শিউলী জাহানের একগুচ্ছ কবিতা: সম্পর্কগুলো পথ বা নদীর মতো নয়

ফলেন এঞ্জেল

ছায়াপথে চলতে চলতে মানুষেরা একদিন প্রেমহীন হয়ে যায়
নক্ষত্রের সারি ভোরের অপেক্ষায় রাতের সিঁথি কাটে,
তখন জলপাই বনে প্রেমজ শোঁকে মসলার ঝাঁজ ;
অদূরে পদ্মপুকুর, শিশির ভেজা দেহ সাঁতার কাটে না।
গ্রীষ্ম যায়-শরৎ যায়
চোখের পাতায় উল্টে যায় ক্যালেন্ডারের পাতা,
পাথরে পাহাড়ে বেড়ে ওঠে শ্যাওলার ঘ্রাণ;
ঝিনুকের হৃৎপিণ্ডে যদি কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে বালুকণা,
ভালোবাসার মেয়েরা তবু বলে না আর — ভালোবাসি
চাঁদের আলোয় শীতের উল বোনে ব্যস্ত আঙুল;
ছায়াপথে চলতে চলতে মানুষেরা প্রেমহীন হয়ে যায়,
হয়ে যায় ভাস্কর্য — অর্ধশরীরী ফলেন এঞ্জেল।

 

যারা যায় নিঃস্ব করেই যায়

বেলাভূমিতে মুখ ঘষে ঘষে যারা উড়ে যায়
তারা হৃদয়ের পালক ফেলে নিঃস্ব হয়েই যায়।
পালক খোঁজে না পাখি,
পাখিও খোঁজে না তার পালক,
অনিকেত নদীজলে কেবল জেগে থাকে চাঁদের বিস্ময়!
মধু ও মহুয়ার পথ বেয়ে ছায়ারা হেঁটে যায়—
ছায়ারা যেতে যেতে রেখে যায় শঙ্খের শিস,
সূর্যাস্তের বাঁকে পথিক হয়তো ফেরে
পথ— সে কী ফেরে?
পুস্প ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে,
যারা উড়ে যায় তারা নিঃস্ব করেই যায়।

 

অবশিষ্ট

যা কিছু ভেঙে যায়
একসময় ভুলে যায় তার ভেঙে যাওয়ার আদ্রতা,
ভগ্নাংশই তখন পূর্ণ রূপে পৃথিবী দেখে
ডানা-ভাঙা ভাস্কর্য আবার নতুন রূপে পর্যটকের ক্যামেরায়।
এই যেমন, বিগত দিনের যাবতীয় ভাঙচুর শেষে
কবি নির্মাণ করে বৃক্ষগৃহ; সবগুলো জানালায়
পাতার ফাঁক-ফোকরে কিছু রোদের কারুশিল্প নিয়ে;
স্মৃতি যদিও অক্ষর সাজিয়ে যায় নিয়মিত বৃক্ষের বাকলে
পাতায় পাতায়
দৃষ্টির গভীরতায়
কবির আঙুলে —
তাঁর এবং তাদের উপস্থিতিও থাকে
থাকে স্পর্শ, থাকে যৌথ আবেগের ঘন গুচ্ছ, লতা-গুল্ম
একান্তে
সংযমে
আলো-ছায়া বৃক্ষগৃহে
কাদাময় এবং পবিত্র।
আর— এক ফোঁটা অমৃতের মতো
চিরকালীন কিছু প্রতিদিন জমা হয় আমাদের অবশিষ্টে…

 

বোহেমিয়ান সুবাস

ভেবেছিলাম নৈকট্যে রঙ কিছুটা ফিকে হবে
মেঘে ঢাকা সূর্য হলেও ক্লোরোফিলের অভাব হতো না
ভাবনাগুলো ভাবের বদলে কেবল ভুল অঙ্কই কষে গেল।
দরজা জানালা খুলে দিলে
বিন্দু বিন্দু আলোয় রঙের ঘনত্ব বেড়ে গেল—
চোখ সরে গেল চোখ থেকে,
পলকের চঞ্চলতায় আবার উদভ্রান্তি,
আবার অমীমাংসিত কথন ও ক্লান্তি
শীতের শুকনো বাকল ফুঁড়ে সবুজ পাতাদের আশায়
বৃথা হলো সকল জলের সঞ্চয়!
অথচ, ধৈর্যশীল জোনাকিরা কিছুতেই বুঝতে চায় না
বোহেমিয়ান খুশবু একবার যে ধারণ করে
সেখানে পরাজিত হয় হাস্নাহেনার নিজস্ব সুবাস।

 

সম্পর্কগুলো পথ বা নদীর মতো নয়

মানুষের সম্পর্কগুলো হয় খুব হঠাৎ করে
মুখর হলরুমে, বৃষ্টিভেজা দুপুরে, কোনো নির্জন কফি টেবিলে
কিংবা অস্থির জনপদে; মানুষের সম্পর্কগুলো পথ বা নদীর মতো নয় —
জীবনের জটিল সমীকরণে সমান্তরাল হয় না এগিয়ে চলা।

মানুষের সম্পর্কগুলো অনেকটাই আবার ঋতুকালীন
সকল সময় উজ্জ্বল থাকেনা চাঁদ এবং নক্ষত্রেরা; ঘন্টাধ্বনির সাথে
বাঁধা থাকে তার স্থায়িত্বের নোঙর; সবুজ-হলুদ-কমলা পাতার মতো
একসময় ঝরে যায়; আবার শীতনিদ্রায় খোঁজে পুনর্জাগরণ!

পথ কিংবা নদী কিছুটা গন্তব্যহীন গন্তব্যে বয়ে চলে অন্তহীন
তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে জনপদ-শাখাপ্রশাখা মাড়িয়ে নাড়িয়ে,
মানুষের সম্পর্কগুলো কিছুদিন গন্তব্যহীন— উড়ন্ত-ডুবন্ত রঙিন বেলুন
অতঃপর অস্তিত্বের অন্বেষণে খুঁজে নেয় উষ্ণ গৃহকোণ!

 

শিউলী জাহান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবন এবং লেখালেখির জগতে প্রবেশ। জড়িত ছিলেন বেশ কিছু সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকায়। প্রকাশিত হয়েছে দুটি কবিতার বই। সব ধরণের লেখার প্রতি আগ্রহী, যা মনকে আলোড়িত করে। তবে কবিতা লেখা ও পড়ার প্রতি টান প্রবল। প্রকৃতি ও মানুষ তার লেখার মূল বিষয়। বর্তমান নিবাস কানাডার টরন্টো শহরে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।