ফিরে আয় তুই
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’
গাইতে গাইতে ছেলেগুলো অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।
আমি কোনকিছুই আগের মতো আর ঠিক
দেখতে পারি না
আমি কোন শব্দ শুদ্ধ উচ্চারনে আর
বলতে পারি না,
ওদের ভেতরে চড়ুই পাখির মতো নাচে বাংলাদেশ। যেন
লক্ষ লেদ মেশিনের ঠুক ঠাক ঘর ঘর ঝন্ ঝন্ শব্দ…
মাথার ভিতর কেমন ঝিম ঝিম করে।
স্বাধীনতা আমাদের হলো
বাঙলা ভাষা আমাদের হলো
বঙ্গোপসাগর ও তার জোয়ার ভাটার অনেক ঢেউ
আমাদের হলো, কিন্তু
ছেলেগুলো…
কি ভাবে কখন ভুলে গেলো সব
ভুলে গেলো মানুষে মানুষে ভালোবাসা,
ওরা ভুলে গেলো বাতাবি লেবুর ঝোঁপে পলাতক
জোনাকির ঝাঁক
উঠানের এক কোনে ফুটে ওঠা গোলাপ জুঁই।
এতো সহজেই এতকিছু বুঝি ভুলে যাওয়া যায়!
আমার দাদীর নরম সুরে গাওয়া কিছু কিছু গান
এখনো আমার মনে আছে
গাঁও গেরামের হাটে দলছুট কিছু জোনাকির কথা
এখনো আমার মনে আছে
আমার মেয়েটি বাঁকা ঠোটে প্রথম যেদিন হেসেছিল
সেদিনের ঝলমলে রোদ এখনো আমার মনে আছে।
সন্ধ্যার বিষন্ন অন্ধকার ছায়া ফেলে কিষানীর কালো পিঠে
নতুন ধানের শীষে
পেট ভরে খাওয়া ভাতের খুশিতে
মাথায় জ্যোৎস্না নিয়ে সারারাত বসে থাকে কেউ কেউ।
মধ্যরাতে চন্ চন্ করে ওঠে গিটারের সুর
পদ্মার অলস ঢেউয়ের মতো
ফের সুর তোলে বব মার্লি
জর্জ হ্যারিসন
রবি শংকরের অলৌকিক সেতার।
ওরা চায় নিয়ন বাল্বের সব আলো
বিলবোর্ডে ঝলমল করে ওঠা সব বর্ণমালা;
শিরায় উপশিরায় হিমেল হিমোগ্লোবিনে সুনামির মতো ফুঁসে
ওঠে ফেন্সিডিলের ঢেউ।
দেয়াল ঘড়িতে এখন বারোটা বাজে-
বলি, ফিরে আয় বাপ
বিকেল হাওয়ায় পুরনো দিনের গানগুলো ফের শুনি
তোর প্রিয় কবিতাগুলি…
নদীর ওপারে সূর্যাস্তের অমন লাল… চল না,
ফের একবার দেখি, একসাথে বসে।
মায়ের করুন চোখে এত অন্ধকার ঢেলে দিস নে বাপ,
এ মাটির কসম
ফিরে আয় তুইৃ…
প্রেম
সকাল কখনো ছোঁয় না চাঁদ। তবু
কী মায়া ছড়ায় চারিদিক।
তারাগুলো কি জানতে চায়, হঠাৎ তারার দেশে
কেন ওরা আলোহীন?
আমিও ঘুমের ক্লান্তি নিয়ে
শুয়ে শুয়ে
স্বপ্নের তালিকা দীর্ঘ করি
এলোমেলো শিহরণ,
ভালো লাগে…
জাগে পরকীয়া সাধ।
সকাল কখনো ছোঁয় না চাঁদ। তবু
কী মায়া ছড়ায় চারিদিক।
কার ঘরে উৎসব ছিল কাল,
কার ঘর থেকে ভেসে আসে নিশীথ সুখের গান,
কোন পাহাড়ের লজ্জা ঢাকে ভোরের কুয়াশা…
ন্যাংটা ছেলেগুলো হঠাৎ
নাগরিক হয়ে ওঠে.
শেয়ার বাজার, রফতানি আয়
ওরা জানতে চায়;
গরিবেরা শুয়ে শুয়ে কী স্বপ্ন দেখে!
ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান?
শূন্য সানকির ঠুং ঠাং শব্দ
শুকনো মরিচপোড়া গন্ধ
এক থালা ঠান্ডা ভাত, আর
অসময়ে আলসে ঘুম, আবার আলসে ঘুম।
ওরাও স্বপ্ন দেখে, ওরাও ওড়ে আকাশে আকাশে।
ঘুমের ভিতর শুয়ে থাকি
নরম নদীর কথা ভাবি, তার
শান্ত ঘ্রাণের কথা ভাবি
হঠাৎ হাওয়ায় থেমে থাকা জলগুলো কাঁপে
নরম নদীর কথা ভাবি
কী এক রহস্য, গভীর রহস্যের দিকে যায়…
কখন যে পূর্ণ হয় এ জীবন,
আমি কি তা জানি?
অত জল বুকে তবুও সমুদ্র কাঁদে!
কেউ কেউ ভালোবাসা পায় প্রেমিক পায় না
কেউ কেউ ভালোবাসা চায় প্রেমিক চায় না
ইচ্ছা হয় আমি বর্ষা হয়ে ধুয়ে দেই সব
ইচ্ছা হয় সবুজ শীতল ছায়া হই
ফুল হয়ে থাকি কৃষ্ণ খোঁপায়
পাখি হয়ে উড়ি বৃষ্টি হাওয়ায়
অসময়
ভেসে ওঠে তার মুখ
বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে হায়!
সে যেন না হারায়!
সে যেন না হারায়!
আধুনিক কবিতা
কবিতা এখন চায় তেলে ভাজা মচমচা ফ্রেঞ্চফ্রাই, ফ্রেস
গার্ডেন সালাদ, পেয়ালার গাল বেয়ে পড়া
ফেনায়িত উষ্ণ ক্যাপোচিনো
কবিতা এখন খোঁজে হাতিরঝিল, হঠাৎ হঠাৎ আলোর খেলা
হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছুটে যাওয়া হাত ফের ধরা
কবিতা এখন চায় টি-টুয়েন্টি ম্যাচ,
স্টেডিয়ামে গজল সন্ধ্যা, আর
তোমার শাড়ীর ভাঁজে তোমাকে জড়িয়ে থাকা প্রিয় পঙক্তিমালা
কবিতা এখন চায় স্লিম ফিগার, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে
সুগন্ধমাখা, কবিতা এখন চায় আমাজন ডটকম,
প্রেয়সীর ঠোঁটে লাল রেভলন।
কবিতা এখন চায় নিউইয়র্ক, টরন্টো, ফেসবুকে লাইভ;
কবিও এখন শুধু কবিতার বই হাতে,
পড়ে কি কবিতা?
দেশে দেশে
নিউইয়র্কের আইল্যান্ডগুলো সারারাত
নিভে জ্বলে, কিন্তু
বহু বহু দেশে
এবং বাংলাদেশে,
এইক্ষণে, চারিদিক ফর্সা হয়ে আসে
টেবিলে টেবিলে উষ্ণ রুটি, কমলার রস,
মেলামাইনের মায়াবী প্লেটে গোল গোল সব
ডিমের কুসুম
স্বাগত জানায়
সুপ্রভাত, হে সুসময়। কিন্তু
ফেরিঘাটে,
স্টেশনের প্লাটফর্মে
কুলিদের লাল লাল জামার ভেতর থেকে
সকালের সুশোভিত আলো
নদী ভাঙা উদ্বাস্তুর
ম্লাণ মুখ থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসা
বিড়ির ধোঁয়ার মতো
আস্তে আস্তে
মিশে যায় গ্রাম ও শহরে।
টাইম স্কয়ারে ছটফট করা আলোর ঝলক দেখতে দেখতে
কখন যে একটি বালক
হঠাৎ পিছলে পড়ে মিরপুরে, সাভারের
রপ্তানিমুখি পোশাক তৈরি কারখানার ফটকে;
মালিবাগ, মগবাজারে
রেল লাইনের উপর
হাঁটু গেরে বসে থাকা বৃদ্ধের বিষণ্ণ চোখে।
বিদেশ ফেরত দম্পতির স্ফীত অনুদানে
উলিপুর, তিস্তা, কুড়িগ্রামে
চকচক করে ওঠে মাদ্রাসার ঢেউ টিন।
বস্তির অস্থির শীতে জড়সড় শিবু কাকা
রিলিফের কম্বল হাতে
ফোকলা দাঁতের বিষণ্ন হাসিতে আনন্দ ছড়ায়
মঙ্গা পীড়িত উলিপুরে…
এইসব দুপুর রাত্রি এবং
নিরব সকাল
ঘুরে ফিরে আসে;
আমরা জানালা খুলে দেখি
কলতলে ভিড়,
ঝাড়ু হাতে রঘুনাথ ফুঁ দেয় চায়ের গরমে;
স্টেশনের প্লাটফর্মে
পাগলি টা…
তখনো গভীর ঘুমে।
যে পারে পারুক, আমি পারি না
কেউ কেউ আমাকে উড়নচণ্ডী ভাবে।
আমার সম্পর্কে ওদের ধারণা এরকমই। সংসারে
নিজেকে গুঁছিয়ে রাখা কিম্বা সংসার গুছিয়ে রাখা
কোনটাই আমার নাগালে নেই।
এ কাজে যাদের সিদ্ধি স্মরণীয়, যারা প্রতি পয়সা হিসাবে
রাখে প্রতিক্ষণ আমি ওদের মহিমা
থেকে চিরকাল দূরে থাকি। কার পাঁচতলা ছাদে
ফুলের বাগান, কারা চিরোল হাসিতে ডলার ভাঙায়
আর কেলভিন ক্লাইনের
সুগন্ধি ছড়িয়ে
কাম-হীন যুবকের শোকের আগুনে ঢালে
কেরোসিন, আমি তা জানি। এসব খবর
পাখির বিষ্ঠার মতো গন্ধ ছড়ায় আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
চাঁদের আলোয় যখন পুড়ছে শহর, তখন
কেউ কেউ বন্ধ রাখে ঘরের জানালা আর
এক মুঠো বাতাসের জন্য কী যে হাহাকার…
বাইরে শরীর জুড়ানো কি ঠাণ্ডা হাওয়া, ওরা বুঝলো না।
কেউ কেউ নিজেই গুছিয়ে নেয় নিজেদের ঘর,
কারো ঘর সময়েই বদলায়।
সব কিছু গোছানোই আছে! তবু
কী যে তোমরা গোছাতে বলো?
তুমি কি পারবে
গাছের সবুজ থেকে চির হরিতের গন্ধ মুছে দিতে?
আমি কি পারবো
সমুদ্রের জল থেকে নোনা স্বাদ মুছে দিতে?
যে পারে পারুক, আমি পারি না…
শামস আল মমীন

জন্ম ডিসেম্বর ২৬, ১৯৫৭ রংপুরের বদরগঞ্জে। তিনি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যাপাঠ নেন স্থানীয় স্কুল ও কলেজে। ১৯৮২ তে যান আমেরিকা। সেখানে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য এবং এডুকেশনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮৯ সন থেকে তিনি নিউইয়র্কের শিক্ষা বিভাগে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন। ৯০- এর শেষে মমীন সাহিত্য পত্রিকা আকার ইকার সম্পাদনা করেন। তারও আগে, জানুয়ারী ১০, ১৯৮৫ তে প্রকাশ করেন আমেরিকা থেকে বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক দিগন্ত। শামস আল মমীন ছিলেন তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।
এই লেখকের কবিতার বই
১৯৯৫ চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না
২০০১ মনোলগ (২য় সংস্করণ ২০১৫)
২০০৯ সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা
২০১২ আমি সেই আদিম পুরুষ
২০১৪ আমি বন্দী খোলা জানালার কাছে
২০১৬ কেউ হয়তো আমাকে থামতে বলবে
২০১৭ নির্বাচিত কবিতা
২০২০ অনেক রাত জেগে থাকার পর
দোলে হাডসন দোলে পদ্মা (যন্ত্রস্থ)
সম্পাদিত পত্রিকা
১৯৮৫-১৯৮৭ দিগন্ত
১৯৯৭-১৯৯৮ আকার ইকার
