চারটি কবিতা


শামস আল মমীন 

 

ওরা চিৎকার করে কিছু বলতে শেখেনি

প্রকৃত জ্ঞানীরা শেষমেশ যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে, কারণ
কোনকিছু ওরা চিৎকার করে বলতে শেখেনি।

একটা কবিতা মিথ্যেবাদীর সাজানো গল্প হতে পারে
একটা কবিতা নিন্দুকের রটনাও হতে পারে;
হতে পারে শুধু এর শুরুটাই মিথ্যা।

মিথ্যুকেরা ভিতরে ভিতরে সত্যকে পরাস্ত করে।
টেলিফোন বাজে, বারবার টেলিফোন বাজে, কিন্তু
কেউ কথা বলে না। এই নীরবতা আমি ভাঙতে চেয়েছি।

বাড়িটা নীরব, তার মানে এই নয় ঘরে কেউ নেই।
এইসব ছলচাতুরি আমার জানা আছে

ওদের মহৎ কথা, কানে কানে কথা,
যতো যুক্তিতর্ক..
একদিন নিজেরাই নিজেদের অর্থ খুঁজে পাবে; কারণ

ওরা চিৎকার করে কিছু বলতে শেখেনি।

 

অসুখী প্রেমের গল্প

 

মেয়েটা ওবীস্।
ঘূর্ণিস্রোতের জলের মতো কোমরের ভাঁজ তার, ওঠে
নামে… অসুখী নারীরা যেমন, প্রেমের অ-সুখে, অমাবশ্যা
পেতে রাখে চোখে-মুখে, আসলে কে জানে তার যন্ত্রণা কোথায়।

ইচ্ছা হয় জেনে নেই কে প্রথম দেখেছিল জীবনের ভ্রূণ।
না-কি, আমিই জন্মমৃত্যুকে বুনে যাই…দূরে,
সমুদ্রের নিস্তব্ধতা… গোপনে কি যে বলে আমার পরাণে, আমার
চোখের পলক বোঝে শুধু সেই কথা। আমি কি সূর্যের কথা বলি,
না বৃষ্টির? আমি কি দেবতা কারও? তবু কেন ছুটে আসে লতাগুল্ম,
পিঁপড়ের দল, ছোট ছোট খড়কুটা? ওরা ভয়ে ভয়ে থাকে
এই বুঝি এলো বন্যা, আবার অকাল মৃত্যু…। আমি সমুদ্রের

নিস্তব্ধতা বুঝতে চেয়েছি, মাছধরা নৌকাগুলো বার বার কেন
পথ ভুলে আসে আমার গাঙেই। আবার নতুন পাখনা গজাবে
নাকি দেহের আড়ালে? আমি কি মানুষ না-কি দেবতার পূজা করি?
আমি জন্ম, আমি মৃত্যু… তবু বয়সের কাছে হাত পাতি।

ভাঙা সাঁকোটির নিচে কালো জল… পরিত্যক্ত পাহারাঘরটি
দেখে মনে পড়ে প্রথম ভালোবাসার কথা; প্রথম ছোঁওয়ার
থর থর কাঁপা সহজে কি ভোলা যায়। কখনো আকাশে মেঘ,
কখনো বরফ, কখনো নদীতে বহমান স্রোত হয়ে ওরা থেকে যায়…

অলস সকালে যখন কাঠবিড়ালি গুটিসুটি
হয়ে শোনে বৃষ্টি আর কুয়াশার গান; আমার বিষাদ মন
নেচে গেয়ে ওঠে।

ঘুমের ভেতর আমি কতবার মরে যাই… সকালে ওঠার আগে ক্লান্ত,
ক্লান্ত এবং বিষণ্ণ চোখ মেলে থাকি আদিম উৎসের দিকে। কিন্তু…
কতদিন আমি টলমান নপুংসক দেবতাকে
ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রাখবো?

রাস্তার ওপারে

 

জানালার গ্রিলে সাপের মতো গোল
একটি হাত
হঠাৎ উধাও
ফিরোজা শাড়ির পাড় পতাকার মতো ওড়ে
তারপর নেই

তারপর…
গোলাপ পাপড়ির মতো গোলাপি পিঠ
তার চেয়েও গোলাপি সুগোল স্তন
যেন
সার্চ লাইটের মতো বিচ্ছুরিত আলো
জানালার গ্রিল
বেয়ে
গড়িয়ে গড়িয়ে
ছড়াচ্ছে আবছা
অন্ধকারে
তার ঠোঁটের কোণায় মোমের আলোর মতো
ঈষৎ নরোম হাসি
তারপর নেই
নেই…
হঠাৎ সামনে দাঁড়ানো একটি গনগনে
আগুন
সারা রাত ধরে পেরেকের মতো গেঁথে ছিল
আমার ভিতরে
নগ্ন
নারী

 

ভালোবাসা… এক চমৎকার জিনিস

 

বন্ধু… ভালোবাসা এক চমৎকার জিনিস,
ঘৃণা করবার মতো অন্য কিছুরও কমতি নেই আজকাল।
আমি শুধু আমার কবিতা শোনাতে চেয়েছিলাম, দাউ দাউ
আগুনের মাঝখানে বসে আমি শুধু আমার কবিতা
পড়তে চেয়েছিলাম; শহরের ব্যস্ততম পথে
হঠাৎ দাঁড়িয়ে, দালানের
ছাদ থেকে পড়তে পড়তে আমি
শুধু কবিতাই পড়তে চেয়েছিলাম।

আমি চাই আমার কবিতা শুনতে শুনতে সকলের
মাথা ধরে যাক
আমি চাই আমার কবিতা শুনতে শুনতে সকলের
চোখ ভিজে যাক, ভয়ে চিৎকার করুক, দৌড়ে
পালাক, রক্তাক্ত হোক, রেডিও টেলিভিশন চিবিয়ে চিবিয়ে খাক…
আর ঝগড়া করতে করতে গলায় জোর কমে গেলে
অন্যের টাকায় মদ খেয়ে বেঘোর মাতাল হোক। এটা

কফি আর ফালতু আলাপে অলস কাটানো কোনো নিরিবিলি
সন্ধ্যা নয়; মাথার ভিতরে কত আর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে।
কখনো ফুলের গন্ধে আমরা আপ্লুত হই এবং ভালোবাসার খাদে
পড়ি; কিন্তু তার মানে এই নয় জীবন আমাদের বর্ণময়।

আমরা আতঙ্কে পার করি প্রতিটা সময়; এটা
আদিম বর্বরতার মূল দৃশ্যে পৌঁছাবার আগে এক
খণ্ড দৃশ্য মাত্র।
মাথার উপরে মিসাইলের বিদীর্ণ চিৎকার বিলবোর্ডে
রঙিন আলোর মতো জ্বলে নিভে; বোমা বিধ্বস্ত রাস্তায়, ধ্বংসস্তূপে
হাতে হাত রেখে হেঁটে যাওয়া, এও এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য… কিন্তু
প্রেমিকার বিষণ্ণ হাসির মতো অদ্ভুত সুন্দর।

আমি কবিতার কবর দিতে এখানে আসিনি,
আমি এখানে এসেছি বিকেলের উৎসবে রঙিন
বেলুনের মতো কবিতাকে আকাশে ওড়াতে। আমি
এখানে আসিনি হাঁটু বেয়ে ওঠা হামাগুড়ি দেওয়া
অঝুঝ শিশুর টলমল গালে চুমু দিতে। আমি
এখানে এসেছি ওকে গভীর জলের খাদে ছুঁড়ে ফেলে
দিতে; দেখি, জীবনকে ভালোবেসে একা একা কূলে
পৌঁছানোর কৌশল শিখেছে কি-না…

ভালোবাসা… এক চমৎকার জিনিস। কিন্তু
ঘৃণা করবার মতো জিনিসের কমতিও নেই আজকাল।
ঘৃণার মাঝেও ভালোবাসা… আর
একথা বলেই ওরা আমাদের পিছু পিছু আসে
বিনে পয়সায় রঙিন খেলনা দিয়ে আমাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট করে,
বিনিময়ে শর্তহীন
মলমূত্র আর বর্জ্য ঢালে আমাদের আঙ্গিনায়।

রাষ্ট্রের নেতারা ভাবেন, একটা ছোটখাট যুদ্ধ
ওদের নিষ্ক্রিয় ক্যরিয়ারে
চমকে দেবার মতো কিছু ঘটে যাবে…আর
আমরাও পেয়ে যাব গ্লসি ম্যাগাজিনের কভার গার্লের মতো
সুন্দরী ললনা… যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ…রক্তের
শেষ বিন্দু পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবে।
কমপক্ষে একটা করেও যদি এইসব মারণাস্ত্র
আমরা কিনতে পারতাম!

আমারটা, আমার সাথেই আছে..

জুলাই ৩, ২০১০

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *