আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

জর্জিয়া

কাকে সে বলতে পারে? ন্যাগ এবং লভিকে বিশ্বাস করা চলে। কিন্তু তার ভয় একমাত্র টেরেন্স। তাই কোরা সিদ্ধান্ত নিল শুধু তাকেই সে বলবে যে এমন ভাবনার কথা তাকে বলেছিল।

কোরা আর দেরী করে নি। সেদিনই সে সিজারকে তার সিদ্ধান্ত জানাল। সে এমনভাবে উত্তর দিল যেন সে নিশ্চিত ছিল কোরা প্রথম দিন থেকেই রাজি। কোরা যেসব কালো মানুষদের চেনেজানে সিজার আদৌ সে রকমটি নয়, একবারে ভিন্ন প্রকৃতির। ভার্জিনিয়ায় এক গরিব বিধবা মিসেস গারনারের ছোট্ট খামারে তার জন্ম। সিজার তার বাবার সাথে সবজি আর আস্তাবল তদারকি করত। আর মা গার্হস্থ্যকর্ম। সেখানে তারা কিছু সবজি চাষ করে তা শহরে বিক্রি করত। মালিকের বাড়ির পিছনে সবজি খেতে নিজস্ব একটা দু’ঘরের কুঁড়ে বেঁধে থাকত তারা। কুঁড়ের বাইরের দিকটা বুলবুল পাখির ডিমের মত সাদা রং করা। এক শে^তাঙ্গের বাড়ির এমন রং দেখে তার মার খুব পছন্দ হয়েছিল।

জীবনের শেষ দিনগুলো শান্তিতে কাটানোই ছিল মিসেস গারনারের ইচ্ছা। আর কিছুই চাওয়ার ছিল না তার। দাস ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি প্রচলিত ধারণা সমর্থন করতেন না বটে; কিন্তু এটা ভাবতেন যে, খারাপ হলেও সমাজের জন্য এ ব্যবস্থার দরকার আছে (নেসেসারি ইভিল)। আফ্রিকানদের তিনি মেধাহীন ভাবতেন। মনে করতেন, দাসত্ব থেকে তাদের স্বাধীনতা দেয়ার ফল হবে মারাত্মক। কীভাবে তারা জীবন নির্বাহ করবে? কেননা তারা তো কিছুই বোঝে না। তাদের পরিচালনার জন্য দরকার জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন সাদা মালিক যারা তাদের পথ দেখাবে, বলবে কখন কোন কাজটা কীভাবে করতে হবে। মিসেস গারনার তার মত করেই তাদের চোখ ফোটাতে চেষ্টা করেন। তিনি তাদের পড়তে শেখান। তিনি বিশ্বাস করতেন, এক আধটু পড়তে শিখলে তারা নিজেরাই ঈশ্বরের বাণী পড়তে শিখে ভাল থাকবে। তিনি তাদের দেশময় ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দিতেন। এজন্য বিশেষ লিখিত অনুমতিপত্র দিতেন তাদের। মিসেস গারনারের এসব কাজ আশপাশের শে^তাঙ্গরা পছন্দ করত না। বরং তারা এর মধ্যে খারাপ কিছুর ভয় করত। তিনি তাদের মুক্তির বিষয়ে উইল করার প্রতিশ্রুতি দেন যে, তার মৃত্যুর পর তারা স্বাধীন হয়ে যাবে। তারাও সে অপেক্ষায় ছিল।

মিসেস গারনারের মৃত্যুর পর তারা গভীর শোক প্রকাশ করে এবং যথারীতি সবজি চাষ অব্যাহত রাখে। তারা প্রতিশ্রুত উইলের অপেক্ষায় রইল। কিন্তু তিনি সে ধরনের কোন উইল করে যান নি। তার এক বোনঝি বোস্টনে থাকত। দ্রুত তার খালার রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে তিনি এক উকিল নিয়োগ করলেন। এটা ছিল সিজার ও তার মা-বাবার জন্য এক ভয়ংকর দিন যখন তিনি একেবারে পুলিশ নিয়ে এসে হাজির হলেন এবং জানালেন তিনি তাদের বিক্রি করে দেবেন। বিক্রি তো করবেনই, তাও আবার দক্ষিণে, যেখানে নির্যাতন আর অপমান অপদস্ত এতই ভয়ংকর যে তার চেয়ে দোজক অনেক ভাল। বিক্রি হবার পর শেকলে বেঁধে তাদের নিয়ে যাওয়া হল দক্ষিণে। বাবা একদিকে, মা আরেক দিকে। ভাগ্যের ভেলায় সিজারের যাত্রা শুরু হল অন্য কোন অজানা গন্তব্যে। বিদায়ের সে সে সময় এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। ব্যাপারির তর সইছিল না। আলাদা করতে তিনজনকেই নির্মম চাবুক কষতে শুরু করে দিল ব্যাপারি। আলাদা করে সে তাদের নিয়ে যাবে। বিক্রি হবার পর পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন করার সময় এমন কান্নাকাটি দেখে দেখে অভ্যস্থ ব্যাপারির মন পাষাণ হয়ে গেছে। ভাল করেই সে শিখেছে কীভাবে কত তাড়াতাড়ি কেনা গোলামদের আলাদা করতে হয় এবং  দ্রুত যাত্রা শুরু করা যায়। মারের চোটে সিজার পিশাব করে ফেলে। বোঝা গেল দক্ষিণের তীব্র শীত সইবার ক্ষমতা এ ছেলের নেই। তাই সাভানায় এক নিলামে তাকে বিক্রি করে দেয় ব্যাপারি। সেখান থেকে ভাগ্য তাকে নিয়ে আসে র্যান্ডাল খামারে। এখানে এসে তার এমন ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা হয়েছে।
“তুই পড়তি জানিস?”
“হু।” সেটা এখানে দেখানো সম্ভব নয়। কিন্তু এই খামার থেকে দূরে কোথাও যেতে পারলে তার এ দুর্লভ সম্পদের ব্যবহার করতে পারবে নিশ্চয়।

দিনের কাজ শেষে তারা স্কুলে বা দুধঘরের পাশে স্কুলে দেখা করে, যখন যেমন সুযোগ পায়। নিজের সব দায়িত্ব কোরা সিজারের উপর নির্ভয়ে অর্পণ করে নিশ্চিত হতে চাইল।
“এই পূর্ণিমায়,” কোরার ইচ্ছা।

সিজার হিসেব করে দেখল। তারপর বলল, বিগ এন্টনীর ঘটনার পর চারদিকে নজরদারি আরও বাড়বে, বিশেষ করে পূর্ণিমায়। কেননা, এ সময়ই পালাতে চেষ্টা করে অনেকে। যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভাল। এবং কাল রাতেই। মোম চাঁদের আলোই যথেষ্ট। গোপন পথের লোকেরা অপেক্ষায় থাকবে তাদের নিয়ে যেতে।

দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড। সিজার এখন ভীষণ ব্যস্ত। জর্জিয়ার এত ভেতরেও তারা আছে? কোরার মনে প্রশ্ন। পালাবার জন্য মন উতলা হয়ে উঠল। নিজের প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। কিন্তু রেলরোডের সে সব লোক কখন কোথা থেকে তাদের নিয়ে যাবে… এসব চিন্তা খেলতে লাগল মাথায়। সময়মত তারা কি সতর্ক করতে পারবে? আগামি রোববার পর্যন্ত খামারের বাইরে যাবার কোন ছুঁতো তার হাতে নেই। সিজার তাকে বলল, তাদের পালাবার পর চারিদিকে এমন তোলপাড় শুরু হবে যে, তারা সবই জেনে যাবে। তাদের আগে থেকে কিছু বলা লাগবে না।

মিসেস গারনার সিজারকে অনেক কিছুই শিখিয়েছিলেন। তারমধ্যে এই আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড একটা। এক শনিবারে তারা পোর্চের সামনে কথা বলছিলেন। ছুটির দিনে সামনের রাস্তায় কিছুলোক হাটাহাটি করছিল। গাড়ি নিয়ে ব্যাপারিরা আর পরিবার নিয়ে অনেকে হেটে বাজারে যাচ্ছিল। দুর্ভাগা গোলামদের একের সাথে আরেকজনকে গলায় গলায় শেকল বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল ব্যাপারিরা। এভাবে শেখল বাঁধা অবস্থায় তাদের হাটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। সিজার যখন তার মালকিনির পায়ে একটা মলম লাগিয়ে দিচ্ছিল তখন এই বিধবা নারী তাকে একটা কাজ শেখাতে চাইলেন। তিনি বললেন, কখনও স্বাধীন হতে পারলে এই দক্ষতা তার খুব কাজে লাগবে। সিজারকে তিনি কাঠের কাজ শেখার জন্য পাশেই এক উদারমনা ইউনিটেরিয়ানের ওয়ার্কশপে শিক্ষানবিশ হিসেবে পাঠান। কাজটা সে ভালই শিখেছিল। মিসেস গারনার তার হাতের কাজের খুব প্রশংসা করেন।

পরবর্তীকালে সিজার কাঠের সুন্দর সুন্দর বাটি, থালা, গামলা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে বেশ ভালই রাজগার করে।

র‍্যান্ডেল প্লান্টেশনে এসেও সিজার কাঠের এই কাজ করতে থাকল। প্রতি রোববার সবজি বিক্রেতা, মেয়ে-দর্জি বা অন্যান্য মজুরদের সাথে সেও তার কাঠের তৈরি জিনিস বেচতে বাজারে যায়। তেমন বেশি কিছু বেচাবিক্রি না হলেও এবং বাজারে যাওয়ার কিছুটা ধকল পোহাতে হলেও কাজটা তার ভাল লাগে। কেননা, উত্তরে থাকতে সে যেমন ঘুরেটুরে বেড়াতে পারত এই বাজারে কিছু কাঠের জিনিস বেচতে যাওয়ার মধ্যে তেমনি এক ধরনের মজা আছে।

এক রোববার একজন তাকে তার দোকানে যেতে আমন্ত্রণ জানান। শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধ লোকটার মাথার চুল সব পেকে সাদা, আর দেহটাও একটু বেঁকে গেছে। তিনি প্রস্তাব করলেন, সিজারের হাতের কাজ তার পছন্দ। তিনি তা কিনতে চান। তাতে দু’জেনেরই কিছু লাভ হবে। সিজার আগে তাকে কালোদের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে। তার সামনে এসে বেশ কিছুক্ষণ সিজারের কাঠের কাজ বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। কিছু কেনেন নি। তাই তার দোকানে যাবার আমন্ত্রণে সিজারের মনে একটু সন্দেহ জাগল। দক্ষিণে বিক্রি হয়ে আসার পর থেকেই সিজারের মন সাদাদের প্রতি সন্দেহপ্রবণ। সাবধান হতে হবে।

লোকটা নানা রকমের মনোহারি জিনিস, শুকনো খাবারদাবার আর কৃষির হালহাতিয়ারের ব্যবসা করেন। দোকানে কোন খরিদ্দার নেই। গলার স্বরটা নিচু করে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি তো পড়তে পার, তাই না?”
“স্যার?” জর্জিয়ান ছেলেদের মত করে সে বলল।
“চৌরাস্তায় আমি তোমাকে বিজ্ঞাপন পড়তে দেখেছি। একটা খবরের কাগজে। একটু সাবধানে থেক। শুধু যে আমার চোখেই বিষয়টা পড়েছে তা তো নয়। অনেকে নজর রাখে।”

মিঃ ফ্লেচার একজন পেনসিলভেনিয়ান। তার স্ত্রীর জেদাজেদিতে পরে তিনি জর্জিয়ায় আসতে বাধ্য হন। স্ত্রী অন্য কোথাও থাকতে চান নি। তার স্ত্রী মনে করতেন এখানকার হাওয়া খুব নির্মল এবং এই আবহাওয়া তার খুব পছন্দ ছিল। এ কথা ঠিক, জর্জিয়ার মৃদুমন্দ হাওয়া উত্তম; কিন্তু এখানে কষ্টের শেষ নেই। ফ্লেচার দাসপ্রথাকে ঘৃণা করেন। যদিও তিনি উত্তরের দাসবিরোধী আন্দোলনে কখনও সক্রিয় অংশ নেন নি, কিন্তু এই ব্যবস্থার ঘৃণ্য রূপটি তিনি দেখেছেন এবং সর্বান্তকরণে এই প্রথার উচ্ছেদ কামনা করেন।

ঝুঁকি হলেও সিজারকে তিনি বিশ্বাস করলেন। সিজারেরও তার উপর বিশ্বাস জন্মাল। এমন কিছু শ্বেতাঙ্গ মানুষকে সিজার আগেও দেখেছে। তাদের একটা ভিন্ন অন্তঃকরণ আছে। তারা যা বলেন তাতে তাদের বিশ্বাস করা যায়। নিজেরা কে কতখানি সত্যবাদী সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু তারা অন্তত পরস্পরকে বিশ্বাস করল।

কথাবার্তা শেষে ফ্লেচার সেদিন সিজারের কাছ থেকে তিনটা গামলা রাখলেন। পরের সপ্তায় আবার আসার কথাও বললেন তিনি। গামলা তিনটে বিক্রি হয় নি বটে, কিন্তু একটা সম্পর্ক তৈরি হল। সিজারের মতে বিষয়টা অনেকটা বেঢপ একটা গাছের টুকরো কুঁদে কুঁদে যেমন যেমন চমৎকার কিছু তৈরি করা যায় তেমনি। এ লোকটার মধ্যে এমন কিছু মানবিক গুণ আছে যা চমৎকার কিছু উপহার দিতে পারে।

রোববারই সবচেয়ে ভাল। এদিন মিসেস ফ্লেচার তার পরিবারের স্বজনদের দেখতে যান। মিঃ ফ্লেচার অবশ্য স্ত্রীপক্ষের কারো সাথে তেমন সম্পর্ক রাখেন না। অনেকটা তারই বেয়াড়া জীবনযাপনের জন্য তারা ফ্লেচারকে তেমন পছন্দ করে না। ফ্লেচার তাকে বলল, “লোকে জানে, জর্জিয়ার এত দক্ষিণে আন্ডারগ্রাউন্ড রেললাইন নেই।” সিজার অবশ্য বিষয়টা জানে। খোদা সহায় হলে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে টহল বা দাস ধরার লোকদের ফাঁকি দিয়ে ভার্জিনিয়া থেকে কেউ বেশ সহজে ডেলাভার বা আরও উত্তরে চেসাপিকে পালাতে পারে। অথবা রহস্যময় আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড ব্যবহার করেও পালানো সম্ভব।

আমেরিকার এ রাজ্যে দাসবিরোধী যে কোন প্রচারপত্র বা সাহিত্যই নিষিদ্ধ। দাসপ্রথা বিরোধী নেতা যারা জর্জিয়া বা ফ্লোরিডায় এসেছিলেন তাদের সবাইকে মেরেধরে জোর করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষিপ্ত লোকজন জড়ো হয়ে তাদের বেদম পিটিয়েছে, চাবুক মেরেছে প্রকাশ্যে, গায়ে আলকাতরা লাগিয়ে দিয়েছে। তুলো সাম্রাজ্যে মেথোডিস্টরাও পাত্তা পায় না। খামারীরা একে রোগব্যাধি বলে গণ্য করে এবং তা সংক্রমণের প্রবল বিরোধী।

যাহোক, একটা স্টেশন এখানে চালু হয়েছে। সিজার যদি কোন রকমে ত্রিশ মাইল পালিয়ে ফ্লেচারের বাড়িতে এসে উঠতে পারে তাহলে তিনি তাকে এই আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড ধরে পালাতে সাহায্য করবেন।
“ক’জনকে সে পলাতে সাহায্য করেচে?” কোরা জানতে চায়।
একজনকেও না। সিজার তা জানে। তার দোকানে বসে সিজার যা শুনেছে তাতে তার বিশ্বাস জন্মেছে যে, পালানো সম্ভব। এসব বিশদ না বলাই ভাল।
“সে আমাদের সাহায্য করবেনে,” কোরার কথা, “করবে, তাই না?”
কোরার হাতটা নিজের বুকে ধরে সিজার তাকে আশ্বস্ত করল। “কাল রাতে”, বলে তাকে চলে যেতে বলল।

শক্তি সঞ্চয়ের জন্য এখন ঘুম বেশি দরকার। কিন্তু বস্তিতে শেষ রাতটা তার কাটল নির্ঘুম। পাশে অন্য মেয়েরা ঘুমাচ্ছে। তাদের নিঃশ্বসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এটা ন্যাগ। ওটা রাইদা। রাইদা প্রতি মিনিটে কেমন একটা উহ্ আহ্ শব্দ করে। আগামি কাল এ সময়ে সে তাদের এমন সঙ্গ পাবে না। মাও কি পালিয়ে যাবার সময় এমনটাই ভেবেছিল? মার কথা কোরার তেমন মনে পড়ে না। শুধু মনে আছে তার বিষণ্ন ভারি মুখটা। এই হব্ তৈরির আগে থেকেই মা এখানে থাকত। দুঃখ তাকে সব সময় তাড়া করত। আর তাই কারো সাথে তেমন মিশত না। কোরার মনেও মার বিশেষ স্মৃতি নেই। কেমন আছে মা এখন? কোথায় আছে? এমন হঠাৎ পালিয়ে গেল কেন? যাবার আগে একবারও আমাকে একটু আদর না করেই চলে যেতে পারল। শেষবারের মত একটু চুমুও দিতে মন চায় নি তার?
আমি কিন্তু মা মনে মনে তোমাকে বিদায় জানিয়ে যাব। তুমি জানতেও পারবে না।
কোরার শেষ দিনটা যেন একটা টানেল খোঁড়ার মতই বিশাল যজ্ঞ। এর শেষে তার মুক্তি!
মুখে কিছু না বলেও সে “বিদায়” বলল। আগের রাতে খাবার পর সে লভির সাথে বসে অনেক কথা বলেছে। জকির জন্মদিনের উৎসবের পর এত কথা আর বলে নি তারা। লভির বন্ধুর দেয়া উপহার নিয়ে কোরা তাকে বলল, “আসলেই মেজর তোকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে রে। তুইও তারে ভালোবাসিস। আমি ঠিকই বুঝি রে। তোকে দেখলিই বুজা যায়।”

কোরা তার শেষ খাবারটুকু না খেয়ে অন্যদেও জন্য রেখে দিল। এখানে কেউ কারো জন্য নিজের অবসর সময় নষ্ট করে না। আজ কোরার মনে অন্য চিন্তা। আর কোনদিন দেখা হবে না। তাই সে সবার সাথে দেখা করে এলো। কিন্তু কাউকেই কিছু বুঝতে দিল না। তাদের কী হবে? সবাই তো পরবাসী। হব্ তাদের এক ধরণের নিরাপত্তা দেয়। কতটুকু নিরাপত্তা? কেমন নিরাপত্তা? অবস্বাভাবিক এক জীবন। মুখে কাষ্টহাসি হেসে, নির্বোধের মত আচরণ করে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়। না হলে বেধড়ক মার খেতে হবে। হবের দেয়ালের চারপাশে পাতা নানা চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের জাল। রাতে হবে থাকা সেসব থেকে কিছুটা নিরাপদ। সাদারা নির্বিচারে ভোগ করে। কিন্তু কালোরাও সুযোগ পেলে তেমনি খাবলে খায়।

দরজার পাশে কোরা তার জিনিসপত্র জড়ো করল। একটা চিরুনি, অনেক বছর আগে তার নানীর চুরি করা একটা রুপোর চৌকো তাবিজ, কিছু নীল পাথর, ন্যাগের কথায় “ইন্ডিয়ান পাথর”। যাবার সময় হল।

দা খানা হাতে নিল কোরা। চকমকি পাথর, কিছু শুকনো খড়। মার মতই সে শালগম তুলে নিল। সে জানে কালই কেউ এ ফালিটুকু দখল করে নেবে। একটা বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলবে যেন মুরগি ঢুকতে না পারে। হয়ত একটা ডগ হাউস। সে কল্পনা করে। হতে পারে কেউ হয়ত সবজি চাষই করবে। কী হবে কে জানে! এই খামারে এই ফালিটুকুই বোধহয় ছিল তার নোঙর। নইলে সে ভেসে যেত জলের  স্রোতে। আজ নিজেই সে নোঙর তুলে ভেসে চলেছে অজানার উদ্দেশে।

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। গ্রাম এখন নীরব নিথর। খামারের পাশে তারা মিলিত হল। শালগমে ভরা বস্তাটা দেখে সিজার একটা ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গি করল, কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। উঁচু উঁচু গাছপালার ভেতর দিয়ে দুজনে চলেছে। কিন্তু অবিবেচকের মত অর্ধেক পথ পর্যন্ত না দৌঁড়ে হেঁটে এলো। মনে ভয়, কেউ বুঝি তাদের পিছু তাড়া করছে। যদিও তেমন কিছু ছিল না। পালানোর ছ’ ঘন্টা পর জানাজানি হল যে, তারা পালিয়েছে। আরও দু’য়েক জন কোথায় তাও জানা যাচ্ছিল না। নিশ্চয়ই তাদের ধরতে এতক্ষণে লোকজন পিছু পিছু ছুটছে। সেই ভয়ে তারা ঊর্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল।

খামার করার জন্য অনুপযুক্ত কাঁদামাটির মাঠ পেরিয়ে তারা গিয়ে পড়ল বিলের মধ্যে। অনেক বছর আগে একবার কোরা আরও নিগ্রো শিশুদের সাথে কালোপানির এই বিলে এসেছিল। তখন সে শুনেছিল, এই বিলে বুনো শুয়োর, আমেরিকান কুমির আর সাঁতার জানা হরিণ আছে। শিকারীরা কুমির, শুকর আর হরিণ শিকার করে। তার কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। শ্যাওলা কারবারিরা সে সব মরা শিকার কুড়িয়ে তার চামড়া খুলে দূরে কোথাও না নিয়ে প্লান্টেশনের গোপন চক্রের কাছে কম দামে বেচে দেয়।

গত কয়েক মাসে সিজার অনেকবারই এখানে শিকারীদের সাথে মাছ বা পশু শিকারে এসেছে। তাই সে জায়গাটা ভালই চেনে। আর শিখেছে শক্ত পিট বা নরম গাঁদের মধ্যে কীভাবে চলতে হয়। কীভাবে লগি ঠুকে বুঝতে হয় কোথায় কত পানি বা মাটি কেমন শক্ত। উলু-খাগড়ার মধ্যেই বা কীভাবে চলতে হয়। বিলের মধ্যে উঁচু জায়গা খুঁজে বের করতেও জেনেছে সে। হাঁটার লাটি ঠুকে অস্পষ্ট স্থান নির্দিষ্ট করতে জানে। একবার তারা শিকার করতে করতে নিচু কুঁড়োর ধড়াফালি দিয়ে পশ্চিমে গিয়েছিল যেখানে বেশ উঁচু একটা দ্বীপের মত জায়গা আছে। শিকারীরা তাকে এই পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিলের শেষ কোথায় তা খুঁজে বের করা। এজন্য তারা এই উঁচু দ্বীপের মত জায়গা থেকে উত্তর-পূর্বে তত দূর পর্যন্ত গিয়েছিল যেখানে বিল শুকিয়ে শেষ হয়েছে। বিকল্প পথ থাকলেও উত্তরে যাওয়ার জন্য পায়ে হাঁটার শক্ত এ সরু পথটা তৈরি হয়ে গেছে।

এ পথ ধরে অল্প কিছু দূর যাবার পর তারা মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে দাঁড়াল। এখন কী হবে? কোরা সিজারের দিকে তাকায়। সিজার তার হাতটা ধরে শোনার চেষ্টা করছে। রাগত কণ্ঠ নয়। তবে কোন মানুষের কথা বটে। গলা শুনে কালপ্রিটটাকে চিনে ফেলল। ফিসফিস করে বলল, “কথা নয়, লভি।”

এমন কথা শোনার পর চুপ করে যাওয়ার মত বুদ্ধি লভির আছে। ফিসফিস করে সে বলল, “আমি বুজতে পারি তোরা কিচু এট্টা করবি। ওর সাথে যেদিন গেলি সেদিন। কথা না বললি কি হবে, আমি বুজে ফেলি। তারপর তুই যকন ফুলো শালগম তুললি তকন বুজলাম তোদের মতলব।” ফিতে দিয়ে বেঁধে পুরনো কাপড়ের একটা থলে তার কাঁধে ঝুলছে।
“তুই আমাদের খতম করবি রে।”
“না, আমিও তোদের সাতে যাব। যিকেন তোরা যাবি, সিকেনে।”
কোরা ভ্রূ কুঁচকালো। তাকে ফিরিয়ে দিলে সে চুপিচুপি ঘরে ঢোকার আগেই ধরা পড়ে যেতে পারে। লভিও নাছোড়বান্দা।
“সে তো তিন জনকে নেবে না।” সিজার বলল।
“আমার কতা জানে?” জিজ্ঞেস করে কোরা।
সিজার মাথা নাড়ে, না।
“তালি, একজনও যা, দুজনও তাই।”
থলেটা তুলে নিয়ে বলল, “অনেক খাবার আছে সাতে।”

সারা রাত সিজার ভাবল। ততক্ষণে তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতে জঞ্জলে হঠাৎ হঠাৎ নানা রকম প্রাণীর শব্দ শুনে লভি চমকে ওঠে। আবার যখন পানি তার মাজা পর্যন্ত ওঠে সে কেঁদে ফেলে। লোভির এসব স্বভাব কোরা জানে। কিন্তু তার পালানোর কারণ সে বুঝে উঠতে পারল না। বোধহয় সবাই দাসত্ব থেকে পালাতে চায়। দিনে রাতে সব সময় তারা পালানোর চিন্তা করে, সুযোগ খোঁজে। মুক্তিই একমাত্র স্বপ্ন সবার। প্রতিটা স্বপ্নই তাদের মুক্তির স্বপ্ন; যদিও সব সময় তা প্রকাশ করে না, করতে পারে না। সুযোগ দেখে লভি তাই হাতছাড়া করে নি; পরিণতি কী হবে কিচ্ছু না ভেবেই।

পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে তারা পশ্চিমের দিকে চলেছে। কোরা ভেবে পায় না সিজার কীভাবে এই রাতে পথ চিনে পানির মধ্য দিয়ে চলছে। সিজার তাকে অবাক করে ঠিকই চলছে। আসলে তার মাথায় একটা ম্যাপ আছে। তাছাড়া, সে শুধু পড়তেই জানে না, আকাশের তারা দেখে দিক ঠিক করে চলতেও জানে।

লভি হা হুতাশ শুরু করল। বিশ্রাম না নেবার জন্য কোরাকে দোষারোপও করতে লাগল। তারা দেখতে চাইল কী নিয়ে তার থলে এত ভারি কেন? দেখা গেল দরকারি কিছুই নেই তার মধ্যে। সে নিয়েছে বাজে কিছু জিনিস যেমন, একটা কাঠের হাঁস আর একটা কাঁচের নীল বোতল। সিজার আসলেই পথ চিনে চলতে খুব ওস্তাদ। তবে সে ঠিক পথেই চলছে কিনা কোরা তা জানে না।

তারা উত্তর-পুব দিকে চলতে শুরু করল। ততক্ষণে সূর্য উঁকি দিচ্ছে আর তারাও বিল পার হয়ে ডাঙ্গায় এসে উঠেছে। কমলা রঙের সূর্যটা যখন উঠছে তখন লভি বলল, “তারা জানে।” তিনজন আবার একটু বিশ্রাম নিল। একটা শালগম কেটে তারা খেয়েও নিল। মশা আর ডাঁশমাছি তাদের অতিষ্ঠ করে তুলল। গায়ে মাটি মেখে তার ওপর চোরাকাঁটা আর লতাপাতা বসিয়ে তারা দিনের বেলা লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করল। এসবে কোরা কিছুই মনে করল না। এই প্রথম সে বাড়ি থেকে এতদূরে কোথাও এসেছে। এখন যদি ধরাও পড়ে আর তাকে নিয়ে শেকলেও বেঁধে রাখে, তারপরও এত দূর আসতে পেরেছে বলে ভাল লাগছে তার।

সিজার মাটিতে তার লাঠি দিয়ে টোঁকা মারার সঙ্গে সঙ্গে তারা আবার চলতে শুরু করল। পরবর্তী স্থানে থেমে সে তাদের বলল, এবার সে একটু গ্রামের রাস্তা রেকি করতে যাবে। ততক্ষণ তাদের এই জঙ্গলে অপেক্ষা করতে হবে। সে খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে, আধা ঘন্টা খানেক। সে ফিরে না এলে কি হবে সে কথা জিজ্ঞেস না করার মত বুদ্ধিটুকু লভির আছে। তবু, তাদের আশ^স্ত করতে সিজার একটু দূরে একটা ঝাউ গাছের নীচে তার ব্যাগ আর পানির মোশকটা রেখে দিল। ফিরে না এলে তারা যেন তাকে উদ্ধারে যায়।
“জানি,” লভি বলল। তারা শুকনো মাটিতে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল।
জকির জন্মদিনের বাকি গল্প বলতে শুরু করল কোরা।
“জানি,” লভি আবার বলে।
“ও বলে, আমার নাকি ভাল ভাগ্য। মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই, তাই।”
“ওসব ভাগ্যির কথা ফেল তো।”
“তোর মা কনে রে?” কোরা জানতে চায়।

লভি ও কোরার মা  র‍্যান্ডেলে আসে যখন লভির মার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। লভির মা জার। জন্মেছিল আফ্রিকায়। মেয়ে এবং তার বন্ধুদের কাছে আফ্রিকায় তার ছেলেবেলার কাহিনি বলতে ভালোবাসত। নদীর ধারে ছোট্ট এক গ্রামে তার জন্ম। সেখানে ছিল কত রকম জন্তুজানোয়ার। তাদের গল্প করত। একবার গাছ থেকে ফল পাড়তে গিয়ে পা হড়কে পড়ে যায়। তাতে তার একটা পা ভেঙে যায়। খুব ব্যথা পেয়েছিল। জায়গাটা ফুলে গিয়েছিল। হাঁটতে খুব কষ্ট হত। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত। শেষ বয়সে শরীরটা বেঁকে যায়। যখন আর কাজ করতে পারত না, তখন খামারে অন্যদের বাচ্চা দেখাশোনা করত। বাচ্চাদের তার কাছে রেখে মায়েরা খামারে কাজে যেত। কষ্ট হলেও সবাইকে খুব আদরযত্ন করত। ফোঁকলা দাঁতে হেসে হেসে বাচ্চাদের আর মেয়েকে গল্প শোনাত। “আমার গর্ব হয়,” বলে লভি পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।

তাড়াতাড়িই ফিরে এলো সিজার। জানাল, রাস্তার খুব কাছাকাছি এসে গেছে তারা। এখনই ভাল সময়। তাড়াতাড়ি যেতে হবে যাতে ঘোড়সওয়াররা এসে পড়ার আগেই এ জায়গা পার হয়ে দূরে চলে যাওয়া যায়। ঘোড়সওয়ারা খানিক বাদেই এসে পড়বে।
“ঘুমোবো কখন?” কোরা জানতে চাইল।
“আগে রাস্তাটা পার হই, পরে দেখবানে।”

রাস্তা পেরিয়ে তারা বেশ দূরে এসে থামল। ব্যাগগুলো মাটিতে নামিয়ে বিশ্রাম নেবে। বেলা যখন প্রায় পড়তে চলেছে। সিজার কোরার ঘুম ভাঙাল। কোরা মড়ার মত ঘুমিয়ে। ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরতে গিয়ে তার শরীরটা বে-মককা ওকের মোটা শেকড়ের ’পর গিয়ে পড়ে; কিন্তু ঘুমে সে একেবারে বেহুঁশ। লভির ঘুম আগেই ভেঙেছে। প্রায় সন্ধ্যা নাগাদ তারা আবার যাত্রা শুরুর আয়োজন করছে। একাটা গেরস্থ বাড়ির পিছনে ভুট্টোর খেত। মালিক ছোট্ট বাড়িটার ভেতর-বাইরের টুকিটাকি কাজ গোছাতে ব্যস্ত। পলাতকরা তাই সেখান থেকে সরে এসে বাড়ির বাতি নেভানো পর্যন্ত অপেক্ষা করল। এখান থেকে মিঃ ফ্লেচারের বাড়ি পর্যন্ত যেতে সবচেয়ে সোজা উপায় মাঠের মধ্য দিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জঙ্গলে চারদিকে আড়াল আছে এমন জায়গায় লুকিয়ে থাকাই ভাল।

কিন্তু শুকরের পাল সব নষ্ট করে দিল। এখানে খাত ধরে যাচ্ছিল একপাল শুকর। গাছের আড়ালে কয়েকজন শে^তাঙ্গ শিকারী এই খাত ধরে তাদের তাড়া করছে। তারা চার জন। শিকারগুলো এই খাতে শুয়ে আছে। শিকারীরা তাদের খুঁজছে। প্রচণ্ড গরম পড়ছে। সন্ধ্যা হয়ে এলো।

পলাতকরাও এক ধরনের শিকার। তবে এতে লাভ অনেক বেশি।

না, কোন ভুল নয়। এরা নিশ্চয়ই পালাচ্ছে। তারা বুঝে ফেলল। তাদের দুজন গিয়ে হামলে পড়ল ছোটটার উপর। জোরে মাটিতে চেপে ধরে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে। এভাবে চলল কিছুক্ষণ। দাস তিনজন মরিয়া তাদের পরাভূত করে পালাতে; শিকারীরাও তাদের পরাভূত করতে প্রাণপণ লড়ছে। উভয় দলের চিৎকার, হুংকার আর আর্তনাদে জঙ্গল প্রকম্পিত। লম্বা দাড়িওয়ালা বিপুলদেহী সবচেয়ে দুর্ধর্ষ লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সিজার মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হল। তুলনায় সিজার অনেক বেশী তরুণ ও শক্তিশালী; কিন্তু লোকটা সিজারকে মাটিতে ফেলে মাজার উপর চড়ে বসল। অনেক বছর আগে একবার এক শ্বেতাঙ্গকে সে কবরখানায় যেভাবে কুস্তি লড়ে প্রায় অসম্ভব এক বিজয় অর্জন করেছিল তেমনি বিক্রমের সাথে লড়াই শুরু করল সিজার। সে জানে, জীবনমরণ এ লড়াই জিততেই হবে। কেননা, এরা ফিরে গিয়ে খবর দিলে কী ভয়ংকর পরিণতি হবে তা ভালই জানে সিজার।

লভি হাউমাউ করে উঠল। দু’জন তাকে জবরদস্তি ধরে নিয়ে গেল অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর। কোরার উপর হামলে পড়ল এক হালকাপাতলা ছোকড়া। এদের কারোর ছেলে বোধহয়। সে কোরার পরণের কাপড় খুলে নিল। তারপর তার নগ্ন বুকে হাত দিতে উদ্যত হতেই কোরার রক্ত মাথায় উঠল। এক রাতে স্মোক হাউসের পিছনে এডওয়ার্ড আর পিট তার উপর যে পাশবিক নির্যাতন করেছিল সে কথা দগদগে ঘা হয়ে আছে তার মনে। সে কথা স্মরণ করতেই নতুন শক্তি পেল কোরা। মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত হল সে। ছোকরাকে আঁচড়ে কামড়ে থাপ্পড় মেরে ফেলে দিল মাটিতে। এমন লড়াই আগে কখনও লড়ে নি কোরা। তার হাত থেকে দা খানা পড়ে গেছে। সেটাই খুব দরকার ছিল এখন। সেটা হাতে থাকলে এখন তাকেও এডওয়ার্ডের মতই কবরে পাঠাতে পারত এতক্ষণে।

ছেলেটা কোরাকে মাটিতে শুইয়ে চেপে ধরে রাখল। কোরা এক ঝটকায় নিচ থেকে উপরে উঠে এলো আর তাকে সজোরে ছুড়ে ফেলে দিল। একটা মোটা গাছে সজোরে ধাক্কা খেয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকল ছোড়াটা। ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে সামলে নিতে চেষ্টা করছে। ঠিক সেই সময় একটা বড় পাথর খণ্ড দিয়ে তাকে আঘাত করল কোরা। আর তাতে টাল সামলাতে না পেরে গিয়ে পড়ল মাটিতে। দ্বিতীয়বার আরও বড় একখণ্ড পাথর দিয়ে সজোরে বদমাশটার মাথায় আঘাত করে মাথার ঘিলু বের করে দিল কোরা। অল্পক্ষণের মধ্যে তার গোঙানি থেমে নিথর দেহটা পড়ে রইল মরা কুকুরের মত।

সিজার কোরার নাম ধরে ডাকল। দাড়িওয়ালা দুর্বৃত্তটা পালিয়েছে। অন্ধকারে যতটুকু দেখতে পেয়েছে তার ভিত্তিতে কোরা দেখালো, “ওই দিকে।”

কোরা তার বান্ধবী লভির জন্য চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আশেপাশে কোথাও নেই। বদমাশরা তাকে কোনদিকে নিয়ে গেছে কে জানে? তাকে রেখে যেতে তার মন চাইছিল না। তবু দ্রæত এ স্থান ত্যাগ না করে উপায় নেই। নিরুপায় কোরা সিজারের কথামতো দৌঁড়ে এগিয়ে চলল।

দৌঁড়ে অনেকটা পথ গিয়ে তারা একটু থামল। অন্ধকারে কোন দিকে তারা ছুটছে তা বোঝার চেষ্টা করছে। কোরা অন্ধকারে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তাছাড়া তার চোখ বেয়ে ঝরছে পানি। এসব ধকল আর লভির জন্য তার কান্না থামছে না। সিজার পানির মোশকটা নিয়ে আসতে পেরেছে বটে; কিন্তু আর কিছুই নিতে পারে নি। লভিকে তারা হারিয়েছে। আকাশের তারা দেখে দেখে সে চেষ্টা করছে যে পথে পলাতকরা পালায় সে পথ খুঁজে সেদিকে যাবার। কয়েক ঘন্টা দু’জনের মধ্যে কোন কথাও হল না। বৃক্ষকাণ্ডের মত বিশাল পরিকল্পনা এখন যেন শাখাপ্রশাখা আর সরু সরু শেকড়ের মত বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। (চলবে)

 

আমিরুল আলম খান 

জন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।