মোশতাক আহমদের মুক্তগদ্য: পৃথক পালঙ্ক

দৈনিক বাংলার মোড়। শীতকালের বেলা দশটা। রাস্তাঘাট এখনো নরোম, মায়াময়, ফাঁকা ফাঁকা। বিচিত্রা অফিসের তিন তলার সম্পাদকের অফিসে ঢুকলেন ইকবাল হাসান। গোসল করে এসেছেন, কিন্তু তাতেও সারা রাতের ধকল লুকানো যাচ্ছে না। শাহাদাত চৌধুরী বললেন, “ তোমার চোখ এত লাল কেন?”
“ কাল সারারাত পিজিতে ছিলাম, হাসানের কাছে।“
“ আচ্ছা, তুমিও হাসানের ডিউটি করেছ?“ শাহাদাত চৌধুরি যেনবা আগন্তুককে মেপে দেখছেন, তাকালেন ঐভাবেই।
“ পরশু রাতে খুব অস্থির করেছিল। তাই সুরাইয়া কাল আমাকে থাকতে বলল। ও একা সামলাতে পারছিল না। একবার পানি খাওয়াই, একবার বাথরুমে নিয়ে যাই, একবার বলল বাইরে হাঁটতে যাবে। কাজী সালাউদ্দিন আর হাফিজ ধরে ধরে বারান্দায় নিয়ে গেল। ঘুমের ইঞ্জেকশনে কিছুক্ষণ ঘুমায়, আবার উঠে বসে। আমাকে বারবার বলছিল, বুকটা জ্বলে যাচ্ছে রে ইকবাল। একটু হাত বুলিয়ে দে! শার্টের বোতাম খুলে হাত বুলিয়ে দিতে শান্ত হয়ে বলে কর্পূরের কৌটাটা মাথার কাছে রেখে যা। কাল কিন্তু সুন্দরবনের মধু নিয়ে আসবি! এইসব নিয়ে ভাই সারা রাত কাটল!” এই বলে ইকবাল পকেট থেকে একটা লেখা বের করল। “ভোর পাঁচটায় সুরাইয়াকে নিয়ে বের হয়ে ওকে নামিয়ে দিয়ে আমিও বোনের বাসায় চলে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসছিল না। ছটফট করতে লাগলাম। শেষে এই কবিতা লিখে বাসাবো থেকে আপনার কাছে।“

শাহাদাত চৌধুরী কবিতাটা হাতে নিলেন। শিরোনামটা পড়লেন – ‘একজন কবির অসুস্থতায়’ ; কিন্তু কবিতাটা না পড়ে কেমন উদাস হয়ে গেলেন। বেল টিপে মনির পিয়নকে ডেকে দু কাপ চা দিতে বললেন। পড়লে দেখতে পেতেন ওখানে লেখা ছিল, একজন কবি অসুস্থ হলে একটি মাধবী মুখ/ বড়ো বেশি ভেঙে পড়ে দুঃসহ ব্যথায়।
“আগে চা খাও ইকবাল।“ শাহাদাত চৌধুরী সকালে একটা ফোন পেয়েছেন। কিন্তু ইকবাল হাসানকে আরেকটু ধাতস্থ হতে দেয়া দরকার।

ইকবাল আর সুরাইয়া চলে যাবার পর হাসান জেগে উঠলেন।

এই দেশে জন্মেছি বলেই ফুল ফোটানোর প্রজ্ঞা আমি
পেয়েছিলাম, অনাবরণ ; আজ যদিবা হত্যাপ্রবণ
খরায় আমি।
পুড়তে পুড়তে এই ভাবে যাই, এই ভাবে যাই
এই দেশে জন্মেছি বলেই ব্যর্থ বাউল, আমি তবুও বলেছিলাম
চরৈবেতি ……… চরৈবেতি
(আমার চোখে বলেছিলাম/ অগ্রন্থিত কবিতা)

হাফিজকে ডেকে রোজকার মত হুইল চেয়ারে করে করিডোর থেকে ভোর হওয়া দেখবেন বলে ইশারা করলেন। হাফিজুর রহমান লিখেছেন, “ভোরে যথারীতি বাইরে নেওয়ার কথা! কাছে গিয়ে দেখি হাঁপাচ্ছেন! বললেন, বুকের মধ্যে যেন দাঁড়কাকে ঠোকরাচ্ছে! নড়াচড়ায় অক্সিজেনের নল খুলে গেলে ফের লাগানো হলো! কিন্তু অস্থির হয়ে উঠলেন যেন যন্ত্রণায়! কাছে কেবল মা আর আমি! রাতে বুড়িকে বিশ্রামের জন্যে বাসায় পাঠানো হয়েছিল! অগত্যা আমার কোলের উপর মাথাটা তুলে নিলাম; বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন মা! ধীরে ধীরে যেন শান্ত হয়ে গেলেন! বুঝতেই পারিনি কখন চলে গেল প্রাণটা! এভাবেই আমার কোলে মাথা রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কবি!

ভোরের রোদ ফুটলে সংবাদ শুনে সবাই আসতে থাকেন! আমাকে পাঠানো হয় বাদল ও বুড়িদের খবর দেওয়ার জন্যে! রোদের আলোয় যাওয়া আর হলো না হাসান ভাইয়ের!” ‘মোরগ’ কবিতার ছিন্ন মস্তক মোরগের মতো আর ছটফট করবেন না। ‘শান্ত হয় স্মৃতি স্নায়ু প্রকৃতি ও পরম আকৃতি!’ তিন সপ্তাহের হাসপাতাল বাস সাঙ্গ হয়েছে, পাখি হয়ে গেছে তাঁর প্রাণ।

কিন্তু হাসানের ভাইবোনকে মৃত্যু সংবাদ দিতে পারল না হাফিজ। সে গিয়ে বলল, দাদার শরীর খুব খারাপ। তোমরা জলদি হাসপাতালে চলো!

কাজী সালাহউদ্দিন গেল মহাদেব সাহার আজিমপুরের বাসায়। নেটের দরজায় নক করে, দরজার বাইরে থেকেই হাসানের খবরটা দিল। নির্মলেন্দু সেদিন মহাদেবের বাসায়। খবর শুনে তিনি পাথর হয়ে গেলেন। কোনোমতে বলতে পারলেন, তুমি যাও, আসছি আমি। গায়ে একটা শাল জড়িয়ে শিশির ভেজা সকালে বেরিয়ে পড়লেন মহাদেব। হাসপাতাল প্রায় জনহীন, কিন্তু কিছুটা তটস্থ অবস্থা। গেটে আর ভিতরে অনেক পুলিশ। “ হাসানের প্রাণহীন দেহ খাটের উপরে পড়ে আছে, যেন ঘুমিয়ে আছে হাসান। বেঁচে থাকতে যেমন, মৃত্যুর পরও তেমনি নির্জন নিঃসঙ্গ। মনে হচ্ছিল যেন এই মাত্র ঝরে পড়েছে ‘ফুল হয়ে যাওয়া’ একটি জীবন, নাকি জীবন হয়ে ঝরে যাওয়া একটি ফুল, ভোরের ঝরা শাদা শেফালির মতোই এক অভিমানী কবির মৃতদেহ, তখনও কোনো কাপড় দিয়ে ঢাকা দেয়া হয়নি সেই দেহ, আমিই বোধ হয় বাইরে থেকে আসা প্রথম দর্শক, শেষ মুহূর্তের প্রথম সঙ্গী। আমি অনেকক্ষণ, যতক্ষণ পারা যায়, হাসানের মৃত্যু আচ্ছাদিত খোলা দেহখানি দেখলাম, তারপর গায়ের শালটা খুলে ঢেকে দিলাম হাসানের মৃতদেহ, যেন আর কেউ এতোটা দেখতে না পারে। কোনো আপনজন বা কোনো প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে নিজেরও আংশিক মৃত্যু হয়, এই সত্যটি আমি সেদিন প্রথম অনুভব করলাম। সুরাইয়া অনবরত কাঁদছে। … কিছুক্ষণ পর নির্মল এল, সে নিশ্চয় আমার চেয়েও বেশি কাতর হয়ে পড়েছে, গোপনে একাকী সে বোধ হয় অনেকটা কান্না শেষ করে তবেই বেরিয়েছে। এরপর এল হাসানের কলেজ জীবনের বন্ধু মাহফুজ, হাসানের অসুস্থ জীবনের আশ্রয়।“

হাসপাতালের তটস্থ অবস্থার কারণও জানা গেল। ভারতীয় হাইকমিশনে সকালের দিকে হাইকমিশনার সমর সেনকে অপহরণের জন্য ছয়জন আত্মঘাতী তরুণ হামলা চালিয়েছিল। সমর সেন কিছুটা আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছেন, কর্নেল তাহেরের এক ভাইসহ চারজন হামলাকারী নিহত হয়েছে আর দুজন আহত অবস্থায় ধরা পড়েছে। কর্ণেল তাহেরকে যেন মুক্তি দেয়া হয় সেজন্য এই হামলা করে ভারতকে চাপে ফেলাই ছিল হামলার উদ্দেশ্য।

এদিকে সকাল সাতটায় অফিস যাবার পথে সস্ত্রীক রাহাত খান, রইসুদ্দিনকে সাথে করে পিজি হাসপাতালের নির্জন করিডোরে পৌঁছে গেছেন। সিঁড়িটা ফাঁকা।
রাহাত খান ১২০ নম্বর কেবিনে ঢুকলেন। “দক্ষিণ দিকের দরোজা অল্প খোলা ছিল, তা দিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে প্রকাশিত হচ্ছিল রোদ ও কুয়াশামাখা একটি আহত দিন।“ হাফিজ আর কাজী সালাউদ্দিন শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। শিথানে মা, নিশ্চল মূর্তি। পৈথানে সুরাইয়ার থাকবার কথা। নেই সে। “আবুল হাসান শুয়ে ছিলেন তাঁর শেষ পালঙ্কে, শাদা চাদর দিয়ে ঢাকা তাঁর মৃতদেহ।“কবির মা রাহাত খানকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “ বাবা, আমার হাসানকে তোমরা রাখতে পারলে না!”
এই হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়েই আবুল হাসান উচ্চারণ করেছিলেন,” আমার অনলে আজ জাগো তবে হে জীবন, জয়শ্রী জীবন!“

রাহাত খান, শওকত ওসমান প্রমুখ টাকা পয়সার জোগাড়ে বেরিয়ে গেলেন।

শাহাদাত চৌধুরী চা খেতে খেতে ইকবালকে বললেন, “এত ভেঙে পড়ো না। আমরা তো সবাই জানতাম ওর আয়ু শেষ হয়ে আসছে। এত কষ্ট পাচ্ছিল ছেলেটা। তুমি বন্ধুর এই শোককে শক্তিতে পরিণত করো। এ সপ্তাহের বিচিত্রার কাভার স্টোরি করো আবুল হাসানকে নিয়ে- ওকে যেমন দেখেছ হাসপাতালে, ভার্সিটি লাইফ থেকে, পত্রিকা অফিসে – এইসব মিলিয়ে। কবিতাটাও আমি রাখছি। তুমি পারবে। তোমার বেতবুনিয়ার কাভার স্টোরিটা তো বিচিত্রার ওয়ান অব দা বেস্ট!”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে খবর চলে গেল। ছাত্ররা ক্লাসে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন। মুহম্মদ জুবায়ের প্রিয় কবির মৃত্যুতে পিজি না গিয়ে পারল না। পৌঁছে দেখতে পেল ‘উদভ্রান্ত সুরাইয়া আপা, প্রয়াত কবির বিছানার পাশে দাঁড়ানো। অমন করুণ ও অসহায় তাঁকে আগে কখনো দেখিনি।“ আত্মীয় স্বজন, কবি সাহিত্যিকে ভিড় হয়ে আছে ছোট্ট কেবিন, বারান্দা। সুরাইয়া হঠাৎ বেরিয়ে এলেন। কি ভেবে কে জানে, জুবায়েরের হাত ধরে বললেন, “ ওরা হাসানের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তা কিছুতেই হতে পারে না, হাসানের খুব ইচ্ছে ছিল তার কবর হবে রেসকোর্সের একপাশে। সে বলে গেছে। আমার কথা কেউ শুনছে না, তুমি একটু বুঝিয়ে বলবে ওদের?” জুবায়ের সুরাইয়া ম্যাডামের ছাত্র। তার কি ক্ষমতা? হয়ত ইতোমধ্যে অনেককে বলে বলে প্রত্যাখ্যাত হয়ে শামসুন্নাহার হলের পাশের রুমের ছাত্রী ঝর্নার ভাইটিকে সামনে পেয়ে তাকেও অনুরোধ করলেন। তখন তাঁর বিবেচনা শক্তিও হয়ত কমে গেছে। নির্মলেন্দু গুণ তো একপাশে হাঁটু ভেঙে পড়ে আছেন। সামনে রাহাত খানকে দেখে সুরাইয়া খানমকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে নীরবে সরে গেল জুবায়ের। হয়ত ওনারাই কিছু করতে পারবেন। আবার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, ‘সেই সবুজ উপচে পড়া অফুরন্ত অশেষ জলধারার সান্নিধ্যে প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে থাকবে হাসান, ভোরের শিশির পড়বে তার কবরের উপর, ঝরে পড়বে শৈশবের সঙ্গী কোনো গাছের পাতা, সন্ধ্যায় জোনাকি আলো ছড়াবে। “

কিছুক্ষণ পর সুরাইয়াও হাঁটু ভেঙে বসে পড়বেন নির্মলেন্দুর পাশাপাশি। দুজনেরই পরবর্তী কবিতার বই হাসানকেই উৎসর্গ করবেন।

হাসানের মরদেহ বাংলা একাডেমিতে নেয়া হল। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে নিয়ে এসে জানাজা হল। আসাদ চৌধুরী জানাজা থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, “হাসান মারা যাওয়ার পর যারা হাসপাতালে, জানাজায় গিয়েছিলেন তাঁদের চোখে যে শোক প্রত্যক্ষ করেছি তার মধ্যে সামাজিকতার অনেক ঊর্ধে, প্রাণের ব্যাপার ছিল। সামাজিক প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত যারা- তাদের মৃত্যুতে উৎসবের অহঙ্কার থাকে, দেখানোর ব্যাপার থাকে, কিন্তু সেখানে তা ছিলো না। হাসানের সংস্পর্শে যারাই এসেছেন, পেশায় তিনি যেই হোন, কবিতা তাকে স্পর্শ করতো। তিনি বুঝতে বাধ্য হতেন, একজন কবির মুখোমুখি তিনি হয়েছেন।“
শামীম আজাদ খবর পেলেন শবযাত্রার- “ কবির প্রয়াণের পর তার শবযাত্রায় সুরাইয়া আপাই ছিলেন একমাত্র নারী।“

নারী : ভালোবাসা মানে এই পরস্পর শান্তি আর একতাবদ্ধতা,
ভালোবাসা মানেই তো একে অপরের প্রতি সুবিশ্বাসী হওয়া
ভালোবাসা মানেই তো হৃদয়ের ইতিহাস থেকে সব ঐতিহ্য ধারণ করা,
ভালোবাসা মানেই তো একতার ঊর্ধে সুসংহত হওয়া ।
ভালোবাসা মানেই তো ক্ষণ – বিভ্রমের শেষ ।
এর আলোয় কোনো অবিশ্বাসী উত্তেজনা নেই
বিভ্রান্তিও নেই।
প্রেমিক : আর নেই কারো কোনো চিত্তবিকারের পরিনতি,
প্রকৃত আলোর কোন ক্ষয় নেই।
আলো অনিঃশেষ
আলো শান্তিকামী।
( ওরা কয়েকজন)

ফুলে ফুলে ঢাকা কফিন ট্রাকে করে নেয়া হল বনানী কবরস্থানে। ‘সুর্যাস্তের শেষ আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, নীড়ে ফিরে আসছে পাখিরা’- সূর্যাস্তের মতো যেদিকে থেকে এসে আমি ডুবছি/ তুমি সেদিকে কখনো এসো না।

সন্ধ্যায় টেলিভিশনে হাসান স্মরণে অনুষ্ঠান। শামসুর রাহমান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন। কথা ছিল আসাদ চৌধুরী বলবেন সবার শেষে, আর যদি সময় থেকে হাসানের কিছু কবিতা পাঠ করে শেষ করবেন। আসাদ চৌধুরী আর কবিতা পড়তে পারলেন না; বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল হাসপাতালের একটি মুখ, তাঁর নাকে তুলো গোঁজা, মুখে ম্লান হাসি, চোখ বোঁজা। আসাদ চৌধুরীর বুকটা হু হু করছিল।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিচিত্রায় ইকবাল হাসানের গ্রন্থনায় আবদুল মান্নান সৈয়দ বললেন, শেলী কীটসের মতোই একজন রোমান্টিক ও আবেগপ্রবণ কবিকে হারালাম।

আহমদ ছফা বললেন, গোলাপ ঝরে গেছে।
আল মাহমুদের কথাতেও একই প্রতিধ্বনি- মৃত্যুর কথা জেনেও কবিতা লেখা একমাত্র কবির পক্ষে সম্ভব – আবুল হাসান তার প্রমাণ।
শামসুর রাহমান বিচিত্রার জন্য কবিতা লিখলেন ‘যে গেলো নগ্ন পায়ে’। বললেন, স্বল্প সংখ্যক তরুণ কবির মধ্যে যিনি বিশিষ্ট আমরা তাঁকে হারালাম।

আহসান হাবীব বললেন, হাসানের মৃত্যু আমাদের সাহিত্যকর্মীদের জন্য যেমন পরমাত্মীয় হারানোর দুঃসহ আঘাত, কবিতানুরাগীদের জন্যে তেমনি বহন করে এনেছে এক অপূরণীয় ক্ষতির সংবাদ।
মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ বললেন, আমরা একজন হৃদয়বান সৃষ্টিশীল তরুণকে হারালাম।
বন্ধু মুহম্মদ নূরুল হুদা বললেন, একজন ব্যাক্তিবন্ধুকে হারালাম এবং একজন কবি-শত্রুকে হারালাম।
সাবদার সিদ্দিকী অভিহিত ‘প্লাস্টিক জগতে প্রেরিত পুরুষ’টি মহাদেব সাহার কাছে তাঁদের ‘সময়ের সেরা কবি।‘
মর্মাহত রফিক আজাদ। কোনো কথা নেই তাঁর মুখে।
অসীম সাহা বললেন, অসুখ তাঁকে শেষ পর্যন্ত তাঁর এলোমেলো স্বভাবকে বেঁধে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু ওকে তা পারবে কেন? বাঁধনের সমস্ত দড়িগুলো ছিঁড়ে, টুকরো টুকরো করে সে মৃত্যুর করতলে ছুটে গেল।
হাফিজুর রহমান ভাবলেন, শান্তি শান্তি করে চলে গেল শান্তির কপোত!
‘ও বন্ধু আমার’ নির্মলেন্দু গুণ বললেন, “কবি হওয়ার দুরারোগ্য স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঢাকায় এসেই যার প্রেমে আটকা পড়েছিল আমার প্রথম প্রেম সে আবুল হাসান। যার সঙ্গে একদিন এই নগরীর পথে পথে, অলিতে গলিতে, ক্লেদে কুসুমে পরিচয় হয়েছিল- সঙ্গম হয়েছিল- সেই নগর নটীর গর্ভে কবিত্বের পদ্ম জন্ম দিতে দিতে , এই নগরীর বুকেই একদিন সে গেল হারিয়ে। আমি রইলাম, তার মৃতদেহটিকে ঢাকার মাটিতে ঢাকা দেবার জন্য- কবর দেবার জন্য।

সম্ভবতঃ আমার চেয়ে এই নগরীর জন্য হাসানের প্রেম ছিল বেশি। বার্লিন থেকে থেকে এসে গ্রামের বাড়িতে নয় এই নগরীতেই হাসান তাঁর পথের শেষ টানলো। ১৯৭১ এ হাসান যে ঢাকা ছড়েনি, বুঝি তাও ছিল ঢাকার প্রতি তাঁর উন্মাদ প্রেমেরই প্রকাশ, মৃত্যু অন্তে ঢাকার সঙ্গে বুঝি তাই বনানীকে যুক্ত করে দিয়ে গেছে হাসানের আত্মা। ঢাকার জন্য আমার তাই এখন আর অতটা পিরিত নেই, যা একদিন ছিল।“ কথা সত্য। নির্মলেন্দু গুণ এরপরে ময়মনসিংহ কেন্দ্রিক হয়ে পড়লেন। এলিজিতে লিখলেন, ‘ভালোবেসে যারে ছুঁই সেই চলে যায় দীর্ঘ পরবাসে।‘

সুরাইয়া খানম বহু কষ্টে উদ্ধৃত করতে পারলেন সন্তের বাণীর মতো কবির শেষ গ্রন্থের কিছু লাইন, তাঁর শাদা ডায়েরিতেও তোলা আছে-
“যতদূর থাকো ফের দেখা হবে, কেননা মানুষ
যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।”

বনানীর এপিটাফে ‘অনুপ্রাস’ এই পংক্তিগুলোই উৎকীর্ণ করেছে। কবির ভক্ত খাইরুল ইসলাম কবরটি দেখে বলেছেন, “অনেক বয়সী একটা কাঠগোলাপ গাছ আর একটি তরুণ রঙ্গন গাছ আছে কবরটিতে; মনে হয় যেন কাঠগোলাপ গাছটির গোড়া থেকে রঙ্গন গাছটি উঠে এসেছে। লাল সাদা ফুলের কন্ট্রাস্ট কবরটিতে এনেছে এক ধরনের আভিজাত্য।“

কবরখানায় গিয়ে সদ্য বন্ধু হারানোর বেদনা ছাপিয়ে নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহারা এক ধরণের স্বাধীনতার আস্বাদ পেলেন। পনেরই আগস্টের শহীদ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের কবর, জেলহত্যার শিকার শহীদ নেতাদের কবর, সাতই নভেম্বরের শহীদদের কবরগুলো তখনও কাঁচা, বাঁশের বেড়া দেয়া, কিন্তু সাহস করে কেউ জিয়ারত করতে যায় না। হাসানের অকালমৃত্যুতে হাসানের সহাযাত্রীরা দেশপ্রেমিকদের কবরগুলো জিয়ারতের সুযোগ পেলেন। ভয় কেটে গেল অনেকটাই। বনানী কবরস্থানে এসে তাঁরা প্রাণভরে শ্বাস নিলেন। হাসানের জন্য সবাই পছন্দ করলেন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল হুদার কবরের পাশের খালি কবরটা। হাসানের আর একা একা ভয় লাগবে না।

কবরের জমি কিনে দিলেন গাজী শাহাবুদ্দীন আহমেদ, সাড়ে তিন হাজার টাকায়।
শেষ নভেম্বরের শীতের বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে সবাই যে যার গন্তব্যে ফিরলেন। চারদিকে শুধুই নির্জনতা।

আজিমপুরে মহাদেব সাহার বাসায় ফিরলেন হাসানের মা, বোন বুড়ি আর নির্মলেন্দু। সবাই মিলে হাসানকে ছাড়া হাসানকে নিয়ে একটা দীর্ঘ রাত কাটালেন, “ হাসানের জন্য একটি দীর্ঘ শীতের রাত উৎসর্গ করলাম, সারারাত আমাদের মধ্যে থাকল হাসান, সেই অভিমানী কবিকে অন্তত একটি রাত আমরা এভাবে ধরে রেখেছিলাম, সবাই মিলে আমাদের ছোট্ট সাধারণ বাসাটিতে আমাদের ভালবাসার মধ্যে আটকে রাখলাম তাকে।“

আমি ও নির্মল কথা দিলাম আমরা হাসানের বাড়িতে যাব, সেই ঝনঝনিয়ায়, যেখানে নদী আছে, পাখি আছে, গাছপালা আছে, কারফিউ নেই। “
নির্মলেন্দু গুণ ভাবছিলেন, নিয়তির অমোঘ নির্দেশেই কি বছর দশেক আগেই আবুল হাসান লিখে গিয়েছিল তাঁর প্রিয় একটি কবিতা, যার সূত্রে দুজনের বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল!

“ একদিন ঝরা পাতার মতো নামহীন নিঃশব্দে
তোমাদের কাছ থেকে ঝরে যাবো যখোন
পিছনে ফেলে রেখে আমার নিদ্রাহীনতার কয়েক গুচ্ছ ফুল।

একমাত্র মৃত্যুই সুন্দর,
চাঁদের মতোন আত্মা আমার মেলে দিতে পারি
আজ অনন্ত মৃত্যুর সম্ভাষণে!”

 

রেফারেন্স :
১। কপাটবিহীন ঘর, ইকবাল হাসান, সাপ্তাহিক বিচিত্রা ডিসেম্বর ১৯৭৫
২। ইকবাল হাসান, সাক্ষাতকার
৩। শামীম আজাদ, ইমেইল
৪। বিশ্বজিৎ ঘোষ, আবুল হাসান, জীবনিগ্রন্থমালা, বাংলা একাডেমি
৫। আমাদের সুরাইয়া খানম, মুহম্মদ জুবায়ের, সচলায়তন
৬। মহাদেব সাহা, আত্মস্মৃতি ১৯৭৫, অনন্যা
৭। খাইরুল ইসলাম, ফেসবুক পোস্ট
৮। নির্মলেন্দু গুণ, মহাজীবনের কাব্য, কথাপ্রকাশ
৯। ক্রাচের কর্নেল, শাহাদুজ্জামান, মাওলা ব্রাদার্স

 

মোশতাক আহমদ

মোশতাক আহমদের জন্ম ১৯৬৮ সালে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশুনা করলেও সাহিত্যের সব শাখায় তার অবাধ গতায়াত। কবিতার বই, সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট, মেঘপুরাণ, ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, বুকপকেটে পাথরকুচি, ডুবোজাহাজের ডানা ও অন্ধ ঝরোকায়, সখার শিথানে; গল্পের বই স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প, স্মৃতিপাঠের বই অক্ষরবন্দি জীবন। বর্তমানে বিশ্বকবিতার অনুবাদ করছেন, পাশাপাশি কবি আবুল হাসানের জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।