শেলী নাজ: মরণরঙ্গের আলোর ফেরিতে, একলা আগুন

একলা আগুন

এ আগুন একাকিনী, সন্ধ্যার গাউন পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে
মরণরঙের আলোর ফেরিতে, দাহ্যহাড়লোভী, রাক্ষুসে, বর্ণাঢ্য!
ভস্ম করবার বিষ নিয়ে ঘোরে ফেরে, গৃহবিমুখ, নির্জন
হারমোনিয়ামের রিডে সুর জ্বলে যাচ্ছে, জ্বলছে লিবিডো

সন্ধ্যা তাকে ছাড়াই ধাবিত মধ্যরাতের নিদ্রায়
এ আগুনের বুকে ঘুম নাই, চোখে ময়ূরাক্ষী
তার ঘর রাস্তার ওপর, রাত্রিচর যানদের ঘুরন্ত চাকার নিচে
মুমূর্ষু আপেল, রশ্মিময়, থেঁতলানো, জলকামান এলো কি?

আগুনের ঘরে যে পাতকেরা আগুন দিয়েছে,
সকলে সুখের গর্তে আছে, চিমনির নিচে নিরাপদ আলো

সে পোড়ায় না পুড়ে, ধিকিধিকি, ধাতুর ভেতরে, নিরন্তর
হয়তো একলা এ আগুন নির্বাপিত হবে
দুয়েকটি পুরুষ ঝলসে খাবার পর!

 

ঈর্ষাকুচি

হিমঈর্ষা ভোগ করি, তোমাদের ঈর্ষাতুর সোনালী চাকুতে
বিবিক্ত আমার বাহু, রক্তভেজা, কান্নাস্রোতে বেঁধে নিতে
খুঁজছি জরির ফিতে, অতর্কিতে হানা দেয় মুগ্ধ বাজপাখি
পাখোয়াজ নেই, বিষণ্নতার পাখসাট, রাত্রি কি একাকী!

তরল আঁধার ফুঁড়ে জাগছে ডুবন্ত দেহ, কাঁদছে ভীষণ
একান্ত মারীচ হয়ে বুকে মুখ ঘষে শত শত আলপিন
ঝাপসা জানালা খুলে ফেনায়িত দেখি
মিথ্যে প্রেমরাশি, বন্ধুদের মুখ ও মুখোশ, ঈর্ষান্বিত, মেকি

অজর ঈর্ষার কুচি মেশানো রাত্রির হুল জমিয়ে রাখছি
যত তোমাদের ঈর্ষা তত আমি জিতে যেতে থাকি
বুকের ঢাকনা খুলে বয়ে যেতে দিই ঈর্ষার সাম্পান
যতটা ধারালো তোমাদের চাকু তত ফুল্ল আমার বাগান!

 

নাইট ক্লাব

সপ্তাহটা ফ্রাই হতে হতে ফ্রাইডের দিকে ছুটে যায়। আর দিন ঘুময়ে গেলে রাত্রি জেগে ওঠে শহররে মর্মমূলে, কলকব্জায়। আত্মহত্যা প্রবণ একটা যমুনা বুকে নিয়ে আমি দেশান্তরি, তবু সে বইছে মৃত ফেনা ঠোঁটে, তার কূলে কূলে ছটফট করে রাধার ঘুঙ্গুর! সমস্ত ফাটলভর্তি সপ্তাহান্তরে অপমানবিষ্ঠা, ভাঙা হাড়গোড়। পোশাকরে নিচে মেঘ ও বিদ্যুৎ প্রেমের দামে আজ আর কোথাও বিক্রি করব না। আজ সব যুবকের ঘাসে ঘাসে, উজ্জ্বল আকাশে আমিই সুরঞ্জনা। জাগুক মহেঞ্জোদারো, পান করে মৃতসঞ্জীবনী, অর্ধগ্রিল দেহ, পলাতক প্রেমিকের দন্তচিহ্ন ভুল লিখুক তার নজিরে মহার্ঘ্য জীবনী। হৃদপিণ্ড প্রেমের নিখিল, যত মাল্য ডুবে গেছে প্রত্যাখ্যানের জলে তারা আজ অশ্রু ঝিলিমিল, তাই নিয়ে স্বর্গীয় নরকে যাই নরক মধুর জেনে। নরকরে গেটকিপার আফ্রিকান, কব্জিতে সে এঁকে দেয় সিলমোহর, অতঃপর ঢুকে যাই পাপমোচনে। রাত্রি যত গভীর, তত আগুন উড়ে, নাইট ক্লাব ততোধকি চৌম্বকতাড়িত। শরীরে অদ্ভুত মোশন ও ক্ষত, বিস্ফোরতি! রাত জমে উঠে ‘লেটস গো লেটস গো’ এই মূর্ছনায়! কোথায় যাই, কার সাথে… ম্যাটার করে না, যাওয়াই মুখ্য, নৃত্যমঞ্চে পা শর্ষেদানায়। কীভাবে স্নায়ুর ভেতর হুড়কো খুলে ঢুকে পড়ে জ্যাজ, ঝরে যায় বিষণ্ণতা? মিথ্যে-পোশাকও খসে পড়ছে সঞ্চিত অবসাদরূপ, যেন অটামের রঙিন পাতা। মেঝে আঠালো উপচানো বিয়ার ও জীবনের ফেনায়। প্রেম এক অচল মুদ্রা, তাকে ফেলে আসি নরকের দরজায়! হায়, হেথায় শরীরই গণ্ডোলা, দিও না বাধা। তাতে যদি ভেসে চলে এশিয়ান রাধা! রাধা শিকারিনী সয়ম্ভু, সতৃষ্ণ, তার চারপাশে আজ ষোলশ কৃষ্ণ!

 

ক্ষুর

প্রতিটি নারীর হৃদপিণ্ড যেন এক শূন্যতার রাজধানী
জঙধরা আরশিনগর, আমি সে নগরে নিঃস্বতার রাণী

শূন্যতা জাগছে একা, আমি তার একান্ত ময়ূর
ঘুমিয়ে পড়েছি বেদনার নীল মখমলে, জেগে আছে ক্ষুর

চাঁদের বুকের মধ্যে, রাত্রির নীরব বীভৎসতায়, প্রহ্লাদনগরে
সেই ক্ষুর চিরে ফেলে অহল্যা শান্তির মুখ, ঘুমের শহরে

জোছনার অপার নিকেল রক্তের কুহকে একা ভেসে যায়
শূন্যতার রাজকোষ ভরে গেছে বেদনার অপূর্ব মুদ্রায়

সেই মুদ্রা দিয়ে কিনি সাটিনের শয্যা, স্তব্ধতার শিস
মধুর ভেতর থেকে জেগে ওঠে বিষাদপ্রবাহ, মধুমতী বিষ

কামারশালা জাগছে, ফুঁসছে হাপর, আমি সেই স্বর
লুকিয়ে রেখেছি, উচাটন শিরিষের গোঙানির ভেতর

একরত্তি জামার গভীরে ছলাৎছল পৃথিবী কাঁদছে একা
মাস্তুলে চাঁদের লাশ, জেগে আছে কুলুঙ্গিতে শিখা

প্রতিটি নারীই বহন করছে হৃৎপিণ্ডে বধ্যভূমি, রক্তপুর
পুরুষের ফেলে যাওয়া প্রেমের সাপলতা, ফণা, ক্ষুর!

ভিমরুল

রক্তাক্ত শাড়ির লাল নরম খোলস থেকে ছিঁড়ে এনে
আমার ঝিনুক তোর হাতে তুলে দিই
মুমূর্ষু আত্মার পারিজাত দুমড়ানো, রয়েছে বাগানে

দুহাতে আড়াল করি পদ্মনাভি, মূর্ছিত শহরে
খুশি চিৎকার করে ভাঙাল কাঙাল নদীটির ঘুম
তখন তোমার নিকোটিনগন্ধী ঠোঁট পুড়ছিল জ্বরে

আমাকে জঠরে রেখে দিস, এখানে ভীষণ সীসা
পার্কের বেশ্যার থেকে আমি দীন
আলোর দস্তানা হাতে খেতে দিস অমানিশা

অন্ধ আঙুলের ফাঁকে গলে যাচ্ছে স্পর্শের মোহর
রঙচটা কাঠের বেহালা হয়ে ভিখিরি আমার দেহ
নেমে গেছে পথে, পেতে তোর দীর্ঘরাত্রির নখর

ও ভিমরুল, সে চাবুক কোথায়, তোর সে ত্রিশূল?
তোর হুল আন, আর দেখ ঝিনুকে গুটানো
কি নিঃস্ব আমার দেহভর্তি পপিফুল!

 

শেলী নাজ

শেলী নাজের জন্ম ১১ মার্চ হবিগঞ্জে। পাহাড়বেষ্টিত, সমুদ্রবিধৌত চট্টগ্রামেই কেটেছে তার শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের উজ্জ্বল দিনগুলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন-এর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভের পর, বর্তমানে মেলবোর্নের সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন। পেশাগত জীবনে তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত।

তার কবিতার বই ৮টি। ২০০৪ সালে প্রথম কবিতার বই ‘নক্ষত্র খচিত ডানায় উড্ডীন হারেমের বাঁদি’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ‘বিষাদ ফুঁড়ে জন্মেছি বিদ্যুতলতা (ম্যাগনাম ওপাস ২০০৬)’, শেকলে সমুদ্র বাজে (অনন্যা ২০০৭), মমি ও মাধুরী (ম্যাগনাম ওপাস ২০০৯), চর্যার অবাধ্য হরিণী (পাঠসূত্র ২০০৯), সব চাবি মিথ্যে বলে (ম্যাগনাম ওপাস ২০১১), সূচের ওপর হাঁটি (বেঙ্গল পাবলিকেশন ২০১৩), পুরুষসমগ্র (অ্যাডরন পাব্লিকেশন ২০১৫)।

লৈঙ্গিক রাজনীতির শিকার নারীর আত্মপরিচয় নির্ণয়ের যুদ্ধযন্ত্রণা, নারীবাদ, পুরুষতন্ত্রের বিপরীত স্রোতে ভাসবার সাহস আর সমাজবাস্তবতার দ্বান্দ্বিক বোধ তার কবিতার প্রধান বিষয়।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।