গুলজারের কবিতা

[গুলজার হিন্দী ও উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কবি এবং সাহিত্যিক। যদিও তাঁকে হিন্দী ছবির গীতিকার, কাহিনীকার, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে দর্শকরা মনে রেখেছে বেশি। কিন্তু তিনি মূলত কবি। আর এই কবি পরিচিতি গুলজারের কাছে বিশেষ কিছু। অষ্টম শ্রেণিতে পড়বার সময় পরিচিত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সাথে। আর তারপর থেকেই বদলে যায় তাঁর জীবনবোধ। নিজে ঈর্ষণীয় পাঠক। নিজের মৌলিক কাজের পাশাপাশি করে চলেছেন ভারতের নানা ভাষার কবিতার অনুবাদ। ন্যজম ছাড়াও লিখে চলেছেন গ্যজল, ত্রিবেণী, গল্প এবং উপন্যাস। গুলজারের ন্যজম বা কবিতার বৈশিষ্ট্য প্রথমত তাঁর পঙক্তি নির্মাণের সারল্যে, দ্বিতীয়ত কবিতার বিষয়বৈচিত্র্যে এবং তৃতীয়ত বিষয় নির্বাচনে। তাঁর কবিতাকে বলা যায় নিরলংকার এবং উনরঞ্জন রূপরেখায় চিত্রিত। বাহুল্যের কোনো চিহ্নমাত্র পাই না আমরা। কবিতার বিষয় তার নিহিত ভাবের সঙ্গে মিলে সরল সৌন্দর্যে স্বরূপে হাজির হয় পাঠকের সামনে। তাঁর কবিতায় আছে সংশয়োত্তীর্ণ বেদনার প্রলেপ, কোমল জিজ্ঞাসা। যেন বিষাদগ্রস্ত আলোচারী পাখি— ফেলে যায় তার অনিবার্য ছায়া, আশ্বাস। তাঁর সাহিত্য কীর্তির জন্যে সম্মানিত হয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা সহ নানাবিধ পুরস্কারে। এখনও সচল তাঁর কলম। পাঠক, এই ন্যজম বা কবিতাগুলো মূল হিন্দী ভাষা থেকে অনূদিত। গুলজারের কবিতাজগতে আপনাদের স্বাগতম।]

জিন্দানামা

লাহোরের গলি পেরিয়ে এক রাতের চাঁদ
জেলখানার উঁচু পাঁচিলে চড়ে,
‘কমান্ডো’র কায়দায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ‘সেল’এর ভেতর,
টু শব্দটি হয় নি,
পাহারাদারদের কেউ জানতেও পারে নি!
‘ফয়েজ’র সাথে দেখা করতে গেছিল, শুনেছি
‘ফয়েজ’কে বলতে, কোনো কবিতা শোনাও,
সময়ের স্পন্দন থেমে আছে!
কিছু বলো,
সময়ের স্পন্দন শুনি!

 

ভিডিও

বয়স যদি একটা স্পুলে লাগানো থাকত—
বা তাকে লাগিয়ে রাখা যেত
আর প্রতিদিনের ছবি সুরক্ষিত থাকত সেখানে
সবই, ওই টেপের ভেতর—

আমি তোমার ব্যথায় দ্বিতীয়বার বাঁচতে গিয়ে,
রোজ ওকে চালিয়ে দিতাম, রিউইন্ড করতাম,
যে বাঁচাটা ছিল বছরের পর বছর ধরে, তাকে নিয়ে
প্রতিরাতে বেঁচে উঠতাম!!

 

সবকিছু তেমনই চলছে

সব কিছু তেমনই চলছে
তুমি থাকতে যেমন চলত সব
রাতও তেমনি মাথা ঝুঁকিয়ে আসে
দিনও তেমন চোখ কচলে জাগে
সারা রাত হাই তুলতে থাকে তারকারাজি
সবকিছু তেমনই চলছে, যেমন চলত তুমি থাকতে
তোমার যাওয়ায় পর যদি
কিছু বদল আসত বেঁচে থাকায়
তৃষ্ণা না জাগত পানির বা, নখগুলো না বেড়ে যেত
না উড়ত হাওয়ায় চুল বা নিঃশ্বাসে উষ্ণতা না থাকত
সবকিছু চলছে আগের মতই…
শুধু এটুকু তফাৎই এসেছে আমার রাতগুলোয়
ঘুম না এলে এখন শোওয়ার আগে
একটা করে ঘুমের ওষুধ রোজ গিলে নিতে হয়!

 

ফুটপাত

এই ফুটপাতে থাকাটা এখন মুশকিলের বন্ধু,
ভাবছি ফুটপাত বদলে নেব
আগের মত শরম-লেহাজ নেই লোকের মধ্যে,
আগের দুনিয়াদারীও নেই!

সেই তো দিন ছিল— আশেপাশের লোকেরা জিজ্ঞেস করত
কেউ না খেয়ে শুয়ে পড়েছে কিনা
এখন তো শুলেই পকেট মার হয়, —
তার ওপর মাথার নিচে রাখলেও
জুতোজোড়া চুরি হয়ে যায়

আমি যখন এ শহরে এসেছিলাম,
আট আনা নিত এ পাড়ার দাদা—
আর দু আনা হপ্তা দিতে হত পুলিশওয়ালাকে
এত ভীড় ছিল না—
ভিক্ষুকদের সংখ্যাও কম ছিল
সবাই কাজ করেই খেত!

কেউ আড়তে কাজ করত, কেউ দোকানদার
কিছু ছিল ইরানী হোটেলের ছেলে,
এসে শুয়ে পড়ত—
ফাউ খেতে চাওয়া নেতার সংখ্যা কম ছিল
আগেকার নেতারা না— ‘বাটা’র জুতোর মত
বছরের পর বছর চালানো যেত,
‘ক্ষমতা’ওয়ালা ছিল সব
এক তুড়িতেই প্রতিপক্ষকে ঢিঁট করতে পারত শালারা—
এখন তো আসে আর যায়!
সব আবর্জনা!!

আমার সময়ে—
মেয়ে-বউদের দেশে রেখে মজদুরি করতে আসত লোকে
কেউ মেয়ে, বুড়িমাকে সাথে করে আসত—
সবাই সম্মানের চোখে দেখত তখন—
কোনো ঝামেলাই ছিল না শালার!

কী না কী হচ্ছে এখন, ছিঃ ছিঃ—
এখন ফুটপাতে থাকাটাও অনেক ঝুঁকির
কতদিন থেকে হিন্দু-মসুলমান দাঙ্গা করানো শুরু হয়ে গ্যাছে
পাড়ার দাদা এসেও ধর্ম কী জানতে চায়
কোন শালা জানে ধর্ম কী?
মনে আছে কি?
কতো করে হলো নিজেদের?

যেদিন থেকে পা কাটা গেল এ্যাক্সিডেন্টে.,
ট্রাকওয়ালা মদ খেয়ে ফুটপাতে ট্রাক উঠিয়ে দিয়েছিল,
মিলের চাকরিটা খোয়া গেল!
তখন থেকে এই নিয়ে
তোয়ালে বেচে ট্যাকসি ধুয়ে দিন পার করি!!

শেষমেষ এই ফুটপাত
ছেড়েই দিল ঝুমরু ল্যাংরা,
চৌপাটির পুল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে
নিজের জীবন দিয়ে দিল সে!

 

সাবেরা তাবাসসুমের পরিচিতি


সাবেরা তাবাসসুম। কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।