একগুচ্ছ কবিতা

মোশতাক আহমদ

ধারাবাহিক মুঠোফোন

১. কথা ছিল যাব

হাঁটতে হাঁটতে সহসা
এসে গেল সড়কের বাঁক
যে যার বিবরে ফেরার দিন

এ যাত্রা হলো না যাওয়া তারামণ্ডলে

যাওয়াই হলো না আর

২. রুমালিয়া ছরা

এখন আর নেই সে জলের ধারা
নামটুকু বয়ে চলে রুমালিয়া ছরা

৩. শেষ চুমুকের বদলে

শেষ চুমুক ছিল না মোটেও  স্বাস্থ্যপ্রদ
এই জ্ঞান জন্মেছিল পাত্র শেষের আগে

তলানি-কুড়িয়ে-পাওয়া মত্ততার বদলে
বিকল্পের খোঁজ মেলে শিল্প-সহবাসের

৪. গালিবিজম

আফশোস কোরো না গালিব
একটা লম্বা জীবন চাও আল্লামিয়ার কাছে
ঘুরে-ফিরে দেখা হয়ে যাবেই
প্রিয় মুখ, বুলবুল আর বসন্তের সাথে

৫. বিষ

কত যুগ কত শতাব্দী উপেক্ষায়
পঁচিশ বছর তো কিতাবে
আমার রক্তের বিষ মেপো না
মাইক্রোগ্রামের হিসাবে

 

নদী ও ঈর্ষার কবিতা

আজকাল নদীর কাছে গিয়েও শান্তি পাই না
ঈর্ষার সবুজ চোখ পাহারা দেয় ফুরফুরে সময়

সে-নদীর উৎস-মুখ সবুজ পাহাড় থেকে নেমে
জল-আয়নায় ধরেছে নার্সিসাস কবিকে
হয়তো ভালোও বেসেছে, জানি না এখনো;
আরব্যরজনীর অনলাইন কথকতায়
তেমন জানা-শোনা হলো কই আর!
মোহনার মুখ-সেতো এক বিপুল ঈর্ষার সমুদ্র!
নদী, প্লিজ বলবেন না কথা অই সমুদ্র-মুখে।

নদীর কাছ থেকে ফিরি
আরেকবার ফিরবো বলে ঈর্ষার কূলে!

 

সম্পর্কের ভাঙা সনেট

হয়তো পাতাবাহার, তবু তো বৃক্ষই:
সমুদয় ডালপালা, স্মৃতি-শ্রুতলিপি
জল ও শেকড়শুদ্ধ চোখ-বন্ধ কাক
আলগোছে সরালো যেনবা পরচুলা।
পরিধিতে সরে আসে সম্পর্কের কেন্দ্র
করুণ এক জ্যা-বন্দী অবস্থান গড়ে
গর্হিত সে– পরচুলা আর বৃত্তচাপ
মরল “অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে”।

স্মৃতিধর মানুষের দুঃখ নিরবধি
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রক্তের অক্ষরে,
হৃদয়ের আন্দোলনে হারায় না কেউ
রাজ্য। সম্পর্কের সর্বনাম নীলকণ্ঠ;
দুনিয়াবি অন্ধকারে নিটোল বিষাদ
ড্রেসিং টেবিলে, গহীন পরচুলায়।

 

‘পরমা’-কাহন

( উৎসর্গ: অপর্ণা সেন )

একদিন ছিল একটাই নাম আর পরিচয়।

চল্লিশে এসে
তুমি কারো স্ত্রী, মা, ভাবি, বৌমা ইত্যাকার
নানা ভুমিকার চক্রব্যূহ পেরুতে পেরুতে
শেষাবধি ভুলেই গেলে নিজের নাম!
দুনিয়াজোড়া ফাঁদ পাতা এই হারান-প্রাপ্তি-নিরুদ্দেশের।

তোমার গহীনে কতো ফালগুনের অবহেলার হালখাতা
সে পাঠ কে আর জানে বলো!
“তোমার নাম কি, (পরমা!)?” অনুচ্চারিত-বন্ধুর
মুখোশে চিৎকৃত জিজ্ঞাসায় বিপন্ন

হরিণীর চোখে স্থির তাকানো
অনবদ্য ক্লিক হয়ে আছে ডিজিটাল দুনিয়ায়।

তুমি পরমা! চিরসবুজের প্রতিশব্দ;
–নিপুন (কামেরাম্যানের) উস্কানি তো ঝুঁকবেই বন্ধুর বেশে।
আচানক ভেঙ্গে পড়ে যৌগিক খোলস, নিয়তি-রাঙানো
শত-সহস্র আসক্তির ফুটেজ
আলিফ লায়লা রজনীর দুরালাপ, অন্তর্জাল
আর খুদে বার্তা চালাচালি:
অসহ্য এক প্যারালাল দ্বৈত জীবন।
ভেসে গেলে ভাসিয়েও নিয়ে গেলে তাকে, জলমগ্ন
বৃষ্টি ভেজা মুখের ক্লিকগুলোয় ধরা থাকলো যাবতীয় সুখের চিহ্ন (আহা সুখ!)।

দ্বন্দ্বের পরতে পরতে উন্মোচনের দিনরাত

বৃষ্টিভেজা মুখের প্রচ্ছদ
জেনে যায় সংসার, ভুমিকার প্রতারক জোয়াল।
আর পরমা, তোমার নাম
পৃথিবীকে একবার খুঁজে পেয়ে
স্খলিত পুনরায়
নিতল পাহাড়ি নদীতে হারিয়ে যাওয়া রাজকুমারীর কানফুল;

রূপশালী মৎস্যের স্মৃতি থেকে যায় শুকনো রূপচাঁদায়
স্পর্শ আর ঘ্রাণ হারায় না কখনো ধীবরের জাল

হাজার এক রাত্রির জন্যে
তবু খুঁজে পেয়েছিলে নিজেকে, পরমা!
উন্মোচিত হয়েছিলো নাম! তোমার নাম!

পয়লা ফাল্গুন
চট্টগ্রাম ১৪১৮

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।