জাহিদ হায়দারের একগুচ্ছ কবিতা

আমার ছিন্নপত্র : ৮

কার্তিকের ইলশেগুড়ি বৃষ্টিতে ‘লিট ফেস্ট’
সরস্বতীর ধমনীর আন্তর্জাতিক কম্পন খুঁজছে ।

বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গনে
গ্রাম্য নাগরিকের দল
কিছু আন্তর্জাতিক ঢেউয়ের কাদায়, ভেজা ঘাসে
পোশাকি ব্যবহারে আপাতত মননশীল,
তাপনীয় সঙ্গকামে কফি হাতে আলাপে মুখর।

আমরা দৃশ্যের কথা বলি।
দৃশ্য আমাদের কথা বলে।

দুজন তরুণতরুণী বেশ ভালো ইংরেজিতে,
দু’চারটি বাংলা শব্দের খবিশ উচ্চারণে,
চোখেমুখে বৃষ্টিভেজা আলোর সাফল্যে জীবিত,
শশি থারুর ‘ সুইটেবল বয়’-এ যৌনতার শিল্পরূপ নিয়ে
ব্যক্তিগত বৃষ্টির ঝিরঝির উপভোগ করছিল।

রমণী মাংসবতী। আমার খারাপ লাগে।
হাঁটতে তার কী কষ্ট।
কেন যে শিল্পকলা ! কেন যে উৎসব !
সাথের তরুণী অধিক চঞ্চলা।
বসন শরীর কামড়ায়। গরিব স্তন।
পায়ের জুতো কাদায় মলিন। হাতে চকবার।
লাল ঠোঁটের ঢেউয়ে কিছুটা আইসক্রিম
আন্তরিক কষ্টে গলে যায়।
জিহ্বার ফণা খয়েরি দুগ্ধ চাটে।

পোশাকের কী ফিউশন! তরুণের গায়ে হলুদ ফতুয়া।
হাঁটু পর্যন্ত তিন পকেটঅলা জিন্সের প্যান্ট।
পায়ে স্পঞ্জ। হাতে কফি। দুই হাতে লাল নীল চুড়ি।
কানে মাটির দুল। গলায় উপকারী গামছা।
মাঝে মাঝে কার্তিকের শীতার্ত বৃষ্টি মুছছে।
নিজ হাতে বান্ধবীর মুখ মুছে দিচ্ছে। ভালো ধৈর্যযাপন।
তরুণী সুন্দরী। বব ছাট। পরনে তাঁতের সুন্দর শাড়ি।
নীল রং। পাড়ে দৌড়াচ্ছে হরিণ। নৃত্যময় ময়ূর।
কালো ব্লাউজে মেয়েটির শিল্প: স্লিভলেস।
সামনে পেছনে লো কাট। পিঠ প্রায় পূর্ণ ফরসা চাঁদ।
স্তনের বিভাজনে কমলারঙের বোঁটায়
একটি শিউলি-লকেট শীলিত আদরে ঘুমাচ্ছে।
গ্রীবার পাশ থেকে নেমে আসা
ব্লাউজের কালো স্ট্রিপে শাদা রঙে ছাপা:
‘তুমি কোন কাননের ফুল…’।
‘গগনের’ গগন ভাঙা, কালোর ভেতর লেপ্টে গেছে।
‘তারা’ শাদা হয়ে জ¦লছে নবীন স্তনে।
‘স্বপনের পারা’ কাপড়ের অন্ধকারে।

তোমার মনে হতে পারে,
যদিও তোমার মন শুধু তোমারই,
দৃশ্যগুলির কথা বানিয়ে বলছি।
যদি আগামীবার যাও
এবং কোথাও হও ‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল’
আর ‘উৎসবে’ ঢাকার সাহিত্য
যদি কিছু ‘আন্তর্জাতিক’ হয়,
দেখবে : কী বিচিত্র দঙ্গল।
দঙ্গলে মাঝেমধ্যে যাওয়া ভালো।
তুমি দৃশ্য। অন্য দৃশ্যতে কারো বিশেষ রচনা।

এবার যদি আসতে,শুনতে :
ভালো বাংলা, আঞ্চলিক বাংলা, লোকসঙ্গীত,
ইংরেজি, ইটালিয়ান, হিন্দি, ‘ফাকেন শিট’।

দেখতে: ‘ক্ষণখণ্ডে’র কোলাহল।
মাঠে কবিদের প্রতিভার বয়নশিল্প।
বাতাসে উড়ে যাচ্ছে শব্দের হাহাকার।
শ্রোতা আছে। মাথা নিচু। ব্যস্ত মোবাইলে।

অডিটরিয়ামে তখন চলছে
দুই বোন, হাসিনা ও রেহানার বেঁচে থাকার যুদ্ধছবি।

শতরকম ওয়াড় পরা কথার
আন্তর্জাতিক আয়োজনে তুমি ক্লান্ত হলে,
তোমার ক্লান্ত হবার অধিকার আছে,
বাইরে যাবার স্বাধীনতা খোলা।

নব্বইটি সেশন।
হয়তো  শ্বাসের বাতাস খোঁজা নব্বইটি নগরমল্লিকা।
শিল্পচর্চার জট।
মূর্খ দেশে শিল্পের, সাহিত্যের রূপচর্চা ভালো।
কর্পোরেট-হাসাহাসি মানতে পারলে তুমি সমকালীন।
হিসাবের মৎস্যনীতি ভালো।
নয়ন জুড়াতে পারে, পুড়ে যেতেও।
অন্ধ হলে আমাকে ডাক দিতে পারো।
হাত ধরে শূন্যস্থান,
আলো অন্ধকারের চড়াই-উতরাই,
চোরাবালির ফাঁদ পার করে দেব।

মনিকা আলী আর শশী থারুর
এদিক-ওদিক দৃষ্টির সৌজন্য ফেলে
গাড়ির দরজার দিকে
তমোজ্যোতি-ঠোঁটে হেসে চলে যায়।

০৮.১১.২০১৯

 

 

বালিঘড়ি

তোমার সঙ্গ কি সময়প্রমাদ ?

যখন হঠাৎ
আছে
ছিল হয়ে যায়।

অচেনা নতুন বাঁচে
নতুন খোঁজার সংঘাতে।

শূন্যের নামতা পড়ায় দূরত্বের খাদ।

সকালে পাখিটা বসে
ইজিচেয়ারের হাতে।

২৫.০৩.২০২০

 

পঞ্চকোষ

(বেদান্তে উক্ত পঞ্চকোষ: অন্নময়, প্রাণময়, মনোময়, জ্ঞানময় এবং আনন্দময়।)

আমি যে চেটেপুটে খেয়েছি অঙ্গার
হইনি ছাইধুলি,অবাক অগ্নি।

আমি যে হৃদিপাড়ে ছুঁয়েছি ঢেউগুলি
ভেসেছি প্রাণময় যমুনাকল্লোলে।

থামেনি ঝঞ্ঝা মনের পল্লবে,
আমার বনভূমি দহনে চিন্তিত।

লিখেছি অক্ষর চলার পৃষ্ঠায়,
রচিত বাক্য দেবে কি রৌদ্র?

হেসেছি সুখেদুখে, বাঁচার অর্থে
হয়তো অর্জন, অথবা বর্জন।

খেয়েছি চেটেপুটে পঞ্চকোষ-মধু,
পুঞ্জীভূত ঘাম লবণে উজ্জ্বল।

১১.০৫.২০২০

 

জীবনের অংশ

সবুজ পাতা যখন ছেঁড় তুমি
সাপেরদাঁত পড়তে পারে মুখে।

ফসলগুলি কাটবে তুমি কাল
রাত্রে আসে আগুনমুখা নদী।

প্রিয় মানুষ হঠাৎ চলে গেল
দরজামুখে বিদায় পড়ে চিঠি।

একটি ক্ষত সঙ্গী সারাক্ষণ
বহনকারী সেবায় বাঁচে তার।

ছিল না কথা ফিরবে মুসাফির
পদচিহ্ন পদক্ষেপ হলো।

শীতের পথে নামলো বিদ্রোহ
দাবির মুখে পালালো উর্দি।

টিকেট ছিল দোহারপাড়া যাবে
ট্রেনের লেজ তোমার মুখ দ্যাখে।

চেষ্টাগুলি করেনি কিছু ত্রুটি
থাকতে পারে ভুলের কিছু ধুলো।

আরোগ্য-ভার হাতের সমবায়ে
দূরত্বের অসুখে ঢাকা দিন।

সূচনামুখ বিকল্পের পথে
দেখাতে পারে সূর্যজাগা গৃহ।

কোথাও কোনো জীবাণুখড়গ নেই
তোমার হাতে পায়রা খায় দানা।

অংশ পড়ো,   আশ্বাসের পুথি
না পড়লে নতুন বাঁচা খোলো।

১৪..১০.২০১৯

 

চিরজীবিতা

গঞ্জে বৈষ্ণব একা এসেছিল।
বটবৃক্ষ নিচে করে গেছে গান :
চাওয়ার শেষ হলেই
তুমি সবার সম্রাট।

গঞ্জে বৈষ্ণবী একা এসেছিল
অনেক ভীড়ের গর্তে বসে বলে গেছে গান :
সহজ কি রূপচর্চা করে
দৃষ্টি কাড়িতে?

নৌকায় দুজন উঠে সারা পথে গেয়েছিল সুর:
ওগো ঢেউ
লিঙ্গদেহ করো পারাপার।

(লিঙ্গদেহ : দেহের অভ্যন্তরে কল্পিত ১৭-টি অবয়বযুক্ত সূক্ষদেহ :
চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক, বাক্, পাণি,পা,পায়ু, উপস্থ,প্রাণ,
অপান, সমান, উদান, ব্যান, মন ও বুদ্ধি )

 

জাহিদ হায়দার 

জন্ম : ২১ এপ্রিল ১৯৫৬ পাবনার দোহারপাড়া গ্রামে। বড় দুই অগ্রজ জিয়া হায়দার ও রশীদ হায়দারের বিশেষ পরিকল্পনায় ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া।
কিশোরকাল থেকে লেখালেখি শুরু। প্রধানত কবি। লেখালেখির অর্জনে আছে, গ্রন্থ: কবিতা–৮, গল্প–৩, উপন্যাস – ১ এবং ভ্রমণ – ১।
বিশেষ ভালোলাগা : চলমান ও স্থির মানুষের মুখ দেখা।

কবিতা:

স্বাগতকালের পর্যটক (১৯৮২)
খোলা দরোজার দিন (১৯৮৫)
অগ্নিগণ সখা আমার (১৯৯২)
বলো দূত, অভিসার তিথি (১৯৯৬)
বন্দনা করি অপেক্ষার (১৯৯৭)
রূপকথা এঁকেছিল ক’জন (২০০৬)
স্বপ্নপাড়ানি (২০১২)
নির্বাচিত কবিতা (২০১৬)
অববাহিকায় (২০১৭)

গল্পগ্রন্থ: জীবিকাজট (২০০১), আটমাত্রা (২০০৬),প্রেক্ষাপটের দাসদাসী (২০১৮, প্রকাশক: সমাবেশ)

উপন্যাস: প্রেম ও মৃত্যুর কথন (২০১৭)

ভ্রমণ: যখন ক্যামবোডিয়ায় (২০০৫)

Facebook Comments

One Comment

  1. Tushar Das

    Chonde lekha kobitar to ajkal dekha pawa besh mushkil. Mone holo bohudin por chonder kobita poRlam. Prothom lekhai “Litfest” niye je drishyoshokor tini jojona korechen, tar circusm, bidrup, tirjokota pathik ke chnuye jabe. 7matrar matrabritter bhetre 6 matrar ponkti juRe deyar khelai tini dokkhota dekhalen besh porer kobitai. Ar seshe 5 matrar matrabritter lekhatio besh legeche. Kobike shubheccha janai.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।