নাজনীন খলিলের একগুচ্ছ কবিতা

মেয়েটা

মেয়েটা আসতো মাঝেমধ্যে ছেলেটার খোঁজে।
–এমন বললো পুরনো বাড়িওয়ালা।
আসতো চোখভরা এক আকাশ মেঘ সাথে করে
আচমকা বৃষ্টিতে চৌকাঠ ভিজে যেতো।
সেই প্রবল বর্ষণের ভেতরে বিষণ্ণ
পা টলোমলো করতে করতে ফিরে যেতো;
তার কোন বর্ষাতি ছিলোনা।
পুরনো ঠিকানায় রোজ মেয়েটার চিঠি।জমে জমে স্তূপ।
স্থান সংকুলানে মাঝেমাঝে ফেলে দিতে হয় ডাস্টবিনে;
ছেলেটা দেয়নি তার নতুন ঠিকানা।

ড্রয়ার-ভর্তি স্মৃতির কোলাজ সামনে নিয়ে বসে থাকে মেয়ে।
পুরনো এলবাম। কাশবন।শূন্যে উড়ে যাওয়া যুগলবন্দী ছবি;
ফ্যাঁকাসে হতে হতে সাদা মেঘের কিনারা ছুঁয়েছে ।
হুড খোলা রিকশায় শহর মুঠোয় পোরা দিন ;
সব নিয়ে চলে গেছে ছেলে।

মেয়েটা
ব্যাগ-ভর্তি ঘুম কিনে নিয়ে আসে।

 

এবং দ্বিতীয় আমি

ম্যাজিক মিরর।
এপাশেও প্রতিচ্ছবি। ওপাশেও।
তোমাকে দেখছি আমি।তুমিও কী দেখছো আমাকে?

জেনে নাও
আমরা কোনদিন হাত ধরাধরি করে হাঁটবো না
রোমান্টিক কাপলের মতো।
মাঝখানে অভঙ্গুর কাচের দেয়াল ;
তবু অলৌকিক স্পর্শ ছুঁয়ে যাবে, যাচ্ছে।
অহর্নিশ অন্তর্গত যুদ্ধ হবে। সমঝোতা হবে।
মাঝেমাঝে, —’ তোমার তুমিকে বড়ো ভালোবাসি’ বলে ফেলবে বেখেয়ালে।
আমিও তোমাকে এমন কিছু…

আমরা আজীবন সমান্তর দূরত্বে।
আমরা আজীবন পাশাপাশি।

আমরা এক নই।
অবিচ্ছিন্ন নই। তবু আমাদের বিচ্ছেদ হবেনা।
পৃথিবীর নিক্তির মাপে দুজন একত্র।
কিন্তু আমরা তো এক নই— দুজনেই জানি। আমরা দুজন।
শুধুমাত্র অন্যোন্য।
আমরা পৃথক নই তবু আমৃত্যু বিভেদ-দহন বয়ে চলি।

আমি
এবং
দ্বিতীয় আমি।

 

আকাশবাড়ির ঠিকানা

আকাশের পকেটে কোন ডাকবাক্স আছে?

চিঠি উড়ে যাচ্ছে একটা প্রগাঢ় নীল অভিযাত্রার দিকে
শূন্যের সাথে শূন্যের দ্বন্দ্বজ কোলাহলে কে বেশী বেগবান
নির্ধারিত হোক।
হিপনিক জার্কসে ঘুম ভেঙ্গে গেলে
বুকের মাঝখান থেকে এক জোড়া সারস উড়ে যায়
অন্তহীন মেঘের বাড়ির পথে…
একটি প্রবল ঘুম দ্রুত পতনোন্মুখ
অভ্রংলিহ পাহাড়ের চূড়া থেকে নিতল গহ্বরে।
আহা স্বপ্ন! সূর্যমহলের সিংহদুয়ারে আটকে পড়া স্বপ্নগুলো!
মনোশরীরবৃত্তে বন্দী ঘুম অথবা স্বপ্নের প্রতি
তর্জনী তাক করা ; অভিষঙ্গ-বাহুল্য। মনে হলো এমন।

রাত বেয়ে নেমে আসে কাঁকর ভেজা এক পথ
শিথানে চুলের গোড়া থেকে ঝরে পড়ছে মেডুসার সাপ…

 

ইল্যুশন

হ্যাঁ তোমাকেই তো!
যুগ যুগ ধরে খুঁজেছি তোমাকেই।
শুধু যুগ? অনন্ত মহাকাল নয় কেন?
চেনাঅচেনা সমস্ত মুখের ভিড়ে তোমার আদল…
ব্যস্ত সড়ক পার হতে হতে
প্রতিটি পথিকের দিকে খরচোখে তাকিয়েছি।
তুমি কোথাও ছিলে না। হয়তো থাকোই না।
তুমি যে থাকো না– তুমি যে অলীক
কেউ বললো না সে কথা। অনেকেই জানে।
হয়তো বড়রাস্তার ওই যে পাগলটা
মাঝেমাঝে মুখোমুখি হয়ে গেলে
সন্ত্রস্ত সতর্কতায় দ্রুত সরে যাই, সেও জানে।
হয়তো কাউকে একদিন এমন করে সেও খুঁজেছিল।
সে জানে! আমি জানি না!

শেষপর্যন্ত জেনেছি আমি
‘তুমি’ অ্যালকোহলের ঘোরে তৈরি এক ইল্যুসন
খোয়ারি ভাঙ্গার পরেই যা মিলিয়ে যায়।
এই অনর্থক বোধের জন্য মানুষ কতোপথ
অহেতুক হেঁটে গেছে!
কেউ কোনদিন তাকে পায়নি।

পায় না।

 

 

নাজনীন খলিল

জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে, বাংলাদেশের সিলেটে।
পড়াশুনা সিলেটেই, সরকারী মহিলা কলেজ এবং মুরারীচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ(এমসি কলেজ) থেকে স্নাতক।
লেখালেখির শুরু ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে। তখন থেকেই রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপক। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনারও কাজ শুরু। সাহিত্য-সংস্কৃতি মাসিক ‘ সমীকরণের’ নির্বাহী-সম্পাদক হিসেবে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনধারা নামে একটি পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক ছিলেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলতঃ কবিতা এবং কথিকা।

প্রকাশিত কবিতার বই:পাথরের সাঁকো; বিষাদের প্রখর বেলুনগুলো; ভুল দরোজা এবং পুরনো অসুখ; একাত্তর দেখবো বলে(ব্রেইল,যৌথ);গুপ্তপধানুকী অথবা মাংসবিক্রেতা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।