অনিকেশ দাশগুপ্ত’র একগুচ্ছ কবিতা

যুদ্ধ বিরতির আগে

দীর্ঘ ট্রামের সারি
কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে হলুদ বাতাসা—
খই ছুঁড়ে দিচ্ছে কেউ;
টেরেসের দিকে উঠে যাচ্ছে শীতার্ত বিরতি
হাইড্রাঞ্জিয়া— আমাদের সাদা বিস্তৃত রুমাল…
নাকে চেপে ধরো, ক্ষীণ দীর্ঘশ্বাসের সুতো ধ’রে।
খর মোমবাতি জ্বেলে সেই সুতো পার হবে তুমি
এখন দীর্ঘ ট্রাম
ঠান্ডা স্মারকের মতন
তোমার স্মরণাতীত কালের ট্রামে ঝুলে আছে
মানোত্তীর্ণ জুঁইফুল আর
ফরাশ বিছানো সাদা রেল
এখন গম্বুজের খিন্ন বাতাসে এই আধবোজা শহর –
ওয়াচ-টাওয়ারের গাঢ় হলুদ বাতি ।

বিস্তীর্ণ বহুতলে রক্ত ঠিকরে ওঠে
রক্ত না— চেনার রাতে ।

 

আয়োজন

ক্রমশ ফ্যাকাসে অথচ সচেতন ক্রুশ
রৌদ্র পরবর্তী এই ঘরে
অন্তর্লীন চাকা দুটি সমান তালে পা ফেলে
তীব্র ঝিঁঝিঁ ডেকে ওঠে উষ্ণ সকল উৎসে
এই সভা ,অধিষ্ঠিত মোম রং,সপার্ষদ আয়োজন
এর জন্যেই একেকটা গাছে ঘেরা রাস্তা
কাঠের বিক্ষেপ সহ
যেখানে নাগরিক গান বাজে
নৃত্যের মহড়া ভেবে প্রতিধ্বনি জড়ো হয়
দু’চারটে তাৎক্ষণিক বেড়াল নরম ঝোপের ভেতর
নখ আঁচড়ে মহৎ ভাষায় লোহার শেকল দেখে
সবুজ অনেক থামে বাদামী ইটে ভ’রা জটিল স্তব্ধতা
একটা ঘোর, দিনের সমস্ত হলুদ নিয়ে বিস্তৃত
এই চারকোনা বোর্ডে অনুকরণ করে প্রথম সাজঘর
সচকিত একটা যন্ত্রেই নানান স্বরলিপির সাদৃশ্য থাকে ।

 

মহানগরে প্রথম রাত

নীল আর্চের ওপার থেকে এগিয়ে আসে
অগণিত হেলমেটের ফ্ল্যাশে রৌদ্রোজ্জ্বল এক পথ
মায়াবী ঘোড়ার এই সজাগ অস্তিত্বে
আমরা একে অপরকে বিপ্লব ও ধূর্ততা বিষয়ে
আবেদন জানাই…
অশ্বারোহী সৈন্যদলের কুচকাওয়াজের পর
ফুটপাথে অত্যন্ত সুস্থির স্মৃতিহীন ধুলো
মালি,সহিস; ঋণমুক্ত শুঁড়িঘরে
আরও অনেক পরিচিত কন্ঠস্বর
প্রতিশ্রুত পশরা সাজিয়ে রাখে—
উৎসবমুখর বিকেল ফুরোয়
ঝকমকে রাংতায় ঢাকা ফুলদানি
নিজের সুস্বাদু উজ্জ্বলতায় অবাক হয়…

দিনের শেষে

আরক্ত রং লেগে উজ্জ্বল মার্বেল টপ টেবিলে
ঘুম ও গর্জন জড়ো হয়
টিলার ওপারে ব্যারাকে শুশ্রুষার জন্য সাদা ফটফটে
বিছানা ,তোমার নামও উচ্চারিত হবে ধর্মোপদেশের শেষে
যখন হথর্ন ফুলের ঝোপ থেকে কপিশ মানুষেরা
মাছের ঘাই দ্যাখে,শান্ত রঙের মজলিশে একাকী প্রেমিক
বইয়ের মার্কারগুলি ছিঁড়ে ফ্যালে একঝাঁক বেড়ালের উদ্দেশ্যে
কুয়োর পরিধি বরাবর আমাদের সাইকেল বেড়েছে
একটা প্রশস্ত গেট না খোলার জন্য চাবি হাতে
এগিয়ে আসে কা’রা
তেষ্টা— ফোয়ারা— পুষ্পাকীর্ণ বেড়াগুলি উপেক্ষা ক’রে—

পাকদণ্ডী বেয়ে মায়েরা চলেছে শান্তি স্বস্ত্যয়নে
ময়রানীটি ম্যাজেন্টা শিরায় ছানার গোলা ছাড়তেই
আগুনের বল আমাদের ঘাড়ের পেছনে
বুটিক ডানা মেলে ওড়ে,উড়েছে …

 

স্বাধীনতার পরের রাত

আলো কাটা অক্ষরের কথা ভাবো
কত সূক্ষ্ম ভাবে একটা জ্যামিতিক কাঁচ এসবে ছিল
আলোয়ান চাপিয়ে কারা ময়দার প্রজ্জ্বলন দেখতে আসে
ঘাসের জ্যা নিয়ে ভাবতে ভাবতে
শেকড় শুদ্ধ বীজ নষ্ট করার আগে লাইটহাউসের কাছে
একটা বৃহৎ জাহাজ পৌঁছে দেওয়া হবে
যেন এই শহরেই নাবিকের মহানির্বাণ…
সান্ত্রীর জন্য অন্ধকার আর ক্যাফের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে
ঘোড়সওয়ার – লন্ঠন হাতে এগিয়ে আসে
যেহেতু নরম অর্বুদে ঢাকা পড়েছে শিবিরভর্তি হলুদ চোখ
বালিনদীর কাছে এই আমাদের শেষ রাত
ক্যাভালরি থেকে তৃণক্ষেত্রের দিকে
ঝকঝকে শিরস্ত্রাণের এই বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ…

 

অনিকেশ দাশগুপ্ত

জন্ম: ১২ অক্টোবর ১৯৮৭
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণীবিদ্যায় স্নাতকোত্তর।
বর্তমানে মালদা জেলায় সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান শিক্ষক। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রথম সারির ওয়েবম্যাগ ও লিটিল ম্যাগে নিয়মিত লেখালিখি। কাব্যগ্রন্থ নেই।
ইমেইল : [email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।