শান্তা মারিয়ার ভ্রমণগদ্য: গড মেড ওকলাহমা

ঘটনাটা ২০০৬ সালে। সেপ্টেম্বর মাস। স্থান ওকলাহোমা স্টেট। মহাদেশ আমেরিকা।

লিডারশিপ ইন জার্নালিজম নামে একটি সংক্ষিপ্ত ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশ নিতে ওকলাহমায় গিয়েছি আমরা দশজন সাংবাদিক। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখন রীতিমতো তারকা। তখনও তারা সেরকম তারকা হয়ে ওঠেননি অবশ্য। দশজনের নামের তালিকা দিচ্ছি প্রথমে। শাহনাজ মুন্নী, রোজিনা ইসলাম, শাহনাজ বেগম, লাবণ্য কাবিলী, নাজমুন মিলি, সালমা ইয়াসমিন,  নাসিমা খান মন্টি, রাজি, নাসরাত আশিয়ানা চৌধুরি এবং আমি।

আমেরিকার ওকলাহমা স্টেটের ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেলর্ড কলেজের প্রফেসর জো ফুট এই প্রোগ্রামের মূল আয়োজক। সব টাকা পয়সা দিচ্ছে অবশ্য ইউ এস স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ফলে আমরা রীতিমতো মার্কিন সরকারের অতিথি। সেজন্যই ভিসা পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। কর্মশালায় লেখাপড়া করছি, সেই সঙ্গে বেড়ানোও চলছে ধুমিয়ে। যাই হোক এরই মধ্যে একদিন প্রফেসর জো ফুট ঘোষণা করলেন তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন ঘোড়ায় চড়তে। ওকলাহমার পাশের স্টেট হচ্ছে টেক্সাস। এসব স্টেটের ঐতিহ্য হলো ঘোড়ায় চড়া।

ঘোড়ায় চড়ে নাজেহাল

থান্ডার বার্ড রাইডিং স্ট্যাবল। ইংরেজিতে স্ট্যাবল আর বাংলায় আস্তাবল। দুটোই শুনলে যেমন নোংরা, গোবর ও বিচালির পচা গন্ধে ভরপুর বলে মনে হয় তেমন কিছুই না। বরং চারদিক ছবির মতো ঝকঝকে, চকচকে। অনেক বছর আগে টিভি সিরিজ ডালাস-এ এমন চকচকে ঘোড়ার আস্তাবল দেখেছি। আরও দেখেছি অসংখ্য ওয়েস্টার্ন মুভিতে। যেখানে কাউবয়, র‌্যাঞ্চমালিক আর আউট ল এর দল বন্দুক পিস্তল নিয়ে ধুন্ধুমার লড়াই করে। সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন সিরিজের বইগুলো গোগ্রাসে গিলেছি একসময়। গ্রেগরি পেক, জন ওয়েন, হেনরি ফন্ডা, পল নিউম্যানকে কত দেখেছি ওয়েস্টার্ন মুভিতে। রাইডিং স্ট্যাবল এ যাচ্ছি এমন কথা শোনার পর থেকেই আনন্দে ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

পরদিন সকাল সাতটার মধ্যে আমি তৈরি। ব্লু জিন্স, রেড শার্ট, লেদার বুট। নিজেকে ওয়েস্টার্ন মুভির নায়িকা ভাবতে কে বারন করেছে? প্রফেসর ফুটও কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটায় হাজির। এই সময়নিষ্ঠায় আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ আমারও ঠিক সময়ে সব জায়গায় উপস্থিত থাকার একটা বদনাম রয়েছে। আমার সফরসঙ্গীরা এই ধরনের বদনাম থেকে মুক্ত। তাই তারা একটু সময় নিয়েই তৈরি হলেন।

শহরের একপ্রান্তে রাইডিং স্ট্যাবল।

দূর থেকে থান্ডার বার্ড নামটা দেখেই মনে শিহরণ জাগলো। বাহ। বিশাল গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে কাঠের দোতলা বাড়ি। ঠিক যেন ওয়েস্টার্ন মুভির সেট। অফিস ঘরটা মানে পুরো বাড়িটাই মুভির মতো করেই সাজানো। আমাদের প্রত্যেককে একটা করে কি যেন কাগজে সই করতে হলো। সেটা কীসের কাগজ সেকথা পরে বলবো। একটু রহস্য থাকা ভালো।

আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটা করে কাউবয় হ্যাট এবং সানগ্লাস দেওয়া হলো। এগুলো অবশ্য ঘোড়ায় চড়ার পর আবার ফেরত দিতে হবে।

এইবার সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো ঘোড়ার আস্তাবলের সামনে। আস্তাবল থেকে একটি একটি করে ঘোড়াকে বের করা হচ্ছে আর আমাদেরকে একজন একজন করে সেটার পিঠে উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতক্ষণ আমার ধারণা ছিল বোধহয় প্রত্যেকের সঙ্গে একজন করে সহিস বা গাইডজাতীয় কেউ থাকবে। কিন্তু দেখলাম নাহ, তেমন কেউ নেই। তার মানে একেবারে একাই উঠতে হবে। প্রফেসর ফুট শিখিয়ে দিলেন বাঁদিকের লাগাম ধরে টানলে ঘোড়া হাঁটবে আর ডানদিকের লাগাম ধরে টানলে ওটা দৌড়াবে। ভালো তো। ঘোড়ারও ডানপন্থা বামপন্থা আছে তাহলে। বলতে বলতেই রোজিনাকে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে বসতে। দিব্যি আনন্দে হেলতে দুলতে যাচ্ছে। আমাকে বলা হলো আমার জন্য ছোট একটা ঘোড়া আনা হচ্ছে। কারণ আমার আকৃতিও তো সকলের চেয়ে ছোট। শাহনাজ মুন্নির ঘোড়ার নাম লোনসাম। ও বেশ স্বচ্ছন্দেই উঠে গেল।

সবশেষে আমার পালা। আমার ঘোড়ার নাম বেটসি। ও নাকি মেয়ে ঘোড়া। ফলে কম দুরন্ত। ছোট ঘোড়া বলে যেটিকে আনা হলো তার আকৃতি দেখে তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। বিশাল উঁচু। বিরাট লম্বা। হাতি-ঘোড়া কথাটা কেন বলে এবার বুঝলাম। হাতির কাছাকাছিই হবে বোধকরি এটা । আমি এর আগে কোনোদিন ঘোড়ায় চড়িনি। এমনকি আমাদের চিড়িয়খানার ছোট টাট্টুতেও নয়। এই বিশাল দানব দেখে তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি। এর মধ্যে আমাকে ঠেলে ঘোড়ায় উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরে বাবা এটা তো এবার দেখি দুলকি চালে চলতেও শুরু করেছে। এই আমেরিকান ঘুড়ীটা বোধহয় মনে করেছে ওর পিঠে একটা মশা বসেছে। ও সমানে পিঠ ঝাঁকাচ্ছে। কি যেন বলেছিলেন প্রফেসর? ও হ্যা, বাম লাগাম ধরে টানতে হবে। কিন্তু বেটসি সেই লাগামের টান শোনার পাত্রী নয় মোটেই। ও ছুটতে চাইছে কদমে। আমি তখন বাবারে মারে করে রীতিমতো চ্যাঁচাচ্ছি। কারণ এতক্ষণে আমার মাথায় ঢুকেছে যে আসলেই আমি ঘোড়ায় চড়ে বসেছি। এবং সেটা আমাকে যেকোন সময় পিঠ থেকে ফেলেও দিতে পারে।  যত সুরা আর দোয়া দরুদ জানা ছিল সব পড়ছি। আমার চিৎকার শুনে পিছনে অন্য একটি ঘোড়ায় আসীন প্রফেসর ফুট চেঁচিয়ে সাহস দিচ্ছেন, ‘ডোন্ট ওরি শান্তা, আয়্যাম রাইট বাহাইন্ড ইউ।’ আমি তার আওয়াজ পেয়ে চেচাঁলাম ‘ফুট ফুট প্লিজ হেলপ।’ ভয়ের চোটে তখন কি আর স্যার, প্রফেসর এসব কথা মনে থাকে? ফুট আবার উত্তর দিলেন ‘ডোন্ট ওরি। নাথিং উইল হ্যাপেন্।’ যাব্বাবা। কেউই দেখি আমাকে বাঁচাতে আসছে না। অগত্যা কি আর করা। ঘোড়াকেই বললাম, ‘মা তুই থাম’। বলেই বুঝলাম ওতো আমেরিকান, বাংলা বুঝবে না। তাই ইংরেজিতে শুরু করলাম, ‘বেটসি বেবি, সুগার বেবি, ডোন্ট রান বেবি, জাস্ট ওয়াক।’

ঘোড়ার নাম বেটসি

এদিকে আরেক বিপদ। শাহনাজ মুন্নীর ঘোড়া লোনসাম এগিয়ে আসছে আমার বেটসির দিকে। সম্ভবত এটা ওর বান্ধবী। এসে নাকের সঙ্গে নাক ঠেকিয়ে কুশল বিনিময় করল। তারপর দুটোই দুলকি চালে চলতে লাগলো পাশাপাশি। বলছি বটে দুলকি চাল। কিন্তু ওর ওই দুলকি চালের ঠেলাতেই হালকা পাতলা এই আমি একবার ছিটকে উপরে উঠছি আবার ঘোড়ার পিঠে ধপাস করে নামছি। তখন আমার ওজন ছিল ৩৫ কেজি। এই হালকা ওজন নিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকাই মুশকিল।

চূড়ান্ত ভয় পেলেও একটু এদিক ওদিক তাকালাম। দুর্দান্ত সুন্দর দৃশ্য। টুরিস্টদের জন্যই মনে হয় পুরো এলাকা বিশেষভাবে সাজানো। একদিকে ছোট্ট একটা জলাশয়। কি নীল তার জল। আবার কখনও বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে ঘোড়া। মরুভূমির ভিতর দিয়ে গেল কিছুক্ষণ। তারপর বিশাল উদার প্রান্তর দিয়ে চললো। একবার চোখে পড়লো একটি গাছে দুজন আউট ল’কে ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এগুলো আসলে পুতুল। দেখতে মনে হয় একেবারে আসল। একদিকে ট্রেইলের চিহ্ন কাঠের ফলক দিয়ে দেখানো।  মোটকথা পুরো এলাকা ওয়েস্টার্ন মুভির আমেজ দেওয়ার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি।

এসব দেখছি আর সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছি। ফুটও সমানতালে উত্তর দিচ্ছেন। যাহোক দু’ঘন্টা(আনুমানিক) হর্স রাইডিংয়ের পর থামলো। যেখান থেকে উঠেছিলাম সেখানেই আবার ফিরে এসেছি।

ঘোড়া থেকে নামানোর পর আমরা দোতলা বাড়িটির ভিতরে যখন গেলাম আমাদের প্রত্যেককে এক গ্লাস করে ফলের জুস খাওয়ানো হলো। এবার বুঝলাম কী লেখা ছিল ওই কাগজে। ওটা নাকি একটা অঙ্গীকারনামা। ওখানে বলা আছে আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এই রাইডিংয়ে অংশ নিয়েছি। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে আহত বা নিহত হলে তার জন্য কেউ দায়ী নয়। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এজন্য কোনো ইনশিওরেন্স ক্লেইম করা যাবে না। কি সর্বনাশ। এবার মনে পড়লো সুপারম্যান (এই ভূমিকায় যিনি অভিনয় করতেন) তো এই ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়েই মারা গিয়েছিলেন। হায় হায়। আগে জানলে কি আর উঠতাম। তবে, তাহলে তো এত সুন্দর দৃশ্য দেখা থেকেও বঞ্চিত হতাম। ভাগ্যিস আগে জানিনি। সাংবাদিকতা পেশাটাই তো এমন। কখন কি ঘটবে কেউ জানে না। এরপর পেশাগত জীবনে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছি। তখনি মনে পড়েছে সেই হর্স রাইডিংয়ের কথা। যেন শুনতে পাই শিক্ষক জো ফুট বলছেন, ‘ডোন্ট ওরি শান্তা। আয়্যাম রাইট বাহাইন্ড ইউ।’ প্রবীণ শিক্ষক, শ্রদ্ধেয় জো ফুটের সেই কথাটি আজও আমাকে সাহস জোগায়, জীবনে এগিয়ে যেতে বলে।

ক্যাসিনো আর স্বপ্ন ধরার দিন

স্বপ্ন কি সত্যিই ধরা যায়? ড্রিম ক্যাচার নাম শুনেই চোখের পাতায় যেন ধরা দেয় স্বপ্ন। ২০০৬ সালে আমেরিকায় গিয়ে প্রথম শুনি ড্রিম ক্যাচারের নাম। ড্রিম ক্যাচার বস্তুটি দেখতে একটু অদ্ভুত ধরনের। সুতা বা কাপড়ের তৈরি বড় একটি বৃত্ত। তার নিচে ঝুলছে একটি বা কয়েকটি পাখির পালক। বৃত্তটির ভিতরেও রয়েছে সুতার নানা রকম নকশা। দেখতে মনে হয় মাকড়শার জালের মতো। উইলো হুপের ভিতরে এই বুনন। এটি ঝুলিয়ে রাখার জন্য রয়েছে সুতার দড়ি বা ফিতে। মোটামুটিভাবে এটাই হলো ড্রিম ক্যাচার। এগুলো বিশাল বড় আকার থেকে শুরু করে ছোট্ট হতে পারে। রেড ইন্ডিয়ান বা নেটিভ আমেরিকান জাতির বিভিন্ন গোত্রের সংস্কৃতি হলো ড্রিম ক্যাচার।

ওকলাহমা স্টেটে প্রচুর সংখ্যক রেড ইন্ডিয়ান বা আমেরিকান আদিবাসীদের বসবাস রয়েছে। তাই ওকলাহমার ঐতিহ্য অনেকটাই রেড ইন্ডিয়ান ঐতিহ্য। উপকথায় বলে, আসিবিকাশি হলেন স্পাইডার ওমেন। তিনি শিশুদের দেখভাল করেন। বলা যায় শিশুদের গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল ধরনের এক দেবী। রেড ইন্ডিয়ান গোত্রগুলো যেহেতু আমেরিকার নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে তাই আসিবিকাশি সবার খোঁজখবর রাখতে পারেন না বা সবার কাছে পৌছাতে পারছেন না। আসিবিকাশিকে ডাকার জন্য শিশুদের মা, নানীরা এই ধরনের ড্রিম ক্যাচার তৈরি করে তাদের দোলনা বা খাটের কাছে ঝুলিয়ে রাখতেন। ড্রিম ক্যাচার দেখে আসিবিকাশি যেন বুঝতে পারেন যে, এখানে রেড ইন্ডিয়ান শিশু আছে। তিনি তাদের সুন্দর স্বপ্ন দেখান এবং ঘুমের মধ্যে অশুভ কোনকিছু থেকে রক্ষা করেন। ড্রিমক্যাচারের বুননটা তাই অনেকটা মাকড়শা জালের মতো। এটি প্রথমে ছিল ওজিবি গোত্রের উপকথা। পরে নেটিভ আমেরিকানদের সব গোত্রের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই ড্রিমক্যাচার ছড়িয়ে পড়ে। ওকলাহমায় দেখলাম ড্রিম ক্যাচারের আদলে তৈরি নানা রকম জিনিষ। শোপিস, কানের দুল, গলার হার সবকিছুতেই ড্রিম ক্যাচারের নকশা। আমি অনেকগুলো কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম এগুলো রেড ইন্ডিয়ানদের হস্তশিল্পের নমুনা। ও মা, পরে দেখি অনেকগুলোর পিছনেই ছোট্ট করে লেখা মেড ইন চায়না।

ড্রিম ক্যাচার কিন্তু আমি পরে চীনেও দেখেছি, নেপালের থামেলেও দেখেছি। জানি না ওগুলো কিভাবে ওখানকার বাজারে গেছে। নেপালেরটাও স্থানীয়ভাবে তৈরি, চীনেরটাও। সবগুলোই দেখলে রেডইন্ডিয়ান সংস্কৃতির কথা মনে পড়ে যায়।

ওকলাহমায় প্রচুরসংখ্যক আদিবাসী আছেন। স্টেটের নাম ওকলাহমার অর্থ হলো ওকলা (লাল), হুমা(মানুষ)। তার মানে লালমানুষ। দক্ষিণ মধ্য আমেরিকার এই স্টেটে লালমানুষ বা আদিবাসী আমেরিকানদের আধিক্যের জন্যই এই নাম। চেরোকি, চোকতাও ইত্যাদি ট্রাইবের লোকজন বাস করে এখানে। একসময় খুব নিষ্ঠুরভাবে আদিবাসীদের দমন করা হয়েছিল। তাদের হত্যা করা হয়েছিল। তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মরুভূমির দিকে। তাদের আহার্য বাইসনকেও ইচ্ছাকৃতভাবে মেরে ফেলা হয় পালে পালে। যাতে ট্রাইবাল মানুষ না খেয়ে মরে। বস্তুত এসব ইতিহাস পড়লে শ্বেতাঙ্গদের দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না। তাদের মুখে মানবতার বাণী শুনলেও হাসি পায়। ওকলাহমা ষাটের দশক পর্যন্ত যথেষ্ট বর্ণবাদী ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ এবং রেড ইন্ডিয়ানদের সূর্যাস্তের পর শহরের বাইরে তাদের জন্য নির্ধারিত আবাসে চলে যেতে বাধ্য করা হতো। তাদের জন্য জলের কল ছিল আলাদা।  এখন অবশ্য এসব জঘন্য নিয়মকানুন আর নেই।

আমরা যখন ওকলাহমা যাই তখন সেখানে দারুণ শান্তিময় পরিবেশ দেখেছি। ওকলাহমায় ক্যাসিনো এবং জুয়াখেলা নিষিদ্ধ ছিল। তবে আদিবাসীদের পরিচালিত বেশ ক’টি ক্যাসিনো রয়েছে। এগুলো তাদের বিশেষ রীতিনীতির অধিকারের মধ্যে পড়ে। এমনি একটি ক্যাসিনো দেখতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। ক্যাসিনোর নাম রাইজিং সান।

ক্যাসিনো কথাটি শুনলেই চোখে ভাসে জেমস বন্ড, রাশিয়ান রুলেট, তিন তাস, ক্যাবারে নাচ, মদের গ্লাস ইত্যাদি ইত্যাদি। অ্যাকশন মুভিতে সারাজীবন এসব দেখেছি। পড়েছিও মাসুদ রানার অভিযানে। ভয়ানক বদমাশদের জায়গা হলো ক্যাসিনো- এমন একটি ধারণা মনের ভিতর তৈরি হয়ে গিয়েছিল।  কিন্তু ওকলাহমার ক্যাসিনোতে ঢুকে ভয়ানক কিছু বা কাউকে চোখে পড়লো না। আলো ঝলমল বিশাল জায়গা। রাশিয়ান রুলেট, জ্যাকপট সেসব ঠিক আছে। কিন্তু যারা এগুলো খেলছে তাদের চেহারা সুরত নেহাত গোবেচারা ভদ্রলোকের। বেশিরভাগই একটু বয়স্ক নারীপুরুষ। তাদের মুখে মেকআপও তেমন চড়া নয়, সাজসজ্জাও উগ্র নয়। এক জায়গায় স্টেজে গান হচ্ছে। তিনজন ওয়েস্টার্ন গায়ক। পোশাক ওয়েস্টার্ন মুভির মতো। মাথায় কাউবয় হ্যাট। কান্ট্রি সং হচ্ছে। চমৎকার গানের সুর। ধুমধাড়াক্কা নয় মোটেই। আমার মনে পড়লো প্রিয় গান   ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’। জন ডেনভারের এই গানটি আমার চিরদিনের পছন্দের গানের তালিকায় রয়েছে। সেই সঙ্গে স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুমহলে আমাদের প্রিয় গান ‘জনি জনি প্লিজ ডোন্ট ক্রাই’।

ক্যাসিনো দেখছিলাম। বেশ অনেকগুলো ঘর। ঘর না বলে বড় বড় হলরুম বললেই যথার্থ হয়। এসব খেলায় আমার তেমন আগ্রহ নেই। এমনকি জ্যাকপটেও নয়। তাই বরং দেখছিলাম রেড ইন্ডিয়ানদের। ক্যাসিনোর ভিতরেই রয়েছে একটি দোকান। এই দোকানটারও পরিচালক রেড ইন্ডিয়ান। ওখানে রেড ইন্ডিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম ছবি, বই, নানা রকম অলংকার, চাবির রিং,মগ ইত্যাদি রয়েছে। এই ক্যাসিনোর নাম লেখা শোপিসেরও অভাব নেই। আমিও কিনলাম কিছু।

ওকলাহমাতে আমাদের একটি স্টুডেন্ট’স পার্টিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে দুতিন জন রেড ইন্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপ হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন। একজন লাইব্রেরিতে, অন্যজন অন্য এক বিভাগে। দুজনেই চেরোকি গোত্রের মানুষ। মহিলাটি লাইব্রেরিতে চাকরি করেন। তার নামটা ভুলে গেছি। বললেন ওরা মূল জনস্রোতে মিশে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। অনেক আগে নাকি তাদের এনক্লেভে থাকতে হতো। আজকাল সেসব বালাই নেই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই থাকেন। তার স্বামী একজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। মাঝে মাঝে রেড ইন্ডিয়ানরা কোনো অনুষ্ঠানে মিলিত হলে তাদের গোত্রের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। রেইন ডান্সসহ বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে তখন। তবে এগুলো নেহাতই আনুষ্ঠানিকতা। ব্যক্তি জীবনে আর দশজন আমেরিকানের মতোই চলেন তারা। তার সঙ্গে কথা বলছিলাম আর কল্পনায় যেন দেখতে পাচ্ছিলাম প্রেইরির বুকে ঘোড়ার পিঠে ধাবমান রেডইন্ডিয়ানদের। সামনে ছুটে চলেছে বাইসনের পাল। গোত্রের প্রধান তাঁবুর সামনে  বসে আছেন সর্দার। গায়ে বিচিত্র নকশা করা পোশাক। ছায়ায় বসে মাদুর বুনছে কয়েকজন নারী। তাদের কালোচুলে লম্বা বেণী করা। গলায় পাখির পালকের গয়না। খেলা করছে কয়েকটি শিশু। প্রেইরির ঘাসবন থেকে ভেসে আসছে উতল হাওয়া। শান্তিময় পরিবেশ। নিশ্চয়ই এই মহাদেশে শ্বেতাঙ্গ দখলদাররা আসার অনেক আগের এই ছবি।

আমি তাকালাম আমার পাশে বসা নারীর দিকে। তার পরনে আধুনিক স্কার্ট আর টপস। তবু কালো চুল আর কালো চোখের দৃষ্টিতে আদিবাসীদের সেই ইতিহাস যেন উঁকি দিয়ে গেল। ড্রিম ক্যাচার ক্যাচ মি সাম সুইট ড্রিমস। টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস। আমি ফিরে যেতে চাই সেই সরল জীবনে।

ম্যারিয়টস ইনের মায়া

ম্যারিয়টস ইন। নামটা শুনলে চোখে ভেসে ওঠে চমৎকার কয়েকটি কটেজের ছবি। বাগান, ঘাসে ছাওয়া মাঠ, সুইমিং পুল, লন টেনিস ও বাস্কেটবল খেলার জায়গা।  ওকলাহমায় গিয়ে ওখানেই ছিলাম আমরা। কটেজগুলোও চমৎকার। ডুপ্লেক্স কটেজ। প্রতিটি কটেজে দোতলায় আর নিচতলায় দুটি বেডরুম,দুটি ওয়াশরুম, কিচেন কাম ডাইনিং, ছোট্ট একটু বসার জায়গা। কিচেনে ওভেন, ফ্রিজ সবই আছে। আর বেডরুমে টিভি, ফোন তো আছেই।

কমন বারান্দা দিয়ে সংযুক্ত একটি কটেজের দুটি ডুপ্লেক্স রুমে আমরা ৯ জন মেয়ে রয়েছি। আর রাজি যেহেতু ছেলে তাই তার জন্য আলাদা একটি সিংগেল রুমের ব্যবস্থা।

দীর্ঘ বিমানযাত্রায় আমরা যখন এখানে পৌঁছালাম তখন প্রত্যেকেই দারুণ ক্লান্ত। ঢাকা থেকে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজে দশ ঘন্টা উড়ে পৌঁছেছি হিথরো। সেখানে ১ ঘন্টা মাত্র স্টপওভার দৌড়ের উপরে গেছে। একটুর জন্য প্লেন মিস করেনি লাবণ্য কাবিলি। এরপর প্যানঅ্যাম বিমানে আরও দশঘন্টা যাত্রায় আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে গেছি শিকাগো। সেখান থেকে ২ ঘন্টার বিমানযাত্রায় ওকলাহমা সিটি। তারপর একঘন্টা মোটর ভ্রমণে ছোট্ট বিশ্ববিদ্যালয় শহর নরম্যান। এখানেই ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়। দূরত্ব? ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীর নগর। এর কাছেই ম্যারিয়টস ইন। ঢাকা থেকে ভোররাতে যখন রওনা দেই তখন বেশ প্রাণবন্ত ছিলাম। কথা ছিল তিনঘন্টা আগে পৌঁছাবো সবাই এয়ারপোর্টে। যাতে রিপোর্টিং টাইম এর আগে সবাই একসঙ্গে হতে পারি। তার মানে বাড়ি থেকে বের হয়েছি প্রায় ২৭/২৮ ঘন্টা আগে। আমি জার্নিতে কখনও ঘুমাতে পারি না। তাই এই ২৮ ঘন্টা জেগে আছি। বলাবাহুল্য একেবারেই কাহিল হয়ে পড়েছি। ম্যারিয়টস ইনে যখন পৌঁছালাম তখন রাত। নাজমুন মিলি, আমি, শাহনাজ বেগম ও নাসরাত এক ডুপ্লেক্সে। পাশের ডুপ্লেক্সটিতেই শাহনাজ মুন্নি, রোজিনা, লাবণ্য, মন্টি আর রিতা। ওদেরটা আমাদেরটার চেয়ে একটু বড়।

কটেজে ঢুকেই চোখে পড়লো ডাইনিং টেবিলের উপর বড় একটি বাস্কেট। তাতে নানা রকম চকলেট, কুকিজ, ফ্রুটস আর সফট ড্রিংকসের ক্যান। বাহ। এটি ম্যারিয়টস ইনের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য স্বাগত উপহার। এত ক্লান্ত ছিলাম যে রাতে কিছু চিন্তা করার আগেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছি। জেট ল্যাগ।

পরদিন ভোর ছটায় ঘুম ভেঙে গেল। আবার ঘুমাবো? নাহ, নতুন দেশ। একটু বরং দেখা যাক। তখনো অন্ধকার কাটেনি। কটেজের বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু একটু করে ভোরের আলো ফুটছে। জায়গাটা চমৎকার। সেপ্টেম্বর মাস। ওকলাহমায় তখন আমাদের পৌষ মাসের আরামদায়ক শীত। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শীত কমে যাচ্ছে। ওকলাহমায় দেখেছি দুপুরের দিকে বেশ চড়া রোদ। তখন গরম লাগে। শুষ্ক গরম। তবে ভোরবেলাগুলো স্নিগ্ধ।

সাড়ে সাতটায় তৈরি হয়ে চললাম ডাইনিংয়ের খোঁজে। আলাদা একটি বড় বাংলোতে ডাইনিং। সব আন্তর্জাতিক বড় হোটেলের মতোই বুফে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা। ওটস, দুধ, বাদাম, স্ক্র্যাম্বল এগ কোনো কিছুরই অভাব নেই। সবই ফ্রেশ। ম্যারিয়টস ইনে যে ক’দিন ছিলাম সকালবেলার খাবারটা খুব শান্তিতে খেয়েছি।

ম্যারিয়টস ইনে নিজেদের রান্না করে খাওয়ারও সুযোগ ছিল। আমি যেদেশে যাই, সেদেশের খাবার খেতেই বেশি ভালোবাসি। এর মাধ্যমে বৈচিত্র্য আর অভিজ্ঞতা দুটোই জোটে। তবে আমার রুমমেটরা দেখলাম বাংলা খাবার খেতে বেশ আগ্রহী। এক ছুটির দিনের সন্ধ্যায় নিজেরাই রান্না-বাড়ি খেলা শুরু করলাম। মেন্যু ঠিক হলো আলুভর্তা, ডিমভাজা, ভাত, ডাল। প্রধান শেফ শাহনাজ আপা ও রিতা। বাকিরা সবাই জোগানদার। বেশ মজা হয়েছিল। কেউ পেঁয়াজ কাটছি, কেউ মরিচ, কেউ ডিমের আর আলুর খোসা ছাড়াচ্ছি। মনে হচ্ছিল ছোটবেলার চড়ুইভাতির দিনগুলোতে ফিরে গেছি। যখন সব কাজিনরা মিলে বাড়ির বাগানে রান্না-বান্না করতাম। খাবারটাও নেহাত মন্দ হয়নি।

বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী খুব আদুরে আর নরম স্বভাবের মেয়ে। বলতো, ‘আমাকে কেউ মুখে তুলে খাইয়ে দাও’। নামে মিল থাকলেও স্বভাবে পুরো বিপরীত শাহনাজ বেগম। তিনি ভীষণ কড়া মেজাজের। বলতেন, সবাইকেই রান্না করতে হবে, পারো বা না পারো। একদিন রান্না করতে গিয়ে শাহনাজ আপা একটি ফ্রাইপ্যান পুড়িয়ে ফেলেন। আমরা ভাবছি ক্ষতিপূরণ না দিতে হয় আবার। পরে দেখলাম খামোখাই ভয় পেয়েছিলাম। কোনো জরিমানা করা হয়নি। দিনের পর দিন আমেরিকান খাদ্য স্মোকড বিফ, বার্গার, স্যান্ডউইচ, স্যুপ, কেক ইত্যাদি খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমরা নিজেরাই রান্না করে নিতাম। রিতা হাসি-খুশি স্বভাবের। রোজিনাও খুব হাসি-খুশি মেয়ে। নাজমুন মিলি ভারিক্কী স্বভাবের। আমাকে বেশ উপদেশ দেয়। লাবণ্য কাবিলী সবচেয়ে চুপচাপ। নাসরাতের মুখে সারাক্ষণ তার মেয়ের গল্প। নাসিমা মন্টি আমুদে। আবার মাঝে মাঝে খুব চুপচাপ হয়ে যায়। আমরা সবাই এসেছি ভিন্ন ভিন্ন পরিবার থেকে, বিভিন্ন স্বভাব নিয়ে। তবে এখানে এসে যেন এক পরিবারের হয়ে গিয়েছি।

ম্যারিয়টস ইন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বেশ খানিকটা পথ। আমাদের গাড়ি করে আনা নেওয়া করতেন এক তরুণ। বেশ সুদর্শন। নাম উইল। এই তরুণ ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। পার্টটাইম আমাদের আনা নেওয়ার কাজটি করে দিয়ে ভালোই রোজগার হচ্ছে তার। প্রথমদিন থেকেই ড্রাইভারের পাশের সিট মানে উইলের পাশের সিটটি চলে গেল বন্ধু রিতার দখলে। আমরা রিতাকে আর উইলকে নিয়ে মজার মজার মন্তব্য করি। রিতাও সেই রসিকতা দারুণভাবে উপভোগ করে। যেহেতু উইল আমাদের ভাষা বোঝে না তাই তার সাথে বাংলায় ‘টাংকি’ মারতে তো কোনো সমস্যা নেই। উইল কিছু বুঝতে পেরেছিল কিনা তা আমার জানা নেই। তবে এরই মধ্যে একদিন সে তার স্ত্রী নিয়ে হাজির। আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তরুণীর নাম মনিকা। ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত। দীর্ঘদেহী শ্বেতাঙ্গ উইলের পাশে ছোট্ট খাট্টো মনিকাকে বেশ সুইট লাগে। সেদিন বেড়াতে যাচ্ছি আমরা। মাইক্রোর পিছনের তিনটি সিটে সবাই। উইলের পাশে মনিকা। হায়, রিতার জায়গাটা দখল হয়ে গেছে। আমরা সবাই সমস্বরে গান ধরলাম, বন্ধু যখন বউ নিয়া আমার বাড়ির সামনে দিয়া হাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্যা যায়। হাসতে হাসতে আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলালো রিতাও।

ম্যারিয়টস ইনের চারপাশে ঘাসে ছাওয়া মাঠ, ফুলের বাগান আর লম্বা লম্বা গাছ। হেমন্তে হলুদ-লাল-কমলা নানা রকম রঙ ধরেছে। এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই আমাদের ক্ষণস্থায়ী আবাস সেই কটেজগুলো।

যে কোনো জায়গা থেকে চলে আসার সময় আমরা খুঁজে দেখি কিছু ফেলে যাচ্ছি কিনা। কিন্তু সর্বত্রই আমরা স্মৃতি ফেলে আসি। কোনো জায়গায় কিছুদিন থাকলে মায়া পড়ে যায়। সেই মায়া কাটিয়ে চলে আসতে কষ্ট হয় বৈকি। ম্যারিয়টস ইনের সেই দিনগুলো ছিল দারুণ ‘মায়া জাগানিয়া’। আজও তার মায়া জেগে আছে স্মৃতির ফোল্ডারে।

ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে

ওকলাহমা ইউনিভারসিটির গেলর্ড কলেজের সামনে

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেখেই চোখ জুড়িয়ে গেল। এমন পরিবেশ দেখলে মনে হয় আবার ভর্তি হয়ে যাই। ফিরে যাই মধুময় শিক্ষার্থী জীবনে। ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো কলেজ। একেকটি কলেজ একেকটি ফ্যাকালটি। গেলর্ড কলেজে রয়েছে ম্যাস কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ। সেই বিভাগেই সংক্ষিপ্ত ফেলোশিপে এসেছি আমরা। আমেরিকা এসে পৌঁছানোর পরদিন সকালেই শুরু হলো ক্লাস। এমনিতেই রসাতলে (গ্লোবে দেখা যায় আমাদের দেশের নিচেই আমেরিকা। তাহলে রসাতল তো বলাই যায়!) চলে এসেছি। ঘুমের সময় ওলটপালট হয়ে গেছে। সম্ভবত সেকারণেই দু’ঘন্টা ক্লাসের পরই বেজায় ঘুম পাচ্ছিল। তবে দেখলাম ঘুম কাটানোর বেশ ভালো পদ্ধতি ক্লাসের ভিতরেই রয়েছে। ক্লাসের একদিকে রয়েছে কফি আর কুকিজের ব্যবস্থা। ক্লাস নেওয়ার পদ্ধতিও চিত্তাকর্ষক। মূল বিষয়বস্তু হলো উইমেন লিডারশিপ ইন জার্নালিজম। ওদের পড়ানোর পদ্ধতিই এমন যে আগ্রহ জাগে। আর গ্রুপ ওয়ার্ক, মাল্টিমিডিয়া প্রেজেনটেশন, নানা রকম প্রোজেক্ট বানানোর কাজ বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করে দেয়। ঝকঝকে ক্লাসরুম, প্রত্যেকের জন্য কম্পিউটার, আরও কতকি সুবিধা। আমরা লাঞ্চ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায়। দারুণ ঝকঝকে। শিক্ষার্থীদের অনেকে এখানে পার্টটাইম চাকরি করে। নোটিস বোর্ডে কয়েকটি জব অফারও দেখলাম। ডর্মেটরিগুলোও সবরকম সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন। ওকলাহমা স্টেট আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে বড়। সেই তুলনায় লোকসংখ্যা বিস্ময়করভাবে কম। পুরো স্টেটে ত্রিশ-চল্লিশ লাখের বেশি নয়।

প্রাকৃতিক গ্যাস আর তেলের রাজ্য। সেইসঙ্গে কৃষিকাজও হয় বেশ ভালোভাবেই। প্রেইরির একটা অংশ পড়েছে এই স্টেটে। প্রেইরি শুনলে মনে পড়ে লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি সিরিজ, লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের সেই বিখ্যাত বইগুলো।  ছোটবেলায় পড়া তেপান্তরে ছোট্ট শহর লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি অবশ্য সাউথ ড্যাকোটা স্টেটের ঘটনা। ওকলাহমা তার তিন স্টেট দক্ষিণে। মাঝে রয়ে গেছে নেব্রাসকা ও কানসাস। তবু প্রেইরি তো আছে। নামটাই যথেষ্ট।

শুনলাম আমাদের কলেজ যার ব্যক্তিগত দানে গড়ে উঠেছে সেই ধনকুবের গেলর্ড ছিলেন বিশাল দানবীর। নরম্যান শহরে তার দানকর্মের অনেক পরিচয় রয়েছে। কলেজভবনের সামনেই তার বিশাল ভাস্কর্য। ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয় ওকলাহমা সিটি থেকে কিছুটা দূরে নরম্যান নামে শান্তিময় একটা ছোট শহরে অবস্থিত। নরম্যান বিশ্ববিদ্যালয় শহর। মূলত ছাত্র, শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট মানুষজনই এখানে বসবাস করেন। এই ছোট শহরেও অবশ্য বড় বড় শপিংমলের অভাব নেই। টার্গেট, ওয়ালমার্ট এর মতো সুপার চেইনশপগুলো তো আছেই। নরম্যান এতটাই শান্তিপূর্ণ যে এখানে অপরাধ ঘটে না বললেই চলে। দশবছরেও হয়তো কোনো খুনের ঘটনা ঘটেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে আমাদের অনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হলো আমাদের সম্মানে আয়োজিত এক লাঞ্চে। ভদ্রমহিলা দারুণ বিনয়ী । কথাও বলেন চমৎকারভাবে। এখানে একটা বিষয় আমার খুব ভালো লাগছে যে,  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললেই মনে একটা শ্রদ্ধার ভাব জাগে। কারণ তাদের কথা শুনলেই বোঝা যায় এরা যেমন প্রচুর পড়াশোনা করেন তেমনি সংযত ও বিনয়ী। ম্যাস কমিউনিকেশনের যে শিক্ষকরা আমাদের ক্লাস নিলেন তারাও এমন। বলতে গেলে সারাদিন গবেষণা ও বিদ্যাচর্চার মধ্যেই থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সুভ্যেনির শপে গিয়েও বেশ মজা পেলাম। জেমস জয়েস, অ্যাডগার অ্যালেন পো সহ বিখ্যাত লেখকদের ছোট্ট ছোট্ট্ প্রতিকৃতি। তার মধ্যে ম্যাগনেট লাগানো। যাতে ফ্রিজে বা স্টিল ক্যাবিনেটে আটকে রাখা যায়। আর ওকলাহমা লেখা মগ, কফিপট, পেপারওয়েটসহ নানা রকম স্যুভেনির রয়েছে। কিনেছিলাম বেশ’কটি।কয়েকটি এখনও রয়ে গেছে ধুলোপড়া চেহারায়। তার মধ্যে একটি ছিল মাঝারি আকৃতির সফট টয়েজ স্নুপি। এই স্নুপি হলো গ্র্যাজুয়েট স্নুপি। তার পরনে অভিষেকের পোশাক। হাতে গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট।

সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা একটা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে। এই পত্রিকায় তারাই কাজ করে। এখানে কাজ করার মাধ্যমে তারা হাতে কলমে সাংবাদিকতা শেখে। সেই পত্রিকায় আমাদের সাক্ষাৎকার ও ছবি ছাপা হলো। ফলে পুরো বিভাগ আমাদের বিষয়ে জানতে পারলো।

একদিন বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি বিশেষ সান্ধ্য আয়োজনেও গেলাম। সেখানেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় ঘটলো। আমেরিকানরা বেশিরভাগই খুব আত্মকেন্দ্রিক। নিজের দেশের বাইরে অনেক কিছুই তারা জানে না। ওদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশের নাম শোনেনি। বাংলাদেশ বিষয়ে কিছুই জানে না। তবে আমাদের বিষয়ে তাদের দারুণ কৌতুহল। বিশেষ করে শাড়ি এবং কপালের টিপ প্রসঙ্গে। এ বিষয়টি নিয়ে বলতে আমি খুব মজা পাই। সেদিন দশজনের মধ্যে একমাত্র আমিই ছিলাম শাড়ি পরা। ব্যাগে একপাতা টিপও ছিল। উপস্থিত ছেলে মেয়ে অনেকেই আমার কাছ থেকে টিপ নিয়ে কপালে পরেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিটি ছিল বিশাল। সেখানে বইয়ের সংগ্রহ দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।

তবে ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল এর বিশাল সবুজ ক্যাম্পাস। একটা বিষয় খুব অবাক লাগতো যে এত সুন্দর সবুজ ঘাস কিন্তু কেউ ঘাসে বসে না। বসার জন্য আলাদা বেঞ্চ আছে। কেউ ঘাসের উপর দিয়ে চলেও না। সরু পথ আছে ঘাসের ভিতর দিয়ে বা একপাশ দিয়ে। সবাই সেই পথ ধরে চলাচল করে। প্রথমে এর কারণ না বুঝলেও পরে বুঝেছি ঘাস যেন নষ্ট না হয় বা দলে না যায় সেজন্যই কেউ ঘাসের উপর দিয়ে চলে না বা ওতে বসে না।

গাছের ছায়ায় বেঞ্চে বসে সেই সবুজ ঘাসের ছাওয়া মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে দারুণ ভালো লাগতো। অন্য রকম এক প্রশান্তিতে ভরে উঠতো মন।

আরেকটি জিনিষ খুব পছন্দনীয় ছিল। সেটা হলো সকালবেলা ক্লাসে ঢুকতেই নাকে ভেসে আসা কফির সুবাস। সতেজ করা সেই কফির কাপ হাতে নিয়ে শুরু হতো দিনের পড়াশোনা।

 

শান্তা মারিয়া

২৪ এপ্রিল, ১৯৭০ ঢাকায় জন্ম।
ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় নারী নেতৃত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।

১৯৯৭ সালে দৈনিক মুক্তকণ্ঠে সাংবাদিকতা শুরু। এরপর জনকণ্ঠ, আমাদের সময়, রেডিওআমার ও চীনআন্তর্জাতিক বেতার এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম-এ সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ আমাদের সময় পত্রিকায় ফিচার এডিটর পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে চীনের ইউননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার শিক্ষক। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে পেপার উপস্থাপন করেছেন। কবিতা, গল্প ও ভ্রমণকাহিনি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এ পর্যন্ত ৫টি কাব্যগ্রন্থসহ ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, চীন, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল এবং বাংলাদেশের প্রায় সবক’টি জেলায় ভ্রমণ করেছেন। জ্ঞানতাপস ভাষাবিদ ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পৌত্রী ও ভাষাসৈনিক এবং বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী মুহম্মদ তকিয়ূল্লাহর কন্যা। ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। মিথোলজি ও ইতিহাসপাঠ শান্তা মারিয়ার প্রিয় নেশা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।