ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের জনক আন্দ্রেই তারকোভস্কি (প্রথম পর্ব)

ফারহানা রহমান

“মানুষ চায় জগতে পরিবর্তন আনতে, বিশ্বসমাজকে আরো উন্নততর করে তুলতে। দুটি জিনিসের মাধ্যমে এটা সম্ভব: একটি হচ্ছে জ্ঞান অপরটি শিল্প।” – আন্দ্রেই তারকোভস্কি
ছেলে বেলায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় যে মানুষটির দিন কেটেছে এবং পরের দিনটি কী করে চলবে, কী খাবেন তার কোন নিশ্চয়তা যে মানুষটির একসময় ছিল না তিনিই একদিন প্রাচ্যের কবিতা ও সঙ্গীত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজেকে উৎসর্গ করলেন আর এই মানুষটিই হচ্ছে জগতবিখ্যাত রুশ চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কি। সিনামাকে তিনি কবিতা করে তুলেছিলেন। কবিতা যেমন জগত সম্পর্কে, মানবতা সম্পর্কে, সৌন্দর্যের বিমূর্ততা নিয়ে ভাবায়। জীবনবোধের সুক্ষতা প্রকাশ করার মৌলিক একটি ধারা, ঠিক তেমনি তারকোভস্কির সিনামাও দর্শককে বিশ্ব-জগতের অসীমতার ধারণাকে নিয়ে, ধর্ম, শিল্প ও দর্শন ও মানবতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। একজন কবির মতোই তিনি তার সিনামায়, ছোট কোন একটি বিষয়কেই সুসামঞ্জস্য সমগ্রে পরিণত করতেন। আন্দ্রেই তাঁর সিনামাকে কখনোই পণ্য হিসেবে দেখেননি। সিনামা তাঁর কাছে ছিল স্রেফ তরতাজা শিল্পের আরেকটি রূপ। একজন ধার্মিক মানুষ হিসেবে তিনি ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য এবং মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্যই নির্মাণ করতেন চলচ্চিত্র। তাঁর জীবনের ধ্যান ধারণা, ভালোবাসা, আশ্রয় সবই ছিল তাঁর চলচ্চিত্র। একারণেই তারকোভস্কিকে বলা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আধ্যাত্মিক ফিল্মমেকার এবং সিনামার কবি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বারগম্যান তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমার কাছে তারকোভস্কিই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক, তিনি চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা উদ্ভাবন করেছেন, চলচ্চিত্রের প্রকৃতির প্রতি তাঁর ছিল সততা, যেমন করে প্রতিবিম্ব জীবনকে অধিগ্রহণ করে এবং জীবনের উপর স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়।”

শিল্পীর জীবন সম্পর্কে, তাঁর নিজের কাজ অর্থাৎ চলচ্চিত্রভাবনা সম্পর্কে তারকোভস্কি মনে করতেন যে, শিল্পী সত্যের অনুসন্ধ্যান পরিত্যাগ করলে শিল্পকর্মে তার প্রভাব হয় সর্বনাশা তাই শিল্পীর লক্ষ্য হতে হবে সত্য আর সেই সত্যের দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ পরিক্রমের জন্য তারকোভস্কির পছন্দ ছিল চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজটি। তাঁর মতে, “সিনেমায় সবচেয়ে বড় হচ্ছে আর্টিস্টের তথা পরিচালকের মনোভঙ্গি। বিশ্বের বর্তমান সমস্যাগুলো তাঁকে তলিয়ে বুঝতে হবে। ডাক্তার যেমন অস্ত্রপ্রচার করে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভাগ নিরীক্ষণ করেন রোগ নির্ণয়ের জন্য, তেমনি আর্টিস্টেরও উচিত ছবির মাধ্যমে বিশ্বের বর্তমান ও চিরন্তন সমস্যাগুলো দর্শকের সামনে তুলে ধরা। সমস্যাগুলো একবার জানা হয়ে গেলে বিশ্বের জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিবর্গ তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে পারেন।”

আন্দ্রেই তারকভস্কি ইভানোভো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওব্লাস্টের ইউরিয়েভেটস্কি (রাশিয়ার কোস্ট্রোমা ওব্লাস্টের কাদিসস্কি জেলার জাভ্রাজে গ্রামে ১৯৩২ সালের ৪ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আন্দ্রেই আরসেনিয়েভিট তারকোভস্কি। তিনি ছিলেন একইসাথে রাশিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, চলচ্চিত্র সম্পাদক, চলচ্চিত্র থিওরিস্ট, থিয়েটার ও অপেরা পরিচালক। দীর্ঘ শটের মাধ্যমে অপ্রচলিত নাটকীয় কাঠামো, স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিনেম্যাটোগ্রাফির ব্যবহার, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবনের চিত্রকল্পের সঙ্গে আত্তীকরণের মাধ্যমেই তিনি চলচ্চিত্রের সার্থকতা খোঁজার চেষ্টা করতেন। সিনেমায় তাঁর অবদান এতটা প্রভাবশালী ছিল যে অন্য কোন সিনামাতে যদি কখনো একই ধরনের কোন শট নেওয়া হয় তখন সেই কাজগুলির নাম হয়ে ওঠে তার্কোভস্কিয়ান কাজ।

তারকোভস্কির মতে সিনেমার গূঢ় বৈশিষ্ট্য নিহিত কালচেতনায়। তিনি প্রকৃতপক্ষে তাঁর জীবদ্দশায় চিরকাল একাই সংকট, সমস্যা ও বিরোধের সঙ্গে লড়ে গেছেন। পথে পথে হোঁচট খেয়েছেন, দিনের পর দিন বেকার থেকেছেন। হেঁটেছেন তীব্র অনিশ্চয়তার পথে অথচ অবিচল থেকেছেন সাম্যের পথে, বিপ্লবী চেতনায় আর জীবনবোধের উন্মেষণে। শৈশবের জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন,“আমরা সেসময় খালি পায়ে চলাফেরা করতাম। গ্রীষ্মকালে জুতোই পড়তাম না, কেননা আমাদের কোন জুতো ছিল না। শীতে আমি পশমি কাপড়ের বুট পরতাম এবং বাইরে যাবার দরকার হলে মাও তাই পরত। দারিদ্র সঠিক শব্দ নয়, চরম দুরবস্থার চেয়েও খারাপ সেই অবস্থা। সম্পূর্ণ বোধাতীত, কল্পনাতীত। মা না থাকলে কিছুই হতো না, সবকিছুর জন্যই আমি মায়ের কাছে ঋণী।”

শিল্পের উৎকর্ষের ব্যাপারে আপোষহীন তারকোভস্কির নির্মিত ফিচার ফিল্মের সংখ্যা মাত্র সাতটি। সেগুলো হচ্ছে- ইভান’স চাইল্ডহুড (১৯৬২), আন্দ্রেই রুবলেভ (১৯৬৬), সোলারিস (১৯৭২), দি মিরর (১৯৭৫), স্টকার (১৯৭৯), নস্টাজিয়া (১৯৮৩) ও দি সেক্রিফাইস (১৯৮৬)। তারকোভস্কি নির্মিত একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র ভয়েজ ইন টাইম(১৯৮২) ইতালি থেকে প্রযোজনা করা হয়। এছাড়া ফিল্ম স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি দি কিলার(১৯৫৬), দেয়ার উইল বি নো লিভ টুডে (১৯৫৯) ও দি স্টিমরোলার এন্ড ভায়োলিন (১৯৬১) নামে তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করেন। এত অল্পসংখ্যক চলচ্চিত্র তৈরি করলেও তার প্রত্যেকটি সৃষ্টি সত্য ও সুন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে এক একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।

তারকোভস্কির বাবা ইউক্রেন বংশোদ্ভূত আরসেনি তারকোভস্কি ছিলেন প্রখ্যাত রুশ কবি এবং অনুবাদক। মা মারিয়া ইভানোভনা ভিশনিয়াকোভা তারকোভস্কায়া ছিলেন থিয়েটার ও ফিল্ম অভিনেত্রী যিনি মস্কোর ম্যাস্কিম গোরকি লিটারেচার ইন্সটিটিউটের গ্রাজুয়েট। ভল্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহর ইয়োরিয়েভেটসে কেটেছে তাঁর শৈশব। শৈশবে তাঁর অসংখ্য বন্ধু ছিল এবং তাঁর বন্ধুদের মাঝে তিনি খুব সক্রিয় ও জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৩৭ সালে তাঁর বাবা আরসেনি তারকোভস্কি সংসার ত্যাগ করলে তিনি এবং তাঁর ছোট বোন মার সাথে মস্কোতে চলে আসেন। ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তারকোভস্কির মার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে শিল্প ও সঙ্গীত ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি ছেলেকে একটি মিউজিক স্কুলে পিয়ানো ক্লাসে ভর্তি করে দেন একইসাথে একটি আর্ট স্কুলেও ভর্তি করান। ছবি আঁকা আর পিয়ানো বাজানো ছাড়াও তারকোভস্কি সাহিত্য এবং বিশেষত কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৩৯ সালে মস্কোতে এসে ৫৫৪ নাম্বার স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা শুরু করেন। তবে যুদ্ধের জন্য পড়ালেখা স্থগিত হলে তাঁকে তাঁর মা ও বোনের সাথে নানির বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। ওখান থেকে ১৯৪৩ সালে ফিরে এসে তিনি আবারও আগের স্কুলে ভর্তি হন। মস্কোতে জামাস্কোভরেচিয়ে জেলার শশিপক স্ট্রিটে থাকা অবস্থায় নিয়মিত পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি মিউজিক ও ড্রয়িং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সোভিয়েত ফিল্ম স্কুল ভি.জি.আই.কে.-তে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সঙ্গীত এবং ড্রয়িংয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যান। এরইমাঝে ১৯৪৭ সালের নভেম্বর থেকে ৪৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি টিউবারকুলিস (যক্ষ্মা ) রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকেন। তারকোভস্কি মনে করতেন , “একজন শিল্পী কখনো খুব আদর্শ এবং আরামদায়ক থাকাকালীন অবস্থায় খুব ভালো কোন কাজ করতে পারেন না। শিল্পের জন্য চাই অপ্রাপ্তি। কোন ফাঁপা পরিবেশে শিল্পীর পক্ষে বাস করা মুশকিল। শিল্পের জন্য চাপ দরকার, দরকার কষ্টের অনুভূতি। পৃথিবী যদি খুব আদর্শ জায়গা হতো তাহলে এখানে শিল্পের দরকার হতো না। অসুস্থ পরিবেশেই মহান শিল্পের জন্ম হয়।” মাত্র ৫৪ বছরের জীবদ্দশায় তাঁকে মোকাবেলা করতে হয়েছে একের পর এক দুর্ভাগ্য, বাঁধাবিপত্তি আর হয়রানি। সোভিয়েত চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত থাকার ২০ বছর কর্মজীবনে ১৭ বছর তাঁকে বেকার অবস্থায় থাকতে হয়েছে। শিল্পী হিসেবে তাঁর কাজের স্বাধীনতার জন্য চিরকাল লালায়িত তারকোভস্কি নিজ দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে কখনোই সেটি পাননি। রাষ্ট্রের সদয় সম্মতি ছাড়া যেখানে একটি শটও নেওয়া সম্ভবপর নয় সেখানে যে সিনামা করতে গিয়ে তিনি প্রতিমুহূর্তে হয়রানির শিকার হবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। প্রচলিত অর্থে চলচ্চিত্র বলতে যা বোঝানো হয় তারকোভস্কির সৃজন প্রক্রিয়ায় আসলে আমরা সেটা দেখিনা। তিনি চলচ্চিত্রের সাথে জীবনের চিত্রকল্পের সম্পূর্ণ আত্তীকরণের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব ও সার্থকতা খুঁজে পেতেন। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র মানেই সত্যের অন্বেষণ, দর্শন, মানব প্রবৃত্তি, অনুভূতির সাবলীলতা, শাশ্বত চেতনার প্রবাহমানতা অথচ কাঠামোগত প্রচলিত দৃশ্যবিন্যাসে অনীহা।

তিনি ছিলেন এক স্বপ্নমগ্ন- প্রেমাতুর শিল্পী। যিনি যত্নবান ছিলেন মানবিক সম্পর্কগুলোর প্রতি। মানব জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। ফলে তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিদ্বেষের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি মানুষের অন্য মানুষকে চিনতে হবে। একবার চিনতে পারলেই মানুষের মধ্যে পারস্পারিক বোঝাপড়া এসে যাবে এবং সেখান থেকেই আসবে বিশ্বপ্রেম। যদিও পড়ালেখায় তিনি ভীষণ অমনোযোগী ছিলেন তথাপি তিনি গ্রাজুয়েট হন এবং ১৯৫১-৫২ সালে মস্কো ইন্সটিটিউট ফর ওরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজে (এটি ছিলো ¬ইউএসএসআর এর বিজ্ঞান একাডেমির একটি শাখা) আরবি ভাষায় পড়ালেখা শুরু করেন। ¬কিছুটা আরবি কথা বলতে ও লিখতে পাড়া সত্ত্বেও খুব শীগ্রি তিনি উক্ত পড়লেখার উপর সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং প্রথম সেমিস্টারের পর আর পড়াশোনা করেননি। এরপর তিনি একাডেমি অফ সায়েন্স ইন্সটিটিউট ফর নন-ফোরাস মেটালস এন্ড গোল্ড এ খনিজ সন্ধানীর কাজ নেন এবং এসময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন ফিল্ম নিয়ে পড়ালেখা করার। ১৯৫৪ সালে গবেষণা অভিযান থেকে ফিরে আসার পর, তারকোভস্কি স্টেট ইনস্টিটিউট অফ সিনামেটোগ্রাফি (ভিজিআইকে)তে আবেদন করেন এবং চলচ্চিত্র পরিচালনার প্রোগ্রামে ভর্তি হন। এটি(ভিজিআইকে) রাশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে একটি। তাঁকে খুব কঠিন প্রতিযোগিতায় পাস করে এখানে পড়ালেখা করতে হয়েছিলো। সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান নিকিতা ক্রুসচেভের শাসনামলে তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালকদের জন্য কিছু নতুন সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের আগ পর্যন্ত বছরে খুব কম চলচ্চিত্র তৈরি হতো তবে ৫৪ সালের পর থেকে সেখানে নতুন নতুন পরিচালক আসতে থাকে এবং চলচ্চিত্রের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ক্রুসচেভের সময়কালে তিনি সোভিয়েত সমাজে পশ্চিমা সাহিত্য, সিনামা ও সঙ্গীত বিষয়ে বেশকিছু ডিগ্রি প্রবর্তনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে তারকোভস্কি ইতালিও নিও রিয়েলিজম চলচ্চিত্র, ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ এবং কুরোশাওয়া, বুনুয়েল, বার্গম্যান, ব্রেসোকে পরিচালক হিসেবে দেখার এবং তাদের তৈরি সিনামাগুলো দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর ওপর এই সকল পরিচালকবৃন্দের গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। ফিল্মস্কুলে সিনামা তৈরির ব্যাপারে মিখাইল রম ছিলেন তারকোভস্কির শিক্ষক এবং পরামর্শক। যার ছাত্রদের মধ্যে শুকশিন এবং কোঞ্চালোভস্কির মতো প্রভাবশালী চলচ্চিত্র পরিচালকরাও অবশ্য ছিলেন। তারকোভস্কি মনে করতেন চলচ্চিত্র পরিচালক হবেন নানাদিক থেকেই একজন সংগ্রাহক। তার আবেগ অনুভুতির ব্যাপারগুলো, ইমেজগুলো, প্রকৃতপক্ষে তার পুরো জীবনটার সাথে একটি নির্দিষ্ট অর্থময় ব্যঞ্জনায় বেঁধে থাকবে। সেখানে অভিনেতাদের উপস্থিতি থাকুক না থাকুক তাতে খুব একটা বেশি কিছু যায় আসেনা।

১৯৫৬ সালে আরনেস্ট হেমিংওয়ের ছোটগল্প অবলম্বনে কিলার নামক প্রথম স্টুডেন্ট শর্টফিল্ম তৈরি করেন আন্দ্রেই। সেসময় ভিজিআইকে পড়তে গিয়ে তাঁর সাথে পরিচয় হয় ইরমা রাউসের। ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে সহপাঠী ইরমা রাউসকে তিনি বিয়ে করেন। এর পরের বছর ‘দেয়ার উইল বি নো লিভ টুডে’ নামক আরও একটি শর্টফিল্ম বানান। ১৯৫৯ সালে লেখেন কন্সেন্ট্রেটের স্ক্রিপ্ট। ১৯৬২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর প্রথম সন্তান সেঙ্কার জন্ম হয়। বাবা আরসেনি তারকোভস্কির নামেই ছেলের নাম রাখা হয়। ভিজিআইকেতে পড়ার সময়েই তারকোভস্কির উপর দারুণ প্রভাব পড়েছিলো চলচ্চিত্র পরিচালক গ্রিগোরি চুখরাইয়ের। ছাত্রের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে চুখরাই তার ফিল্ম ক্লিয়ার স্কাইসের জন্য সহকারী পরিচালক হিসাবে তারকোভস্কিকে নিতে চেয়েছিলেন। আন্দ্রেই প্রথমে আগ্রহ দেখালেও পরে তার গবেষণায় এবং নিজের প্রকল্পগুলিতে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফিল্মস্কুলের তৃতীয় বছরে পড়ার সময় তারকোভস্কির পরিচয় হয় কঞ্চালোভস্কির সাথে। যিনি পরবর্তীতে রাশিয়ার একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। পরিচয়ের প্রথম থেকেই তারা দুজন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাদের চিন্তার জগত, ভাবনা ও পছন্দের জায়গার মিল এবং স্বপ্নের মিলগুলো তাদেরকে আরও বন্ধু করে তোলে। ১৯৫৯ সালে দুজন মিলে লিখে ফেলেন এন্টারটিকা-ডিসেন্ট কান্ট্রি নামক একটি স্ক্রিপ্ট। স্ক্রিপটি তারকোভস্কি ফিল্ম প্রোডাকশন ইউনিট লেনিনফিল্মে জমা দেন। যদিও সেটি সেসময় এক্সেপ্টেড হয়নি। পরবর্তীতে তারা দ্য স্টিমরোলার এন্ড দ্য ভায়োলিন নামে আরেকটি সফল স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন এবং সেটা বিক্রি করেন রাশিয়া ও ইউরোপের সবচেয়ে পুরাতন ও বৃহৎ ফিল্ম স্টুডিও মসফিল্ডে। ১৯৬০ সালে এটি তারকোভস্কির গ্রাজুইয়েশন প্রোগামে কাজে লাগে যা তাঁকে ডিপ্লোমা পেতে সাহায্য করেছিল। ১৯৬১ সালে নিউইয়র্ক স্টুডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে এটি প্রথম পুরস্কার লাভ করে। ১৯৬৫ সালের প্রথম থেকেই আন্দ্রেই তাঁর ফিল্ম প্রোডাকশন এসিস্টেন্ট লারিসা কিজিকোভার সাথে একসাথে বসবাস করতে থাকেন। ১৯৭০ সালে তাঁর প্রথম স্ত্রী ইরমার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি লারিসাকে বিয়ে করেন। ১৯৭০ সালের ৭ অগাস্ট তাদের পুত্র আন্দ্রিয়ুস্কার জন্ম হয়।

তারকোভস্কির প্রথম ফিচার ফিল্ম ইভান’স চাইল্ডহুড তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৬২ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এটি সর্বোচ্চ পদক গোল্ডেন লায়ন জিতে নেয়। এতিম ছেলে ইভান যার বাবা-মা-বোনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান সৈন্য দ্বারা হত্যা হওয়া এবং তার যুদ্ধের সময়কালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে ছবি তৈরি করা হয়েছে। ছবিটিতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং বীভৎসতা দেখানো হয়েছে। এই সিনামাটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তারকোভস্কি বলেছেন যে তিনি যুদ্ধের প্রতি তার ঘৃণাকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্বফ্রন্টে সোভিয়েত আর্মির সাথে জার্মান অয়েরমাট এবং জার্মান নাজির সাথে সরাসরি যুদ্ধের নানা ফ্ল্যাশব্যাক দেখানো হয় ছবিতে। ১২ বছর বয়সী ইভান যুদ্ধের স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। এবং গ্রামের একটি জলাশয় পের হয়ে যাওয়ার সময় সোভিয়েত আর্মি তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং ক্যাম্পে রাখে। সেখান থেকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে সে কিছুতেই স্কুলে না গিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত জানায়। ইভান তার বাবা-মার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকে। ফলে যুদ্ধের এক পর্যায়ে গভীর রাতে বনের জলাভূমিতে ক্যাপ্টেন কলিন এবং গেলসেভের সাথে একটি অপারেশনে গেলে ইভান বনের গভীরে নিখোঁজ হয়ে যায়। এবং যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে লেফটেন্যান্ট গেলসেভ জানতে পারে যে ক্যাপ্টেন কলিনকে হত্যা করা হয়েছে এবং ইভান অপারেশনের সময় জার্মান আর্মির কাছে ধরা পড়ে। পরে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ইভান’স চাইল্ডহুড ফিল্মটি সর্বপ্রথম তারকোভস্কিকে বহির্বিশ্বের কাছে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৬২ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এটি তাঁকে গোল্ডেন লায়ন পুরষ্কার এনে দেয় এবং সান ফ্রান্সিস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গোল্ডেন গেইট এ্যাওয়ার্ড এনে দেয়। ৩৬তম একাডেমী এ্যাওয়ার্ডে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম হিসেবে মনোনীত হয়।

 

ফারহানা রহমান

প্রধানত কবি, গল্পও লিখে থাকেন। চলচ্চিত্র সমালোচনাতেও আগ্রহ অনিঃশেষ। ১৯৭২ সালের ১৩ আগস্টে ঢাকায় জন্ম। বেড়েও উঠেছেন ঢাকায়। পড়াশোনা প্রথমে পল্লবী মডেল হাই স্কুলে, লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে এইচ,এস,সি পরে ইডেন মহাবিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। উদার সংস্কারমুক্ত উচ্চ শিক্ষিত পিতা শেখ রহমতউল্লাহর ছায়ায় নাগরিক অনুষঙ্গে বেড়ে উঠবার কারণে সংস্কারমুক্ত মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। মাঝে কয়েক বছর শিক্ষকতা এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করার পর এখন পারিবারিক ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অপরাহ্ণের চিঠি (২০১৬), অপেরার দিনলিপি (২০১৭) ও লুকিয়ে রেখেছি গোপন হাহাকার (২০১৯), শ্রেণীশত্রু (গল্পগ্রন্থ) ২০২০, বিশ্বসেরা সিনামা কথা(চলচ্চিত্রের উপর লেখা গদ্যের বই) ২০২০। এছাড়া, দিপাঞ্জলি (যৌথ) ২০১৭ ও মনোরথ (যৌথ) ২০১৮। তিনি বই পড়তে, মুভি দেখতে ও বেড়াতে ভালোবাসেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।