মারুফুল আলমের দীর্ঘ কবিতা


প্রাতিস্বিক প্রার্থনা পরিক্ষিপ্ত পরিক্রমণ এবং অন্যান্য

কবি শোয়েব শাদাব কে

উপক্রম:তাঁর প্রার্থনা

প্রারম্ভে প্রার্থনা ওই ক্রীড়ারত জগত পিতার
অভিলাষে সৃষ্টি যার মনোহরা এই বিশ্বলোক
নিপুণ নায়ক বটে সর্ববিধ রহস্যজনক
মৃত্তিকার সহযোগে সৃজিলেন আদিম আদম
দূতগণ চমকিত তাহার এগূঢ় অভিজ্ঞানে
কহিলেন: ওম শান্তি,ওম শান্তি; শান্তি ওম ওম!

উন্মোচন:এক,দুই,তিন,চার,পাঁচ…

দেহের বাকল খুলে উঁকি দিই নিজস্ব নিয়মে
অত:পর দ্রুতগতি আমি এক পাথরের বল
গড়াতে গড়াতে নামি এক,দুই,তিন, চার,পাঁচ…
সূর্যপুষ্প ছুঁয়ে আহা ক্রমশ গড়িয়ে যাই সিঁড়ি

পেছনে আলোক দ্যুতি;কাছে ডাকে কোমল আঁধার
অবশেষে স্থিত হই,কাটা পড়ে জলের শরীর
কাচ-কাচ স্বচ্ছজলে নিশ্চয়ই দৃশ্যমান আমি
জন্মঘ্রাণে গেয়ে উঠি অনধীত সনাতন গীত।

এক: যাত্রা হলো শুরু

অস্বচ্ছ আলাক কণা প্রণয়ের উৎসমুখ হ’তে
ঘর্ষণে উৎক্ষিপ্ত হলে খুলে যায় সোহাগী কপাট
শুদ্ধতম রসায়নে দুলে উঠি চংক্রমিত প্রাণ
সেই হ’তে এই আমি সেই হ’তে যাত্রা হলো শুরু…

পরিণত পরিবেশে ক্রমাগত অলীক আমেজ
কুয়াশার স্নেহযোগে প্রাচলিক গড়ে ওঠা রীতি
ধীরে-ধীরে বেড়ে ওঠা উষ্ণতাপে ক্রমশ জমাট –
মোমের ফেয়াল ঘেরা তুলতুলে বেলুন-কোটরে।
সচকিত রক্তজল সম্মিলিত সংমিশ্রণে জানি
অবয়ব অনুভবে সৃষ্টি করে মজ্জা-মাংসকোষ
জৈবনিক আয়োজনে স্পন্দমান শিরা-উপশিরা
নিরন্তর মিশে যাওয়া সুনিপুণ কারিগরি স্রোতে
এঁটে বসে মাংসপিণ্ড অবিরাম হাড়ের উপর।

দুই: নিজস্ব ভূগোল

পাকে-পাকে ঊর্ধ্বমুখি প্রসারিত সিক্ত দড়িপথ
অযুত ঈথার কেটে পৌঁছে দেয় সূর্য-সরোবর
ডুবু-ডুবু শুদ্ধ স্নান;বিদ্ধ হলে আলোকের সুচ
হেসে ওঠে করোটির পুঞ্জিভূত আদি মৌলকণা
পানাহারে পূর্ণপ্রাণ,চন্দ্রমার সোমের আরক –
জাদুকরী মায়াবলে দেখালো সে আমার ভূগোল
দর্পণের
প্রতিবিম্ব
ছবি –
ঠিকঠাক
সবকিছু
হস্ত,পদ,স্কন্ধ,মাথা… শ্রী অঙ্গের তাবৎ গড়ন
শুধু পুচ্ছ নেই
এবং আপাতত
উল্টো হ’য়ে আছি।
স্থিত এ-কোটরে কোন রক্তচোষা প্রাণী নেই জানি
তথাপি
সুদীর্ঘ
সোনালি পুচ্ছের
খ’সে পড়া স্মৃতি –
ঘোরকৃষ্ণ কংকপক্ষী যেন স্থির হ’য়ে বসে থাকে
চেতনের আলোকিত কোষে; দ্যুতিহীন তীক্ষ্ণ ঠোঁটে
নেড়েচেড়ে খুঁটে খায় মগজের স্বচ্ছ প্রোটোজোয়া
উপক্রান্ত উপদ্রবে উসকে ওঠে বোধিতব্য জ্ঞান।

তিন: ইতিহাস গাথা

সিদ্ধাসনে ভেদ ক’রে দৈবজাত রুক্ষ আবরণ
সময়ের ভাঁজে-ভাঁজে জীবাশ্মের স্মৃতি চিহ্ন যত
পতন পতন রব শুন্যবৃত্তে মিশে-মিশে হাওয়া –
সকরুণ হাহাকারে রেখে যায় কীর্ণ ইতিহাস।

পাতাল পিয়াসি আমি যেন এক বেহায়া বাউল
সুতীব্র সুরের টানে তুলে আনি শিকড়ের রাগ
খুঁড়ে-খুঁড়ে ক্রমাগত প্রহরের প্রথম পরান –
কৌতূহলী কোদালের উপহত কড়ুয়া কন্দকে
ধরা পড়ে বজ্রনাদ প্রাথমিক ক্ষৌণী বিস্ফোরণ
পরিচেয় পরিপত্রে মনে পড়ে বিবর্তন গাথা।

অনন্তর পূর্ণপ্রাণ; বিদায় হে বেলুন প্রাসাদ
নিম্নস্রোতে ভেসে যায় ঝাঁকে-ঝাঁকে মৃত্তিকার মাছ
আমার দু’হাত ভরা আকাঙ্ক্ষার অবিনাশী চোখ
আলো ছুঁড়ে মুছে দেয় আঁকাবাঁকা আঁধার টানেল
রন্ধ্রে-রন্ধ্রে রক্ত নাচে;কেঁপে ওঠে ঈশ্বরীর কায়া
ডানায় ভ্রমণ নেশা পর্যটনে আমিও নাছোড়
প্রসন্ন প্রস্তুতি পিয়ে ভেঙে-ভেঙে ঘড়ির প্রহর
জলভ্রমি ফুঁড়ে উঠি ধাবমান বোরাক-বোরাক
বঙ্গভূমে জন্ম নিই আমি এক নিষাদ নাগর
ডঙ্কা-ডঙ্কা বাজে ঢাক-ঢোল জন্মধ্বনি শুধু…।

চার: রক্ত-গুহা-গ্রাম

সিঁড়ির দ্বিতীয় ঘোর দৃশ্যগুচ্ছ অতল অবাক
সম্মোহিত শৈশবের খণ্ড খণ্ড রঙ-চটা স্মৃতি
অতিদূরে ভাসমান অন্তহীন মেঘের মোকামে
মাথা গুঁজে শুয়ে আছে যেন এক বেগানা বেড়াল
উঁকি দেয়
মাঝে-মাঝে
ঘুরে আসে
রক্ত-গুহা-গ্রাম
মুখ রাখে মাতৃস্তন জনাতিগ দুগ্ধ সরোবরে।
দূরে যায়;
কাছে ডাকে,
বিচ্ছুরিত বিবিধ বিষয়
নিজ ভাণ্ডে জড়ো হলে জ্বেলে দেয় লতার আগুন
আলো-আলো তীব্র আলো কখনোবা নিমেষে উধাও
দূরের নক্ষত্রগণ নেচে ওঠে আত্মপরিচয়ে।

পাঁচ: হরিণ গতির স্রোত

ফড়িঙের পিছু ছোটা হাতে ধরা লাটাই ও সুতো
আকাশে উড়ছে ঘুড়ি;চক্করে ভোমমারা নীল

রুবী’পা লক্ষ্মী সোনা গ’লে যাই মোমের মতন
উষ্ণ-তনুয়া-তাপে কাটে দিন এই আমাদের

দু’বেলা কষ্ট ভাতে ইহা নয় ভুল ব্যাকরণ
পিতাজী ধীবর হেতু কুঁড়ি ফোটে সাম্যবাদের

মাতার ওষ্ঠে স্নান;আদুরিয়া স্নেহরঙ দ্রুত
ক্রমশ ধূসর হায় অরুণিমা কাঙ্ক্ষিত চিল!

রুবি’পার মুখ জিজীবিষু দিন ধন্দের ছলে
ফিরে যায়,আসে – গৃহমুখি প্রিয় পায়রা যেমন
শারদ আকাশে ওড়ে,সবাকার জম্পেশ স্নেহে…
দেহের ভাণ্ডে তবু ক্ষতকূপ ছাই-কৌশলে
খুঁটে নেয় দ্রুত ঝরা-পাতা-শোক দাহ্যক্ষরণ

জ্বলতঁহি চিতা ক্রমে জেগে উঠি দ্বিধা-সন্দেহে।

উপসংহরণ: সূর্যবন্দনা

ছিঁড়েছি দ্বিধার আয়ু সময়ের তীক্ষ্ণ শাদা দাঁতে
নিকষ নেকাব খুলে বোধিমূলে বসিয়েছি জানি
আহা কতদিন মেঘের আড়াল–শুন্য-শুন্য সব-ই
যোগভাগগুণে অবিরত– পিছল পিছল পথ
ডানে-বাঁয়ে টানাটানি কৈশোরিকক্রীড়াক্রান্তিকাল
বিজ্ঞাপিত দ্রুত স্রোতে কতিপয় দ্বিপদী ছাগল
খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটে– অন্তদৃশ্যে হিসিধ্বনি মলমূত্রত্যাগ
দুঃখযোগে হা-পিত্যেশ ডাকে ভ্যা-আ,ভ্যা-আ
অনন্তর ঝরে পড়া-ঝরে পড়া নষ্ট ঘ্রাণ অস্পৃশ্য আপেল
অন্ধকারে ডুবে যাওয়া শুধু– স্বচ্ছ ওই দৃশ্যগুলি
জমে জমে বিস্ফোরিত হ’লে শব্দহীন রসায়নে
চুরচুর বোধের ব্রাকেট– তাই আমি সাজিয়েছি
গভীর শিকড় কেটে-কেটে চোরাজাল কামটের
মত সূর্যমোহে ধাবমান শক্তিমত্ত যেন এক
নিষাদ নাগর– নেচে উঠি মুক্তানন্দে– সুখ আহা কী ভীষণ
সুখ এ-গমনে– জেগে ওঠে তেইরেসিয়াস আমার এ-মন
ক্রমশ দ্বিধার বিন্দু দূরীভূত তোমার আলোকে
সংশয়ের সূক্ষ্ম সুতো অনায়াসে ছিঁড়ে ছিঁড়ে হাওয়া– স্থিত হও
দিবানিশি… নীলীরাগে বাঁধো ফিনিক রৌরবে– অয়ি সখী
প্রণম্যপরান ও সূর্যঠাকুর

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *