পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

অরণ্যের পথে

 সহসা এর মাঝে একদিন আমি জীবনের প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে গেলাম। রাজাকাক্কার প্রতি আব্বার ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা,ভালোবাসা আর নির্ভরতা। সেই নির্ভরতার সূত্র ধরে আব্বা আমাকে রাজাকাক্কার সংগে আম্মাকে ছাড়া একা একা বরমচাল যাওয়ার অনুমতি দিলো। শুধু যে রাজাকাক্কার জন্যই দিলো, এমন নয়।বিউটিআপার অবদানও সেখানে কম ছিল না। বিউটিআপার সাথে আমার অসম বয়সের বন্ধুত্ব মোটামোটি সবার গোচরেই ছিল। আমি বরাবরই ছিলাম মিশুক প্রকৃতির।ফলে ছোটবড় সবার সঙ্গে খুব দ্রুত মিশতে পারতাম। হতে পারে আমাদের সংসারে আমি ছাড়া আর কোনো বালিকা না-থাকাতে আমি প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ বোধ করতাম। এবং যাকে পেতাম তাকেই আকড়ে ধরতে চাইতাম। কুমড়োলতার আকর্ষি যেভাবে অন্যকে জড়িয়ে ধরে লতিয়ে উঠতে চায়, লতিয়ে উঠে বেঁচে থাকতে চায়। আমিও ওইরকম জড়ানো স্বভাবের ছিলাম। এ ছাড়াও আমি অত্যন্ত মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসতাম। মানুষকে একেবারে নিজের করে নিতাম। যেখানে সত্যি কোনো খাঁদ থাকতো না। কোনো দূরত্ব থাকতো না। আমি ছিলাম আপাদমস্তক নির্ভেজাল মানুষ।

এই প্রথম আমি একা একা পরিবার ছাড়া কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি– আহা! সেই আনন্দেই ভরপুর আমি। নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগাড়। আব্বার মারধর আর কড়া শাসনের বাইরে যেতে পারছি, আম্মার খামাখাই মুখ ঝামটাঝামটি, ছোটকার অকারণে পিছু লেগে থাকা,প্রদীপের সাথে ঝগড়াঝাটি– এসব ফেলে একা একা দূরে বহুদূরে ঘুরে আসা–যা কিনা আমার স্বপ্নেরও অতীত। আব্বা তো আমাকে প্রায় বাসায় বন্দী করে রাখে। সেই থেকে আমার বন্দীজীবনের প্রতি ভয়ানক বিতৃষ্ণা। আমার পিছু কেউ সারাক্ষণ খবরদারি বা পুলিশগিরি করলে  আমি ততই পিছলে যেতে থাকি।পালাতে থাকি মনে মনে।মুক্তির জন্য হাঁসফাঁশ করতে থাকি। তুমি যদি আমাকে স্বাধীনতা দাও– আমি নিশ্চয়ই তার মর্যাদা রাখবো। আমার দিক থেকে পাহারা সরিয়ে নাও, আমি তোমাকে শ্রেষ্ঠ বন্দীর আনুগত্য দেব।

একদিন শুভক্ষণে ভোর ভোর আমরা সিলেট রেলস্টেশনে গিয়ে ট্রেনে উঠে বসলাম। এই ট্রেন বরমচাল হয়ে ভাটেরা বাজার স্টেশনে স্বল্প সময়ের জন্য থামবে। প্রথম শ্রেণীর নরম সিটের উপর  আয়েশ করে আমি বসেছি জানালার পাশে। যে কোনো যানে আমি জানালার পাশটিতে বসতেই পছন্দ করি। কিন্তু এটা আমি ঘুনাক্ষরেও বিউটিআপাকে বুঝতে দেইনি। বিউটিআপা নিজেই বলেছে–

পাপড়ি, তুমি জানালার পাশে বসো।

এমনিতেই আমি নাচুনি বুড়ি, তদুপুরি পেয়েছি ঢোলের বাড়ি!

আমার কাছে জানালা মানে তো সমস্ত পৃথিবীকেই দেখে নেয়া। আমি জানি, এই জানালা গলিয়েই ঢুকে পরবে মাইলকে মাইল সবুজ ধানের ক্ষেত। উড়ে আসবে ঝাঁকে ঝাঁক বকপাতি, শালিকের কিচিরমিচির আর জলের আধার! আমি দৃষ্টির জালে পেয়ে যাব বিলের পর বিল আর তাতে ফুটে থাকা এন্তার শাপলা। সে শাপলার রঙ দুধের মতো ধবধবে শাদা। বা রক্তের মতো টুকটুকে লালও হতে পারে। আমি জানালার পাশটিতে বসলেই পাবো বুনোসবুজের সুঘ্রাণ, যে সুঘ্রাণ নাকে ঝাপটা মারতেই মগজের ভেতর বনভূমির চিত্র আঁকা হয়ে যায়। তেলরঙে আঁকা সেই চিত্র কোনোভাবেই মুছে ফেলা যায় না!

আমি এতটাই আনন্দে বিভোর থাকি যে, ট্রেনের দুলে ওঠাও ধরতে পারি না। ট্রেন বেগে চলতে শুরু করলেও আমার বিস্ময় যেন ঘুচতে চায় না। বিউটিআপার প্রশ্নে অবাক হয়ে তাকাই–

পাপড়ি বলোতো ট্রেন কি বলে?
ট্রেন আবার কি বলবে? ট্রেন কি মানুষ নাকি?
আরে বলে বলে। ট্রেন মানুষের সাথে কথা বলে।
তাই নাকি?
হুম।
ট্রেন কি বলে?
ট্রেন বলে লেফট রাইট। লেফট রাইট।
বিউটিআপার কথা শুনে আমি তব্দা মেরে যাই।
বিউটিআপা বলে—
তুমি বলে দেখো ট্রেন তোমার সাথে বলে বলে চলবে।
দারুণ উল্লসিত হয়ে উঠি আমি।
মনে মনে তখুনি বলতে শুরু করি–
লেফট রাইট, লেফট রাইট

অবাক কাণ্ড! ট্রেনেও আমার সাথে বলতে শুরু করে লেফট রাইট, লেফট রাইট।

ইস! বিউটিআপা কতকিছুই না জানে! আমি হইলাম গিয়া একটা বোকার হদ্দ। এখনো এটাই জানিনা যে ট্রেন লেইফ রাইট গতিতে চলাফেরা করে!

লেফট রাইট করে করে ট্রেন দ্রুত পা চালিয়ে এসে পড়ে ভাটেরাবাজার স্টেশনে। আমার হাতে একটা ব্যাগ, তাতে দুই-চারটা জামাকাপড়। আমি ব্যাগটা কাধে নিয়ে নেমে পড়ি। ট্রেন থেকে নামতেই তীব্র শীত এসে আমাকে কুঁকড়ে দিয়ে যায়। কী করব বুঝে উঠতে পারি না। আমার পরনের জামার উপর  ন্যায্যমূল্যে চাচাজানের কিনে দেয়া কাপড়ের কোট। শেরওয়ানী কলার দেয়া। কিন্তু ভেতরে কোনো লাইনিঙ  নাই। এই কোট বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নাই যে, তীব্র শীতকে আটকাতে অক্ষম! আর আমার শীতবস্ত্র বলতে গলায় একটা সরু মাফলার। চেক ফ্লানেল কাপড়ের। আম্মা অবশ্য এই কাপড়কে বলে ফেলালিন! এই মাফলারটা আবার এজমালি। মানে বাসায় আমি, ছোটকা আর প্রদীপ যখন যার সুবিধা মতন ব্যবহার করি। এখন আমি যেহেতু পাহাড়ের দেশে বেড়াতে এসেছি, সেহেতু মাফলারটা অবধারিতভাবে আমার দখলে। আমি মাফলারটা যতোটা সম্ভব মেলে কান-মাথা পেঁচিয়ে ফেলি। কিন্তু শীতের আক্রমণ তাতে সামান্যতমও কমে না। শীতের সাথে আমার এই নীরব যুদ্ধ বেশিক্ষণ চলে না। রাজাকাক্কাকে রিসিভ করতে একটা বড়সড় জিপ গাড়ি এসে গেছে। আমরা গাড়িতে গিয়ে উঠে পড়ি। এই গাড়ি থেকে চারপাশেই দেখা যায়। কারণ কাচের জানালা লাগানো। এমনকি পেছনের দরোজাতেও কাচ দেয়া। রাজাকাক্কা বসেছে ড্রাইভারের পাশে। মানে সামনের সিটে। আমি আর বিউটি আপা বসেছি পেছনের একটা সিটে। আর এই সিটের মুখোমুখি আরেকটা সিটে রাজাকাক্কার অফিস সহকারী দুইজন। বিউটি আপাকে দেখি ভীষণ শক্ত মুখ করে বসে আছে। অফ হোয়াইট পুলওভারের উপর শাদা জর্জেটের ওড়না ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছে। বিউটি আপা কাউকে দেখছে বলে মনে হচ্ছে না। আমিও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে আছি। বয়স অল্প হলেও বুঝতে পারছি গাড়ির ভেতর কোনো কথা বলা যাবে না। আমি যে সারাদিন ভ্যানভ্যান করে করে বিউটি আপার মাথা খেয়ে ফেলি , সেসব এখন করা যাবে না।

কী আর করা? আমিও মুখ বন্ধ করে ভাবলেশহীন থাকার চেষ্টা করি। জিপ চলতে শুরু করলে আমি বিস্মিত হতেও যেন ভুলে যাই। চারপাশে সবুজ ছাড়া যেন আর কোনো রঙ নাই। বিশাল এক সবুজ সমুদ্দুরের ভেতর দিয়ে আমাদের গাড়ি পথ কেটে চলেছে। বদ্ধ জানালার কাচ গলিয়ে আমি দেখার চেষ্টা করছি বাইরে আর কি কি রয়েছে? কিন্তু অগণন বৃক্ষের সারি ছাড়া আমার নজরে কিছুই আসছে না! মাঝেসাঝে জিপ জাম্প করলে বুঝতে পারছি রাস্তাঘাট বন্ধুর! এই মধ্যদুপুরেও গাড়ির কাচে ফোঁটা ফোঁটা শিশির জমেছে! ফলে চারপাশের দৃশ্যাবলি ঝাপসা ঠেকছে। দীর্ঘ বনভূমি পার হয়ে আমাদের জিপ থেমে পড়ে একটা টিলার সম্মুখে। রাজাকাক্কার সহকর্মীরা নামার পরে ধীরে ধীরে বিউটি আপা আর আমিও নেমে পড়ি। টিলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে দেখি লম্বা ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে বহুদূর। একেবারে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে! এই সিঁড়ি হয়তো আসমানে গিয়ে ঠেকেছে। নিচ থেকে এমন এক বোধ জাগে।

আলোছায়ার রহস্যময় এক দুপুরে আমি  অপূর্ব এক বনানীর ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। সূর্যের আলোকে আড়াল করে দিচ্ছে বৃক্ষদের শাখাপত্রের ছায়া। সকাল-দুপুর কিংবা সন্ধ্যার গোলকধাঁধার মাঝে এক বিমূঢ় বালিকা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। কর্ র কর্  করে কোনো অচেনা পাখি ডেকে উঠলেই কেঁপে উঠছে সে!

বিউটিআপা আমার এই বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকা টের পায় কিনা কে জানে? আমার কাছে এসে আলতো করে হাত ধরে বলে

পাপড়ি আসো।

আমিও বিউটিআপাকে অনুসরণ করি। নরম ও নিঃশব্দ পায়ে বিউটিআপা ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। কিছুদুর ওঠার পর বিউটিআপা থেমে পড়ে। আমাদের সামনে এক বালক দাঁড়িয়ে! যার ভীষণ ধবধবে গায়ের রঙ আর ধূসর কেশরাজি। নীল চোখের অধিকারী এই বালক বয়সে আমার চাইতে দুই-তিন বছর কম হবে। বিউটি আপা সস্নেহে তার চুলে হাত বুলিয়ে বলে— কী খবর গালিব?

আম্মা কেমন আছে?

গালিব কথার উত্তর না দিয়ে চোরা চোখে আমার দিকে তাকায়।

হয়তো সে বুঝতে চেষ্টা করে এই নতুন মুখ কোথা থেকে উদয় হলো? বা তার আগমনের হেতু কী?

আমিও গালিবকে দেখেও না দেখার ভাণ করে দাঁড়িয়ে থাকি।

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।