গোলাম কিবরিয়া পিনু

ও বৃষ্টিধারা ও বারিপাত


রজনীজল এসে ভিজিয়ে তোলে
অঙ্কুরও গাছ হবার স্ফূর্তি পায়
প্রভাহীন আলোহীন অবস্থায় তৈরি হতে থাকে
বাঁশঝাড়ের ভেতর অশথ।


পর্বতের গায়েও আজ বৃষ্টি
এতদিন পর্বত ধুলোবালিকণা নিয়ে রুক্ষ ছিল
পর্বতচূড়া ভিজে ভিজে আজ কান্তিময়
সৌম্যদর্শনে নয়নশোভন।


উদ্যানরক্ষক জানে জলের মাহাত্ম্য
মালিনীও জানে
কুঞ্জবনে তাই জলের অন্তরা নিয়ে
সকল গানের সূচনা।


টলটলে জল
কাকচক্ষুর মতো নির্মল জল
সূর্যরশ্মি নিয়ে নাচে
ঘোলা জল এসে হারিয়ে যায়।


জলভ্রমণে গিয়ে জলকেলি
জলকন্যা তার স্বপ্ন মাখামাখি করে
মিশে যায় জলগর্ভে
জলগর্ভ থেকে সুজলা ফসল।


ও বৃষ্টি তোমারও সুর আছে গান আছে
আছে রাগের বজ্রপাত
কখনো চপলা মেঘজ্যোতিঃ
ক্ষণদ্যুতি নিয়ে কখনো চঞ্চল
অঞ্চল বিছিয়ে দিয়ে কখনো নীলাঞ্জনা।


জলের কপটতা নেই, জল কৈতব নয়
জলের প্রবৃত্তি প্রকাশ্য
অসংকোচে ধরা দেয়, সরলচিত্ত নিয়ে
তার গতিতে–তার প্রকৃতিতে দিলদরিয়া।


জল বাষ্প হওয়ার পরও বেঁচে থাকে
অভিমানে দূরে গিয়ে মেঘপুঞ্জ হয়
বৃষ্টির সুষমা নিয়ে আবারও ঝরে
এই মৃত্তিকায়–অন্তরের সৌন্দর্য
বার বার ঢেলে দেয়।


জলের গভীরতা ও বিস্তার দেখে
মনে হয় সুমেরু-কুমেরু সবমিলে
অকূলপাথার–
কেউ দূরে নইÑজলবৃত্তে আছি
চারদিকে জলেশ্বর।

১০
ও বৃষ্টিধারা ও বারিপাত
হাহাকার নিয়ে
তোমার অপেক্ষায় বহুদিন
এ শ্রাবণের রাত।

 

সমুদ্রহৃদয়


জল পেয়ে তেজি হয়ে ওঠে বানমাছ
সেতুর খুঁটিও টের পায় স্রোত
নদী-প্রপাতে চলার উত্তেজনা
জলযোগ আজ বরষায়।


জল পেয়ে ধুপধাপ-লাফালাফি
দুরন্ত বালকেরা উদ্বেলিত
উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে চঞ্চলতা
দিনদুপুরে–ভরদুপুরে।


মেঘধ্বনি শুনি–বৃষ্টি আসবে
কূলবতী অপেক্ষায় থাকে
জলের দুলুনি নিয়ে–এইবার
মেঘনার মোহনায় যাবে।


কুহেলিকা মেঘ নয়
জলোমেঘ বৃষ্টি নিয়ে আসে
ধূলোর এ পথে ধূলো থাকে না
প্রশান্তির শীতল বাতাস।


জলের উদারতায়
শিশু উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে
পুষ্পরেণুর জন্য তৈরি হতে থাকেÑ
আয়ুষ্কাল বাড়ে।


সমুদ্রহৃদয়ে কত জল
কত জলধারা এসে মেশে
পৌঁছে প্রপাত ও উষ্ণপ্রস্রবণ
এরপরই সে জলেশ্বর।


জলবিয়োজন হতে হতে খরা
রসহীন পলিমাটি
অথচ এ মাটি এসেছিল
নদীরও জলে।


উথালপাথাল জলে উচ্ছলতা
নির্জীবতা থাকে নাÑ
জলের অভাবে মুষড়ে পড়া
নদীও কাঁদে!


জল এলে নদীর দুকূল ভরে যায়
দুকূল আপন ভাই
বিভাজন ও বৈষম্য থাকে না
জলের ধারায় পূণ্যতোয়া।

১০
বাদল হাওয়া বদলায় দিন
জলগর্ভের ভেতর তরুরাজ জন্ম নেয়
এইভাবে স্বর্ণপুষ্প ফুটতে থাকে
চারণভূমিতে।

 

জলেরও উদারতা নিয়ে জাগে মহাপ্রাণ


বৃষ্টিমুখরিত রাতে মুখরারমণী
মুখর হলে প্রকৃতিও কষ্ট পায়
মেঘবহ্ণি আগুন ছড়ায়।


শজিনার পাতা ভিজে ভিজে ব্যাকুলতা তৈরি করে
কামরাঙা জল পেয়ে কীসের ইঙ্গিত দেয়
বাসক পাতার ভেতর ! রক্তচিতার ভেতর !
জলচেতনার ছায়া খেলা করে।


মজাপুকুরের জল আনো টেনে
এঁদোপুকুরের খিঁড়কিদুয়ার খুলে দাও
স্রোতস্বিনীর সঙ্গে সম্পর্ক করো
কল্লোলিনীর হাত ধরে নেচে ওঠ।


চোখ আজ আর্দ্র, জলসিক্ত চোখে
পূর্ণগ্রাস, জল নেই
শোকভূমি তৈরি হয়
ধূ-ধূ মাঠে মৃগতৃষ্ণা নিয়ে থাকি।


বৃষ্টিপাতের পর ভূমিকর্ষণ
লাঙল দেওয়া
কৃষি জমি জেগে ওঠে
কৃষকের ভেতর শস্যোৎপাদনের অরণ্যপুষ্প।


জলকাদা মেখে ভদ্রলোকের পা
যেতে পারে না বিজয়নগর থেকে শান্তিনগর
পাথুরে মাটিতে থাকতে থাকতে
স্বভারের দোষ–মোষ হয়ে যায়।


জল নিয়ে গিরিমাটিও সিক্ত হয়
কাঁকুরে মাটিও প্রাণ পায়
পলিমাটি ঘ্রাণ ছড়ায় ফসলের
জলছাড়া মৃত্তিকা শুধুই পরিত্যক্ত ভূমি।


মরুভূমি–তার কাছে জল নিয়ে যাও
জলের উপরে থেকেও সে নিঃসহায়-বন্ধা
মরুমায়া থেকে শুধু মরীচিকা দেখা যায়
জলের অভাবে বৃক্ষহীন।


হাতে জল নাও, জলে
হও পরিষ্কার, ঘরে কাদা-পায়ে
কেন? কেন ম্রিয়মাণ?
শরীরে তোমার লেগে আছে ঘিনঘিনে ময়লা ও গন্ধ
জল দিয়ে ধোয়াপাগলা করে নাও।

১০
জলের উদারতা নিয়ে
জাগে মহাপ্রাণ
বৃষ্টিজল–প্লাবনের জল
এসে মিশে যায়, এরপর–
সমুদ্র-হৃদয়।

 

রাঙামেঘ


রাঙামেঘ আজ রাঙিয়ে তুলেছে
রজনীজলের দেখা হবে
স্থলজাত-ধুলোমাখা থাকা যাবেনা এখন
কাঁকুরে মাটিও ভিজে যাবে
অগ্নিদগ্ধ জীবাশ্মও আজ প্রাণ ফিরে পাবে
জল ভেঙে ভেঙে যাওয়ার বর্ষণমুখর সাহসটুকু
হাঁটু ভেঙে পড়বে না !


অবশেষে মেঘজমা হলো
অতঃপর  আকাশভাঙা বৃষ্টি
বালুচর ডুবে গেল !

আমি কাদামাখা হয়ে ঘরে ফিরি

বালুকাবেলার চেয়ে
মজাপুকুরের চেয়ে
জলপ্রবাহ কি ভালো নয় ?

জলের হৃদয় জাগে আর এক হৃদয়ের মাঝে
তরঙ্গতাড়ন সাঁঝে !

 

বর্ষাভেজা দিন

লালপদ্ম তুমি ভিজে যাচ্ছো
বৃষ্টির ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে !
বর্ষাভেজা দিনের জন্য কি
এতদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলে ?
বীজপত্র হয়ে আবার আসবে কি ফিরে ?

এইবার সৃষ্টিমূল ভুল ভাবে  নয়
অজগর উপযোগী খরামগ্ন দিন নষ্ট করে
রোপণ করবে কি হাঁটুস্পর্শ করা কোনো
নতুন বিস্ময় !

 

উতলধারায় সম্মোহন

নীরদবাহন নিয়ে আমি আজ আসি
কাঁকুরে মাটিও ভিজে যাবে
ভিজে যাবে এঁটেল মাটিও
মরু তার দুঃখ ভুলে যাবে !

বৃষ্টিবিন্দু দিয়ে শুরু
উতলধারায় সম্মোহন
শুশ্রূষাকারী বুঝেছে চিকিৎসার অতীত জলেভেজা
চন্দ্রাহত রোগ !

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।