লুৎফুল হোসেনের তিনটি কবিতা

মন-তৈজসে

তখন পাপড়িগুলো খুলতে খুলতে
শূন্য গোলাপ একের পর এক
নরম তুলোর মেঘের শরীর
তুলে এনে বিছিয়ে দিই
জেট ব্ল্যাক মার্বেল ডিসেকশন টেবিলে
ধারালো ছুরির নিচে

ভ্যানিলা ক্রিম কেকের মতন
কাটি তাকে ফালি ফালি করে
জলের বিবর ছেনে দেখি
কোন জৈবিক নিয়ম খেলা করে
কতটা বেদনার্ত বৃষ্টির শিরোনামে
বিন্দু বিন্দু তার রক্তপাত ঝরে

বারবিকিউ স্টিকে গাঁথা
ঝলসানো স্তনের মিনার
বাদামি বৃন্ত তার মিলায় কিনা
মলিন ভস্মের আঁধার শরীরে
চারকোল ক্রোধের বাতি নিভিয়ে
মৃগনাভি পোড়ে নাকি পাতার আগুনে

সুগন্ধি লোপাট হলে
চুম্বন জোটে কিনা প্রেম তৃষিত
ওষ্ঠাধরের প্রপাত অবগাহন নাব্য ভ্রমণে
সঙ্গমের নামে দুর্গম হয়ে ওঠে কিনা
ভালোবাসার সর্বনামগুলো
অভিমান সমান নৈঃশব্দ্য ঘিরে

 

যুগল জোছনায়

সঙ্গ-নিরোধের অবরোধও পারেনি ঠেকাতে
অন্তর্গত প্লাবন জলের ঢেউ
নিঃশব্দ সখ্যে জেগে থাকা নির্ঘুম চোখে
প্রতিক্ষণ স্পর্শের সুবাস খুঁজে ফেরে কেউ

বৈরি বাতাসের বিপরীত বসন্তে
নিস্তরঙ্গ সময়ের গায়
থোকা থোকা ফুল ফুটিয়ে
নির্বাক বৃক্ষেরা যেভাবে হিম তাড়ায়

দোলনায় ঝুলে থাকা যুগল পায়ের
উপমায় দোদুল্যমান বোগেনভিলিয়া
অনবধানে যেভাবে তড়পায়
পালে হাওয়া তুলে পাটাতন নাচায়

চৌকাঠের গায়ে সময় সন্ধি খুলে
স্মৃতির বুনন মেলে জীবন নকশি-পাতায়
পাথুরে মেঝেও বুঝি অনায়াসে
তিরতির পদ্ম জলের ঢেউ ছুঁয়ে যায়

এ দহন দিনের ত্রস্ত সীমানায়
বলো অনিন্দিতা-ইচ্ছেরা তোমার
ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়
সাধের কোন দুর্বোধ্য অচেনায়

পাতন-সিদ্ধ

হাউই ওড়াতে ওড়াতে
আগুন সখ্যে আঙুলে পড়েছে ফোস্কা
অমায়িক জল-বালিশগুলো
সময়ের ঘুড়ি হয়ে
দিনে দিনে বোধহীন পাথুরে কর
জোনাকির মোলায়েম স্পর্শে
করতল দেয় না জানান আর
অনুভূতির পূর্বাপর

জমিনে সরিষা ফুল
বুকে ফুটে থাকে রোদ
চুম্বনের কাঁটাঝোপ
জলের প্রলেপ দিলে
শালুক গন্ধ রন্ধ্রে খেলা করে জোর
শীত রাত পার হলে শিশির-সঞ্চয়ে
ওমের চাদর বিছিয়ে আসে ভোর
জোড়া সূর্যের উপত্যকায়
নাক ডুবিয়ে দুচোখ তখনও
আধো নিদ্রায় নেশামগ্ন স্বপ্ন চূড়

রোজ রাতে প্রখর ঝড়ের মতো
নিদ্রা সন্ধানী প্রহর
তুমুল ভাঙতে থাকে চোখ
ইন্দ্রিয়ের পরতে পরতে
জমানো তৃষ্ণার অসুখ
নেশার আব্রু ছিঁড়েখুঁড়ে
তলানিতে জমায় বিন্দু বিন্দু সুখ
রোদের প্রশ্রয়ে
সাপ হয়ে ওঠা লতাগুল্মের দিন
ফুরোলে সকলই হয়তো
মিয়ানো লজ্জাবতী-লাজুক
অনাপসী পরিকীর্ণ জীবন বিমুখ

শূন্য পেয়ালা উদগ্রীব মুঠোবন্দি
তবু ফুরায় না কাঙ্ক্ষার জলসিঞ্চন
একবার বাষ্প করে তারে
ফের জল ফের মেঘ জমে জমে
হিমাঙ্কে পতন
বরফ শরীরে জল
শুভ্রতার চপল ত্বকের ওমে
নুন মাখে সঙ্গমের ক্লান্ত বিষাদ

দিনে দিনে ভালোবাসায় ক্ষয়ে গেছে
আয়ু কিংবা ভাগ্যরেখা
করতল মসৃণ তার
জীবনের পরতে পরতে
স্পর্শ মন্ত্র বাণে
পরম যত্নে বোনে আশ্চর্য পরিখা

 

লুৎফুল হোসেন

বি, প্রকাশক ও সাহিত্যকর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। বিভিন্ন রকমের পোর্টাল ও পত্রিকায় নিয়মিত গল্প, কবিতা, ফিচার, প্রবন্ধ এবং গান লিখছেন। বাংলাদেশের লিটলম্যাগ ও নানা প্রকাশনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত আছেন সেই ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকেই। শৈল্পিক মননশীলতাকে প্রশ্রয় দিয়ে একটু একটু করে গড়ে তুলছেন তার নিজস্ব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘রচয়িতা’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।