সঙ্কটময় সময়ের শিল্প

শিল্প শুধুমাত্র যে আনন্দেরই প্রকাশ তা নয় । যেকোন প্রকাশই আনন্দের, সেটা হতে পারে প্রতিবাদের, হতে পারে বেদনার, যেকোন সংকটের। শিল্পী তাঁর মনোজগতের চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারলে আনন্দ পান। বর্তমান বিশ্ব ভয়াবহ মহামারী কোভিড-১৯’এর কবলে। প্রতিদিন চেনা-অচেনা মানুষের মৃত্যুসংবাদে বিপর্যস্ত মানবজাতি। তবে সুস্থতার হার একেবারে কম নয়। এই সংকটকালীন সময়ে মনে হয়েছে, সংকটে যে শিল্পের সৃষ্টি সেই শিল্পকর্মগুলো নিয়ে ভাবনা আশা জাগাবে মানবের। বিষয়বস্তুর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংকটকে অভিব্যক্তি প্রকাশের দ্বারা শিল্পী শিল্প সৃষ্টি করেন তাঁর নিজস্ব ভাষায়। এর মাধ্যমে তিনি নতুন স্বপ্নও দেখাতে পারেন।

বর্তমানে মানুষের প্রধান অনুষঙ্গ মাস্ক। পর্যটকশূন্য হচ্ছে পর্যটন নগরীগুলো। দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেওয়া পরিবারের ছবিতে মায়ের টেনে নিয়ে যাওয়া স্যুটকেসে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়া শিশুটি। পলিথিনের দেয়াল বা কাচের জানালার ওপর থেকে নানী-দাদীদের আদর পাবার জন্য উৎকণ্ঠিত শিশুরা। ছোট মনে কত কল্পনা, কবে সবার সাথে দেখা হবে, কবে হবে সব স্বাভাবিক! কফিনের সারি হাসপাতাল থেকেই সরাসরি সমাধিস্থলে। কাছের মানুষের শেষ দেখার অনুমতিও নেই। পৃথিবীব্যাপী ডাক্তার, নার্স, আইনরক্ষাকারী বাহিনীর অক্লান্ত চেষ্টা, সচেতন করে তোলার প্রয়াস। এ এমন এক ভাইরাস যাকে খালি চোখে দেখা যায় না, অজান্তেই ঢুকে পড়ছে মানবশরীরে। নিরাপদ দূরত্ব ও সঠিক স্বাস্থ্যবিধির নিয়মই আমাদের সুরক্ষিত করতে পারে এ মহামারী থেকে।

সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই মহামারী বেশ কয়েকবার দেখা দিয়েছে। মৃত্যুতে শূন্য হয়েছে অনেক সভ্যতা। এর কোনটি মানুষের অনবধানতা ও লোভের ফলাফল বা প্রকৃতির খেয়াল। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত বিশটির বেশি মহামারী সংগঠিত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে অসংখ্য মানুষের।

৩০০০ খ্রিস্টপূর্বতে চীনে আদিম যুগের মহামারী

প্রকৃতি আমাদের বারবার সতর্ক করার চেষ্টা করেছে। ভূমিদখলের প্রচেষ্টায় মানুষ রাসায়নিক বিস্ফোরণ সংঘঠিত করছে । অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও জীবনব্যবস্থা সৃষ্টি করে মহামারী। যার বাহক মানুষ অথবা প্রাণী। সুস্থ জীবন ও সুস্থ পরিবেশই পারে সুস্থ পৃথিবী দিতে।

ইতিহাসের মহামারীগুলোর অনেক ভয়াবহ আবহ দেখি। যার সব ছবি হয়তো আমরা দেখতে পাইনি, কিন্তু অনেক স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে কঙ্কালের পর কঙ্কালের অবস্থান দেখে বোঝা যায় মহামারীর ভয়াবহতা। উপরোক্ত ছবির মতো গণকবর বিভিন্ন মহামারী ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ের বাস্তব উদাহরণ।

দুর্যোগ, মহামারী, শিল্পীদের মনে ও কর্মজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। সংকট তাদের ভাবিয়ে তোলে। কিভাবে আবার স্বপ্ন দেখা যায়, সেসব বিষয়ও তাঁদের ছবি হয়ে ওঠে। বিশ্বের সেরকমই কিছু শিল্পকর্মের দিকে আলোকপাত করতে চাই।

পিটার ব্রুগেল “ট্রায়াম্ফ অব ডেথ”

“ট্রায়াম্ফ অব ডেথ” (১৫৬২-৬৩) পিটার ব্রুগেল-এর ১১৭ সেমি x ১৬২ সেমির দীর্ঘ তৈলচিত্রটি বর্তমানে মাদ্রিদের প্রাদ ন্যাশনাল মিউজিয়ামে ১৮৬৭ সাল থেকে সংরক্ষিত। পিটার ব্রুগেল দ্যা এলডার একজন বিখ্যাত ডাচ শিল্পী। যিনি প্রধানত প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং কৃষকদের জীবনের ছবি আঁকতেন। বিশাল আকৃতির ছবিগুলো ছিল বর্ণনাধর্মী এবং বার্ডস আই ভিউ পরিপ্রেক্ষিতের। শুধুমাত্র জীবনের ছবি নয় বিভিন্ন প্রবাদ নিয়েও কাজ করতেন তিনি। এই চিত্রটিতে তৎকালীন সময়ে ইউরোপে সংঘঠিত প্লেগ মহামারীর মৃত্যু যন্ত্রণার ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। চার্চের প্রার্থনা থামাতে পারছে না প্লেগ, থামাতে পারছে না মৃত্যু। ছবিতে প্রস্ফুটিত জীবনের কোন কিছু দেখা যাচ্ছে না, সর্বত্র মৃত্যুর হাহাকার। ছবির পশ্চাদ্ভূমিতে দেখা যাচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা, বিরানভূমি, দূরের সমুদ্রজাহাজ। কঙ্কালসার সেনাবাহিনী সমস্ত কিছুকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেবার চেষ্টায় রত। কঙ্কালকর্তৃক পাতাবিহিন গাছগুলোকেও উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা। জীবনের সকল অস্তিত্বই যেন বিলীন । গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি অথবা আত্মহত্যার দৃশ্য। কঙ্কালসার কুকুর দ্বারা মৃতদেহ ভক্ষণের চিত্র দৃশ্যমান। অশুভ প্রতীক হিসেবে আছে ঘোড়ার পিঠে কাক। ছবির মাঝখানে জমে থাকা পানিতে মৃত মাছের এবং ভেসে ওঠা মৃত মানবের শরীর। সম্মুখে ডানদিকে ঘোড়ার গাড়ি ভর্তি মানুষের মাথার খুলি। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী, পেশার মানুষ, কৃষক, সৈনিক, সন্মানিত ব্যক্তি, সকলেরই অস্থির জীবন। কঙ্কালের দলেরা বেঁচে থাকা মানুষদের নিয়ে যেতে চায় মৃত্যুর বিভীষিকাময় জগতে। দমবন্ধ হবার মত এই ছবিটির মধ্যেও সর্বডানে যুগলের বাদ্যযন্ত্রের সুর হয়তো ভবিষ্যতের সুন্দর দিনের স্বপ্ন দেখায়।

পিটার ব্রুগেলের মতোই প্লেগ মহামারী নিয়ে কাজ করেছেন ফরাসি ব্যারক শিল্পী নিকোলাস পুসিন (১৫৯৪- ১৬৬৫)। ১৪৮ সেমি x ১৯৮ সেমি আয়তনের এই চিত্রটির নাম ”দি প্লেগ অব অ্যাসদদ” (১৬৩০-১৬৩১)। এটি একটি কমিশন ওয়ার্ক। এই তৈলচিত্রটি ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। চিত্রটির অনেকগুলো ভার্সন পরবর্তীতে তেলরঙ ও ছাপচিত্র মাধ্যমে আঁকা হয়েছে। গ্রীক স্থাপত্য সম্বলিত শহরে পথের মাঝে প্লেগ আক্রান্ত মায়ের মৃত্যুর কারণে মাতৃদুগ্ধ পানরত শিশুটির অসহায় দৃষ্টি, উদ্বিগ্ন চেহারা নাটকীয় আবহের সৃষ্টি করেছে। শিশুটির বাবা শিশুটিকে সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মৃতদেহকে স্পর্শ না করবার জন্য অনুনয় করছে। স্থবির শহরের এদৃশ্যে দূরে আরো মৃতদেহ সরানোর প্রচেষ্টা। সমগ্র চিত্রপটে মনোজাগতিক অস্থিরতার স্পষ্ট প্রকাশ।

নিকোলাস পুসিন-এর “দি প্লেগ অব অ্যাসদদ”

উপরোক্ত ছবিটির সাথে আমরা যদি জয়নুল আবেদিনের (১৯১৪-১৯৭৬) আঁকা ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় মায়ের মৃতদেহের পাশে চিৎকাররত অসহায় শিশুটির অসহায়ত্বের সাদৃশ্য বোঝার চেষ্টা করি তাহলে দুটো চিত্রেরই মানসিক ক্ষরণ এক। ১৯৪৩-এ  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে পৃথিবী। ভারতবর্ষে এর পূর্ববর্তী বছরে ব্রাউন স্পোর্ট ব্যাকটেরিয়ায় ধানের ফলন কম হয়। এবং ১৯৪২-এর ঘূর্ণিঝড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তৎকালীন সময় ভারতবর্ষের বেশিরভাগ চাল চলে যেত ইংল্যান্ডে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সাধারণ মানুষের কাছে খাদ্যের জোগান বন্ধ করে দেন ,নদীপথে নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। তার নির্দেশে চালের গুদামে আগুন দেওয়া হয়। গ্রামে খাদ্যের জোগান না থাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ শহরে চলে আসে। খাবারের অভাবে কলকাতা শহরের রাস্তায় দেখা যায় মৃতদেহের স্তূপ। বাংলার এই দুর্ভিক্ষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি মানবসৃষ্ট কলঙ্কজনক অধ্যায়।

জয়নুল আবেদিন-এর “দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা”

সোমনাথ হোড় (১৯২১-২০০৬), চিত্তপ্রসাদ (১৯১৫-১৯৭৮), জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা ও ছাপচিত্রগুলো দুর্ভিক্ষের ঐতিহাসিক দলিল  ও সাক্ষী। পিকাসোর গোয়ের্নিকা, আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি, জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি” যুদ্ধের বিভীষিকা ও মানবিক বিপর্যস্ততার এক একটি দৃষ্টান্ত। ফ্রান্সিসকো গয়া’র (১৭৪৬-১৮২৮) চিত্রমালার মধ্যেও আমরা গৃহযুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের ফলাফল দেখতে পাই। যেখানে হতাশা, হানাহানিপূর্ণ পৃথিবী আর শাসকের শোষণ পর্ব।

অপরদিকে শিল্পী এস, এম, সুলতানের (১৯২৩-১৯৯৪) ১৯৭৬-এ আঁকা ‘চর দখল’ তৈলচিত্র প্রতিবাদী মানবের কথা বলে। সময় ও রাষ্ট্রের অশুভ নিয়মের বিরুদ্ধে সুঠামদেহী কৃষক-কৃষাণী স্বপ্ন দেখতে চায়। যে কোন বিপর্যয়ে শিল্পীরা মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি দেয়।

এস এম সুলতান-এর “চর দখল”

১৯১৮-১৯১৯-এর স্প্যানিশ ফ্লুতে (Flu) আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বিশ্বের পাঁচ কোটি মানুষ। বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান চিত্র শিল্পী গুস্তাভ ক্লিমট (১৮৬২-১৯১৮) মৃত্যুবরণ করেন মহামারিতে।  ক্লিমট-এর স্বনামধন্য ছাত্র ইগন সিলি (১৮৯০-১৯১৮) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে প্রিয় শিক্ষকের প্রতিকৃতি অংকন করেছিলেন। ইগনের আঁকা শেষ ছবি “দি ফ্যামিলি” (১৯১৮)। ছবিটিতে যে পরিবারটি দেখা যায় এটি ছিল ভবিষ্যৎ কল্পনার রূপ। ছবিটি শেষ হবার মাত্র তিনদিন আগে ইগনের স্ত্রী ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মারা যান স্প্যানিশ ফ্লুতে। সেই সাথে মারা যায়  তাদের অনাগত শিশু ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন । ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কিছুদিন পর স্প্যানিশ ফ্লুর লক্ষণ নিয়ে  মাত্র আঠাশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন শিল্পী ইগন সিলিও। মহামারিতে এভাবেই অনেক প্রতিভা অকালে হারিয়ে গেছে জীবনের গল্প থেকে। তাঁদের শিল্পকর্মগুলো জগতের অমূল্য সম্পদ।

এগন সিলির “গুস্তাভ ক্লিমট এট হিজ ডেথ বেড” এবং “দি ফ্যামিলি”

নরওয়েজিয়ান শিল্পী এডওয়ার্ড মুঙ্খ (১৮৬৩-১৯৪৪)-এর অধিকাংশ চিত্রের বিষয়বস্তুতে হতাশা, অনিশ্চয়তা,হাহাকার।  অল্প বয়সে যক্ষ্মা হওয়াতে মুঙ্খ ছিলেন ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের অধিকারী। স্প্যানিশ ফ্লু আক্রান্ত করেছিল কালজয়ী এই শিল্পীকেও। সেই সময়ে দুইটি আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কনের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন এই রোগের ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়কে। প্রথম চিত্রটি হল “সেলফ পোট্রেট অন স্প্যানিশ ফ্লু” (১৯১৯)।

যে  চিত্রটিতে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই ফ্লু সম্পর্কে। তিনি কিভাবে অতিবাহিত করেছিলেন  সেই সময়কে এটি তার একটি বাস্তব উদাহরণ যেন। শ্বাসকষ্ট ,মানসিক অবসাদ ও দুর্বলতা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এখানে। চেয়ারে উপবিষ্ট শিল্পী, তার চারপাশে হলুদাভ রঙের ব্যবহার। ভেতরের অগোছালো রূপটিকেই প্রকাশ করেছেন ছবির কম্পোজিশন ও রঙের ব্যবহারে। বেদনাতুর সময়ের ছায়া অবলোকন করা যায় চিত্রটিতে। দ্বিতীয় যে চিত্র “সেলফ পোট্রেট আফটার স্প্যানিশ ফ্লু” সেটি স্প্যানিশ ফ্লু পরবর্তী আত্মপ্রতিকৃতি। এখানে মুঙ্খকে দণ্ডায়মান দেখা গেলেও যথেষ্ট দুর্বল, শক্তিহীন মনে হচ্ছে। স্থির অবয়বে কঠিন সময়কে জয় করে ফেরার, ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। এই চিত্রটিতে সবুজের আধিক্য নতুন জীবনের রঙের কথা বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল এই স্প্যানিশ ফ্লু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও স্প্যানিশ ফ্লুতে বিপর্যস্ত সময়ে চিত্রকলার আরেকটি ইজমের সূচনা হয়েছিল দাদাইজম (১৯১৬-১৯২৩) নামে। সমস্ত যুক্তি, নিয়ম, নন্দনতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের বাইরে গিয়ে শিল্পীরা তাঁদের প্রকাশ করছিলেন এলোমেলো শব্দ, কবিতা ও চিত্রের মাধ্যমে।  যেখানে যুদ্ধের বিভীষিকা ও অর্থহীন জীবনের কথাই প্রধান।

এডওয়ার্ড মুঙ্খ-এর “সেলফ পোট্রেট উইথ স্প্যানিশ ফ্লু” এবং “সেলফ পোট্রেট আফটার স্প্যানিশ ফ্লু”

বর্তমানে যে সময়টাতে আমরা বসবাস করছি, সেটি আমেরিকান বিখ্যাত শিল্পী এডওয়ার্ড হপারের ( ১৮৮২-১৯৬৭) এঁকে যাওয়া সময় বলে মনে হয়, যেখানে একাকিত্বভরা জীবন। এই কঠিন সময়েরই প্রতিচ্ছবি যেন প্রতিফলিত হয়েছে “দি মর্নিং সান” (১৯৫২) ছবিতে।

এডওয়ার্ড হপার “মর্নিং সান”

শিল্প সময়ের প্রতিচ্ছবি। একে এড়িয়ে যাবার কোন পথ নেই। মূর্ত বা বিমূর্ত চিন্তাও চেতনায় ধরা দেবে তার নিজস্ব ভাষায়। সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষরণগুলো ব্যক্তি শিল্পীর কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলবেই । এজন্যই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধের ভয়াবহতা, মহামারী প্রভৃতি শিল্পসাহিত্যের বিষয় হিসেবে বারবার এসেছে। ইউরোপের মধ্যযুগের চিত্রমালাতে অশুভ শক্তিরূপে এসেছে ভূতপ্রেতসদৃশ উপস্থাপন অথবা অশুভ প্রাণীর অবয়ব। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও রাজনৈতিক ভূমিদখল প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে লুণ্ঠন করবার প্রবণতা বৃদ্ধি করেছে । মানুষ এক দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্যদেশে পৌঁছেছে তেমনি বিভিন্ন সময়ে সাথে নিয়ে গেছে এক এলাকার সংঘঠিত ছোঁয়াচে রোগ। প্লেগ, কলেরা, কালাজ্বর, এভাবেই  সীমানা পেরিয়ে আরেক অঞ্চলে পৌঁছেছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে মহামারি। বিজ্ঞানের আবিষ্কার, মানুষের প্রচেষ্টায়  আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে জগত। সুস্থ ও সৃষ্টিশীল সময়ে ফিরেছে।  কিন্তু অস্থির সময়ের ছাপ রয়ে গেছে শিল্পকলায়, সামাজিক, রাজনৈতিক অঙ্গনে । আদিম যুগের শিল্পকলায় খাদ্য আহরণের প্রক্রিয়ার সাথে যাদু বা ধর্মীয় আচারের যোগ আছে । শিল্প শুধু মানসিক শান্তির জন্য নয় মানসিক প্রয়োজনেরও। বিপন্ন সময়, মহামারী, যুদ্ধ, সমাজের অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষরণের চিত্র এবং সেই সাথে বিভিন্ন ইজমের সৃষ্টির কারণে কালোত্তীর্ণ শিল্পীদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে মানবের ইতিহাসচিত্র সহজে বুঝে নিতে পারি। এক্সপ্রেসনিজম ,দাদাইজম এসেছে সময়ের দাবিতে। শিল্পকর্মের মাধ্যমে তাঁরা প্রকাশ করেছেন তাঁদের ক্ষরণকে। পৃথিবী পেয়েছে পিটার ব্রুগেল, গয়্যা, এডওয়ার্ড মুঙ্খ, ক্যাথে কোলরিজ, ইগন সিলি, চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোড়, জয়নুল আবেদিন, এস, এম, সুলতান, এডওয়ার্ড হপার, ডেভিড হকনিসহ অজস্র কালজয়ী শিল্পীকে।

ডেভিড হকনি “স্প্রিং”

বিখ্যাত ব্রিটিশ শিল্পী ডেভিড হকনি (জন্ম-১৯৩৭) দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ । যুক্ত ছিলেন পপ আর্ট মুভমেন্টের  সাথে। তিরাশি বছর বয়সেও তিনি কঠিন সময়কে অতিক্রম করার জন্য অনুপ্রেরণামুলক কাজ করে চলেছেন। তিনি বলছেন,” We need art, and I do think it can relieve stress. What is stress? Its worrying about something in the future. Art is now.’

তবুও আগামী কয়েক বছর কোভিড-১৯’এর প্রভাবে আমাদের স্বাভাবিক শিল্পচর্চার গ্যালারী, স্টুডিও  শিল্প, নিও নর্মাল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। পড়াশোনা, অফিস, অনলাইন প্রদর্শনী, ই-কমার্স উত্তরোত্তর উন্নয়নের আরেকটি দ্বার খুলে দিচ্ছে । যারা এ দৌড়ে পেরে উঠছে না তারা পিছেয়ে পড়ছে। চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়াবার। পৃথিবী আমাদের বরাবরই বিপন্ন সময়ের পর নতুন রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পথ দেখিয়েছে। এটাই জীবনের ধর্ম। করোনাকালীন এ  সময় একান্ত নিজের ভাবনাকে ভাবার অবকাশ তৈরি করে দিয়ে অন্তরাত্মাকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় দিয়েছে। পৃথিবী  প্রকৃতি ও বাতাসের বিষাক্ত অধ্যায়কে সুস্থ  করে তুলবার চেষ্টায় রত। আকাশ  নির্মল, ঝলমলে হয়ে উঠেছে। এই সংকটকালীন সময়ের আঁতুড়ঘরেই হয়তো জন্ম হচ্ছে আরও কালজয়ী শিল্পকর্ম। নবজাগরণের প্রত্যাশী মানবকুল।

কঠিন এই সময়কে অতিক্রম করে আবার আলোকিত সময়ের, স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখবে মানবজাতি। দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সংকটকাল কাটিয়ে নবজাগরণ প্রত্যাশী আজ মানবজগত।

 

 সান্ত্বনা শাহরিণ

আমার জন্ম যশোরে ১৯৮৩ সালে। ছোটবেলা থেকেই আমি ছবি আঁকার সাথে সম্পর্কিত ছিলাম যশোর চারুপীঠের  সঙ্গে।

লেখাপড়া এস,এস,সি গভঃ গার্লস হাই স্কুল যশোর। এইচ, এস, সি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ যশোর। বি, এফ, এ এবং এম, এফ, এ বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন, ভারত থেকে। বর্তমানে আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপচিত্র ডিসিপ্লিনে প্রভাষক হিসাবে কর্মরত। দীর্ঘ সময় ধরে চিত্রকলার সাথে আমি যুক্ত। এবং বর্ণিকা আর্ট স্টুডিওর একজন ফাউন্ডার মেম্বার  ও শিল্পকলার  বিভিন্ন ধারার কাজের সাথে সংযুক্ত।

স্টুডিও:

বর্ণিকা আর্ট স্টুডিও

পালবাড়ি মোড়, গাজীর ঘাট রোড, যশোর।

E-mail –[email protected]

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।