নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-১০

[ এই উপন্যাসটি ৯ পর্ব পর্যন্ত প্রকাশিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। ইতিমধ্যে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। ধারাবাহিকতার কথা বিবেচ না করে এখন থেকে আবার নিয়মিত প্রকাশিত হবে। – সম্পাদক]

নিধির বাবাকে অফিসের কাগজে সরকারী সই নিতে অনুপের অফিসে যেতে হয়েছিল। আর সেই সাক্ষাতের পরপরই অনুপ তাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছে। ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে এই প্রথম ঢাকার বাইরে থানা পর্যায়ে তার পোষ্টিং। সে আর তার বউ তমালিকা সরকারী প্রটোকল আর ‘স্যার স্যার’ বলা সংস্কৃতিতে হাসফাঁস বোধ করে। উপরন্ত অনুপ বাংলা, ইংরেজী দু’ভাষাতে কবিতা লেখে (ইংরেজী সাহিত্যের স্নাতক)। মেলামেশার জন্য তার ‘ভদ্রলোক’ দরকার।

মোমের নরম আলোর মত ত্বক তমালিকার, ঘরে এন্তার বেলীফুলের ঘ্রাণ তার গায়েও ছড়িয়ে থাকে বোধহয়। সে তাদের সরকারী কোয়ার্টারের পেছন দরজা খুলে অস্তগামী সুর্যের আলোয় কোপানো একফালি জমিতে শেকড় গজানো পুইডাঁটা গুজে দেবার দৃশ্য দেখায়।

-‘আর ভাবী জানেন এই পুইশাক লাল রঙের’।

তমালিকা সদ্য অন্তস্বত্তা, মাত্র দু’বার মাসিক মিস গেছে তার, আনন্দে ঝলমলিয়ে ফিস ফিস করে নিধির মা’কে এ সংবাদ দেয় সে। অনুপের যত্নআত্তির সীমা নেই তবু তার খুব ইচ্ছা সে তার বাপের বাড়ি কুমিল্লা শহরে গিয়ে সন্তান প্রসব করে আসে। সাধ খায়। তার মাসি’র মেয়ের সাধ কত পদের খানা খাদ্যে পরিপূর্ণ ছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পায় নিধি’র মা। সেখানে ভালো ডাক্তারের সংখ্যাও অগন্য, কেউ কেউ তাদের আত্মীয়স্বজন। আর ফুরসত পেলেই তারা কুমিল্লা বার্ডে গিয়ে বেড়িয়ে আসার ইচ্ছা তার। এই পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে তার মেসো চাকরী করতো। দুস্প্রাপ্য কত গাছ যে সে দেখেছে সেখানে, বিচিত্র তাদের নাম! তমালিকার চোখ আরো বড় আরো স্ফটিক।

– ‘একটা গাছের নাম চিত্রণজীত’।

-‘আমি তো শাল গাছ দেখলেও চিনতে পারি না’—নিধির বাবার বিগলিত স্বীকারোক্তি।
এরপর খোলা বাগানে দাঁড়িয়ে তারা চারজন তারপর হাত লাল করা শাল পাতার গল্প করে।
-‘আমি স্লেট দিয়ে ঢিল মেরে কত শালপাতা পেড়েছি। দু’একবার ভীমরুলের চাকেও টোকা লেগেছে, তারপর দৌড় কাহাকে বলে ’—অনুপ তার শৈশবে ফিরে যায় দুদ্দাড়।
অনুপের বলার ঢংএ নিধির মা’র স্কুল বেলার স্মৃতি মনে পড়ে, তারও হাইস্কুলের রাস্তায়ও ফিনফিনে শালবন ছিল, তার কচি পাতা পেড়ে হাতে ঘষে কত লাল করেছে সে। আচ্ছা, অনুপ কি কোনও কালে তার সহপাঠি ছিল? কার মতো জানি দেখতে লাগে, ক্লাস ওয়ান বা টু’এর কোন গুড বয়ের সঙ্গে চেহারা মিলে যায়, যাদের নামগুলি আর কখনো তার মনে পড়ে না।

পরে যখন তাদের স্কুলে যাবার লাল ইট দেয়া রাস্তা কালো পীচের হলো, শালবন উপড়ে ফেলা হয়েছিল। কি কারণে এই উৎপাটন তারা বাচ্চারা কেউ বোঝেনি। তবু ভালো যে একটা বড়সড় আমবাগান ছিল, ছোট্ট রেলিং ছাড়া ব্রীজ আর একদফা রেললাইন পার হয়ে তাদের স্কুল। প্রতিদিন স্কুলে যাবার সময়টায় রেললাইন ট্রেন যেতো। নিধি’র মা’র তখনো ‘পথের পাঁচালি’ পড়া হয়নি, রেলগাড়িকে যেতে দিয়ে নিজে ঢালু জমিতে নেমে দাঁড়ানোর সময় জানালায় কৌতুহলী যাত্রীর চোখ দেখে তাই তার তেমন কিছু মনে হতো না।
রেললাইনের দূরগামী স্লিপার আর সোজা লোহার পাতের ওপর দিয়ে ব্যালান্স রেখে হাঁটতে গেলে পা দুটো শির শির করত। তার সহপাঠি মালিহা’র বোন লিলি এখানেই ট্রেনে কাটা পড়েছিল। লিলিকে ঘিরে প্রগাঢ় স্মৃতি হিসেবে শুধু একটা ফটোর মুখ মনে আছে নিধির মা’র, তীব্রভাবে। মালিহা নিজের অংক বইতে লুকিয়ে রাখতো সেটা, যেন কোন অসাধ্য অংক মেলাবার নিরন্তর চেষ্টা। ফটোটায় লিলি সাজগোজ করেছিল, নীল আর রূপালী পাড়ের কাতান, রূপার চিক কন্ঠার হাড়ে লেপ্টে আছে, কানের কাছ ঘেষে খোঁপায় গুজেছে লাল গোলাপ। লিলি’র রূপ আর অহংকার দুই-ই সহজাত অভ্যাসে ফেটে পড়ছে ফটোটায়।

-‘ছবিটা ঢাকায় নিউমার্কেটের ষ্টুডিওতে গিয়ে তোলা। ছোট মামার বৌভাতের সময়’– মালিহা বলেছিল।

-‘লিলি আপা’র বয়স আঠারো হইছিল, না?’

আঠেরো বছর বয়স কি দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি…সুকান্তের কবিতা নিধি’র মা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ার আগেই পড়েছে। যখন লিলি’র কথা শুনেছিল তখন তাদের বাসায় বাইশ বছরে মরে যাওয়া এই কবির একমাত্র কাব্যগ্রন্থটা ছিল। স্কুলে ক্লাশ এইটে উঠে সে এই বই থেকে ‘দেশলাই’ কবিতাটা আবৃত্তিও করেছিল— “আমি একটা ছোট্ট দেয়াশলাইয়ের কাঠি, এতো নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়িনা, তবু জেনো মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ— বুকে জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছাস”। ‘ছোট্ট’ শব্দটার ওপর জোর দিতে গিয়ে চোখ সরু করে মধ্যমা, তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুলের সম্মিলক একটা ভঙ্গী দেখাতে বলেছিলেন তাদের বাংলার স্যার। তারপর থেকে নিধি’র মা বুকের মধ্যে জ্বলে উঠবার উচ্ছাস অনুভব করতো, কিন্তু কিভাবে জ্বলে উঠবে তা বুঝে উঠতে পারতো না। সুকান্তের কবিতা তাড়িত সেসব দিনে সে দেখেছে— লিলি মালিহাদের মা প্রায়ই রেললাইনের ধারটায় এসে বসে থাকতো। শীর্ণকায়, আলু থালু, ঢলঢলে ব্লাউজের ধার গলে ঝুলে পড়া স্তনের খানিকটা দেখা যায়। ভেতরে লুকানো তার আর্তনাদ নির্নিরোধ বন্যার মত প্রকাশ হয়ে পড়তো। আসলে মহিলা হয়তো আদৌ তা লুকিয়ে রাখতে চাইতেন না। লোকালয় যে বেদনার প্রকাশ গ্রহণে অনভ্যস্ত, তার বাঁধ দূরের গোচরে এনে ভেঙ্গে দিতেন উনি। স্কুলে যেতে আসতে নিধির মা আর তার সহপাঠিদের মন বিষণ্ন করে দিতো সেই উন্মুক্ত শোকচর্চা।

কত সহপাঠিদেরকে তার ছেড়ে আসতে হয়েছে, নয়তো তারা ছেড়ে চলে গেছে অবিভাবকের বদলীর চাকরীর সুবাদে। নিধি’র মা কেন যেন সবার নাম আর অবয়ব এক সঙ্গে মিলিয়ে মনে করতে পারে না। কারো মুখ জ্বলজ্বল করে, কিন্তু সেখানে একটা নাম সেঁটে দিতে গেলে দ্বিধার মুখে পড়ে যায় সে।

তমালিকার ঘরে তৈরী ক্যারামেল পুডিং আর মুচমুচে পেয়াজুর সুখী ঢেকুর তুলতে তুলতে অনুপের সঙ্গে তারা গল্প করে। নিধি তার রং করার খাতা নিয়ে কোনার ছোট্ট টেবিলে গোজ হয়ে থাকে।

-‘আপনাদের মেয়েটা খুব কম কথা বলে?’

বাবা মা’র আড়চোখ নিধির পিঠে গেঁথে থাকে। কিছু অচেনা শব্দ ঘরের সবাইকে চুপচাপ ধাওয়া করে।

-‘আসলে কি বলবো, লুকানোর কিছু নাই, ওকে দেখলে বুঝা যায় না, একটু লার্নিং ডিসেবিলিটি আছে’, নিধির বাবা গলা খাকারী দেয়— ‘ আমরা ওকে কোন থেরাপিষ্টের কাছে নিবো ভাবতেছি, আর আমাদের দেশে এইসব সার্ভিস কই বলেন, রাশিয়াতে শুনেছি স্পেশাল গাইডেন্স টিচার এইসব আছে,…’ বাবা হঠাৎই উচ্ছসিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক দেশের ইত্যকার সুবিধাদির পাতা খুলে বসলে নিধি’র মা’র ইষৎ অস্বস্তি শুরু হয়। নিধির তো সবই স্বাভাবিক, সব ঠিক। শুধু অক্ষর মালা আর সংখ্যা গণনা শিখতে দেরী হচ্ছে (এত অল্প পরিচয়ে ওর বাবা এমন খোলা মেলা না বললেও তো পারে!)

-‘ইন্ডিয়া’তে গিয়ে দেখতে পারেন, কাছের দেশ, চিকিৎসাও সস্তা’—তমালিকা বলে।

-‘আসলে ইউ এস এ তে এইসব ট্রিটমেন্ট সবচেয়ে ভালো হয়’, অনুপের জানার পরিধি বেশী, ‘শিশুমনস্তত্ব নিয়ে ওদের কত রিসার্চ এইসব সাবজেক্টের উপরে, মাই গড! কোনভাবে দেখেন এইটা সম্ভব হয় কিনা। তার আগে অবশ্য ভালোভাবে খোঁজখবর করে…’ তেলেভাজা মুখের ভেতরে গলে এলে ইউ এস এ’তে নিধি’র চিকিৎসা সম্ভাবনা বিষয়ে কথা আর আগে বাড়ে না। নিধির প্রসঙ্গে সামান্য অপ্রতিভ বোধ করলেও এই দম্পতিকে ভালো লেগে যায় নিধির বাবা মা’র।

ঘরের আলো নিস্প্রভ হয়ে ওঠার আগে কি বিবেচনা করে অনুপ সেদিন স্বতঃপ্রনোদিত হয়েই তার কবিতার খাতা খুলে বসে। তাদের সামনে জীবিত সমুজ্জল কবি! নিধির মা’র তবু হতবিহবল লাগে না, বলে— সে কবিতা বোঝে না। অল্প ভদ্রতা করে বলে— ‘আরেকটা পড়েন’।

অনুপের খাতাভর্তি কবিতা। আর শোনাবার মত শ্রোতা (শোনার বিনিময়ে ঘরে তৈরী খাস্তা নাস্তা) পেয়ে মহা উৎসাহী হয়ে যায়। অতগুলো কবিতা পাঠ থেকে নিধির বাবার কোনটাই মনে থাকে না, তবে নিধির মা দু’তিন লাইন মনে রাখতে পেরেছে।

নিধি যখন নদীর পাড় জুড়ে ভেজা বালি চেপে চেপে খেলে, ওর মা ভূবন উজানো বাতাসে আঁচল সামলাতে সামলাতে সেদিন অনুপের কাছ থেকে শোনা কবিতার লাইনগুলি আওড়ায়— বার বার বলে। এক পর্যায়ে নিধির বাবা অসহিষ্ণু হয়ে কোকড়া চুল ঝাঁকালে সে নাচার হয়ে বলে—‘কি করি মাথা থেকে যাইতেছে না তো’! মাথা থেকে কবিতা বের করতে অন্য কিছু ভাবতে হয়। অন্যকিছু, অন্য কোন কথা। কিন্তু অন্যকিছুর কথা ভাবতে গেলে নিধি’র মা’র ছোট্ট জীবনের সামনে কেবল যৎসামান্য শূন্যতার ছবি ভাসে, সে শূন্যতার আশে পাশে তার একহারা দিন রাত, ফ্যাকাশে, রঙ কম। চোখ বন্ধ করে বেনীআসহকলা ধরার অসহায় চেষ্টা পেয়ে বসে তাকে।

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস- ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ- ‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।