সুস্মিতা চক্রবর্তীর তিনটি কবিতা

নীলাভিলাষ

নীলের দরদী আমি তুমি বঁধু নীলের প্রতিমা
জগতের সব নীল তোমা মাঝে ফুটিয়াছে গাঢ়।

অনড়-অলস আমি নীল-নাথবতী
নীলময় ব্রহ্ম দেখি নীলের তাপসী
ও নীল লাগিয়া আমি ডাকাতিয়া বাঁশি!

ও নীল কখনো তুমি নীলাভ্র-আকাশ
ও নীল কখনো তুমি তুমুল হুতাশ
ও নীল কখনো চাঁদ নীলিম-চন্দ্রিমা
ও নীল কখনো রুদ্র প্রলয়-গরিমা
ও নীল কখনো নাড়ী আত্মজা-দোসর
ও নীল কখনো বন্ধু পরম-নির্ভর
ও নীল রূপেতে মন মনের গোঁসাই
ও নীল পরশে সুখ অনঙ্গ-আত্মায়।

ও নীল নিরীখে তুমি কল্পনীলেশ্বর
ও নীল আধার তুমি মৃগাঙ্গশেখর
ও নীল ভুজঙ্গ তুমি উত্থিত-নীলের
ও নীল মেঘের দূত বিরহ কৃষ্ণের
ও নীল একলা জপি নীলশ্যাম নাম
ও নীল বিচ্ছেদ বড় ভালবাসিলাম।

নীলের মধুতে তুমি শ্রীমধুসূদন
নীলের যাতনাজ্যোতি কৃষ্ণ-জনার্দন
নীলের নিদাঘে তুমি চৈতন্য-চাঁদ
নীলের কীর্তনে ভাসে নদীয়ার রাত!

ও নীল কখনো তুমি জাহ্নবী-নিতাই
ও নীল কখনো তুমি বৃন্দাবনে ঠাঁই
ও নীল নীলের মায়া কবিতার রাত
ও নীল নহলী বর্ষা মিলনানুরাগ
ও নীল কদম্ব-ঘ্রাণে বরষা-আগুন
ও নীল নিরংশু-নীড়ে বিরহ-দ্বিগুণ।

ও নীল নীহার তুমি স্নেহের প্রকাশ
ও নীল ভৈরবী তুমি সৃষ্টির প্রয়াস
ও  নীল নীলের দর্প বিষামৃতপায়ী
ও নীল পরম ধ্যানে নীলানন্দময়ী
ও নীল ক্ষেপার দল সাধুর বাজার
ও নীল চাঁদের গায় কলঙ্ক হাজার।

ও নীল তেয়াগে তুমি হেম-মূর্তির সীতা
ও নীল ভাবের ঘোরে পাগলাই মুর্ছিতা।
ও নীল চরন-ঘন-শ্যাম-পীতাম্বর
ও নীল নূরের রাগে দম কলন্দর।
ও নীল যুগলভজা সহজ সাধন
ও নীল শোকের দাহ অতীত-তর্পণ।

ও নীল নিরম্বুকালে সদগুরু সার
ও নীল চম্পক তুমি ভক্তি-বাঞ্ছা-হার
ও নীল সাঁইজি তুমি নীলের বারাম
ও নীল নবনী তুমি নলিনী-কন্যার
ও নীল পুরীতে তুমি ঢেউ নীলাচল
ও নীল গেরুয়া ছোপে উড়ালে আঁচল
ও নীল নির্জিত হাসি অধরা প্রকাশি
ও নীল নীদয়ানীলে দারুণ বিলাসী।

নিবিড় নীলের লীলা তুমি আমি বঁধু নীলযোগেশ্বরী
মহাতীর্থ পুণ্যঘাটে স্থিত পুণ্যযোগে পুণ্যসিদ্ধালোভী

দুর্লভ-অমেয় জলে নীল অভিলাষী
নীলাগুনে পুড়ে শেষে হ- সর্বনাশী
ও নীল লাগিয়া তবু গায় বারমাসী!

 

 

স্তব্ধতার গান

উদ্ভ্রান্ত দিনের শেষে-
লীন হয়ে হাসে মহাকাল।
স্তব্ধতার ডানা ভাঙ্গে ধ্যানাচ্ছন্ন হলুদ বিকাল।
কলরব থেমে গেলে ক্রমে সন্ধ্যা- গাঢ় অন্ধকার।
অন্ধকারে জ্বলে রাত্রি, পিপাসিত শান্তি-বরষার,
তোমারও গন্তব্য; আহা প্রবারিত আমার সকাল!

 

 

এই শ্রাবণে জলের দিনে


এতোটা জল খলবলিয়ে দু ’চোখ বেয়ে–
ঝরলো যেন দিনের শেষে বকেয়া জল;
আজ শ্রাবণে জলে মগ্ন ব্যাকুল মনে–
চোখের জলে বৃষ্টি জলে হৃদয় তল!


অসুস্থ খুব, শুনছি গান, – একলাটি যে!
শেষ শ্রাবণে বর্ষা হলো দুদিন খুব;
জলের তলে যাতনাভর শহর-পথ,
কাব্য ঘরে নিবিড় তবু জলের ডুব!


ভিজছে জলে শ্রাবণ ঢলে একলা কাক!
জানলা খোলা জলজ দিনে পুড়ছে মন–
চোখের জলে বিষাদ ধোয়া চশমা-কাঁচ,
এই শ্রাবণে রইল কোথায় নিকট জন!


কর্মব্যস্ত দিন পেরিয়ে শ্রাবণ নামে!
ঘন আঁধার ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিশির ডাকে–
পেরিয়ে যায় জমাট কোনো দহন ব্যথা;
মেঘের তৃষা অঝোর জলে পাতার ফাঁকে!


ঘন শ্রাবণে জলের গানে মেঘ পড়শী;
মেঘ পালকে জলের খামে অচিনপুরে–
পাঠালো মেঘ অদৃশ্য কোন্ কারসাজিতে!
সজল মেঘে বরষা এলো উজাড় করে।

রাবি-ক্যাম্পাস: ২৮ শ্রাবণ, ১৪১৮

 

Facebook Comments

6 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।