জাহিদ হায়দারের ছোটগল্প: বৈচিত্র্যের সংগ্রাহক

দ্বিতীয়বার ভদ্রমহিলাকে আবার দেখলাম। প্রথম দেখেছি প্রায় দু’মাস আগে।  মধ্য এপ্রিলে। পয়লা বৈশাখের দুই দিন পর। ছিল শুক্রবার। সেদিন সকালে উত্তর-আকাশে মেঘ ছিল।

আবির কম্পিউটার হাউজের বাইরে পনেরো ফিট চওড়া ভালোমন্দ পিচের রাস্তায় রিকশ’র বেল, গাড়ির হর্ন এবং মানুষের কথা ও চলাফেরার শব্দ থামছে না। শব্দ সবসময় বাঁচবার সঞ্চয়ে ও খরচে প্রাণবান।

কম্পোজিটার হাসানের পাশে বসে চারেেকানা কালো ফ্রেমের প্লাস-মাইনাস পাওয়ারের চশমা পরা মহিলার বেশ বড়ো দুটি চোখ মনিটরে পলকহীন। বয়স হবে ষাটের কাছাকাছি। পায়ের স্যান্ডেলের কালো দুই ফিতের উপর আকাশী রঙের সুতি শাড়ির, টাঙ্গাইল অথবা পাবনার, লালকালো চওড়া পাড় ঝুলছে। মাথার উপর সুতির খয়েরি চাদর। চাদরে হলুদ আর লাল গোলাপের কয়েকটি নকশি। পাপাড়ি এলোমেলো। কাঁচা হাতের কাজ। গ্রীবা ও বক্ষদেশ ঢাকা। সুরা নূরের একটি আয়াতে ঐরকম আদেশ আছে। তাঁকে ধার্মিক মনে হলো, ধর্মান্ধ নয়।

‘না না হাসান বানানটা ভুল হলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ়-এ ম-এ রশ্শো উ নয়, র্দিঘো উ হবে’। ‘সরি আপা’। হাসান বানান শুদ্ধ করে। হাসে। ‘সূত্রে খবরের কাগজের নামটা তারিখসহ দশ পয়েন্টে লেখ।’ হাসান বিচিত্র খবরটির নিচে লেখে।

মহিলার উচ্চারণ স্পষ্ট। স্বর শ্রবণ সহন। পরে জেনেছি, তিনি শিক্ষক। সৎ। আয় সীমিত। বাসার বারান্দায় বাড়িঅলার অনুমতি নিয়ে ক্লাস এইট ও নাইনের দুই ব্যাচ ছাত্র পড়ান। বিষয় বাংলা ও ইতিহাস।

 

২.

মাঝে মাঝে আমি কম্পিউটার হাউজে জরুরী কাগজপত্র প্রিন্ট করতে যাই। হাসান আমার মুদ্রণরুচি বোঝে। কাগজের উপর ও নিচে এবং দু’পাশে কতটা মার্জিন রাখতে হবে একদিন ওকে বলেছিলাম। হাসানের  ডানেবামে যে-দুজন তরুণ কাজ করে তাদের কথাবার্তা ও কাজ আমার ভালো লাগে না। একজন কথা বললে মুখ দিয়ে চুকো ঢেকুরের গন্ধ বের হয়। আর একজন নিয়মিত দাঁত মাজে না। মুখে সিগারেটের গন্ধ। ‘হাসান ভালো আছ’, এসেছি জানাবার জন্য আমার জিজ্ঞাসা। ‘ভাই বসতি হবে।’ আমি হলুদ রঙের প্লাস্টিকের হাতল ছাড়া চেয়ারে ওর কাছাকাছি বসি।

ভদ্র মহিলা, মনে হলো, আড় চোখে, চশমার কোনা দিয়ে আমাকে দেখলেন। নিয়মিত ছাত্রদের আচার-ব্যবহার এবং ওঠাবসা দেখা চোখের দৃষ্টি হয় অন্যরকম। অনেকদিন শিক্ষকতা করলে, শিক্ষকরা আশপাশের সব মানুষকে ছাত্র মনে করে।

নরমাল ১৬ পয়েন্টে হাসান কম্পোজ করছে। হতে পারে ভদ্রমহিলা যেন পাশে বসে পড়তে পারেন, এ-জন্যে পয়েন্ট বড়ো। আমার চোখ ভালো। মনিটরে  ‘বিচিত্র খবর’ পড়তে পারছিলাম। ‘সব প্রাণিদের আত্মরক্ষার  কৌশল আছে’, আমার চোখে পড়লো। ভদ্রমহিলাকে বললাম,‘ আপা যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলতে পারি ?’ আমার মুখের দিকে তাঁর দৃষ্টি দেখেই বুঝলাম তিনি বিরক্ত হয়েছেন। তাঁর কাজের মনোযোগে বাধা দিয়েছি।  ‘বলুন।’ ‘আমি যতদূর জানি, ‘‘সব প্রাণিদের’’ ভুল বাংলা, দুটো বহুবচন একসঙ্গে হয় না।’ আমার কথা শুনে তিনি শিক্ষকের চোখে তাকালেন এবং বললেন, ‘খবরের কাগজ ভুল লিখবে কেন ? হাসান টাইপ করো।’

আমার মনে হলো, কেউ পরামর্শ বা উপকার না চাইলে আগ বাড়িয়ে ওই দুটি কাজ করতে যাওয়া ঠিক না। গত বছর একজন তরুণী, বৃষ্টির সময়, আমার সামনে রিকশ উল্টে, ঢাকার গর্তভরা রাজপথে পড়ে গেল। আমি ছিলাম ফুটপাতে। তাকে ধরে তোলার পর আমার দিকে রাগের চোখে, বিশেষ অর্থ বুঝিয়ে, তাকালো, চোখে ছিল ঘৃণা, বললো : ‘আমি নিজেই উঠতে পারতাম।’ ওই অভিজ্ঞতা থেকে আমি কেন যে শিক্ষা নিইনি!

 

৩.

মাস তিনেক আগে প্রথম দিন হাউজে ঢুকে দাঁড়াতেই দানীউল ইসলাম, হাউজের মালিক, হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আসবার উদ্ধেশ্য। পেন ড্রাইভ দেখিয়ে বলি : ‘একটি পনেরো পৃষ্ঠার ফাইল প্রিন্ট করতে এস্ছি। ড্রাইভটা যেন ভাইরাস না হয়।’ হাসানকে দেখিয়ে দানীউল বললেন : ‘ওখান থেকে করতে হবে। মনে হয় অন্যগুলাতে ঝামেলা আছে।’

অন্যের নাম জানতে হলে, সাধারণ ভদ্রতা, প্রথমে নিজের নাম বলতে হয়। বলেছিলাম। দানীউল একজন ভদ্রলোক। উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফিট হবে। বয়স চল্লিশের উপরে। হাতে সোনালী ও কালো রঙের ছোট বড়ো দুটো মোবাইল। বাম হাতের তর্জনীতে লাল ও অনামিকায় নীল রঙের পাথরের আংটি। ভাগ্যের উন্নতির জন্যে নাকি নগ্ন আঙুলে আংটির সৌন্দর্য, জানি না।

দানিউলের বড় ছেলের নামে হাউজের নাম। ‘কতদিন হলো দোকানটা হয়েছে ?’ দানীউল বুঝতে পারেন, কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমার জানা দরকার। হেসে বললেন, ‘আমরা আমাদের কাজের এই জায়গাকে বলি অফিস, দোকান না। আমি বলি না কিন্তু এখন বলতে হচ্ছে, আমি একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী।’ সাধারণত যারা কম্পিউটার সায়ান্স পড়া শেষ করে, বলে, ‘আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।’

কম্পিউটার হাউজের তিনটি দেয়ালই শাদা। পশ্চিমের দেয়ালে বড়ো ফ্রেমে বাঁধানো মক্কার ছবি এবং দক্ষিণের দেয়ালে প্রায় একই মাপের ফ্রেমের মধ্যে কালো কাপড়ের উপরে স্বর্ণাক্ষরের আরবীতে লেখা ক্যলেমা তৈয়বা : লাইইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলল্লাহ।’ ছবি দুটির বেশ নিচে এবং উত্তরের দেয়ালে এই হাউজে কম্পিউটারের কী কী প্রোগ্রাম শেখানো হয় তার তালিকা শাদা কাগজের উপর কালো, লাল, সবুজ রঙে ছাপিয়ে, লেমিনেট করে সাঁটা আছে। চোখে পড়লো : চুকো ঢেকুরের তরুণ কানে হেডফোন লাগিয়ে স্মার্টফোনে হিন্দি ছবির এক নায়িকার সাহসী নাচ দেখায় ব্যস্ত। তার হাতে এখন কাজ নেই। ওই নায়িকার উপর একটা ফিচার পড়েছিলাম। ‘তিনি লাজুক কিন্তু পর্দায় খুব সাহসী।’ ভালো লেগেছিল বাংলা ভাষার ঈঙ্গিতপূর্ণ শক্তি।

 

৪.

এই দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ ও রাষ্ট্রে সৎ থাকবার জন্যে প্রতিদিন যাঁরা যুদ্ধ করেন তাঁদের মধ্যে একজন বৈচিত্রের সংগ্রাহক ওই স্কুল শিক্ষক ভদ্রমহিলা। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে বা কোনো বন্ধের দিনে বিভিন্ন কাগজ থেকে সংগ্রহ করা বিচিত্র খবর তিনি কম্পোজ করান। প্রতি এ-ফোর মাপের পৃষ্টা কম্পোজ করতে অন্য গ্রাহকের কাছে দানীউলের অফিস যা নেয় তার থেকে ৫ টাকা কম রাখা হয় এই শিক্ষকের কাছ থেকে। দানীউল আমাকে বলেছেন, ‘দয়া নয়, ওনার বাঁচাটা সৎ।’ আমি বলেছি: ‘আসলে পরিমাণ অনেক, তাই কম নেন’। দানীউল হেসে বলেন, ‘আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, বসেন,  দেখবেন অন্য কেউ পঞ্চাশ পৃষ্টা কম্পোজ করতে আসলে কত বলি।’ কথার দৃঢ়তা বুঝে কথা বাড়াই না।

 

৫.

একজন লোক এলো। মুখ দিয়ে খারাপ মানের সিগারেটের গন্ধ বের হচ্ছে। হাউজে ঢোকার আগে সুখটান দিয়ে ফেলে এসেছে। আমার নাক নিজে থেকেই দুর্গন্ধ সইতে দু’তিনবার কুচকায়। লোকটির কণ্ঠস্বর খরখরে। কথার প্রতিটি শব্দ কানে লাগে। অক্ষরের ঘোষধ্বনি চিৎকার করে। ‘আপা কয়েকবার ফোন করলাম, ধরলেন না, তাই আসলাম, রিকশা ভাড়া গেল। আর কতক্ষণ ?’ ভদ্রমহিলা বলেন, ‘আর দুই পৃষ্ঠা।’

বাংলাবাজারের কোনো এক প্রেস থেকে লোকটি এসেছে। ‘হইলে মেইলে পাঠায়ে দিয়েন। প্রেস কিন্তু বসে আছে আপা, কাল বিকালে পাঁচশ বই দিতি হবি।’ বলে চলে গেল। আমি দেখলাম, বাইরে যেয়েই লোকটি সিগারেট ধরালো। হাতে নিল মোবাইল। সম্ভবত প্রেসকে কাজের অবস্থাটি জানাবার জন্য ফোন করবে।

 

৬.

মহিলা হাসলেন। আমি কাছাকাছি ছিলাম বলেই হাসির শব্দ শুনলাম। হাসানের হাসির শব্দ বেশ জোরে হলো। কোনো এক বিচিত্র খবর তখন কম্পোজ করছিল। ‘কী বিচিত্র খবর ?’ এখন আমার জানবার উপায় নেই। ‘ আমি কি একটু পড়তে পারি ?’ বলবার উপায় নেই। তিনি বিরক্ত হবেন।

একঘেঁয়েমির আঠায় আমাদের জীবন প্রতিদিন আটকে যাচ্ছে। বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে ‘বিচিত্র খবর’, ‘বিচিত্র দুনিয়া’ ‘আজব খবর’ নামের পুস্তিকার বিক্রী ভালো। কে বৈচিত্র না চায় ?

মনে পড়ে,অনেকদিন আগে আমি লঞ্চে খুলনা যাচ্ছিলাম। তখন বিকাল। দুষণে বুড়িগঙ্গার পানি  আলকাতরারং। পড়ন্ত রোদ ঢেউয়ের উপর ফ্যাকাসে।

ডেকের উপর কাঠমিস্ত্রির দল। বসেছে গোল হয়ে। ঢাকায় কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরছিলো। পাশে হাতলঅলা কাঠের বাক্সে র‌্যান্দা, ছোটো করাত,বাটালি। এবং বাক্সের পাশে রুটি, কলা, পলিথিনে টোস্ট, সিগারেট আর কাগজে মোড়ানো পান। একজন পড়ছিলো ‘বিচিত্র খবর’। শ্রমিকদের চোখে মুখে হাসি। র‌্যান্দা মারা কাঠের মসৃণতা তাদের ঠোঁটের হাসিতে। একজন ছোটো বাটালি দিয়ে নখ কাটছিল, চোখ বাটালির দিকে, নাম ফরিদ, বললো, ‘সামাদ আবার ওই পক্ষি দুইটার খবর পড়ো।’ ‘ক্যা কালকে সন্ধ্যেয় শোনো নাই ?’ সামাদের প্রশ্নে ফরিদ বললো : ‘পক্ষি দুডের জন্যি মায়া হচ্ছে, দুই পক্ষি দুই জায়গায়।’ ফরিদের চাচাতো ভাই কাঠের রংমিস্ত্রি হামিদ হেসে বললো,‘মায়া হবিই তো।’ এই ‘হবিই তো’র মধ্যে এক ঘটনা আছে। ফরিদ যাকে ভালোবাসতো তার বিয়ে হয়েছে অন্য জায়গায়।

সামাদের পাঠ জড়তাহীন। যুক্তাক্ষরে বাধা পড়ে না। কণ্ঠস্বর শ্রবনসহন। কেউ তার  লেখাপড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, উত্তর শোনে : ‘ক্লাস এইটে ওঠার দশদিন পর আব্বা মরে গেল। বাড়ির বড়ো তো, সংসার মাথায় পড়লো।’

‘ ও পাখি তুই কান্দিস না’ এবং ‘এখনো প্রিন্সের অপেক্ষায়’ সামাদ প্রতিবেদন দুটির শিরোনাম দু’বার পড়ে। পড়বার পর থামে, সঙ্গীদের মুখ দেখে, ‘কাইল কিন্তু কইছি, প্রিন্স মানে রাজপুত্র আর প্রিন্সেস মানে রাজকন্যা। কইছি, ব্লু হইলো সবুজ, গোল্ড মানে সোনা, দম্পতি মানে স্বামীইসতিরি কিন্তু আমি জানি না ম্যাকাও মানে কি।’

বড় করাতের পাশ বসা সগির বললো : ‘রাজকন্যা আর রাজপুত্রের রূপকথা ?’ ফরিদ হাত তুলে বললো, ‘কথা বলিস না। শোন। ছবিই তো দেখা যাচ্ছে টিয়াপাখি, সামাদ পড়।’

‘ব্লু গোল্ড ম্যাকাও দম্পতি প্রিন্স ও প্রিন্সেস দুই মালিকের হেফাজতে রয়েছে। তাই আলাদা দিন কাটছে তাদের। মামলার বিবাদি বলছেন, ‘ প্রিন্সকে ফেরৎ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মহানগর হাকিম আদালত। কিন্তু পুলিশ এ বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে না।’

আর মামলার  বাদী বলছেন, ‘আদালত এমন কোনো নির্দেশ দেননি। এজন্য প্রিন্স তার হেফাজতেই আছে।’

অপর দিকে কলাবাগান থানার পুলিশের বক্তব্য, ‘গতকাল সোমবার পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতের রায়ের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ওই রায় অনুযায়ী কাল বুধবার পুলিশ আদালতে রায় জমা দেবে। বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হবে শুনানি।’

মামলার বাদী সিঙ্গাপুর-প্রবাসী মোহাম্মদ ইকরার সেলিম প্রিন্সকে লালনপালনের দায়িত্ব দেন আবদুল ওয়াদুদের কাছে। বিবাদী আবদুল ওয়াদুদ সিঙ্গাপুর থেকে মেয়ে পাখি প্রিন্সেসকে এনে পুরুষ পাখিটির জোড়া তৈরী করেন। এরপর ওরা ডিম দেয় এবং বাচ্চা ফোটায়। প্রায় তিন বছর পর ইকরার সেলিম পাখিটি ফেরত চাইলে আবদুল ওয়াদুদ তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এরপর ইকরার সেলিম আদালতের আশ্রয় নিলে মহানগর হাকিম পাখিটি তাঁর কাছে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর আবদুল ওয়াদুদের পক্ষের আইনজীবী নির্বাহী হাকিমের আদালতে বিশেষ আবেদন করেন। আদালত দুই পক্ষকে ১০ জানুয়ারী হাজির হয়ে শুনানিতে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তার আগে পাখিটি কার জিম্মায় থাকবে তা নিয়ে দুই পক্ষ  পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়।

বাদী ইকরার সেলিমের ভাই নাজির আহমেদ বলেন, ‘প্রিন্স তাঁদের বাসায় আসার পর আগের মতো স্বাভাবিক আচরণ করছে। আম্মু, ভাইয়া, আঙ্কেল বলে ডাকছে।’ তিনি আরও বলেন, আদালতের রায়ের অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।’

বিবাদী আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ থাকলেও পুলিশ পাখিটি ফেরত দেয়নি। পাখির সংসার রক্ষায় তিনি সবার সহযোগিতা চান এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।’

এ প্রসঙ্গে কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এনামুল হক গতকাল রাতে প্রথম আলোকে (প্রথম আলোকে শব্দ দুইটা বাঁকা ক্যইরে লেখা) বলেন, আদালতের রায়ের ব্যাখ্যা সংগ্রহ করে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

গতকাল সোমবার ‘ও পাখি তুই কান্দিস না’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন মহল পাখি দুটি যে মালিকের কাছেই থাক না কেন, ওদের সংসার রক্ষার পক্ষে মত দিয়েছে।*

‘সামাদ থামো।’ করাতি খালেক হাত তোলে। ‘মানে বুঝছো?’ প্রশ্ন করে সঙ্গীদের দিকে তাকায়। যেন এক জটিল ধাঁধা। ‘বলো জজের রায় কী হওয়া উচিৎ?’ ফরিদ বলে: ‘দুই পক্ষি একসাথে থাকার রায় হলি ভালো  হয়।’ রংমিস্ত্রি হামিদ হাসে, বলে : ‘আমি জানতাম ফরিদের রায় কী হবি।’

খালেক করাতি বলে : ‘দেখ আল্লার দুনিয়ায় পশুপাখির মদ্দিও কত ভালোবাসা। কী আজব ব্যাপার।’

 

৭.

আমি গুলিস্তান থেকে মিরপুর যাবো। ঘড়িতে চারটে কুড়ি। বাসে খুববেশি ভিড় নেই। কিছুক্ষণ পর অফিস ছুটি হবে। তখন সামনে ভিড় হতে পারে। দেখি, প্রতিবন্ধী ও মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৯-টি সিটের একটিতে বিচিত্র খবরের সংগ্রাহক ওই শিক্ষক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। সালাম দিলাম। আমাকে চিনেছেন। কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। জানলাম, তিনি মিরপুর একনম্বরে যাবেন। আজ তো কোনো বন্ধের দিন নয়। ‘আজ কি স্কুল বন্ধ ?’ আমার প্রশ্নে তিনি বললেন : ‘আমি ক্লাস নিই দুটো পর্যন্ত।’ মনে হলো, বাসায় আজকে ছাত্র পড়ানো নেই।

একজন হকার পল্টন থেকে উঠলো। ‘ভাইসব বিচিত্র খবর পড়েন। সামনেই জ্যাম। পড়েন, হাসেন। অবাক হন। বোঝেন দুনিয়া কত আজব কারখানা। পাখিরা রাত্রে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া এক দেশ থেইকে আর এক দেশে যায়। বাঘের দুধ মানুষের বাচ্চা খায়, বাঘ বাচ্চাটারে খায় না। মাত্র পাঁচ টাকা।’ হকার লালসবুজ কভারের ছোটো বইটি যাত্রীদের সামনে তুলে ধরে কথাগুলি বলে যাচ্ছে।

আমি ভদ্রমহিলাকে দেখছিলাম। তাঁর মনোযোগ অন্য যাত্রীদের উপর। হতে পারে, কেউ ‘বিচিত্র খবর’ কেনে কি না দেখছেন। ‘এইদিকে একটা’। বইটা নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছেন। চোখমুখ অবাক হচ্ছে। মুখে মৃদু হাসি। আনন্দের এক প্রসন্ন ছায়া।

আমার মনে হলো, এইসব বিচিত্র খবর তিনি তো আগেও অনেকবার পড়েছেন, তখনো অবাক হয়েছেন, খুশি হয়ে হেসেছেন। তাঁর পাশে বসা তিনচার মাসের অন্তসত্তা মেয়েটির চোখমুখ খুব চিন্তিত। হতে পারে চিন্তা সন্তানের জন্য। মেয়েটি ভদ্রমহিলার হাসিমুখের দিকে তাকায়। তিনি একটি বিচিত্র খবর মেয়েটিকে দেখালেন। মেয়েটি পড়ে। অবাক হয়। হাসে।  মেয়েটির হাসি দেখে ভদ্রমহিলা খুশি হলেন।

মিরপুর এক নম্বরে দুজনই নেমে যাই। ফুটওভার ব্রিজে উঠেছি। রাস্তার মোড়ের অন্য পাশে যাবো। ভদ্রমহিলা আমার সামনে। ব্রিজ থেকে পাশাপশি নামবার সময় বললাম, ‘ভালো থাকবেন’। ‘আপনিও’, তাঁর উত্তর সংক্ষিপ্ত। রাস্তায়  নেমে আমার গন্তব্যের দিকে কয়েক পা এগিয়ে পেছনে তাকালাম।

ভদ্রমহিলা আবার গুলিস্তানগামী বাসে উঠলেন। বসেছেন বাসের মাঝখানে, জানালার পাশে। হাতের কালো ব্যাগ থেকে ‘বিচিত্র খবর’ নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। মুখ প্রসন্ন। নিঃশব্দ হাসিতে জীবন্ত।

বাস যাচ্ছে। মিরপুর আনছার ক্যাম্পের স্টপেজ থেকে একজন ‘বিচিত্র খবর’-বিক্রেতা বাসে উঠলো। যাত্রীরা শুনছে : ‘পড়েন বিচিত্র খবর, জানেন কী আজব দুনিয়া, অবাক হন, হাসেন, দাম মাত্র পাঁচটাকা।’

ভদ্রমহিলার চোখে ভাসছে : বাসের সব যাত্রী পড়ছে ‘বিচিত্র খবর’। বৈচিত্রের সৌন্দর্যের সম্মিলনে কারো মুখে বিষণ্নতা নেই। সবাই হাসছে। সবাই অবাক। চোখের তারাগুলি নতুন,উজ্জ্বল, সরল।

মানুষ বিস্মিত হলে সুন্দর শিশু।

বাস যাচ্ছে।

* প্রতিবেদন: প্রথম আলো:০৭- ০৮.০১.২০১৩

এপ্রিল, ২০২০

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।