ফানুসের আত্মা: তুষার চৌধুরী


রমিত দে

পারসিস্টেন্স অফ মেমোরি। সালভাদর ডালির ছবিটার কথা মনে করা যাক। যেখানে টু ডায়েমেনশানে স্বেচ্ছা নির্বাসিত  ফোর্থ ডায়েমনশনের জীবাশ্ম ।  শিল্পী সেখানে স্মৃতিকথাটির মত; সময় সেখানে ক্লান্ত, গলিত, আপেক্ষিক, নিজের কাছেই স্পষ্ট নয় উত্তরজাতকের  বিশাল বন্দীত্ব। ঠিক এ জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন শিল্পী একজন কবি চূর্ণ মনসিজ নিয়ে ঠিক কি করতে পারেন?  বনকুসুমের মত শোক! ইউনিভোকাল অ্যাটিটিউট নিয়ে স্বপ্নের পরিচর্চা! প্রাকজন্মের উৎসব! নাকি খুলে ফেলবেন দৃশ্যমান বয়ন ও বিকারের গায়ে লেগে থাকা পীত চৈত্রের কারখানা!  দেখবেন বড়শীতে গেঁথে গ্যাছে তার নিজেরই কিছুটা,  কিছুটা মধু ও মুখোশ, সমুদ্র ও লোনাজলে উড়ালবর্তী দীর্ঘতা রেখে ফিরে যাচ্ছে জীবিত কাফন হাতে! তুষার চৌধুরির চশমা ছিল কিনা জানি না, তুষার চৌধুরি ঘুড়ি ওড়াতে পাড়তেন কিনা  জানিনা, কিন্তু  ছাদে ওঠা বারন ছিলনা তাঁর, বারন ছিলনা টাল খেয়ে পড়ে যাওয়া মাংসের নিভৃতে, আর রেটিনার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে একে একে খুলে ফেলা অতীন্দ্রিয় আলোকমিতির;  হয়ত তাই এই পত্রমর্মরের দেশে তাকে আমরা পাই সেই দ্রষ্টার ভূমিকায়, যার শোক পাতাঝরার জন্য নয়, বরং জমার মধ্যে তিনি খুঁজে নিলেন প্রাচুর্যের স্মৃতিফুলকি, প্রতারক ইয়োগোর মস্করা; অন্তর্বাস খুলতে খুলতে অমরতার কথা তিনি বললেন না, নাগরিক বিরক্তিকে, তেতো টক মিঠে অস্থিচর্মসার পচনশীলতাকে কম্যুইনিকেট করলেন তাঁর তুহিন শব্দে,  নির্মোহ অথচ সচেতন কম্পাঙ্কে। সত্তরের দশকের দিকখোলা  অঙ্গারবর্ণ আর অন্তর্ঘাতী কবিতা ক্লাসে তুষার চৌধুরীরই মনে হয় সেই একমাত্র ছাত্র যিনি নিজেরই মুখোমুখি বসার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন অবিমিশ্র আনন্দ, ভেঙে খানখান করেছেন নিজেকে নিজেরই নিঃসঙ্গতায় নির্জনতায়; চেনা বর্তুল ফেলে তুলে নিয়েছেন অচেনা ব্রহ্মাস্মিকে, জীবন ও জীবাশ্ম– সবটুকু নিয়ে সে যেন এক বিপদ্দজনক ট্রেকিং। শূন্যতাকে একটু বেশী ভরসা করতেন তুষার, যে শূন্যতা তার বিশ্বজগত তাঁর অন্তর্গমন তা কিন্তু অপরিপক্ক শ্যামদেশের নয়। হাজামজা গন্ধহীন প্রতারক বস্তুজগতের সামনে তিনি সমাধিফলকের মত উদাসীন, তাই তার শব্দের ঠাস বুনোটে বারবার জারিত হয়েছে অবিশ্বাস; বিরতিহীন দুঃস্বপ্নের কাছে তিনি ছুঁড়ে দিয়েছেন নির্লিপ্ত ন্যুডিটি; কবিতা তাঁর কাছে সুপাচ্য নয়, স্বপ্নের নথি হয়ে আসেনি; সে যেন সংগমহীন অন্ধকারে অপেক্ষা করছে বিদ্রুপের ফুলদান নিয়ে। ব্রা-বিহীন, ক্যুইজসফল প্রাত্যহিকতায় কবিতাকে পুষ্পিত জাগরণের বদলে প্রথাভঙ্গকারীর ভূমিকায় রেখে দু হাত শিথিল করে লিখে গেলেন-…

“কে বলে কবিতা আসে? কিছুতে আসে না ।/ সে শুধু হাওয়ায় তার দুটো একটা উচ্ছন্ন পালক ছুঁড়ে মারে ।/ কে বলে কবিতা আসে? কখনো আসে না / হয়তো হঠাৎ কোনো দুর্জ্ঞেয় দেশের ডাকটিকিট/ পাঠায় তোমাকে রামধনুর খামে”…

শুরু থেকেই নিজের আদলে তুষার চৌধুরী তৈরী করে নিয়েছিলেন একটা লার্জ স্কেল হ্যাবিটেট  একটা অটোক্র্যাসি যা মরমী নয়, ভাববাদী নয়  ডুবজলে অথবা ভাসমান নয়, এক ছিন্নমূল তার স্বরূপদীপ্তিতে, অ্যাবস্যুলিউট রিলেভেন্সের দিকে যা জড়ো করে রেখেছে কবিকে, কবির পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধিকে। এটুকুই তুষারের নাতিশীতোষ্ণ, তার নিজস্ব ভঙ্গি– যেখানে  মেধাবী উৎসর্গপত্রে উঠে আসে আশ্চর্য চেতনার মৌল, স্বাদকোরকে লেগে থাকে উদাসীন সামান্যতা, সেরিব্রালের সবটুকু। ঘন গভীর বহুব্রীহি ধ্রুপদীয়ানাতেই তাঁর আলোকিত সুড়ঙ্গটি বারবার শব্দের জুয়া দৃশ্যের জুয়া নিয়ে বসেছে প্রয়াসহীন পাথরটির পাশে, বিলুপ্ত হবার আগে পূনর্ণবীকরনের জন্য। স্থপতির মত তাঁর সেই পথ সেই প্রতিষেধক যা চিরন্তন অথচ অচিন্তনীয়, যেখানে মৃত্যুকেও বাঁধতে চাইলেন তাঁর দ্রাক্ষাপুঞ্জে , আনন্দ অস্তিকে–“উজ্জ্বল কবিতা কিছু লেখা যাবে শীতে/ উন্মাদ প্রমেহ মেহ ভালোবাসা নিয়ে যদি আরো কিছুদিন/বেঁচে থাকা যায়/ স্বপ্নে উড্ডয়নপটু ডানায় ভর করে আমি গঙ্গা নামে বেশ্যার বিছানা থেকে/ উড়ে যাবো শৈশবের ডালে/ বাঁচার উৎকন্ঠা থেকে দেখা যাবে মৃত্যুর মাদক”-;

অসামান্য মেধা আর সাথে মেশালেন ক্লাসিকাল  শ্বাসবায়ু, এক বিস্ময়কর ধ্রূপদী মেটাফরে অক্ষরবৃত্তময় বাংলা কবিতার সুশীল বনভূমিতে নিয়ে এলেন সেই কাঙ্খিত মেটামরফোসিস, অ্যাসিড রেইন, যা চিরাচরিত পোশাকী পেলব কবিতার রন্ধনশালাকে বিপরীত অবরোহনের দিকে ড্রিল করল; আনন্দের অনুসরণকারী কবি নন তুষার, তিনি শ্লেষের দ্বারা পরিক্ষীত;স্বপ্ন তাঁর কাছে অস্বপ্ন, মেয়েমদ্দ সবই পোকাপতঙ্গের সমূহ, ইমপারফেক্ট ব্যালেন্স থেকেই দেখতে চেয়েছেন মাছের খাবার, ফাৎনার চরিত্র, আর রীতিভাঙ্গা ফাটলের ডিক্টেশন, তাঁর কাব্যভাষা যেন তার ইন্দ্রিয়ের সংস্কার, পঙ্গু পাঠকের সমর্থনের হাত সেখানে নেই কিন্তু দীক্ষিত কবির চরাচরপ্লাবি গভীর রহস্যলিপি খুলে দেওয়ার অভীপ্সা আছে। বাংলা কবিতার পাঠকের আয়কর ফাঁকি দিয়ে তুষার চৌধুরীই লিখতে পারেন “মাথার ভেতর অতিজটিল জ্যামিতিঘেরা পাখি কুঁকড়ে পড়ে আছে”– আর তাই দু পা ফাঁক কবিতা জগতে তাঁর এই স্বেচ্ছাচার এই কল্লোল যে সংস্থাস্বীকৃত হবে না সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।

১৯৭৯ তে গৌরব প্রকাশনী থেকে প্রকাশ পেল তুষার চৌধুরীর প্রথম কবিতার বই অলীক কুকাব্যের রঙ্গে, অর্থাৎ বাংলা কবিতার এমন এক সময় তিনি কুড়োতে এলেন বোধের ব্যঞ্জনবর্ণ, বিশ্বপ্রবাহের রাইজোম যখন মূলস্রোতের কবিতায় প্রতিষেধক হিসেবে গ্রাহ্যতা পাচ্ছে নৈরাজ্যবাদ আর প্রগতিতত্ত্বে আক্রান্ত কবিতা, আত্মক্ষয়ী কবিদের সমাজসচেতনার উল্লাস দিয়েই চেষ্টা চলছে সাহিত্যের তিমিরহননের। বলা যেতে পারে,  ১৯৭৩ এ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সাথে যুগ্মসম্পাদনায় ‘স্থানাঙ্ক’ করার পর ১৯৮২’র শুরুতে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা কবিতা দর্পণেও ছিল এই নতুন জলবায়ুর খোঁজ। সেখানে পরিমার্জনাই ছিল মননের প্রাথমিক সংজ্ঞা; তার নিজস্ব ভাষায়– “মানূষের সঙ্গে কবির যতটা ফারাক মানুষের নেশার সঙ্গে কবির নেশার ততটাই ফারাক”; আর এই ফারাকটুকুই যেন কবিতা  দর্পণের , বাজারী হট্টগোল থেকে সহজ মানুষের হাট থেকে কিছুটা এগিয়ে এসে হেমারেজে ভরে নেওয়া নিজেরই আয়না, নিজেকে টুকরো টুকরো দেখাবার খেলা; অনুকরণ নয়, ‘মাংসের তল্লাট জুড়ে মৃত্যুর আতর কানে গুঁজে’ অনুশীলন করতে এলেন চেতনঘরের সেই অকোলাহল, সেই অনির্দেশ্য অলীক ভগ্নাংশ, যেখানে অসংশোধনীয় সত্য ছাড়া কবির কাছে আর কোনও অন্ত্যমিল নেই। ভাটায় ভেসে থাকা সেই আবহমানের কাদাটিকে কুয়াশাটিকে সনাক্ত করতে চাইলেন যাকে কেউ চিনলো শোকতাপ হিসেবে কেউ  নিরেট শুভ্রতা , আর তুষার চৌধুরীর কাছে তাই যেন কৃষ্ণবর্ণ আততায়ী, রামপিথেকোসের হাড়গোড়, চিরপ্রবাহমান কবিতাকল্পে স্বপ্নাদিষ্ট ডুবুরী হয়ে তুলে আনলেন গূঢ় বির্বতনের উৎসব; অমরত্বের নীল মাংস নিয়ে শৃঙ্খলিত মানসসাধন ছেড়ে , আবহমান বাংলা কবিতার তৃণভুখ স্বজ্ঞা ছেড়ে  যৌক্তিক করলেন শুদ্ধচৈতন্য, আত্মক্ষয়ী প্রসাধন থেকে নির্জন না হয়েও লবন ঘেঁটে বের করে আনলেন মুক্ত পয়ার।সেই প্রথমতা সেই আত্মবৃত্ত সেই বিচ্ছিন্নস্বত্তার ভেতর ধরার মত কিছু একটা যোগসূত্র , মৃত্যু ও জন্মের শেষে শোক ও বিষাদের শেষে নতুনভাবে অর্বুদ বোতাম খুলে দিয়ে তরল দর্পন নাড়িয়ে দিয়ে দেখাতে চাইলেন তাঁর তেজস্ক্রিয়তা তাঁর ভ্যারিয়েশন। -“কেন এই রক্তচিহ্নহীন অন্ধকার/ঠিক বারান্দার নিচে কার প্ররোচনা/তবে কি দুঃখের ছায়া গোপন সঞ্চার নেমে এলো/দুঃখ তো এমন কিছু তীব্র নয়/ প্রত্যেক শরীরে/তবে কিছু দীর্ঘশ্বাস রক্তাল্পতা ব্যর্থ অভিসন্ধি ছেয়ে আছে/ এসব বিবিধ পরাজয় মানবিক/তবু আমরা সকলেই এসবের বিপরীতক্রমে হেঁটে যাই/ মৃত্যুর বিপক্ষে যাই বাগানে অথবা /এই ত্রস্ত সময়ের থেকে মগ্ন শৈশবে”…। জলদোলায়িত গুল্মের মত ভাসতে ভাসতেই বাংলা কবিতার গন্ধমুষিকদের বিপরীতেই হেঁটেছিলেন তুষার। তাঁর মেলানকলি আসলে গূঢ অহংকার, প্রেত জীবিতের ভেতর নবীন জেগে ওঠা, জলের টলটলের মত তীব্র বিদ্রুপ ব্যঙ্গ অসহায় সহবাসভূমির দিকেই। মুক্ত বাজার দখল করতে চাননি তুষার, মৌতাতহীন রং তুলি নিয়ে নেমে পড়েছিলেন ভেতরবাড়ির বিন্যাসে যেখানে শব্দহীন পাতাটাই খুঁজতে থাকে স্বপ্নাদিষ্ট কবির দলছুট রূপান্তর । যেখানে কোনো কমপালসনস নয়, কোনো কনসাস নয়,  মিহি মোলায়েম নয়, জিরাফের মত এক ইনফাইনাইট অস্তিত্ব পেতে চেয়েছেন কবি। অস্তিত্ব! নাকি সুন্দরের স্বরূপ ব্যাখায় অনস্তিত্বই ছিল তুষারের টেক্কা? পর্ণমোচী সমাজ উরুজন্ম আর বিবাহের মাঝে কালি ঢেলেছেন, এলোমেলো আঁচড় কেটেছেন, সূর্যগ্রাসী প্রশ্রয়বোধেই কৃষ্ণগহবরের আকর দিয়েছেন তেষট্টি বছর ধরে। সাতপাতালের সুড়ঙ্গলোকে বারবার টের পেয়েছেন কবিতার আততায়ী ত্রাস, তার পোড়া দুর্গ; সিন্থেটিক কবিতার কাছে এসে বারবার অপ্রকৃতিস্থ হয়েছেন  তুষার চৌধুরি।

প্রথম বই অলীক কুকাব্য রঙ্গে থেকেই একধরনের নাগরিক সলিলিকি, নশ্বর কবিতার অপুষ্ট ভ্রূণের প্রতি লাভা ওগড়ানো,  কবিতার মমিগৃহ থেকে কবিতার মুক্তির দিকেই বরাদ্দ হয়েছিল তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা।  নদীকে পেরিয়ে গেলে পড়ে থাকে কেবল যে সেতু যে প্যারাবলিক শূন্যতার ধারণা, প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই তুষার দেখালেন সেই অলীক  অপচ্ছায়া, সেই  ছদ্মবেশে মুদ্রিত সাইডব্যাগটি, যেখানে তোলা আছে বাজারপ্রাঙ্গন-ফুলদানী আর ফড়িং এর অবয়বে এক সাররিয়াল ইকোনোগ্রাফি; বাকুনিনের কালেক্টিভ অ্যানার্কিজমের ভঙ্গিতেই যেন অস্বীকার করতে চেয়েছেন সমস্ত প্রাথমিক অস্তিত্ব যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সলিটারি সেল, যার ভেতরই সেই অনুশীলিত জন্মবীজ, বার বার এই রক্ষণশীলতা থেকে এই ভীরু ইমেজ থেকে বোবাযুদ্ধে নিজেকেই নিজের প্রতিদ্বন্ধী করেছেন তুষার, ভালোবাসার সূর্যমূখী  বীজকে অস্বীকার করে দাবী করেছেন পাথর আর আবলুশের স্বর্গ; সত্তরের মাঝামাঝি এই স্বঘোষিত বোহেমিয়ানিজম একান্তই তুষার চৌধুরীর। সাথে হাসি ও মস্করার কিছু জার্ক, আসলে মৌতাতের ভেতর দিয়েই তামাশার ভেতর দিয়ে তাঁর এই নতুন কবিতা, যা এক অর্থে অশনাক্ত বললেও ভুল হয়না, আধুনিক বললেও। যাবতীয় ক্ষুৎকাতরের মধ্যে বিপন্নতার মধ্যে ব্যঙ্গকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন নির্বিকার বুজরুকি হিসেবে, কবন্ধের মত জলের ভেতর সে যেন নিজেকে ভাসাবার খেলা, একটা মিথ্যে প্রতিরোধ, ছক্কাহীন তুষারের এই লূডোখেলা এই ভাঁড়বিদ্রোহ মৌলচিন্তাপ্রনালীকে তাচ্ছিল্য করে যেন সাইকোঅ্যানালিটিক ক্রিটিসিজম, যেখানে অনায়াসে বলতে পারেন-

“রোমিওকে বেঁধে রেখে ঠোঁট কামড়ে জুলিয়েটকে বলি/ ঘুরে ঘুরে নাচো/ বুদ্ধকে সাবধান করি বারবার , মহাশয়, আপনার অঢেল/ অনুকম্পাহীন হসি দেখলেই গা পিত্তি জ্বলে যায়/ বর্ষাতি গামবুট পরা ভারভারিক্কি কণিষ্ককে দেখে / সান্ত্বনার মতো বলি, হে রাজন, কেঁদো নাকো খুঁজো দেবো মাথা”…

দর্শনকে তিনি দিলেন এক অতিরিক্ত, সিদ্ধির অধিক সংক্রমণের অধিক; কবিতার জীবন তার জনন-উৎসের টেন্সরগুলোকে ভাঙা ও গড়া থেকে ছুঁড়ে দিলেন লুপ্ততার দখলে, সংরক্ষণের বাইরে পরিকল্পনার বাইরে শব্দকে বোধকে দ্বিতীয় বন্ধনী থেকে ছুঁড়ে দিলেন চিরায়ত পারমুটেশনে যেখানে কবিতা যতদূর যাবে ততদূরই রেখে যাবে ধরতে পারার মত এক  অধরা জ্যোর্তিবলয়।  কাব্যসংস্কারহীন, উদাসীন, চৌহদ্দী পেরোনো উপাসক ছাড়া এই চিন্ময় প্রক্ষেপ আর কার দ্বারা সম্ভব? কবিতা দর্পণের সম্পাদকীয়তেই এই সিগনেচার এই আত্মজ্ঞান লক্ষ্ণণীয়–“কবিতা যে যুথচারীদের শোরগোল নয়, নিঃসঙ্গের আত্মনিগ্রহ, এ কথাটা একজন কবিই জানে। কবিতা লেখা হয়েই চলেছে, অলক্ষ্য নির্দেশে। কবিতা লেখা অত সোজা নয়। কবিরা সংখ্যায় বেশি হয়না; দুই কবির মধ্যে কুস্তি হয়না। প্রকৃত কবি জানতে চায় বিশ্বের বিচিত্র কবিদের মাঝখানে তার স্থান কোথায়। প্রকৃত কবির  ঐতিহ্য সম্পর্কে ও অপর প্রকৃত কবির তুলনায় নিজের সম্পর্কে তুচ্ছতাবোধ থাকে । “ হয়ত একারণেই তাঁর মত পাঠাভ্যাস বদলে দেওয়া কবিও রয়ে গেলেন বুর্জোয়া মিডিয়ার চিরায়ু পাঠকের আড়ালে, চালু ল্যান্ডস্কেপের স্রোতফেরত হয়ে উপহসিত থেকে গেলেন যেখানে কবির সংখ্যা কম, প্রসারিত ডানার সংখ্যা বেশি , আসলে বোধের কোথায় কীভাবে জড়িত থাকবে এবং প্রবলভাবে জীবিত থাকবে এই নৈঃসঙ্গ্য জন্মবৃত্তান্তের পাশে তা শিখে নিয়েছিলেন তিনি, শিখিয়ে দিয়েছিলেন ম্লেচ্ছ পুকুরে সুগন্ধ সাবান নিয়ে উধাও হওয়ার সেই নির্মানপ্রক্রিয়া। সেই সামান্য পথিক হওয়ার খেলা যেখানে স্বপ্নের ভেতর আবিষ্ট হওয়া নয়, পথের মাঝে সন্মোহিত হওয়া নয়, বরং আরও এক অগ্রগমন, উচ্চতাভীতি নিয়েও আরও এক ডিপ ফল । -“আমিও একদিন হেঁটে নেমে আসি নদীর গভীরে/ নদীর গভীরে ছিল নাকি? প্যান্টলুনময় দুঃখ আংটির পাথরে নীল বিষ/ এসমস্ত ধুয়ে ফেলতে আরো নিচে নেমে আসি অনাব্য পলিতে/ যেখানে কর্কটগন্ধে উর্বরতা ঘুমিয়ে পড়েছে/ পলির গভীরে শুয়ে শেষবার মনে পড়ে দমবন্ধ শৈশব সাঁতার “… আত্মনিয়ন্ত্রণহীন তাঁর পুঁথিতে শব্দ ছিলনা, ছিল দ্রষ্টার সঞ্জীবনী , ধমনীর নিঃসীম পরিযোজনা, যা গভীরভাবে কেন্দ্রাতীত, বর্হিলোকের দিকেই যা চলমান, আর এভাবেই তুষারের কবিতায় গুছিয়ে ওঠা থেকে যেন এক নতুন জরিপে অমিল হতে হতে আসমানি হতে হতে বাংলা কবিতা পেল এক অনন্য ভাষাট্যুর ।

বিভিন্ন আলোচনায় দেখা যায় তুষার চৌধুরীর কবিতায় যৌনকাতরতার প্রসঙ্গ, রতি সোহাগের চিহ্ন উঠে আসে বিবিধ আলোচকের লিপিতে, হয়ত অনেকেই  বেআব্রু যাপনের সাথে তুলনা করেছেন এই উন্মুখ যৌন দর্শনের, কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি লিখলেন– “আমরা বোঝাপড়া করে শুয়ে পড়ি একটি বালিকের দুইপাশে/ দুজনেই ভাগাভাগি করে নিই একটি করে হাত স্তন উরু/…স্বৈরিণী হবার শিক্ষা পেয়ে মিষ্টি বালিকাটি খিলখিলিয়ে হাসে/আপ্যায়নকারী ঊরুবিস্তার বিষয়ে ওর প্রশিক্ষণগুরু” অথবা “কাবাব চেয়েছি আমি পঞ্চভূজে নারীকেও আদর করেছি/ একান্ত ভূখণ্ডে একটু বিঁধে আছে উনুনের নীলিম শলাকা”– তখন কেবলমাত্র পার্থিব যৌনচিহ্নের মধ্যে তাঁকে অনুধ্যাত করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনা; আসলে বিপন্নতা থেকে জলকনাগুলোকে ছিটকে দেবার জন্যই যেন এই  রতিসর্বস্ব অবজেকটিভ রিয়্যালিটি । এখানে যৌনতা স্রেফ জরায়ু অবদি নয়, জীবিতের সেই নিদ্রাপায়চারী অবদি বয়ে গেছে তার খরজিভ, আসলে এই জলমাটির পৃথিবীকে এই বন্দীশালাকে তিনি যেন অবজ্ঞা করতে চেয়েছেন জৈব প্রচ্ছায়ার ভেতর দিয়েই। যেন সামাজিক অবক্ষয়কে অভিঘাত করেছেন তাঁর নিজস্ব রঙ্গে; যৌনতা আসলে তাঁর সেই প্রান্তিক উচ্চারণ যা নিয়ে তিনি নির্মোহ হতে পারেন, যেন খাদ্যখাদকের এক চিরন্তন এপিসোডিক্যাল বোজাপড়াই দখল করে গুপ্তকথার শূন্যস্থান; ফ্রি স্পিচ অ্যাডভোকেটের দর্শনেই পাওয়া যায়  নিঃসঙ্গ যৌনতার উৎসমুখটি। ঠিক এ জায়গায় দাঁড়িয়ে মাঝেমাঝে মনে হয় তিনি নৈর্ব্যক্তিকতার কবি, আপতিক আবেগ বর্জনের কবি; এলিয়ট যেমন বলেছিলেন-“Poetry is not a turning loose of emotion, but the escape from emotion; it is not the expression of personality, but an escape from personality”-তুষার চৌধুরীও ঠিক তেমনি তার চারিদিকের কুসুমসমাজে আঁচড় কেটে নিয়েছিলেন এক নগ্ন স্নায়ুতন্তুর, শ্বেতসামগ্রীর।

আমরা আধুনিকতা নিয়ে কথা বলি। কথা বলি মেটাফিজিক্স নিয়ে, ডিকনস্ট্রাকশন নিয়ে, সত্তরের শুরুতেই কিন্তু তুষার চৌধুরী সে অর্থে আধুনিকতার জিপসি ছুটিয়ে গেছেন বাংলা কবিতার মেদবহুল আকাশগঙ্গায়।–‘জলের তলায় কাঁদছে যে রমনী/জলের উঠোনে ঘুরছে যে কচ্ছপ/ জলের আকাশে ক্ষিপ্র ছুটে যাচ্ছে যে-সব হার্পুনভীত মাছ/ একই সূত্রে গাঁথা হয়ে আছে/ জলের তলায় কাঁদত যে রমনী আজ সে কাঁদেনা/তার চোখ খুবলে নিয়ে সে নিজেই রেখেছে ঝিনুকে/জলের উঠোনে ঘুরত যে কচ্ছপ তার/মাংস লুট হয়ে গেছে, পড়ে আছে খোল/ জলের আকাশে ঘুরত যে-সব হার্পুনভর্তী মাছ/ তারা নিরুদ্দেশ- ডিম না পেড়েই, আস্তানায়/ খেলা করে অক্টোপাস, শুধু অক্টোপাস”… …এতো ভাঙচুর! শব্দগুলোর গায়েই শব্দগুলো মেলে যাচ্ছে পর্দা টানার শব্দ, প্রকৃত এবং অলীকের ভেতর পাঠক খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই রিট্রিট, ঘূর্ণনের ভেতর ধ্বনিসিরিজের  ভেতর সেই সদাবাহার শুঁড়িখানা যেখানে নোটিশবিহীন ঝোলানো হয়েছে খুশখবর মানুষের নিঃশেষ বিলীন; এ যেন শব্দের কাছে ইমেজের কাছে শব্দের ইমেজের সাক্ষাৎপ্রার্থনা! মুদ্রনকারু থেকে অনেক আগেই তুষার চৌধুরী তুলে এনেছিলেন পজিটিভ ক্র্যাফট, পোয়েটিক ডিকশনের মধ্যে আগাছা ঝরা পাতা সরিয়ে দিয়ে এক নতুন বাঁধাই।  স্ন্যাপশর্ট গেসচার বা অবজেক্ট নয়, একজন শিল্পীকে সোচ্চার হতেই হয়, ভেঙে ফেলতে হয় সুকোমলের হাতঘড়িটা ।  বারবার তিনি ফিরে গেছেন সেই অন্তর্জীবনের কাছাকাছি, প্রদর্শিতের বাইরে অত্যুক্তির বাইরে সেই স্পেস-টাইমগুলোকে পূর্ণবয়স্ক প্রহেলিকাগুলোকে  ধারানুসরনের থেকে বার বার সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছেন সেই পরাবাস্তববাদের দিকে যা আদতে এক বাফারের কাজ করছে  বস্তুজগত ও দার্শনিক বন্ধনের মাঝে।

ফলনশীল মানুষজন্মের কাছে এসে তার আর্তির কাছে এসে তিনি কোনো প্রত্যাখানের দিকে গেলেননা, স্মরণযোগ্য বিপ্লব বা অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতের দিকেও না, বরং ডোরাকাটা চামড়ার কাছে এসে শ্বেত শীতল আফশোসের কাছে এসেও তিনি খুঁজে ফিরলেন সেই জীবপ্রস্তর যা সংবেদী যা বিস্মৃতির পরও বিস্মরণের  । পোষমানা কাকাতুয়া না চেয়ে, চেয়ে নিলেন নুন ও চুনাপাথরের আয়ুরেখা। ঠিক এখান থেকেই তার তৃতীয় দর্শন, দৃশ্যমানতার ভেতরে তুষার চৌধুরী রেখে গেলেন মৌলিক তফাত। “যেকোনো শুদ্ধতা থেকে ভিজে ও স্যাঁতস্যাঁতে ছিদ্রে” ঢুকে পড়ে উপলব্ধি করলেন মাংস থেকে মুক্তি চাই, আর্দ্র আত্মা থেকে মুক্তি চাই, কবিতার থেকেও মুক্তি চাই’…। তুষার চৌধুরী আসলে প্রতিষ্ঠিত চৌহদ্দি থেকে বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন সেই ফান্ডামেন্টাল womb এর দিকে, অতিক্লান্ত চিরায়মান থেকে বারবার তার কবিতাযাপন  ঢুকে পড়তে চেয়েছে সেই বার্থ ক্যানেলে, যেন সেখানেই সেই অন্ধনীল প্যারাডাইস, কোলাহল নেই প্রয়াস নেই, কেবল ঢুকে পড়ে সরে আসতে চেয়েছেন । “অতীত সংগ্রহশালা রয়েছে বলেই সংবেদনা/মানুষের মৃত্যু হলে তার দুঃখ বাগান বসতি/মানুষসমাজে যায়- তবু,/যখন নিজেকে হত্যা করি/মনে হয় মারছি আমি নারীকে নদীকে বাহ্যতাকে”  দুঃখভার থেকে খুঁটে নিয়েছিলেন  চারদেওয়ালের মহাশূণ্য,  নৈঃশব্দেই খুঁজে নিয়েছিলেন নশ্বরতার বেলজার। এতসব অলীক জাদুবাস্তবতায় নিজেকে  ছোঁওয়াছে করে রেখে গেলেন সত্তরের সহজীবী।

একজন কবি কীভাবে তার বস্তুগত জ্ঞানকে ডুবুরির মত তুলে আনবে মূঢ়মতি বিপন্ন বিপুল থেকে এবং  মূলরোম থেকে কীভাবে তাকে ছড়িয়ে দেবে শিনবোনে তা সম্পূর্ণই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, কেউ আত্মার বিশ্লেষণ করেন কেউ আনন্দের, তুষার চৌধুরির মধ্যে দেখা যায় এক অদ্ভুত দ্বৈততা। তিনি মনোহারি সেলুলজ কুড়োতে চাননি ঠিক যেমন ভাবে চাননি আবেগধর্মী শীতযুদ্ধে যেতে;  প্যারাডক্সে যেতে , কেবল সংগ্রহশালায় তুলে রেখেছেন ভাঙাচোরা মাটিগুলো ভেজা ভেজা নির্বাচন গুলো ব্রথেলের ফিটাসগুলো, এই তার সহজ পথ , এই তার পূর্বনির্ধারিত অথচ অপরিজ্ঞাত। যার বাঁকগুলো নকশাগুলো ইম্যাজিনেবল স্পেলিংসগুলো আদতে জীবনদর্শনের মধ্যে দ্বিধার অবকাশগুলো দেখতে দেখতে যাওয়া, জন্মবৃত্তান্তের প্রকাণ্ড তামাশাকে মাপতে মাপতে প্রসূতিধামের দিকে যাওয়া।  সর্বদেশের সর্বকালের সৃজনপ্রক্রিয়াতে দেখা যায় কোনো কোনো কবি  পায়চারী করতে করতে হঠাতই চলে যায় নেপালী প্রেমের গানে,  আবার কোনো কোনো কবি তোষক আর বালিশে খানিক হেলান দিয়ে দেখে  নেয় অনুশাসনের শেকল থেকে কতখানি স্পেস সুইংডোর খুলে রাখা আছে;তারা চেতনার গাদ থেকে তুলে আনে মানুষের জ্যামিতি; এবং বাতিল ভ্রূন এবং পাকা গাবের গন্ধ মাখা সেই ফিনফিনে আত্মা ।

তুষার চৌধুরি আমাদের সমসাময়িক কবি নন, অথচ সমকালীন। কী ভীষণভাবে এই বদ্ধবৃত্তে আজও তাঁর কবিতার পণ্যপল্লী, তাঁর মায়ামন্ত্রের মেছোডিঙি আজও ভাসমান সান্দ্র বনস্থলী পেরিয়ে। তাঁর প্রতীতি যেন গুঁড়ির মত গেঁথে আছে বংশধারার প্রতিটি স্কাইস্ক্রেপারে। ব্যক্তিজীবন বন্ধুজীবন শৈশবসত্তা, ঋদ্ধ পানশালায় ছড়ানো ছিটোনো যাপনগুলোকে  নিয়ে তো কথা হবে সমসাময়িকদের স্মৃতিকথায় , কিন্তু আধুনিক বাংলা সাহিত্যেও  কী তুষার চৌধুরীর মত মজ্জাগত কবির জন্য কোনো স্বেদ  আছে? বামনরূপী পাঠকের আস্বাদে নয়, তার মাপকাঠি ভিন্নপথের, শৃঙ্খলারহিত। শব্দের কুচকাওয়াজ থেকে কার্ফুকবলিত দশা থেকে তিনি ছড়িয়ে গেলেন কাঠবেড়ালি হয়ে, কাব্যের বিষয় থেকে আত্মঘোষিত এক অপর জীবনানন্দের দিকেই  ছড়িয়ে দিলেন বিদ্যমানের মোহ, মেধা,  প্রতিকবাদী দর্শন, সিস্টেমেটিক ডিল্যুশন, সেই লাছিমের দড়ি সেই লাফানোর কায়দা, মানুষের বাবা হয়ে বাবার চপ্পল হয়ে নাকচোখের মাপ হয়ে  ইগলুর ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে  তুষার চৌধুরি দেখালেন  দূরবর্তী টেবিলে বসে প্রজননের কোলাহলের বাইরে বসেই একমাত্র সম্ভব পুরোপুরি একটা জাগরণ, পুরোপুরি একটা আনসাউণ্ড ইরেশিওনাল  প্যারানোইয়া  ।  স্মৃতি যেখানে লেংনথ হারালো সফলতা যেখানে অবিচুয়ারির মত কিছু, সেখানেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হ্যালুশিনেশনের পায়াগুলো। একটা বৃথা ফুলজন্মের থেকে একটা মায়াভবন থেকে বেড়িয়ে এলেন খালি পায়ে  চামড়া পোড়া গন্ধে কবিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, আসলে সেই তুষার চৌধুরির ধ্রুপদী অভিনিবেশ যা তাঁকে ষাটের কবিতার ক্ষতসূত্রের দাগ  থেকে শ্বেতির থেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছিল তার নিজস্ব ঘরানায়, অধিবাস্তব মহাকালে। শীতের দৈর্ঘ্য প্রস্থ বেধ মাপতে যা আগামী প্রজন্মকেও রেখে গেল তুষারীয় ক্যাম্পফায়ারের সামনে।

*** ***

সাহিত্য ক্যাফের পাঠকদের জন্য তুষার চৌধুরীর কিছু কবিতা তুলে ধরা হলো এখানে [সম্পাদক, সাহিত্যা ক্যাফে]

তুষার চৌধুরীর কবিতা

এই শীতের মরসুমে

এই শীতের মরসুমে
আমার বুকের ভেতর শুধু পাখির ঊড়াল
ডালপালায় পাখির আঙুলের আঁচড়
পাতা পল্লবে পাখিদের মল

এই শীতের মরসুমে
শহরের আলোগুলো নীল মাছিদের মতো ঝলমলে
আগুন ধরেছে লিলিফুলে
করবীরা মৃত
ঘরদালানের ফাঁকে মস্ত মস্ত কচুপাতায়
লাফিয়ে বেড়ায় কাঠবেড়ালি
অশ্বরমনীরা সব মিলিয়ে গেছে কুয়াশায়
আবার ফিরে এল মদ
আবার যৌবনের চরসে শিখা জ্বালাই
এই শীতের মরশুমে আমাদের ত্রাতা কেউ নেই
রাতের ববিনে সুতো জড়িয়ে যায়

এই শীতের মরসুম যখন শেষ হবে
আমরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসব
পড়ে থাকবে দু একটা খোলসের মতো কবিতা
যাদের দাম কানাকড়ির চেয়ে কিছু কম
আমাদের হিসি থেকে
এতটুকুও ধোঁয়া বেরোবে না
চতুর্দিকে মল মাছির শহর বিনবিনিয়ে উঠবে
ফিরে আসবে রমনীরা
যাদের ঘোড়াগুলো আস্তাবলে ফিরে গেছে

 

স্থির

হামাগূড়ির ভঙ্গিতে তুমি স্থির
তোমার স্তন ভুঁইমুখো
তোমার যোনি কুক্কুরীর যোনির
মতো দৃশ্যমান
তুমি তাকিয়ে আছো আকাশের
দিকে যার
চাঁদখানা খোবলানো আর যার
গাছপালা
নিথর নিকষ অন্ধকার
কেন লিখি

কেন লেখো?
কলমের ডগা থেকে চতুর বেড়াল হেসে ওঠে
কেন লেখো?
ফুঁসে ওঠে পিতার চেতনাহীন মাথা
কেন লিখি?
কেননা শব্দের স্রোতে যখন তলিয়ে যায় ঘুম
অনিদ্রাকে শুশ্রুষা করার সাধ হয়
কেন লিখি?
কেননা নারীর থেকে বহুদূরে সরে গেছি আমি
নারীরাও ভুলে গেছে আমাকে দৈবের ঘূর্ণিপাকে
শব্দ জরায়ুর জল, জাঁকালো কঙ্কাল
শব্দ শিশমহল শব্দ গোঁয়ার ঘোরানো সিঁড়ি
অথই পাতাল
অথই নামের একটি মেয়ে ছিল প্রথম যৌবনে
শব্দ তার চেয়ে মধুর
নির্বান্ধব দিনে শব্দ অনিবার্য মিত্র চিরসখা
শব্দ কী বেয়াড়া! শব্দ মানুষমক্ষিকা শব্দ ভঙ্গুর গোলগাপ্পা

কেন লিখি?
কেননা লেখার চেয়ে ভালো ফক্কিকারি কিছু জানা নেই আর ।

 

একটি বালিকার দুইপাশে

আমরা বোঝাপড়া করে শুয়ে পড়ি একটি বালিকার দুইপাশে
দুজনেই ভাগাভাগি করে নিই একটি করে হাত স্তন উরু
আধখানা হৃদয় আধামনোযোগ একটি করে কান চোখ ভুরু
টের পাই বালিকাটি আমাদের সমান সমান ভালবাসে
ভারতীয় দণ্ডাবিধি মতে আমরা কেউ কিন্তু এমনটা পারিনা
কার্যত সবকিছু পারি যদি থাকে খাদ্যখাদকের বোঝাপড়া
খাদ্য মানে বালিকা যেহুতু আমরা খাদকের অহং ছাড়ি না
অথচ বালিকা জানে সে নিজে পুকুর আমরা নির্বিষ জলঢোরা

স্বৈরিনী হবার শিক্ষা পেয়ে মিষ্টি বালিকাটি খিলখিলিয়ে হাসে
আপ্যায়নকারী উরুবিস্তার বিষয়ে ওর প্রশিক্ষনগুরু
আমরা ওকে ব্যবহার যত করি মনে হয় অব্যয় অপ্সরা
ওর কাছে হার মানে পুনম ধীলন টিনা পদ্মিনী জারিনা

ওদের বিবাহ হবে একদিন বড় হয়ে ওদের মেয়েরা
মায়েদেরও টেক্কা দেবে তবু এই বালিকাটি সকলের সেরা

 

ইগুয়ানা

ঋতুমতী ইগুয়ানা থুতু ছিটিয়েছে বলে আজ মানুষেরা ছায়াপথে
এসে দাঁড়িয়েছে এই শুশুকসমুদ্রঘেরা মায়ার বদ্বীপে হিজলিবাদামের দেশে

শবগাদা থেকে একটি শব্দ তুলে এনেছে শকুন, যার নাম বিবমিষা
ক্লান্তিতে ঘুমোয় যারা আসলে তাদের নীল ধমনীতে মিশেছে বিষনুন
নারীর খোলস ভেঙে ওরা খুঁজেছিল স্বর্গ বিনিময়ে শিশুসাপে মোড়া জলভ্রুন
পেয়েছিল বলে আজ স্বপ্নে অভ্র পাহাড়ের আলো দেখতে পায়

ওরা স্বপ্ন দেখে বর্শা অশ্বারোহী ধুলোর বাতাস তূর্ষ অহঙ্কারী ঝড়
শ্যামলাকবরে পাশে মিথুন গীটার চাটু পশুচর্বি শিশুমল কোলিয়পটেরা
অনেক দেখেছে, ওরা এইবার মূর্ছা ভেঙে যদি জেগে ওঠে তবে সমূহ ভণ্ডুল
ইগুয়ানা, একমাত্র তুমিই পারো এইসব নিদ্রিত দানোর স্বপ্নে ফসিল ফলাতে

 

পত্রমর্মরের দেশে-১

মধুরে প্রবেশ করি,মূর্ছা যাই পাপড়ির কান্তারে
বহু দূর হেঁটে দেখি অসীম অঞ্চল পড়ে আছে
নগ্ন রাত, কালো ও জমাট রক্তনদী
এ কোন সুড়ঙ্গে এসে খুলেছি পোশাক
শতাব্দীর ইঁদুরেরা ছেড়ে গেছে পুরোনো আস্তানা
অতীতের ক্রুদ্ধ যুবা অথই ফুলের গর্ভে ঘুমিয়ে পড়েছে
পত্রমর্মরের দেশে প্রকৃত জলের মতো অশ্রু ঝরে পড়ে

চিতায় প্রবেশ করি, হিম চিতা, অগিন বেহদিশ
মনে হয় কবে যেন টিউনিসে খেয়েছি হাশিশ
প্রাচীন প্রেমিকা আজ প্রবীণা ঘুঘুর মতো
দূরে কোন  অশনাক্ত বৃক্ষে বসে খসায় পালক
মুখের ওপর মৃত্যু চোখ মেলে ঝুঁকে আছে যেন স্তনবৃন্তের গোলক
বেঁচে আছি, টের পাই, সোঁদা গন্ধ জেগে ওঠে রাতে
গুটিকয় মৎস্যবৃহন্নলা ঢেউয়ে আছড়ে পড়ে নিরালা সৈকতে

 

সমুদ্রের রাজা

সমুদ্রে কি গেছি কোনোকালে
ওখানে সাঁতার কাটে অতিকায় তিমি নৌবহর
মাছের ট্রলার আনে বাঙালির জন্য সুসংবাদ
সমুদ্র খবর দ্যায়
মার্সিডিজকেই টয়োটার
আরো কিছু ভবিষ্যৎ আছে
সমুদ্র কি হেসে খুন হচ্ছে আজ লাঙল ট্রাক্টর ফেলে রেখে
মানুষেরা নেমে যাবে বিশ হাজার লীগের অতলে

মুঠোভর্তি খুশখবর মানুষের জন্য পড়ে আছে
মানুষের বন্ধু আছে সমুদ্রে একথা অ্যারিয়ন
বলে গিয়েছিল
তারা হাসে কথা বলে আমাদের মতো
অকৃতজ্ঞ নয়

কোনোদিন সমুদ্রে পত্তন হবে কলিকাতা কাফে শুঁড়িখানা
সেখানেও দেখা দেবে ভুঁড়িদাস ভিখিরি দালাল কবি মজুর কৃষক
সাংবাদিক মন্ত্রিসভা বেশ্যা প্রনয়িনী
ওখানেও রাষ্ট্র হবে রাষ্ট্রসংঘ হবে
সামুদ্রিক ওলিম্পিকে ভালেরি ব্রুমেল
সোনা পাবে স্লোমোশানে দেড় ফুট ডিঙিয়ে

এটাও অবশ্যম্ভাবী কোনোদিন ঔপনিবেশিক কোলাহলে
সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যাবে কলকাতা নুইয়র্ক লস-এঞ্জিলিস
ভূ-পৃষ্ঠের ঔপনিবেশিক শক্তি একদিন হাঁটু মুড়ে বসে
বশ্যতা স্বীকার করবে সমুদ্রের
সমুদ্রের রাজা
হেসে বলবেঃ পথে এসো চাঁদু
– অলীক কুকাব্য রঙ্গে

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *