যশোধরা রায়চৌধুরীর কবিতা: পীড়া সমগ্র

সম্মিলিত কোলাহলের কাছে নিবেদিত প্রাণ হও।

বারে বারে উৎকন্ঠার কাছে ফিরে যাও কেননা একবিংশ শতকের ঐটিই অভিজ্ঞান।

অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয়টি চৌকা চ্যাপ্টা এবং বেজায় চকচকে। কালচে সমতলের ওপর প্রতিফলিত হয় তোমার মুখচ্ছবি। সর্ব অর্থেই। প্রতিবিম্বিত করে তোমারই ভয়, সংকোচ, শংকা ও ঘৃণা। তোমার অসামাজিক, প্রায় সমাজবিরোধী মুখচ্ছবিই ।

নশ্বরতাই এখন আমাদের পহেচান, নশ্বরই আমাদের ঈশ্বর।

প্রতিদিন নতুন নতুন চিত্ররূপ রচনা করতে হয়, নাহলে আমাদের পুরনো অবয়ব ভাল লাগেনা। এক ঘেয়েমি আমাদের নব কুষ্ঠ। টানা কিছুদিন এক রূপে থাকা আমাদের কাছে পীড়াদায়ক। জেলখানা বিশেষ। সুতরাং নব চাকচিক্য, নতুন পোশাক ও নানা নব মুদ্রা সহকারে আমাদের উৎফুল্ল বদনে হাজিরা দিতে হয় এই অসামাজিকতার আগারে। যার নাম সামাজিক মাধ্যম।

আমাদের নতুন নতুন পোশাকের মত, নতুন নতুন সুখের খোঁজ। বড় খোঁজ। নতুনত্ব ময় নতুনত্বের। সুখ সেই নশ্বরতাই। সুখ সেই অতিরিক্তই। যা ক্ষণবিলোপী ও তড়িৎবেগী। ইলেকট্রিক কারেন্ট নামে এক কালো পদার্থ ইশকুল জীবনে আমরা হজমি ওয়ালার নিকট থেকে পেতাম। সেইরকম ছ্যাঁকাদেওয়া অনুভূতির নামই আজ সুখ।

এই সুখ যদি প্রতিদিন নব নব ছ্যাঁকা, তবে সুখ আরো। সুখ অতি। তা নব নব পীড়ার খোঁজ। মন্বন্তর শেষ হলে পুনরায় নব মন্বন্তর। পীড়া শেষ হয়ে গেলে নতুন পীড়ার নান্দীরোল।

আসলে পীড়াভুবনে আছি। পীড়াকে নব নব রূপে ঝনঝনাতে দেখা নিজেদের সমস্ত স্নায়ু তন্ত্রে। এই সব গ্রহণবর্জনের লীলেখেলার মাধ্যমেই আমাদের অনন্ত সুখোদয়। গৃহকে হাওড়া স্টেশনের মত অপর্যাপ্ত জিনিসে ঠাশাঠাশি করে ফেলাই আমাদের কনজিউমারিজম। প্রতি পদে বস্তুরাজির সঙ্গে ঠোক্কর প্রাপ্ত হতে হতে চলার নামই বিলাসিতা। দিনের অধিক অংশ গৃহসজ্জাকে নিপুণ রাখার জন্য শরীর পাত করাই আমাদের সংসার। আমাদের প্রেম অজস্র পণ্যে প্রিয় পাত্রকে ঢেকে ফেলার নাম। আমাদের শান্তি ঘর্ঘর রবে যন্ত্র নির্গত শব্দরাশির দ্বারা কর্ণমূলকে প্রহত করা। আমাদের বিস্ময়, একের পর এক অবিস্ময়ের বস্তুকে বারংবার ইন্দ্রিয়পটে হাজির করা।

যা করব ভাবি আর যা করি তার বিস্তর ফারাকের মধ্যে ক্রমে সমুদ্রের তলদেশের তুষারদ্বীপের মত গলে গলে নেমে চলেছে আমাদের অভিপ্রায়। সৎ ও সাধু অভিপ্রায়েরা ক্ষণে ক্ষণে বদলাতে থাকা ফেনাবুব্দুদ মাত্র আমাদের নিকটে।

নশ্বরতা আর পীড়ার দুই চাকার ঘর্ষণের মাঝে ছিন্নভিন্ন হতে হতে আমাদের বিকাশ ও বিস্তার, আমাদের আত্মার উদ্ভব ও প্রচন্ড পরিহাসের মত আমাদের উপভোগ।

যা আর কোনদিন উপভোগ হবে না , ভুলক্রমেও যাতে লেগে থাকবে না আরাম ও আনন্দের কোন ছিন্ন তন্তু। কেননা পেষণে ও দুটি কবে ক্ষয় পেয়ে পথপার্শ্বে ঝরে গেছে।

আমরাও আমাদের আত্মতাকে ছেদনের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে কর্তিত একেকটি প্রাণ। আভূমি ছড়ানো সুতো ছেঁড়া মুক্তামালার মোতিগুলি। গড়ায়, গড়ায় ক্রমাগত।

 

যশোধরা রায়চৌধুরী

যশোধরা রায়চৌধুরী, জন্ম ১৯৬৫, কলকাতা, দর্শনে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর, কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরে। কবি ও গদ্যকার। পণ্যসংহিতা ( ১৯৯৬) প্রথম গ্রন্থপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে পরিচিতি।

কৃত্তিবাস পুরস্কার ১৯৯৮ ও বাংলা আকাদেমি অনিতা সুনীল কুমার বসু পুরস্কার ২০০৬। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১৫ গল্পগ্রন্থ ও নিবন্ধগ্রন্থ বেশ কয়েকটি। অনুবাদ করেন মূল ফরাসি থেকে। বিবাহসূত্রে ফরাসি ভাষাবিদ তৃণাঞ্জন চক্রবর্তীর সঙ্গে আবদ্ধ।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।