গোলাম কিবরিয়া পিনু’র কবিতা


ভ্রমণকালে

 

ভ্রমণকালে ভূখণ্ড আরো খণ্ড খণ্ড
অনুভবে আসে,
চিরহরিৎ মিঠেপাতার বৃক্ষ সবুজের ঘাসে।

অন্ধকার ঢাকা গুপ্তস্থান
সেইখানে বিদ্যুতের গান,
বৈদ্যুতিক গোলযোগ নেই–শুধু বিদ্যুৎ চমকায়।
গরম কেতলি ধরার বস্ত্রখণ্ড নাই
তরুগুল্মাবৃত ছায়ামগ্ন উপত্যকা খুঁজে পাই।

ভ্রমণসৃজনে শীতকাল ও মেরুঅঞ্চল মৌন
বুনোফল নিয়ে বিজুবনে গৃহকাতরতা গৌণ।

 

অভিকর্ষ

সারেং নদীতে যাচ্ছে না? সে কই যাচ্ছে?
নদী তাঁকে টানছে না কেন?
জাহাজ কি তাঁর ডুবে গেছে!

সমুদ্রদয়িতা টেনে নিয়ে যেত তাঁকে
জলপ্রবাহ না দেখলে
নক্ষত্রপতি না দেখলে
আকাশপ্রান্ত না দেখলে
সে নিজের অভিকর্ষ হারিয়ে ফেলতো!

কালাপানি নোনাজল অকূলপাথার
জয় করে নেওয়ার জানে সে সাঁতার।

বায়ুহিল্লোলের সাথে সাথে
জল ভেঙে ভেঙে
বিস্তার ও প্রস্ফুটন হয়েছে দিগন্তে
তাঁর স্বপ্নজগৎ হয়েছে পরিব্যাপ্ত।

সারেং! সে আজ আধোঘুমে
আধো জাগরণে,
মৃগতৃষ্ণা নিয়ে ফিরে এসেছে কোথায়?
সে রূপান্তরিত শিলা হয়ে পড়ে থাকবে
মরু এলাকায়
কোন্ ঋতু থিতু হয়ে আছে!

 

শিখাবিস্তার

অগ্নিপ্রভা নিয়ে
জ্বলে ওঠার সময় কি হয়নি এখনো?
শিখাবিস্তারের দিন ঝুলে আছে আজও!

জ্বলে উঠে নিভে গেলে রণতরী কোন দিকে যাবে?
মিইয়ে পড়ার চেয়ে অগ্নিবর্ণ হয়ে
বর্ণশোভিত হবার জন্য
নিজেকেও খুলে ধরতে হয়,
না হলে নিজের শুধু দন্তক্ষয়?
যারা আছে সাথে–তাদেরও পরাজয়!

পতাকা দুলিয়ে ট্রেন থামানোর চেয়ে
ট্রেনটা এগিয়ে নেওয়া চাই,
ঝোলার ভেতর ঝুলে থেকে লাভ আছে?

তিমির-রাত্রির হাড় থেকে চর্বি কেটে নিতে হলে
নিজেরও অলোকশক্তির খোঁজ পেতে
ক’মাইল হাঁটতে হয় বরফাচ্ছন্ন বেলাভূমিতে।

 

কাসুন্দির ঝোল

পৌষপূর্ণিমা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো না
আমার এখনই বস্ত্র দরকার
ন্যাংটা হয়ে যাচ্ছি,
জবাফুলের গাছ আমার উঠানে নেই
আমি পুষ্পবৃক্ষহীন হয়ে যাচ্ছি!

অগ্রহায়ণের মাসে আামার উঠানে গতবার
ধান তুলতে পারিনি,
এবারও কি তুলতে পারবো?

বাসন্তী রঙের কাপড় যাদের মানায় না
তারাও কি এবারও বসন্ত উৎসব করবে?
কাসুন্দির ঝোল নিয়ে–
ভাত মাখানোর ইচ্ছে হলেও কি
সেই ইচ্ছে আমার পূরণ হবে?

আমরা কোন্ কালস্রোত নিয়ে ধরাধরি করি
সেখানে স্নান সেরে নিজের ঘরেই উঠতে পারিনা!

 

নরম কাঠ

কষ্টে কষ্টে ভারী হয়ে আছো
ও নরম কাঠ!
কী সান্ত্বনা দেবো?

পোকামাকড়ের হুল ও কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত
এরপর একটানা দুঃখ-কষ্ট নিয়ে
থেমে থেমে কোন্ ধ্বনি উচ্চারণ করো?
আষাঢ়ের পর ভাদ্র মাস চলে যায়!

তুমি ছিলে সেই স্বপ্নচারী
মহাশূন্যযান নিয়ে একা
চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করার কথা ছিল,
চোখ-ধাঁধানো স্নিগ্ধতায় ভরে যাবে মন!

এখন কীসের সান্নিধ্য ও সংসর্গ?
উদ্ভিদ লালনকারী কোনও ভূ-স্তর নেই আজ
মৃদু চরণে কী বরণে শুধুই হাঁটছো!

 

রোদেপোড়া কষ্ট

রোদেপোড়া ইট ও পাথরের কষ্ট নিয়ে আছি
হাঁটু পর্যন্ত উঠে আসে দুঃখ!

হাত ও পায়ের বেড়ি পরি কোন্ উপকূলে?
নদী ও সমুদ্রের জল স্পর্শ করা বা
তীব্র ও আকুল আকাক্সক্ষা নিয়ে
ত্রিমাত্রিক দুঃখ ছড়িয়ে পড়ে।

ভার বহনে করছি কার? যার তার!
ক্রান্তি অঞ্চলে রোদ থেকে মাথা বাঁচানোর
বিশেষ কোনও শিরস্ত্রাণ নেই!
ডান পা বাঁ পায়ের সাথে বাঁধা
কীভাবে হাঁটবো?

দীর্ঘ বিলাপের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আর্ত-চিৎকার!
শিকারি কুকুরেরা নিয়ন্ত্রণ করছে সময়!

 

শিলাতত্ত্ব

কালি ও কলম আছে
লিপিকুশলতা নেই কেন?
মেধা ও গুণপনায় চোখ খুলে তাকানো সম্ভব
কিন্তু তাকাচ্ছি না!

দরজায় বা জানালায় সামান্য উঁকি দেবার স্থান নেই
সেখান দিয়ে পূর্বেই আগমনকারীকে
সনাক্ত করা যায়।

দুধে ও ঝোলে ভিজানো রুটি পেয়ে
পিঙ্গলবর্ণের ঘোড়ায় চড়ে
জাদুকরের স্পর্শে জ্ঞানশূন্য হয়ে যাচ্ছি
আমাদের ভিটেমাটি ও খনিজ হারাচ্ছি!

কার সাথে ঘনিষ্ঠতা?
বরফের মসৃণ বিস্তার দেখে হাঁটছি
এবং পিছলে পড়ছি
অর্ধতরল কাদামাটির মধ্যে!
তারপর শিলীভূত বা প্রস্তরীভূত হওয়া?

 

দিবাস্বপ্ন

তুমি কোন্ কামিনীর কোলে?
টিমটিম আলোতে ছায়াচ্ছন্ন হয়ে ওঠ?

জায়ফল নিয়ে
নলখাগড়ার বন পেরিয়ে এসেছো এইবেলা?
ইষ্টি বৃষ্টি নিয়ে আসে?

উৎসব পেয়ে উঠে পড়েছো কি কোলে?
খানিকটা সুখস্পর্শ পেয়ে ভেসে যাবে?
মনে নেই কালাজ্বর, পাণ্ডুরোগ, স্বাসকষ্ট
কিংবা পক্ষাঘাত?
প্রমোদবিলাসে সবকিছু ভুলে যাবে!

কোন্ রসে হয়ে ওঠ পক্ক?
সখ্য কার সাথে গড়ে তোল?

হৃদয়বাসনা আছে বলে
আকাশকুসুম দিবাস্বপ্নে মজে যাবে?
অংগুমালা কি নেই এখন?
জলনিধি হতে গিয়ে–আনন্দবিহ্বল হওয়ার কথা ছিল!

কামিনী কি কালসাপিনী হয়নি কখনো?

 

জলপান

ঢলাঢলি করে ঢল নামালে নদীর
জলপান করো!
কার হাত ধরো?
লাবণ্যপ্রবাহ!
নাকি শুধু দাহ!
কোন্ অনুরাগে আজ হয়েছো বধির!

টলমল ভাব নিয়ে কামার্ত শরীর
পাত্রে তলা সরু!
ভূমি আজ মরু?
পাকা জামে রস!
নাকি শুধু কষ!
কলসীতে মধু নেই–অভাব দধির!

কোন্ বাতাসের কোলে আজ ঢলাঢলি
রূপ রস ছাড়া কেন হও শুধু বলি!

 

তোতলানো ও বধির সময়

আমার পুরনো ঘর আরও পুরনো হয়ে যায়
এই গ্রীষ্মকালে!
যে দোয়েল ঘরের কার্নিসে এসে পুচ্ছ নাচাত
সে এখন আসেনা।

পযুদর্স্ত হলে যা হয়
জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য উপকরণে টান পড়ছে,
স্পর্শকাতর বিন্দুর মধ্যে
অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা প্রাণ পেয়ে বড় হতে থাকে,
আছড়ে পড়ে তরঙ্গপুঞ্জ
কুঞ্জ তখন ধ্বংস হয়ে যায়।

ভূগর্ভস্থ এলাকায় অন্ধকার আশঙ্কার শিরোনাম হয়ে ওঠে
উপশিরোনামও তৈরি হতে থাকে,
বন্ধুবেশী বাদুড়েরা
জৌলুসের সঙ্গে রাজকীয় ভাবে
প্রবৃত্তিজাত প্রবণতা নিয়ে উন্মাদপ্রবণ হয়ে ওঠে,
তাদেরও চিনে নিতে হলো তোতলানো ও বধির সময়ে।

 

দূরকল্পী দর্শন

কোথায় থামতে হয়
তা তারা জানে না!
কাঠিতে জমাট রস পেয়ে
পাকস্থলী পূর্ণ করে-উঁচু টাওয়ারে বসে।

এরপর কি তারা
হরিণের রান খাবে আগুনে ঝলসিয়ে?
শিকারি কুকুরকে শিকারের পিছনে লেলিয়ে দেবে?

কার প্রয়োজনে–
সড়ক ও রেলপথ পাকা করবার জন্য
নুড়িপাথর আনা হচ্ছে?
অপাত্রে কি বর্ষণ শুরু হবে?

পরিকল্পনার স্তর পার হয়ে
বাস্তবায়নের স্তরে কী প্রবেশ করছে?
দৃষ্টি ও কর্ণগোচর কিছুই কি হচ্ছে না?
সর্বোচ্চমাত্রায় হতবুদ্ধি হয়ে পড়লে
দূরকল্পী দর্শন কি থাকবে?

কোত্থেকে এসেছে? কোথায় তাদের বাড়ি?
তারা কি রোগ নিরাময় কেন্দ্র খুলতে পারবে
যে এলাকায় মহামারী!

প্রচণ্ড দুঃখ, তীব্র শোক ও মর্মপীড়ায়
কেঁপে কেঁপে জ্বলা মোম নিভে গলে যাচ্ছে!

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *