মতিন বৈরাগীর একগুচ্ছ কবিতা


অতীতমুখি একটা গাছ

সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে থেকে একটা গাছ আকাশ মুখি
কাণ্ড আর পাতারা সব গাছ হয়ে গেছে
বিকেলের ক্লান্তির রোদ সারাটা গাছে ছলকে পড়ে
তবু গজিয়ে ওঠা পাতারা নিস্তেজ নিস্পন্দ
পিঁপড়েরা ছিড়ে কেটে নেয় ঢের
দু’একটা নচ্ছার পাখি ঠোক্কর মারে, গাছ তবু দাঁড়িয়ে থাকে–
বহু আগে এক তক্ষক বাসা বেঁধে ছিলো সেই গাছে
সুযোগ বুজে সেও আজ ছড়াচ্ছে সন্ত্রাস
আর লুটে নিচ্ছে গাছের বৈভব–

শেষ আলো টুকু মুছে যাবার আগে দু’টো পাখি বসে ছিলো সেই গাছে
গাছ তবু নির্বিকার অতীত হয়ে যাবার দিকে
পাখি দু’টো উড়ে যেতে যেতে বলেছিলো
গাছটার দীনতার কথা বলো না কারো
এরকম সময় নির্জনতা চাই আরো
গাছটা দেখলো পাখি দু’টো উড়ে গেছে সূর্যও নিভাচ্ছে আলো
কিছুই শোনা হলো না তার–

এরপর আলোটুকু মুছে গেলে ঘন কালো অন্ধকার।

০২.১২.০৬.

 

লেজের গল্প

একটা সময় ছিলো যখন কোনো বেদনাই করতো না আর্তনাদ
বেদনাগুলো ছিলো নতুন করে ভাবনার অন্তর-আনন্দ
প্রতিটি দিন মনে হতো আরেক দিনের প্রতিজ্ঞা
প্রতিটি ক্ষণ মনে হতো শাণিত সময়ের গতিবেগ
উচ্ছ্বাস নাচতো বুকের ভেতর আর বাজাতো ভৈরবী
ফিঁকে হয়ে যেতো সব মোহ প্রাপ্তির লোভ
আকাশটা মনে হতো ভাবনার শব্দ– শস্য-ভূমি
ফুটে আছে ফুল মোহন বকুল
মনে হতো প্রেম জীবন্ত জেগে আছে, ছুঁযে দেবে গ্লানি।

এমন একটা সময় ছিলো– ভয় ছিলো নাকো– অহঙ্কার ছিলো
এ পৃথিবী আমার হবে, আকাশ আরাধনায় ফোটাবো কুসুম
পাহাড়ে-পাথরে হবে ইস্পাত মন্ত্রের-স্তোত্রগীতি
রুখে দেবে জীবনের বিরুদ্ধ বাতাস

তারপর কতো প্লাবন গেছে ঝড় গেছে বৃষ্টি গেছে
কতো সবুজ পাতা হলুদ হয়ে ঝরে মরে গেছে
কতো আসমানী  অগ্নি-বর্ষন ভেঙেছে ঘর-বাড়ি
কতো সময়ের কতো লোভ ইঁদুর মুখের প্লেগ ছড়িয়েছে
কতো দুঃখ-তাপে ভেঙেছে প্রত্যয়
ডুবেছে সূর্য  আশার ক্যারাভান
বুকের ইস্পাত গলে গলে হয়েছে মরামুখ
অযুত কীট নিয়ত করছে কিলবিল
তারা খেয়েছে সকল অস্তিত্ব ছিলো যা কিছু
লেগে লেপ্টে ছিলো আরো কিছু কাল
মেরুদণ্ডের ফাঁকে পাঁজরের বাঁকে যে টুকু রোদ
চেটে পুটে কামড়িয়ে চুষে– এখন কঙ্কাল–
ধুলো হচ্ছে গুঁড়ো হচ্ছে মিশছে মাটির সংগে
তলিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিহীন কেন্নোর ঘরে–

তারপর, যদি কেউ বলে, লেজ খশেনি
আমি বলি : লেজ কি ছিলো ওই সব কঙ্কালে?

২৮.০৮.০৬.

 

কবির কষ্ট

এখনো প্রাণে হয়নি সুরের সাধা
পথে পথে জাগে মলিন দিনের আলো
জীবন যেনবা নিয়তির ঘোরে বাঁধা
পদে পদে তার অনিয়ম অপমান

দুর্ভাগা দিন এখনো রয়েছে বাকী

দিনের বেলায় আঁধারের কালো এসে
নিয়ে গেছে মুছে আশার স্বপনগুলো
ফোটেনি কুসুম মনের দুয়ারে আজো
তুমিইতো ছিলে দূরের পথের দিশা

দখিনা বাতাস এখনো বলে সে কথা
তোমার স্মৃতি আলোর উত্তরীয়
হৃদয়ের মাটি খুঁড়ে খুড়ে এক কবি
গড়ে তোলে ঘর জীবনের মোহনায়

ফোটনা কুসুম আমাদের আঙিনায়
এতোদূর এসে নিজের দুয়ারে হায়
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময়ের দাগ মুছি
দুর্ভাগা দিন এখনো রয়েছে বাকী–

২০.০৪.০৪.

মধ্যরাতে এই শহর

মধ্যরাতে, এই শহরের গাছগুলো  হেঁটে হেঁটে  চলে যায় বহুদূর
ফুটপাতগুলো খুব প্রগলভ কথা বলে ফিশ-ফাশ
মানুষগুলো কংক্রিটপেটে ঘন হয়ে অন্যমানুষ
অলস ইমারতগুলো পপ-গায়কের মতো নাচতে নাচতে
বাতাসকে ধরে আনে উদ্দাম সঙগীতে
আকাশের তারকারা নিভে গিয়ে দু’এক মুহূর্তে
পাখিদের চোখে ঢেলে দেয় ক্লান্তির  ঘুম
নৈঃশব্দ আর শব্দের নগরী তখন নিজরূপ খুলে-মেলে দেখে
হাসে. কাঁদে, কাঁদায়– বেদনার সুর তোলে
নিস্তব্ধ আকাশ পাটে–

মধ্যরাতে এই শহর যেনো আরেক শহর হয়ে ওঠে
কোথাও ছায়া কোথাও মায়া আর কোথাও আরেক হাওয়া
অনুভব করে  সৌন্দর্য-সাহস নিচুতার দায়
মানুষের হিংসা কুট-কচাল বিপন্ন সকাল–

তারপর প্রতিদিন ভোরে যে শহর আমরা দেখি
সে কি সেই না কি পূর্বদিনের ছায়া কংকাল
যার ভিতর পিষ্ট হয়েছে সভ্যতার কতো না কাহিনী
আর্তনাদ, কান্নার ধ্বনি
মধ্যরাতে এই শহর ঘুমিয়ে পড়ে আবার জেগেও থাকে
(দুই সত্ত্বার দুই শহর একই শহরের দ্ইু রূপ)
ঘুমে আর জাগরণে ঝরে  পড়ে অতীতের স্মৃতি কতো ইতিহাস
আনন্দ বেদনা দীর্ঘশ্বাস–
কেবল কবিরাই পুরাতন স্মৃতির ভেতর ওম খোঁজে
ঘুম ভাঙা চোখে চেয়ে দেখে হারানো দিনের মিনার

মধ্যরাতে এই শহর ঘন হয়ে হয়ে আরেক শহর হয়ে ওঠে–

 

অবলোকন

দেহ ঘড়ি থেমে যাবার সময় সে তাকালো এপাশ ওপাশ–
কেউ আর নেই–
নিচে রাস্তায় মানব-স্রোত নিত্য যেমন থাকে
মহড়া আরো বেড়ে যায়, বেড়ে য়ায়।

ঘড়ির কাটা শূন্যের দিকে এগোয়,  আর সে দেখে
একা একা মাইলের পর মাইল দৌঁড়াচ্ছে
ক’টা তেলে পোকা আর একটা টিকটিকি
ছোট্ট ইঁদুর দৌঁড়ায়, সেও এক জীবনের দায়
ওপাশে ছেলে আর বউ- তৈরী হচ্ছে
সিঙ্গাপুর ট্রিপ, আঁচড়াচ্ছে চুল খুনসুটি করছে
তাদের মুখগুলো কেমন আবছাঁয়া– দীর্ঘ হয়ে যায়–

সে যখন মরে যাচ্ছিল তখন রমিজউদ্দিন ভোট চাইছে
পাড়ার হোটেলে হারাণো দিনের গান
অখিলের দুধের গাই বিয়োচ্ছে আর নিখিল বৌ-পিটাচ্ছে
রাজ্য ও রাজত্বের সভা চলছে কুৎসায়
আর ব্যাবসায়ীরা সমিতি করে ভেজাল দিচ্ছে সব কিছুতে

কেবল বসে থাকা কেবল শুয়ে থাকা কেবল আটকে থাকা

তারপর নিজের মুখ লাবণ্যে ভরা, দুজন–
পরিচয় ছিলোনা তেমন
সেই মুখও হাসলো,তারপর সেও, দু’জনে জানালো
বিদায় সম্ভাষণ–

২৫.০৭.১৩.

 

সর্বনাশ যখন গলা বড়িয়ে

সর্বনাশ যখন গলা বাড়িয়ে ঘরের দুয়ারে
পাকাফল ঠুকরে খায় কাক
আর চাষীর হৃদপিণ্ড থেকে টপটপ রক্ত
তবু  ওরা বলে জগতে আমরা বদলাই না,
সবকিছু ঠিক-ঠাক–

তখন আষাঢ আকাশ ক্ষণিক রোদ ক্ষণিক বৃষ্টি
আর বিড়ালের মতো বুদ্ধিজীবি রাত্রিতেই দেখে ভালো
বলে আহা, শেগাল আর মাতিস যদি হতো
কি সুন্দর আঁকতো আকাশ
তাদের অন্তরদৃষ্টি আরো বেড়ে যায়–

সর্বনাশ যখন গলা বাড়িয়ে আসে তখন রাস্তাটা সোজা
সেই ভবনটায় গরম বুদ্ধির উচ্ছ্বাস আর কতোটা ইঁদুর
মারাগেলো তার একটা হিসেব
এবং এসব শুনতে শুনতে লাল
ইটগুলো কালসে পানসে, ঘুম পায় তার–
একদল হাঁটছে পিছু পিছু আর রাস্তাঘাট ঠিক আগের মতোই
বসে থাকা– বসে থাকা–
তারণ্য উড়ে যাচ্ছে নানারঙা প্রজাপতি
এবং  হেজাব সাজুগুজু জলছা–

বৃক্ষগুলো কিছুতেই বুঝতে পারেনা আর পাখিগুলো
তখন সর্বনাশ ঢুকে পড়ছে একেবারে ঘরে মাঝখানে
সব কিছু ঠিক- হ্যা তাই মনে হয়–ঠিকই আছে–

২৪.০৭.১৩.

 

শুভ্রতায় শূন্যতায়

সকল মানুষ যায় না সার্থকতায় কেউ যায় রোদে
কেউ আজীবন পথের পথিক ফেরে সে অন্যবোধে
কতক মানুষ কেবল মানুষ মানুষের মতো তবু নয়
কেউ আজীবন প্রিয়তার মুখ আনন্দ দুর্জয়
কেউ যায় অন্ধকারে
কেউ আলোমূখি দিনের শরীর পিছু ফেলে রাত
একদিন যায় ইতিহাসে
কেউ আশাহীন কেন্নর মতো ইতর আহার
কারো বা মরন পাখির পালক
কেউ বা আবার সিনাই পাহাড়
কোনদিন কেহ বিপুল বিক্রমে কাঁপায় ফ্রেন্স চেক রুশ
কেউ বা দানব মেডুসার মুখ বেলেয়ার-ওয়াকার বুশ
কেউ সকালের সোহাগ শেফালি মঙ্গলময় ছবি
এতেক বলিয়া দিনের মুখের নীরব হলেন কবি–

০৮.০৩.০৭.

 

মানব বন্দনা

একদিন মানুষের বিশ্বাসী হাত আসমান ছূঁয়ে দেবে
অনায়াশে তারাদের
সকালের রোদ মেখে দিনে দিনে বড় হবে তারা
আর যতো নিপীড়িত আর যতো জনগণ যারা
পাহাডের মৌনতার মতো স্থির সেই সব হাত
জীবনের পতাকারা যতো
নিয়ত জীবনে মিশে পাবে গতিবেগ আলো অবিরত
স্মৃতি হবে ভাষা হবে ধ্বনিময় আশা হবে
আকাশ ছোঁয়ার বিশ্বাসে বড় হতে চায়– হয় যদি তাপ–
তখনই ঝড় হবে ঝঞ্ঝায় ছুটে আসা দুরন্ত আবেগ
পেয়ে যাবে বেগ–
অরণ্যের চুলে চাঁদ যাবে দুলে চেতনার লাল
ভেঙে দেবে ডর-ভয় বিরুদ্ধ সকাল
একদিন মানুষেরা প্রগতিতে যাবে
যেতে যেতে যাবে..

০৯.০৫.০৭

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *