শামস আল মমীনের তিনটি কবিতা

কেমন আছো তুমি

তোমাকে দেখেই বুঝে নিতে পারি তুমি
আছো কেমন। আজন্ম দুঃখের নোলক
পরে কার্তিকের আকালের মতো ঘুরে ফিরে আসো
তুমি। তোমার অ-বলা জিভ অকস্মাৎ রোদ ওঠা
আকাশের চেয়ে তপ্ত। সক্রেটিসের কথার মতো
তোমাকে আমরা বুকে বুকে রাখলাম। হেমলকে
তুমি জান কোরবান করোনি।

উনসত্তরে কী দাঙ্গা না বাঁধালে তুমি!

তোমার চোখের ঝিলিমিলি অগ্নিগিরি,
চিকন বাহুর রুগ্ন পেশি
তবু দাঁড়ালে কী অহংকারে! ডিসেম্বরে
আসছে আমার জন্মদিন;
তোমারও। অথচ একফালি হাসি নেই কারো মুখে।

তোমার খান্কায় আজ আর নেই কোনো মুসাফির!

জানি, তুমি ভালোবাসো কেরোসিন বাতি
কলসীর খলখল জিয়ল কৈ। তুমি ভালোবাসো
গোবরের ঘ্রাণ, বাতাবি সবুজ, নতুন বউয়ের
মতো নতমুখ ধানশীষ।

এখন তোমার চোখে ইলেকট্রিক বাল্ব, জুম লেন্স
বার্গারে এক্সট্টা চিজ। তুমি ভালোবাসো
ওয়াটার বেড, স্পিডি ইন্টারনেট;
তোমার ঘামের দাম ঝুলে আছে পেরি এলিসের
ট্যাগে। বোনের মেয়েটি পায়রার মতো
ঘুরেফিরে, তবু ছুঁয়েও দ্যাখোনা তার তুলতুলে গাল।

তোমার বয়ানে তুমি আর তুমি নেই।
কী করে তোমার কণ্ঠে অবিকল কারো কথা…
কাঁকড়ার মতো হামাগুড়ি দিয়ে আছো তবু
যেমন দেয়াল কামড়ে থাকে টিকটিকি।

 

যাবার আগে

সাত সকালেই উঠে গেছি আজ।
নরম হাওয়ায় ঘুম ঘুম পাখিগুলো উড়ছে আকাশে,
উড়তে উড়তে ওরা খুঁজে নিবে বৃক্ষ-শাখা কিম্বা
ভালোলাগা কোন আউশের খেত। কয়েকটা
পথের কুকুর শুয়ে আছে পথে, প্রভুহীন…

জানালার গ্রীল ধরে দেখি আমি, বহুদূর…
কত দূর গেছে এই পথ, কোন গাঁয়ে?
মনে হয়,
কতো পথ আজও হলো না দেখা।
হয়তো বা,
আরও কিছু ছোঁওয়া যেতো,
আরও কিছু পথ হতো হাঁটা। তবু,
যা দেখেছি আমি
সবটুকু তার মিথ্যা নয় সবটুকু সত্যি নয়।

মেঘদের মতো বাধাহীন হয় কি জীবন?
সরলরেখার মতো হাঁটা যায় এক পায়ে?
ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, ভালোলাগা
কিছু পাওয়া
কিছু চাওয়া,
তবু কেন হারাবার ভয়;

আমার সকল সাহস নিঃশেষ যেন আজ,
যা ছিল বিশ্বাসে, মনে হয় সবি সংশয়,
শুধু সংশয়।
তোমার পায়ের শব্দে
তোমার গায়ের ঘ্রাণে,
চোখের পলকে
যেন জেগে থাকি আমি।

তার চেয়ে ভালো…
আমি একদিন তোমাদের কাছ থেকে ছুটি চেয়ে নিবো
তোমরা গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর
তোমার চোখের টলমল জল দেখতে দেখতে
আমি চলে যাবো
পেয়ারার ডালে চুপচাপ বসে থাকা দোয়েল পাখিটা দেখতে দেখতে
আমি চলে যাবো,

তোমাদের জন্য রেখে যাবো ভরা নদী, খালবিল,
নদী ও হাওরের কিলবিল মাছ
রেখে যাবো সর্ষে ফুলের অনেক হলুদ,
ধনে পাতার নরম গন্ধ। ছোট খাটো সুখ দুখ,
তার কিছু সাথে নিয়ে যাবো,
ঘরের পিছনে বাতাবি লেবুর গাছ, তার কিছু ঘ্রাণ সাথে নিয়ে যাবো;
রবীঠাকুরের গানগুলো,
তোমাদের পলকহীন চেয়ে থাকা দৃশ্যগুলো
আমি সাথে নিয়ে যাবো; সাথে নেবো আরও…
আমার অবুঝ স্বাধীনতা।

সাত সকালেই উঠে গেছি আজ, কিন্তু কার পোড়া মুখ দেখে
অন্ধবিশ্বাসে
শুধু আজ হারাবার ভয় জাগে,
কেন মনে হয়,
এই বুঝি শেষ দেখা, শেষ কবিতার শেষ পঙক্তিও হলো শেষ…

তোমাদের কাছ থেকে ছুটি চেয়ে নেবো আজ
তোমরা গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর

আমি তোমাদের দেখতে দেখতে চলে যাবো;
আমি তোমাদের দেখতে দেখতে, বহুদূর চলে যাবো…

করোনাকে ভয় করোনা

বার্লিন ওয়ালও ভেঙে গেছে,
সে কথা না হয় থাক আজ।

এই দুঃসময়ে, আর কত
দুঃসংবাদ নিয়ে তোমাদের দরোজায় কড়া নাড়বো আমি
কত লাশ কাঁধে
খুঁজে বেড়াবো সাড়ে তিন হাত মাটি।
পিপড়ে খাওয়া মরা কাকের মতো একটা মানুষ
মরে পড়ে আছে।
পাদ্রী, পুরোহিত,
ইমাম, র‌্যাবাই
গ্রাম্য শাসক,
পালিয়েছে ভয়ে সব।
হায়, করোনা সময়!

গ্রেটা থানবার্গ, সুইডিশ স্কুল গার্ল
কি সুন্দর করে বোঝালো তোমাকে
জাতিসংঘে তার কি কাজ।
জনাব ট্রাম্প!

ব্যবসায়ে তোমার মাথা ভালো।
কিন্তু আমাকে বোঝাও তো
কিম জং উন
কি করে তোমার বন্ধু হয়ে গেলো?
কফির টেবিলে হাস্সৌজ্জল পুটিন।
আরব্য রজনীর গল্প শুনতে শুনতে তুমিও হারিয়ে গেলে
যুবরাজ সালমানের সুখের জলসায়।

দ্যাখো তুমি! কি রকম পুড়ে যাচ্ছে মাইল মাইল বনভূমি
অগ্নিকুন্ডে শংকিত সচকিত লোকালয়।
কারো কারো মনে বিপুল সন্দেহ
পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গেলে কার কি আসে যায়?

মনে হয়, অন্যসব গ্রহের মতো
পৃথিবীও জনশূণ্য আজ।
বাহিরে কি সুন্দর হাওয়া কিন্তু তুমি বেছে নিয়েছো
সেলফ-কোয়ারেন্তিন।
পৃথিবীকে আরও মায়াময় করে ফুটে আছে সূর্যমূখী,
গোলাপ, জুই। কিন্তু

ওদের নরম পাপড়িগুলো ছুঁতে পারছো না তুমি;
পাচ্ছ না তার সুগন্ধও। কারণ
সর্বাঙ্গ তোমার লকডাউন।

কিন্তু আজ এই করোনাকালে তার কথা মনে পড়ে।
রংপুর থেকে আরও দূরে,
ওসমানপুরে
বার্ধক্যভারে নত
উবু হয়ে থাকা শূন্য হাড়ির দুঃখ,
মনে পড়ে।

তার স্বপ্নগুলো এখন ভোরের নক্ষত্রের মতো আলোহীন, তবু
প্রজাপতির পিছে ধাবমান বালকের রঙিন দিনগুলি মনে পড়ে।
অন্ধকারে, কি ব্যাকুল, সকলেই চায় আলোর সখ্যতা।

জন্ম হলে মৃত্যুও, এমন বিশ্বাসে
ধনুকের মতো বাঁকা প্রায়…তবুও
উঠে বসে;
চোখ রাখে মহাকাশে যেন কতদিন দেখে নাই পৃথিবীর
আলো অন্ধকার।

হিরোশিমার কথা মনে পড়ে তার।
মনে পড়ে, ক্ষুদিরামের ফাঁসি
বার্লিন ওয়াল
অ-বিভক্ত ভারতবর্ষ।

এক জীবনে যতো কিছু দেখা যায়, তারও বেশি
দেখেছে সে।
উনসত্তরে উত্তপ্ত মিছিলে ছিল;
উদ্দ্যত রাইফেল হাতে বিজয়ের মিছিলেও।
বত্রিশ নম্বরে গুলিবিদ্ধ লাশের উপর দিয়ে হেঁটে গেছে কারা
দেখেছে তাও। তবু
যতক্ষণ বাঁচি
ততক্ষণ আশা…
তার ঝাপসা চোখের আলো আরও একবার অস্তমিত সূর্য
দেখতে দেখতে আমাদের বলে যায়,
‘করোনাকে ভয় করোনা’।

পুটিন, ট্রাম্প,
কিম জঙ উন
তোমরা কি পারবে?
তোমরা কি পারবে
রাজকুমারী সোফিয়ার মতো করোনাক্রান্তদের পাশে বসে
জীবনের গান শোনাতে।
পারবে কি কর্মহীন যৌনকর্মীদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে।
পারবে কি আশা জাগানিয়া
একটিও
পঙক্তি শোনাতে…

মালালা ইউসুফজাই
গ্রেটা থানবার্গ
নেলসন ম্যান্ডেলা

ওদের মহৎ ভাবনায় আমাদের চোখ ভিজে যায়।
আমাদের অব্যক্ত বাসনা আর
অক্ষম উচ্চারণগুলো উপহাস করে আমাদের।

জানি,
এই অসুস্থ পৃথিবীর জন্য সন্তানদের কাছে আমরা
প্রশ্নবিদ্ধ হবো…
সেদিন কি বলবো আমি?
সেদিনও কি আমি
ফেল করা শিক্ষার্থীর মতো নতজানু হবো
আমার অক্ষমতার কাছে?

একদিন, এই পৃথিবী আবার নেয়ে-খেয়ে
অসুধ পথ্যে
সুস্থ হবে…দূরের পাখিরা
মেঘদের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়বে আকাশে।

কিষানেরা ফিরে যাবে মাঠে
হুইসেল শুনে স্টেশানের কুলি, ঝামলাল, আরও
একবার বুকে টেনে নেবে সাধের বধুয়ারে।

ছেলেমেয়ে আবারও
ভোরের পাখির মতো কিচির মিচির করতে করতে
পৌঁছে যাবে স্কুলে, পিছনে দাঁড়িয়ে
মমতাময়ী মা…
আঁচলে মুছবে চোখ; কিন্তু
ওইসব ছেলেমেয়ে কোনদিন জানবে না
তার চোখ ভেজা কেন।

ঈশ্বর, প্রার্থনা করি
সকল মায়ের চোখ যেন ভেজা থাকে আজীবন,
এমন সুখের জলে।

শামস আল মমীন

জন্ম ডিসেম্বর ২৬, ১৯৫৭ রংপুরের বদরগঞ্জে। তিনি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যাপাঠ নেন স্থানীয় স্কুল ও কলেজে। ১৯৮২ তে যান আমেরিকা। সেখানে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য এবং এডুকেশনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮৯ সন থেকে তিনি নিউইয়র্কের শিক্ষা বিভাগে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন। ৯০- এর শেষে মমীন সাহিত্য পত্রিকা আকার ইকার সম্পাদনা করেন। তারও আগে, জানুয়ারী ১০, ১৯৮৫ তে প্রকাশ করেন আমেরিকা থেকে বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক দিগন্ত। শামস আল মমীন ছিলেন তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।

এই লেখকের কবিতার বই

১৯৯৫ চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না
২০০১ মনোলগ (২য় সংস্করণ ২০১৫)
২০০৯ সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা
২০১২ আমি সেই আদিম পুরুষ
২০১৪ আমি বন্দী খোলা জানালার কাছে
২০১৬ কেউ হয়তো আমাকে থামতে বলবে
২০১৭ নির্বাচিত কবিতা
২০২০ অনেক রাত জেগে থাকার পর
দোলে হাডসন দোলে পদ্মা (যন্ত্রস্থ)

সম্পাদিত পত্রিকা

১৯৮৫-১৯৮৭ দিগন্ত
১৯৯৭-১৯৯৮ আকার ইকার

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।