মোশতাক আহমদের কবি আবুল হাসান স্মৃতিগদ্য: এসেছি দৈব পিকনিকে

জিন্নাহর জন্মদিন উপলক্ষে সাধারণ ছুটি। হাসান ভাবলেন, আবু বাকারকে আজ একটু জ্বালিয়ে আসি। আবু বাকার আবগারি বিভাগে কাজ করে, সেগুনবাগিচায়। পাশেই এজি অফিস চত্বরে মাহে-নও, পাকিস্তানী খবর, পাক জমহুরিয়াত, পাক সমাচারসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকার অফিস। আবুল হাসান আর নির্মলেন্দু গুণ পত্রিকার সম্মানী তুলতে এসে আবু বাকারকে নিয়ে নিচের চিটাগাং হোটেলে বসে আড্ডা দেন। আবু বাকার নিজেও তরুণ, সাহিত্য পত্রিকা করেন। হাসান গেলেন আবু বাকারের ঠাটারি বাজারের বাসায়। ছুটির দিনে সেখানে অনেকেই আড্ডার খোঁজে হাজির হয়। শশাঙ্ক আর আনিস আগেই মজুদ। হাসানকে দেখে সবাই হই হই করে উঠল। এমন মধুর স্বভাবের বন্ধু তো কমই আছে। আবু বাকার বললেন, জানো নাকি হাসান, হিমু ব্লেড দিয়ে হাত কেটে এক মেয়ের নাম লিখেছে!
– কেন?, হাসানের নিরাবেগ জিজ্ঞাসা।
– সেই মেয়ে তার প্রেম নিবেদনে সাড়া দিচ্ছে না বলে।
– পাগলের কথা বাদ দাও। চলো আজকে সরকার বাহাদুর ছুটি দিয়েছে, আমরা কোথাও বেড়াতে যাই।
– কোথায় যাওয়া যায়?
– চলো, জয়দেবপুরের দিকে যাই। ওখানে একটা জমিদারবাড়ি আছে।
হাসানের প্রস্তাবে সবাই উৎফুল্ল। কিন্তু পকেটের অবস্থা চিন্তা করে কিছুটা চিন্তিত। আনিস, হাসান আর আবু বাকারকে গুরু মানে। গুরুদের সেবায় লাগতে পারলে জীবন ধন্য। সে বলল, আমার কাছে চার রুপিয়া আছে। আবু বাকার বললেন, আমার কাছেও দুই-তিন রুপিয়া হবে। তরুণ তুর্কীদের আর পায় কে! বাসে হাফ টিকেট কেটে জয়দেবপুর চলে গেলেন। রাজবাড়ি দেখা হয়ে গেলে রাস্তা দিয়ে একটা পিকনিকের বাস যাচ্ছিল। বাস থেকে মাইকে আবদুল আলীমের ‘হলুদিয়া পাখি’ গানটি ভেসে আসল। হাসান বললেন, – চলো আমরাও আজকে পিকনিক করি, এসেছি যখন!
যে কথা সেই কাজ। বাজারে গিয়ে আধা কেজি চাল, আধা পোয়া মসুরের ডাল, এক হালি মুরগির ডিম আর খানিকটা ডালডা আর একটা দিয়াশলাই কেনা হল। কিশোর বিক্রেতা লবণ ফ্রি দিল। এখন হাড়ি পাতিল আর চুলা কোথায় পাওয়া যাবে! ছেলেটা বললো- এখানে তো হাটের দিন ছাড়া মাটির পাতিল পাবেন না, আপনারা মিষ্টির দোকান থেকে দু আনা দিয়ে দইয়ের পাতিল কিনে নিতে পারেন।
ওরা চড়ুইভাতির সদাইপাতি নিয়ে রাজবাড়ি ছেড়ে শ্মশানের কাছে একটা মঠের পাশে গিয়ে হাজির হল। সেখানে পড়ে থাকা লাকড়ি সংগ্রহ করতে গেলে এক বুড়ি হৈ চৈ শুরু করলে মানে মানে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। একটা পাকা বাড়ির সামনে যেতেই কয়েকজন যুবক ওদেরকে থামিয়ে পরিচয় ও বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করে। আনিস সগর্বে আবুল হাসানকে কবি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিল। বললো- ইনার লেখা আগামী সপ্তাহে পূর্বদেশে দেখতে পাবেন। আমরা সবাই ঢাকা থেকে এসেছি। এসে কবির মনে হল পিকনিক করি। বাজার হয়ে গেছে, কিন্তু লাকড়ি জোগাড় করতে পারছি না।
যুবকেরা বললো– এই বাড়ি আমাদের। আপনারা যত খুশি লাকড়ি নেন। বাড়ির পিছনে কিছু ইট আছে। চুলা বানাতে পারবেন।
ওরা সামনের ঢালু জায়গায় গিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করতে লাগল। কৌতূহলী কয়েকজন রাখাল বালককে তারা আমন্ত্রণ জানালেও ওরা বলল– আমরা খাইতাম না, দেখতাছি আপনেরা কেমনে রান্ধেন!
কলাপাতার পাতে খাওয়া সারতে হবে। কিন্তু কারো কাছেই ছুরি নেই। অগত্যা আবু বাকার পড়ে থাকা মাটির পাতিলের কানা দিয়ে কলাপাতা কেটে আনলেন।
সে খাবার ক্ষুধা পেটে তো সুস্বাদু হবেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার, হাসান এই সুখস্মৃতিটা বয়ে বেড়াতেন। অনেকের কাছে গল্পও করতেন। ফেরার আগে সব বর্জ্য এক জায়গায় মাটি খুঁড়ে রেখে আসা হল। স্মৃতি চিহ্ন থাক; আবার কখনো এলে খুঁজে নেয়া যাবে।

পরের সপ্তাহে আবুল হাসান গেছেন প্রেস ক্লাবের পাশে পাকিস্তান কাউন্সিল লাইব্রেরিতে। সেখানের সেমিনার রুমে ‘পতিতা উচ্ছেদ’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পরদিন নারিন্দার গড়িয়া মঠের উল্টোদিকে রফিক সন্যামতের বোনের বাড়ির চিলেকোঠার সাহিত্য আসরে গেছেন। সানি কটেজের এই আসরে কবি জসীমউদ্দীনও কখনো কখনো আসতেন। হাসান প্রস্তাব করলেন, – চলো আমরা মালিটোলার গণিকা পল্লীর সামনে গিয়ে ‘পতিতা উচ্ছেদ’ সভার প্রতিবাদে একটা পাল্টা সাহিত্যসভা করি! হাসানের এই পাগলামিতে যোগ দিলেন শশাঙ্ক পাল, ভূঁইয়া ইকবাল, আবু বাকার, আলী ইমাম, শামসুদ্দিন আসালত, শাহযাদ ফেরদাউস প্রমুখ। কবিতা হল, গান হল, যৌনকর্মীরাও বেরিয়ে এসে গান গাইল, কৃতজ্ঞচিত্তে কবি-লেখকদেরকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করল। আমার ধারনা, যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে এদেশে সেটাই ছিল প্রথম পদক্ষেপ।

তথ্য সূত্র :
আবু বাকার ও আনিসুর রহমান মণ্ডলের সাথে লেখকের কথোপকথন ।

 

মোশতাক আহমদ

মোশতাক আহমদের জন্ম ১৯৬৮ সালে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশুনা করলেও সাহিত্যের সব শাখায় তার অবাধ গতায়াত। কবিতার বই, সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট, মেঘপুরাণ, ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, বুকপকেটে পাথরকুচি, ডুবোজাহাজের ডানা ও অন্ধ ঝরোকায়, সখার শিথানে; গল্পের বই স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প, স্মৃতিপাঠের বই অক্ষরবন্দি জীবন। বর্তমানে বিশ্বকবিতার অনুবাদ করছেন, পাশাপাশি কবি আবুল হাসানের জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।