নজরুল মোহাম্মদের একগুচ্ছ কবিতা

লকআপ

জলমগ্ন জীবন জামদানি আঁচলে ভাসিয়ে দিই—দেয়ালের বুকে পেরেক ঠুকে ঝুলিয়ে দিয়েছি ছবির ফ্রেম! খুনসুড়ি রাতের চোখ গলে সেতারে উঠছে ঝড় সুরের মূর্ছনায়!জানালার পর্দা ভীষণ কাঁপছে জ্বরে বাতাসের শিহরণে—তাতিয়ে ওঠা রোদ ব্যালকনির গা ঘেঁষে চাইছে শীতল সবুজের প্রশ্রয়! চায়ের কাপে ছাইয়ের মাখামাখি অবশিষ্ট জল—শাদা পাঞ্জাবির কোলে পত্রিকার বুকে হাসছে লিকারের দাগ!

দূরে কোথাও বিধবার চুড়ি ভাঙার মতো ভেঙে পড়ছে সকাল— কুমড়োফুলের বেদনা মেখে পালিয়ে যাচ্ছে ঘুড়ি উড়ানো দিন! আতরের সুবাস চুরি করে বাতাস লেপটে দিচ্ছে ফুলের গম্বুজ! ট্রেনের হুইসেলে পুড়ে যাচ্ছে পিছুটানের ডাক—বাতাসের ঢেউয়ে ফুসলে উঠছে জারুলের ঝরে পড়া ফুলের আর্তনাদ!আমনের শীষে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের ছিপ,আধারবিহীন লকআপের সেলাই করে স্মৃতির ফলক—দাগগুলো আরো গভীর হয়,সফেদ আকাশে জমায় গাঢ় মেঘ।

একটা দৌড় আমাদের খুব প্রয়োজন—মানুষের দিকে দৌড়াতে গিয়ে মধুবাজ চিলের ইশারা গড়ে উঠছে বিশ্রামাগার। ষোড়শীর প্রথম প্রেমের মতোই হারিয়ে যাচ্ছে সাহস,বুকের ধারালো পাঁজর ঘুমিয়ে যাচ্ছে ভয়ের ভাঁজে ময়ূর পালক।এসব ভাবতে ভাবতেই জোনাকির আলো ডুবে যাচ্ছে কাজলার বনে—জলের বিছানায় হেলেঞ্চা নকশায় জড়িয়ে যাচ্ছে শালুক ফোঁটা শব্দ! বাউণ্ডুলের ছক্কার দানে মই বেয়ে ওঠা গুটির গায়ে সাপের ছোবল!দরজার ওপাশে নিজেকে রেখে,ভেতর থেকে শুনতে চাইছি নিজের নাম— শুঁকতে চাইছি হৃদয় পোড়া গন্ধ,স্পর্শ করতে চাইছি আয়ুর স্পন্দন!অথচ নদীর জল আজঁলায় ভরতেই উপচে পড়ছে চোখেরজল!

 

প্রত্যাখান

চোখের দূরত্বে ছুড়ে দেয়া তীরে কাতরাচ্ছে শাদা কবুতর—উনুনে ফুটন্ত ভাতের মাড়ের গন্ধে বলকে উঠছে ক্ষুধার তেতো স্বাদ! প্লেটে ছড়িয়ে দেয়া ভাতের দানায় হাসছে ফোকলো দাঁত!এসব অজস্র দিন শামুকভাঙা মুখে লুকিয়ে ফেলে বিষাদের রঙ!তোমার সাথে রোদ্দুরে হাঁটতে গিয়ে ছায়ায় মেপেছি সময়ের দাগ—তোমার কপালে রেখেছি রক্তিম সূর্য, হাতে গুঁজেছি প্রেমের চিরকুট, ছেলেমানুষী অনুরাগ।

তোমাকে আঁকতে গিয়ে রঙেরা করেছে অভিমান—তুলির বুকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আকাশ সমুদ্রের করেছি মুখোমুখি।বিকেলের আলো জড়িয়ে ধরছে অচলায়তনে পৃথিবীর পা,অন্ধকারের চাদরে ডুমুরফুলে পরম্পরায় ভয়—হাঁসের পালকের ওমে ঘুমিয়ে পড়ছে প্রণয়!তারার মুখে প্রতিশ্রুতির নাকফুল জ্বলে,চাইছে উচ্ছ্বাস।আমরা কী হেঁটে যাচ্ছি অজানায়,নাকি বিষণ্ণ প্রান্তর বুকে পুষে আগলে রাখছি আলোর বীজ?

ক্লান্তিহীন চোখে তোমার চোখে চোখ থাক, ক্লান্তিহীন পায়ে তোমার পথে হাঁটা হোক—দুরন্ত কিশোরীর মতো লাজরাঙা তোমার বুকে হোঁচট খাক আমার মধ্যদুপুর, বৃষ্টি ভেজা রাত! পাঁজরে গেঁথে রাখবো মাধুলি; বশীকরণের মন্ত্রে লিখে রাখব তোমার নাম। শুধু তোমার জন্য মৃত্যুকে অস্বীকার করে তাচ্ছিল্য করবো কবরের নিস্তব্ধতা,ফিরে যাওয়ার গান—বুকে তোমাকে রেখে পোড়াব প্রেম; শ্মশানের জমিনে ফুলের বাগান।

 

কবি

প্রার্থনা কোন শব্দ নয়; অনুভূতি! মরুর বুকে ক্যাকটাসে ফুটে থাকা ফুল। গুটিগুটি পায়ে মন সেখানে ছুটে যায়, পাঁজরের মরীচিকা ঘষে উজ্জ্বল আলোয় নিজেকে মেলে ধরে নিজের আয়নায়! ঘর বানাতে গিয়ে মূলত কবরই শেষ আশ্রয়!মৃতের কাপড় যতো দামীই হোক,ময়লা লাগলে কেউ তা ধুয়ে দেয় না—মাটির বুকে জলের দাগ বাতাস মুছে দেয়।

জানালায় চাঁদ ধরতে পারিনি,নদীর জলে ফাঁদ পেতেছি—ঢেউয়ের ভাঁজে-ভাঁজে জোছনা মোড়ে কান্নারজলে চাঁদ আটক করেছি।চোখেরজলে চাঁদের আলো মুছে গেলো যেই— নৈঃশব্দের কানাকানি উজানের লোভে হারিয়ে ফেললো খেই;কেউ পিছে নেই,তবুও ফেরার বাহানায় অজুহাত পিছুটান।অমলভোরে আলোরঙ মেখে পাখির খসে পড়া পালকে লিখে রাখি হারিয়ে যাওয়া নাম।

বাবার কলমে হাতেখড়ি, নয়নতারা আঁকতে গিয়ে মায়ের নাকফুলে আটকে গিয়েছিলো চোখ—সেই থেকে আমি কবি; কবিতায় রপ্ত করেছি মায়ের ভাষা।কবি কবরে থাকে,কবরে খায়,কবরে ঘুমায়—কবি কষ্ট গিলে তোমার বুকে ফুল ফোটায়।কবির কাছে নতজানু প্রকৃতি,কবি বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়।মুখ ফিরিয়ে নেবে? নাও। মনে রেখো,কবি মুখ ফেরালে সৌন্দর্য তুচ্ছ হয়ে যায়; পুড়ে যায় দেবালয় কবির আলেয়ায়!

কবর

কবরের নিস্তব্ধতায় ফুটে থাকা ফুলের অনির্বাণ শপথ—ফালিফালি করে চাইছে আপনজনের পরশ! মুখর ঘাসের গহীনে উঁকি দেয়া রৌদ্র দুমড়ে-মুচড়ে দেয় নিশ্চুপ অন্ধকার!যতো দূরের অবস্থান,ততো নিকটে আসার হাতছানি—প্রগাঢ় বিষণ্নতায় শাশ্বত উত্তাপে ভেঙে পড়ছে বরফের চাঁইগুলো,ডুবে যাওয়ার মতোই নির্ভরতায় ভেসে আসছে বিভূতি বিভূঁইয়ের চেলাকাঠের অসীম শূন্যতা!

শ্রাবণের জল, হেমন্তের মাঠ, পাতাঝরা দিন— বসন্তের অনুরাগে বুকফাটা শিমুলের লালে খুঁড়ে রাখা প্রত্নতাত্ত্বিক ঘ্রাণ জিরিয়ে নিচ্ছে মাটির তাকে থরেবিথরে! ছেঁড়া-ফাটা আস্তিনের নকশা গলে চুইয়ে পড়ছে আদর-সোহাগ ভুলে যাওয়া নামে!দূরের আকাশে ভেসে থাকা দুরন্ত মেঘ,দূরে সরিয়ে রাখা মানুষের মতো বড় অস্থির!প্রিয় নামগুলো বইয়ের পৃষ্ঠায় লুকিয়ে রাখা ফুলের মতো ম্লান—গলাকাটা ছবির মতো চোখ দুটি বেয়ে যায় উজানের স্রোত!

বেঁচে থাকা দুপুরের রঙগুলো ক্ষুধার্ত দাঁতে কেটে-কুটে নিচ্ছে উপোসী চিরকুট—ঘুঘুডাকা সময়ের বিতৃষ্ণায় ফেরার পথগুলো কড়া নাড়ছে না-ফেরা দরজায়! একটা ঘরের আশায় আয়ু ক্ষয়ে খেটে যায় মানুষ—অথচ অনাদরে প্রিয়জনের মৃত বুকে বেড়ে ওঠে ঘাস;কাফনে ঢেকে দেয়া মুখ ভুলে যায়—বুকের বদলে কাঁধের তাড়ায় ভয়ে জমে যায় পাথরচোখ। ভীতু মানুষ ঘর বানালেও,মূলত কবর বানায় সাহসী লোক।

 

মধ্যবিত্ত চাঁদ

ক্ষুধা মেটাতে বেহাত হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সমান বয়স—ঘুঙুরের শব্দে ডুবে যাচ্ছে নৈবেদ্যের ফরমান। অভিজাত বাতাস শেষপ্রান্ত অব্দি ছুটে নুয়ে দেবে ক্ষ্যাপাটে ঘোড়ার ডাক—ভেজাসুরে প্রণয়মাখা চোখে পুঁতে দেবে নির্লজ্জ হেম!সংসারের কালোবোর্ডে ফর্দের হিসেব লিখতেই পালিয়ে যায় শাদা খড়িমাটি—অহমিকাময় চেনামুখ নিকটের সান্নিধ্য ভুলে ঢালে পারদপ্রলেপ!

আঁচলে বাঁধা চৌকাঠ মাড়িয়েই অন্ধবিলে ফুটে হীরের সানা—নাঙ্গা হাঁড়ির নিলামে ঘটিভরা নুনেরজল! একটা কমলারঙা খোয়াব, শিশুর কোমল হাতের খাঁচায় তিরতির করে ঢুকবে বলে সহস্র নিষেধাজ্ঞা গিলে খায় প্রতুষ্যে—সূর্যের বুকে রাখে দিনের হিসেব।তিতকরলার জীবন খুঁজে ফেরে আয়ুর্বেদ উপশম,আঘাতের মতোই সুনিপুণ প্রতিশ্রুতিগুলো!

অভিযোগের দস্তাবেজ হালখাতায় জমা রেখে মিষ্টির উৎসবে পাখি গাইছে কান্নার গান—শিসতোলা নদীর স্রোত, কাকতাড়ুয়ায় ঝুলানো ভয়ের নোটিশে তুলে নিচ্ছে ইরানি গোলাপ! অথচ যারা জীবন ছুঁতে গিয়ে মৃত্যু দেখে ফেলে—তাদের মধ্যবিত্ত চাঁদ আকাশের শিকে ছিঁড়ে নিভে যাওয়া উনুনে গুঁজে দিচ্ছে সুরমার দীর্ঘশ্বাস!

পরিচিতি

জন্ম ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। চরলক্ষ্মীপুর, সিঙ্গাইর, মানিকগঞ্জ

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।