়েছিল আফ্রিকার শিং
সেই থেকে বাইসনের আঘাতে রক্ত ঝরছে; জন্ম নিচ্ছে বীজ—
এই ত্রাস—এই সবুজ—আমি তুলে দিতে চাই মাটিচিবুনো শিশুসিংহের মুখে
যাতে মুত্যুর আগে কেশরের হাওয়ায় ক্লান্ত-ক্রন্দন একটু জিরিয়ে নিতে পারে

 

হংসলতার অভিপ্রায়

না চিনলেও মাধুরীকে নিয়ে আলোচনা করা যায়
যেমন :  ১ ডুবে ১৮ মিনিট ডুবে থাকত ডন্ডপানির জহির
বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করো—পানির নিচে বসে
তার সিগারেট ফোকায় নেমে এসেছিল আগনমাসী সন্ধ্যা
তাই টেবিল-তর্ক হতেই পারে
কিন্তু সন্ত্রাসগাছের সঞ্জীবণীটা কোথায় তা কী ধরা যাবে?
এই যেমন :  কালকেতুবিদ্ধ মৃতদেহীটির ঠিক মাথার ওপর
দেয়ালের জলছাপে একটা হাঁ-করা ইঁদুর
আর হাত বাড়িয়ে দেয়া লতানো হংসলতা গাছটি
এক্ষেত্রে আমরা কার অভিপ্রায়কে ইন্দ্রমোহন মনে করব?

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *