শামস আল মমীনের কবিতা

মাধবীলতা

আরও কিছু
বলতে চেয়েছিলাম আমি ।
কিন্তু… ভালবাসার কথা
অতো সহজে বলা যায় না।

আমাদের ভালবাসা ছিল মাধবীলতার মতো
দেয়াল পেরিয়ে আলো বাতাসের সাথে কি যে খুনসুটি মাখামাখি;
আমাদের জন্য খোলা আকাশ, কিম্বা পার্কের বেঞ্চ, কোথাও
কোন জায়গা ছিল না;
বাসা বাড়িতে কেউ না কেউ আসছে যাচ্ছে
পাশের ঘরে ছোট ছোট ভাই বোন, আরও আছে
গার্জিয়ানদের তীক্ষœ চোঁখ, তবু
আমাদের ভালবাসা মাধবী লতার মতো
মাটি ছেড়ে দেয়াল পেরিয়ে
ক্রমেই ছড়াতে থাকে..

আমাদের গোপন করার কিছু ছিল না,
আমাদের রাতগুলোও অন্ধকার ছিল না কখনো
একটা আলিঙ্গনের কাছে আমরাও
জিপারের মতো মিলিয়ে যেতাম;
যেন মহৎ শিল্পের নিখুঁত কারুকাজ।

আমার এমন কিছু ছিল না যা আমি তাকে দিতে চাই নাই
এমন কথাও নাই যা তাকে বলি নাই
কিছু রাখঢাক কিম্বা কোনকিছু লুকানো আমার জন্য অসম্ভব ছিল।

বিটোভেনের সিম্ফনি থেকে,
রবিশংকরের সেতারের ঝংকার থেকে
তোমার অস্ফুস্ট কন্ঠস্বরও আমি চিনে নিতে পারতাম।

আমরা ইটের পর ইট দিয়ে শুধু একটা দেয়াল
চেয়েছিলাম যেখানে
মাধবীলতা আমাকে জড়িয়ে থাকবে।

আরও কিছু
বলতে চেয়েছিলাম আমি।
কিন্তু.. ভালবাসার সব কথা অতো সহজে বলা যায় না।

এতদিন পর আমাকে দেখেও
কিষানি মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া শিশুটির দিকে
তুমি অনেকক্ষণ তাকিয়েছিলে
বাউলের ঝুলিতে ভিক্ষার চাল দিতে দিতে
তুমি বুঝেছিলো ও তোমাকে
তার হারানো কথাগুলো বলতে চেয়েছিল,

বিকেলের সব রোদ কি ভাবে হারিয়ে যায় বিষণœ সন্ধ্যায়;
দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখেছি আমি।
দেখেছি, কি ভাবে হারিয়ে গেল
মাধবীলতাও।

 

আমাকে দেখে নাই কেউ

মানুষে মানুষে ভ্রাতৃবোধ আমিও দেখেছি ঢের, তবু
আমি ঘৃণা করি সেই সব মুখ
যারা সব লাশ ঢেকে রাখে ধর্মগ্রন্থের পবিত্র পাতায়
আমি ঘৃণা করি সেই সব মুখ
যারা কেঁড়ে নেয় প্রেমিকার নির্জন মূহূর্ত
আমি ঘৃণা করি সেই সব মুখ
যারা কেঁড়ে নেয় শিশুদের মাতৃক্রোড়

জীবন দেখেছি আমি; পৃথিবীতে যতো কথা, সেখানেও
লিখে গেছে কেউ আমার গোপন কথা, আমার ভাবনাগুলো
কফির টেবিল থেকে অলিগলি যায়, আলপথে হাঁটে;
ফুটপাতে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে, তবু
ওরা বলে আমাকে দেখে নাই কেউ মানুষের ভিড়ে।

 

কেমন লাগতো তোমার

যদি একজন মহিলা পুলিশ তোমাকে রা¯তায়
দাঁড় করিয়ে তোমার বডি সার্চ করে,
তার কোমরে পিস্তল–

যদি তার অফিসের দেয়ালে দেয়ালে থাকে
ঘর্মাক্ত উলঙ্গ সব পুরুষের ছবি, যদি
তোমার কদর হতো
তোমার পুরুষাঙ্গের দৈর্ঘ্য মেপে,

কিম্বা তোমার ডাক্তার যদি হয় কেউ একদম
ফাটাফাটি সুন্দরী ;
তোমাকে পরীক্ষা করতে করতে
যেখানে সেখানে
টেপাটেপি করে বলে,
’ইউ আর অল রাইট বেবী’,

কেমন লাগতো তোমার…

 

নায়ক

আমাকে এক ঝলক দেখে নিতে চায় অনেকেই, এমনকি
যখন দরোজা বন্ধ থাকে, তখনও…

একটা চড়ুই পাখি প্রায়শ আমাকে তার নাচ দেখায়
হয়তো সে জানেই না কেউ যে আমাকে নিয়ত নাচায়..
আমিও যে অজানাকে খুঁজি,
শিশুর কান্নায় শংকিত আমিও জেগে উঠি মাঝরাতে ।

সেলুলয়েডের কোন কোন দৃশ্য সত্যি সত্যি
আমাকে জাপটে ধরে
কেউ কেউ ওই বন্ধ কপাটের দিকে তাকিয়ে থাকে, অনেকক্ষণ।
আর বই হাতে মেয়েটি,
প্রতিদিন
আরও একটু সময় নিয়ে হাঁটে…

 

রেসের্কোস মাঠ

সকাল সকাল রসের্কোস মাঠে
ঘাসরে উপর
টলমল
শশিরিরে কথা ভাবছলিাম
শমিুল ফুলগুলো এ সময়ে ফুটবার কথা নয়
গাঁদাফুল অথবা চন্দ্রমল্লকিাও;
দোয়লে কোকলি হঠাৎ করে গয়েে উঠবারও কথা নয়
তবু ওরা কি দখেতে ভড়ি কর,ে প্রতদিনি ভোরে

পথহারা পথকিরে শুকনো মুখরে দকিে তাকয়িে
এক অসম্ভব সময়ে
তনিি বললনে
স্বাধীনতার কথা
ছাপ্পান্ন হাজার র্বগমাইল ও তার নরম মাটরি কথা
পদ্মা মঘেনা কুশয়িারা, আর
সোনালী আঁশরে কথা

প্রায় রমণী হয়ে ওঠা কশিোরীর বুক দখেে ডানপটিে ছলেগেুলো
কি বষ্মিয়ে স্বপ্ন দখেৃে
তার কথাগুলো শীতরাতে
ভাঙাঘরে
চাদররে মতো
আমাদরে জড়য়িে রাখে

আমরা যখন ক্ষুর্ধাত ছলিাম
আমাদরে থালাভরা ভাতগুলো ওরা খয়েে গছেে
আমরা যখন শীতে কাঁপছি
আমাদরে গরম কাপড়গুলো জাহাজ বোঝাই করে নয়িে গছেে
আমাদরে ঘরবাড়ি জ্বলে পুড়ে ছাই, তবু

ভয়কে আমরা ভয় করি নাই
ভয়কে জয় করতে আমরা ললেহিান আগুনে পুড়ছেি
ওদরে হাতে ছলি রাইফলে, মশেনিগান, কন্তিু
ভয়কে ওরা ভয় করছেলি
মৃত্যুকওেৃ

রসের্কোস মাঠ থকেে সকাল সকাল উড়ে যাওয়া এক ঝাঁক পাখি
ধীর পায়ে চলা ঘাসফড়ংি,
গ্রাম্য শাসকরে তাড়া খয়েে গ্রাম ছাড়া
আমনো বগেম, আর
সবাই যাকে পাগলা বলতো সইে লোকটা
প্রতদিনি ভোরবলো এভাবইে বসে থাকে
ঘাসরে উপর
আমরা কউেই এতদনি বুঝতে পারনি।ি

 

গরীবের বিদ্যা-বুদ্ধি

গরীবেরা কিচ্ছু জানে না,
ওরা কিছু বোঝেও না,
ওরা কি গোলাপ ভালোবাসে, না-কি
জুই চামেলি? ওরা ফুল ভালোবাসে..
এমন কথাও কখনো কোথাও শোনা যায় নাই।
গরীবেরা স্বপ্ন দেখে
আকাশে হেলান দিয়ে, তবু কোনদিন
মাথা উঁচু করে দেখে নাই আকাশের নীল..

মার্কসবাদ, বর্ণবাদ,
শেয়ার বাজার, শিল্পকলা
এ সবে কি হয়? গরীবেরা কি জানতে চায়..?

আমাদের গরীবেরা
পায়ে হেঁটে বাজার যায়,
বউয়ের জন্য চুপি চুপি শাড়ী কেনে, আর
মনের খুশিতে জমির আল ধরে
হাঁটতে হাঁটতে
সিনেমার গান গায়।

গরীবেরা মরিচ পোড়া আর পিয়াজ দিয়ে পান্তা খায়
গুলশানে এলিটেরা ইলিশ ভাইজা
সেটারও বারোটা বাজাইছে।

নেতা-টেতা ডাক দিলে ওরা মিছিলে যায়
শ্লোগান দেয়
ওঁরা যা যা কইতে কয় গরীবেরা তাই কয়

ওরা ছাই দিয়া দাঁত মাজে
গাছ-গাছালি পিষা অসুধ বানায়
সর্দি হলে নাকে সরিষার তেল দেয়

গরীবেরা স্বপ্ন দেখে
আকাশে হেলান দিয়ে, তবু কোনদিন
মাথা উঁচু করে দেখে নাই আকাশের নীল।

 

শামস আল মমীন

জন্ম ডিসেম্বর ২৬, ১৯৫৭ রংপুরের বদরগঞ্জে। তিনি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যাপাঠ নেন স্থানীয় স্কুল ও কলেজে। ১৯৮২ তে যান আমেরিকা। সেখানে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য এবং এডুকেশনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮৯ সন থেকে তিনি নিউইয়র্কের শিক্ষা বিভাগে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন। ৯০- এর শেষে মমীন সাহিত্য পত্রিকা আকার ইকার সম্পাদনা করেন। তারও আগে, জানুয়ারী ১০, ১৯৮৫ তে প্রকাশ করেন আমেরিকা থেকে বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক দিগন্ত। শামস আল মমীন ছিলেন তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।

এই লেখকের কবিতার বই

১৯৯৫ চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না
২০০১ মনোলগ (২য় সংস্করণ ২০১৫)
২০০৯ সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা
২০১২ আমি সেই আদিম পুরুষ
২০১৪ আমি বন্দী খোলা জানালার কাছে
২০১৬ কেউ হয়তো আমাকে থামতে বলবে
২০১৭ নির্বাচিত কবিতা
২০২০ অনেক রাত জেগে থাকার পর
দোলে হাডসন দোলে পদ্মা (যন্ত্রস্থ)

সম্পাদিত পত্রিকা

১৯৮৫-১৯৮৭ দিগন্ত
১৯৯৭-১৯৯৮ আকার ইকার

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।