সেলিম রেজা নিউটনের গুচ্ছ কবিতা

কামিনীর ফুলের ইশারা

এই কান্না অত দূরে পৌঁছাবে কি, বলো?
এই যে পাশের ঘরে যত দূরে কচি কষ্ট বুকে নিয়ে সন্তান ঘুমায়
অথবা যতটা দূরে ভেসে যায় বিমানের ইঞ্জিনের ধ্বনি?
আমি ঠিক শুনি, আমি ঠিকই শুনতে পাই
যেভাবে শরীর গলে উপচে ওঠে অন্তরঙ্গ কান্নার উপায়।

কিন্তু অত দূরে জ্বরে কুঁকড়ে পড়া তোমার হৃদয়
কী করে জানবে ছোটো একটা ঘরে অন্ধকার ঘিরে
খোলা খোলা চোখ পাশে খুলে রেখে বিস্তীর্ণ ব্যথায়
শুয়ে আছে প্রাণচিহ্ন কান্না-অতিক্রমী সকালের অপেক্ষায়?

বিমানবন্দরহীন, পথহীন, এই ছোটো লোকালয় থেকে
খালি পায়ে হাইওয়ে টপকিয়ে, যামিনী পেরিয়ে,
পাড়ি দিয়ে যমুনা ও যামঘোষ-শব্দের প্রহরা
অত দূরে পৌঁছাবে কি গলা টিপে গোঙানোর এই অশ্রু-শুশ্রূষার ধারা?

পুলিশ-পেট্রোল আর ডিজেলের গন্ধচক্রে পাক খেতে খেতে
তোমাকে পাঠাচ্ছি তবু ক্রন্দসী এ কামিনীর ফুলের ইশারা।

 

সুপ্তিঘরের গান

আমার সুপ্তি-ঘরের কথা আমি
বলি নি কাউকে,
আমার দুঃখ-ঘরের কথা আমি
বলি নি কাউকে।
আমার যে দিন গেছে ভেসে— সে দিন
ডাকি নি কাউকে,
শুধু একটা পাখি ডেকেছিল
রাগিনী-রাইকে।

আমার নিদ্রামগন দিবস গেল
খুঁজতে নিজেরে,
এলো চেতনপ্রবণ রাত্রি আমার
সেই একই সুরে।
তবু ভেতরে রাই, বাইরে কানাই—
জানাই কাহারে!
আমি ভেতর-বাহির ভেদ করি স্থির-
গতির গভীরে।

আমার সুপ্তিরাতের কথা আমি
বলি নি কাউকে,
আমার দুঃখদিনের কথা আমি
বলি নি কাউকে।
আমার যে দিন গেছে ভেসে—সে দিন
ডাকি নি কাউকে,
শুধু একটা পাখি ডেকেছিল
রাগিনী-রাইকে।

 

ব্যাকডেটেড ব্যথা

ক্রন্দনের স্বাদ সেই তো নোনা নোনা পানি,
ফুসফুসের রঙ সেই তো রক্তেরই লাল;
সবারই সব জানা, সবই তো আমি-তুমি জানি,
তবুও ব্যথা নীল, শ্যামল-নীল শামাদানি।

যদিও কাল যায়, শ্যামের মতো কালো কাল,
আমের ফুল ফোটে, কোকিল গায় কাটা-তাল;
ব্যাকডেটেড গীতি ছাড়ে না অভ্যাস-রীতি–
বোরিং, ঘ্যানঘ্যানা, পুরানা, সুরকানা বাণী।

 

রাষ্ট্রচিন্তা

‘দিদার’ মানে জানো?
অন্ধকারেও আলোর সাথে অস্তিত্বের সাক্ষাৎ—চমকানো।

সন্ধ্যাবেলায় ইফতারিতে বসলো যারা একই পাতে
জিহ্বায় জল ছোঁয়ার আগেই কালো রঙের মাইক্রোবাসের দানো
উঠিয়ে নিল তাদের। শহর কয়েদ হলো গভীর অন্ধ রাতে
আটকানো-শ্বাস কষ্টগানের নিঝুম অন্তরাতে।

মুক্তি, তোমার দর্শন পায় যেন
কথার দায়ে জেলখানাতে বন্দি সমাজ-সংসার-সন্তানও।

 

 

সেলিম রেজা নিউটন

জন্ম:১৯৬৮ সালের জানুয়ারীতে, নিলফামারির সৈয়দপুরে । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন ১৯৯৪ সাল থেকে। আশির দশকে সামরিক-শাসন-বিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিসহ  প্রতিগতিশীল বিভিন্ন আনন্দোলনের সাথে যুক্ত  শিক্ষক, কবি , লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক সেলিম রেজা নিউটনের প্রকাশিত  গ্রন্থ:

অমার মতো ট্রমার মতো; অভ্যাসের অন্ধকার (প্রেম বিয়ে পরিবার ও সম্পর্ক – জিজ্ঞাসা); নয়া মানবতাবাদ ও নৈরাজ্য; গণমাধ্যম পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তুক;অচেনা দাগ (সম্পর্ক স্বাধীনতা সংগঠন );নিউটনের ছেলেবেলা; পরিস্থিতির বিবরণ; ভবিষ্যতের সরকার (মার্কিন ভাষাবিদ, দার্শনিক নোম চমস্কির ‘গভর্নমেন্ট ইন দ্য ফিউচার’ গ্রন্থের ভাষান্তর )।

মানুষ ও প্রকৃতি বিষয়ক ছোটকাগজ মানুষ সম্পাদনা করেন। 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।