সরদার ফারুকের একগুচ্ছ কবিতা

শাহবাগ

শেষমেশ কোথাও যাব না। রাক্ষসপুরীর এই দুর্ভেদ্য দেয়াল,
প্রহরী, বন্দুক আমাকেও অসুখী করেছে
পথের টহল কখনো থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘এত রাতে কুনখানে যাও?’
এর নাম শাহবাগ? আটটা না বাজতেই
দোকানে দোকানে তালা, পানশালা বন্ধ রাখে ছুটির দিনেই!

কেশমার্কা জনপদ, নাম তার মেগাসিটি! প্রবচন মনে পড়ে—
‘গায়ে গোশ নেই, হোলে চর্বি
সমতল বুক, কোথায় ধরবি?’
মাইকে মাইকে স্বর্গের আহ্বান, আমি চেইন খুলে পথের পাশেই
দাঁড়িয়ে পড়েছি
এস পরিবেশবাদী, নারীবাদী, আর যত বাঁদি-গোলামেরা
আমাকেও ধরে নিয়ে যাও

 

চাবুক

ছেলেটি সেজেছে ঘোড়া, পাটের রশিতে
দীর্ঘাকার লেজ বানিয়েছে
মাঝেমধ্যে চিঁহি চিঁহি ডাকে
মেয়েটি সওয়ারী, হাতে চামড়ার দু’মুখো চাবুক

এ কি সেই ভুলে যাওয়া পৃথিবীর রিচুয়াল,
নাকি নাটকের দৃশ্য কোনো, পুরোটা অলীক?
সময়ে সময়ে দেখি ভূমিকা বদল হয়ে যায়
চাবুক যে হাতে পেলো সে-ই তো পেটায়

 

দোকান

আফা, হামার দোকানে আসিয়েন
সেই হাসিটা আবার হাসিয়েন
কও নাই ‘মোক ভালোবাসিয়েন’
অ্যাকবার ফির দোকানে আসিয়েন
আইতত মোর নিন পাড়া দায়
‘পাগলা’ ডাকিছে গ্রামত সবায়
গাহক আসিয়া ঘুরি ঘুরি যায়
দোকানটা কাঁদে লোহার তালায়
কুন্ঠে করিছেন অ্যালা খরচ-সদাই?
হামার কথাটা, আফা, মনে পড়ে নাই?

 

যদি আমি

যদি আমি কাউরে জিগাই,‘কার বাল ফালাইছো অ্যাতো
লাফখাপ দিয়া?’
সে-ও ঠিক আমারে কইবো,‘কত য্যানো আঁটি বানছেন!’

হাত-জাল না নিয়াই গাঙপাড়ে যাই, মাছের সন্ধানে
আলতা-ফিতার কথা ভুলে
কতবার গেছি আমি সেতারার ঘরে
বুঝি না সিনায় ক্যান কামারের জ্বলন্ত হাতুড়ি
বারবার ঘাই মারে, কী যে আমি চাই!

ব্যাবোদা পোলার মতো মাইর খায়া মাথা নিচু করি
বাইরে সবাই শোনে মিউ মিউ, ভিতরে হালুম
কার লগে খেলি এই চোর-পুলিশের খেলা
টুকি দিয়া কোথায় পলাই?

পিঁয়াজের রস চোখে দিয়া কানছিলা?
জানি, আমারে অতডা ভালো পাও নাই

 

খোসার আড়ালে

খোসার আড়ালে নষ্ট বাদামের মতো
ত্রুটিপূর্ণ ভ্রূণ হয়ে বেরিয়ে এসেছি, এই কথা
চিকিৎসক জানে?
মৃতদের বিদ্যালয়ে পড়ে আমিও শিখেছি
প্রতিটি ঘরেই থাকে দুর্গের ফটক,
সংখ্যাহীন সান্ত্রীর পাহারা
জানালার খড়খড়ি ওঠালেই শুধু
কিছুটা দৃষ্টির সুখ, বাকিটা কল্পনা
স্পর্শের অধিক এই ভ্রম বা ভ্রমণ
শ্রুতির বাইরে সব গান…
এইবার চলো তবে, কু উ ঝিক ঝিক
চলো তবে, মেঘনার ঢেউ
লোকোমোটিভের ধোঁয়া, ছেঁড়া পাল
বিদায়, বিদায়

 

সরদার ফারুক


সরদার ফারুকের জন্ম ১৯৬২ সালের ৯ নভেম্বর। পৈত্রিক নিবাস বরিশালের কাশিপুর। পেশায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নব্বুইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক।
১৯৮০ সাল থেকেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন।
প্রকাশিত কবিতার বই– আনন্দ কোথায় তুমি; পড়ে আছে সমুদ্র গর্জন; উন্মাদ ভূগোল; দীপালি অপেরা; ও সুদূর বীজতলা, মঠের গম্বুজ; দূরের জংশন; অন্যদের তর্কে ঢুকে পড়ি; খেলছে একা নীল বিভঙ্গ; নির্বাচিত কবিতা; গির্জার ঘণ্টার মতো উদাসীন; সিংহাসনের ছায়া; যূথিকা নার্সারি; ওঁ মধু, ওঁ শাশ্বত পরাগ; দিন কাটে পালকের শোকে; দ্বিতীয় সংসার; দাসীর বাজারে; সরদার ফারুকের ১০০ কবিতা

গল্পগ্রন্থ-নোনা শহর

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।