যশোধরা রায়চৌধুরীর একগুচ্ছ কবিতা

নাও

যখন বেরুলাম আমরা, তখন ছিল জোয়ারের সময়।
নৌকো বাঁধা হল যেখানে, জল সেখান থেকে অনেক নিচে।

নাইয়া বলল, রোসো।

সরু ফিনফিনে একটা কাঠের তক্তা
সে পেতে দিল একেবারে জেটি থেকে নৌকো অব্দি

কাঠের তক্তার গায়ে খাঁজ কাটা কাটা।
আরো সরু সরু সব তক্তা বসিয়ে বসিয়ে তোইরি এই আশ্চর্য সিঁড়িখানা
নিচে টলমল করছে জল
ঘোলা জল
জলের তল দেখা আমার সাধ্য কী

এই তক্তাটুকু সম্বল।
আমার শরীরের ভার এ তক্তা বইবে কীভাবে
জানা নেই
জানা নেই
নড়বড়ে পচা বাঁশের বেড়ার
এই যে জেটি, মচমচ করে উঠছে,
সকাল বিকেল জোয়ার খাওয়া এই পলিপড়া জেটিটিও
আমার শরীরকে বইবে কীভাবে

আমি দাঁড়িয়ে। তুমি বললে–
এখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকেনা
এখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে নেই
এখানে নৌকোয় উঠবার কথা ভাবতে নেই

নৌকোয় উঠে পড়তে হয়।

পলকা ওই তক্তার ওপর দিয়ে
শরীরকে বানিয়ে নিতে হয় হালকা
নিঃশ্বাস যতটা সম্ভব চেপেচুপে
হাওয়াবাতাসের তোয়াক্কা না করে

এক পা এগিয়ে দিতে হয়
অন্য পা রাখতে হয় স্থির
তারপর অন্য পা এগিয়ে দিতে হয়

এটাই তক্তার ছন্দ
ডরনা মানা হ্যায়
সোচনা মানা হ্যায়

এই ত তোমার এগিয়ে দেওয়া পা
শূন্যে রেখ না বেশিক্ষণ
হিম্মত কর
এগিয়ে যাও

মাত্র চার পা
অনন্তকাল
তলায় ঘোলা জল

দুঃস্বপ্নে বার বার দেখা সেই আগুনের নদী
আজ ঘোলাজলের নদী

আর তুমি
নাইয়া
তোমার বাড়িয়ে দেওয়া হাত
এইসব কিছু পলকে অতিক্রম করায়
তোমার গলা কানে বাজছে
ডরনা মানা হ্যায়
হিম্মত করো জী।

 

আনন্দসন্ধানী

দুইহাতে দুই রকম নশ্বরতা রাখি আমি আনন্দসন্ধানী
একদিকে চর্মরোগ অন্য দিকে ব্যাধির সাবান
এক দিকে ক্রিয়া কর্মে মনোযোগ অন্যদিকে বিন্দু বিন্দু হারানো সময়
ভাল না লাগার মত দিনকাল, গর্তে ঢোকা বিগতপ্রণয়।

কে কাকে সততা দাও, কে বা দাও ব্যথায় আঘাত
কে কাকে মন্ত্রণা দাও কে বা রাখ যত্নভরা হাত।

হে আলো বাষ্পাকুল,
হে আনন্দ, খনি
আমি যদি প্রকৃত প্রেমিক, পরিশ্রমী,
উপভোগ যা যা করি, পূর্ণ করে দাওনি তখনি?

 

অনাহতের গান

এখনো মেলা বসে, মেলায় ঝুরিভাজা পাঁপড় স্তূপে রাখে নরম লোক
শিশুরা কালোকোলো ভিড় জমায় চোখখিদের ঝোঁকে: আরো পেঁয়াজি হোক
এখনো ফেলা রসে প্যাঁচালো জিলিপিরা ফুলের মত ফোটে, ঝাল নরক
তেঁতুলজলে ডোবে প্রাণের অংশ যা, আলুর চোখাসহ লঙ্কা ভোগ…

এবার গাছপালা কিছুটা দূরে গেল, সাইকেলের বাঁকে বসেছে মেয়ে
এবার ধু ধু মাঠ, এবার হাই রোড, এবার টানা পথ, আকাশ ছেয়ে
এসেছে মসৃণ জেটের মত মেঘ, এসেছে বাতাসের দারুণ ধার
এসেছে অ্যাসিডের বৃষ্টি সবজেটে, এসেছে থোড়পোড়া ছাইয়ের ক্ষার…

এখন গ্রাম থেকে শহরে চলে যায় ক্ষুরের মত সেই লৌহপাত
এখনো গ্রাম গ্রাম, শহরও কী শহুরে , মধ্যে উঁচু টেলিটাওয়ার, রাত
এখনো প্ল্যাটফর্ম, এখনো স্টেশনেরা, শান্ত পড়ে থাকে, শূন্যপুর,
এখনো ট্রেন যায়, ট্রেনের ব্রেন থেকে টপটপায় কিছু অন্ধ সুর…

 

বৃষ্টি নামে

বড় বড় ফোঁটা নামে, বৃষ্টি নামে সহস্রধারায়
নিজেই নিজের মধ্যে মূর্ছিত হয়েছি অতএব
আবেশে মন্দ্রিত হয় মাটি আর বৃষ্টির কামনা
এমন দিনটি ভাল, সঙ্গী কিন্তু প্রয়োজন নেই

এমন দিনেই তারে না বলা কথাটি বলা ভাল
বাজে সেটি মনোমাঝে, আর
সে ফাটা রেকর্ড বেজে গিয়ে
সুবিশাল চার্জ আসে, আসে এক অঢেল প্রণয়
নিজেই নিজের মধ্যে সে প্রণয় পাক খেয়ে ফেরে

তারপর গান আসে, ভবদেহে স্বর্গীয় সঙ্গীত
বড় বড় ফোঁটা নামে, আবেগের, রতি উৎপাদনে
আমাদের ক্লান্তি নেই, একা একা শিহরিত দেহে
বৃষ্টি ভিজলে “ঘরে যাও, ঠান্ডা লাগবে” একথা বলার
কেউ না থাকাটি ভাল, বিবাদভঞ্জন

আরো ভাল যুগপ্রয়োজনে
নিজচক্ষু নিজকর্ণ নিজহাত নিজঠোঁট নিজবুকে চুম্বন ঝরানো।

 

হেমন্তের কবিতা

যে প্রিয় ঋতুর কথা বলি, সে ঋতুর নাম হেমন্ত, না জীবনানন্দ?
যে প্রিয় গানের কথা বলি, সে গানের নাম হেমন্ত, না চিরবসন্ত?
গান ছাড়ুন, কবিতার কথা বলুন… তা, জীবুদা
আমার ঋতুটা যে আপনি নিজের করে নিলেন, এটা কি ঠিক হল?
ধানকাটা মাঠ আমার নয় অবশ্য, পাখির পায়ের মত শীত শীত কুয়াশাও নয়।
তাহলেও পড়ে থাকে অনেক, অনেক।
সেইসব পুজো মুছে ফেলা স্লেটে ধূসর অ্যানুয়াল পরীক্ষার পড়াগুলো থাকে,
ঝুপ করে নেমে আসা অন্ধকার থাকে। আশা ভোঁসলে আর রাহুলদেব বর্মণ থাকে,
কত বিকেল, বিকেল মুচড়ে সন্ধে
আমার জন্য নিচু নিচু ধোঁওয়ায় চোবানো, ফগলাইটে মাখানো মনখারাপ এনেছিল
সেইসব দিনরাত্রি, না না, সেই সব বিকেলসন্ধে শুধু আমার, আমার।
কী বিস্বাদ বিষণ্নতার।

হে কার্তিকসন্ধের বালিহাঁস, তোমার বিলাপী, নিষাদচোঁওয়ানো চীৎকার আর শুনিনা
মাথার ওপর চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে তুমি ডাকো না হারানো সঙ্গীকে
হে কলকাতার ভারি নভেম্বর, তোমার ঘোলা চোখে তাকানো আমাকে আর ব্যতিব্যস্ত করেনা।
নেটওয়ার্ক ফেঁশে ঝুলে থাকা কত না একাকী ঝুঁকে পড়া মানুষের হেমন্ত আজ।
আমার বয়ফ্রেন্ডহীন কৈশোর , আমার একাকী হোমওয়ার্ক, আমার মাথা থেকে
সড়সড় করে বুকে নেমে যাওয়া মনখারাপগুলো
সব আমার, আমার ছিল, এখনো আছে।
আমি তাদের রেখেছি আমার নিজস্ব হেমন্তের ভল্টে…
সেই ভল্টে জীবনানন্দকে রাখতে দিইনি কিছু।
সূর্যডোবার পর থেকে
শীত আসার আগে অব্দি
যেসব মেয়েরা রাস্তায় হাঁটে ফেটে যাওয়া রেক্সিনের ব্যাগ হাতে,
সড়সড় করে পাতালরেলের গলিপথে নেমে যায়
আর উঠে আসে নির্জন মফস্বলের ফাঁকা প্লটের ধারে, ঘেয়ো কুকুরের ভয়ে জড়োসড়ো চলে
এখন আমার হেমন্ত সেরকম হয়ে গেল কেন, জবাব দিন
হেমন্তদা, জীবনানন্দদা…

 

বাড়ি যাব

রাশি রাশি ঢেউ এসে বলে তাকে বাড়ি যাব বাড়ি যাব
আকাশের পেলব নীলের মধ্যে ফুটে ওঠা রোদ্দুরও বলেছে
বাড়ি যাব বাড়ি যাব আমি
একদা নিবিড় দিনে প্রেমিকের উষ্ণতার হাত
সেও ত বাড়ির লোভ দেখিয়েছে তাকে

বাড়ি যাব বাড়ি যাব বাড়ি যাব আমি

ঘুমের ভেতরে যেন ভেঙে পড়ে ঝুপ ঝুপ পাড়
সরু দড়ি ধরে আর বাঁশের সেতুটি ধরে পারাপার হয়
মধ্যে তীক্ষ্ণ নদী ভেসে যাওয়া পাথর পাথর
বাড়ি যাব বাড়ি যাব এই সেতু পার হলে বাড়ি

ঘুমের ভেতরে যেন দিকে দিকে আগুন জ্বলেছে
তুমুল আকাশ থেকে বার বার এল বজ্রপাত
পুরনো হারানো ঘর নব নব ঘর হারানোকে
জাগিয়ে উজিয়ে দিয়ে পথ করে দিয়ে চলে গেছে

এই ত আবার আমি উদবাস্তু হয়েছি , পথে পথে
এই ত আবার আমি কেঁদে কেঁদে ফিরেছি ভিক্ষায়
বাড়ি যাব বাড়ি যাব বাড়ি যাব বাড়ি যাব বলে

 

যশোধরা রায়চৌধুরী

যশোধরা রায়চৌধুরী, জন্ম ১৯৬৫, কলকাতা, দর্শনে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর, কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরে। কবি ও গদ্যকার। পণ্যসংহিতা ( ১৯৯৬) প্রথম গ্রন্থপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে পরিচিতি।

কৃত্তিবাস পুরস্কার ১৯৯৮ ও বাংলা আকাদেমি অনিতা সুনীল কুমার বসু পুরস্কার ২০০৬। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১৫ গল্পগ্রন্থ ও নিবন্ধগ্রন্থ বেশ কয়েকটি। অনুবাদ করেন মূল ফরাসি থেকে। বিবাহসূত্রে ফরাসি ভাষাবিদ তৃণাঞ্জন চক্রবর্তীর সংগে আবদ্ধ।

 

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।