চলচ্চিত্রের প্রিয় মুহূর্তরা

ফুয়াদ হাসান 

প্রত্যেকের কিছু প্রিয় গান আছে, আছে প্রিয় কোন কবিতা বা চলচ্চিত্র। আবার বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলে এমন দাঁড়ায় গানের কোন একটি লাইন, কবিতার কোন একটি পঙক্তি অথবা সিনেমার একটি দৃশ্য যা আমাদের মনে বহুদিনের জন্যে দাগ কেটে থাকে কখনও জীবনভর। অথবা এমনও হয়, –ঐ কবিতা, উপন্যাস বা সিনেমাটা সেই অর্থে খুব একটা পছন্দের নয় কিন্তু কবিতার সেই পঙক্তিটা, উপন্যাসের এমন চরিত্র বা কোন চলচ্চিত্রের বিশেষ দৃশ্যটা এমনভাবে মনে গেঁথে যায় সেখান থেকে কোনভাবেই যেন আর বের হওয়ার উপায় থাকে না। মরমী গানের কোন অন্তরার মত মরমে বাজতেই থাকে।

‘প্রতিটি মুহূর্তই একেকটি স্বতন্ত্র মহাবিশ্ব, চিরতরে হারিয়ে যায় ঠিক পরের মুহূর্তে ‘– [Milan Kundera / The Art of the Novel] কুন্ডেরার কথাটা শিল্পের জন্যে যেন জীবনের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। একজন শিল্পী সেই বিশেষ মুহূর্তের জন্যেই অপেক্ষা করে সারাজীবন। একজন পাঠক বা দর্শকও। শিল্প প্রকাশ হওয়ার পর তা যে শাখায় হোক না কেন তা আর নিজের থাকে না, হয়ে যায় শাশ্বত। এক-একজন সাধারণ এক-একভাবে নেয়, এক-এক জায়গা থেকে, এটাই শিল্পের অসাধারণত্ব! চলচ্চিত্র যেহেতু তুলনামূলক বেশিজনের সাথে যোগাযোগ স্হাপন করতে পারে সে কারণে এটা অনেকবেশি সার্বজনীন। আজকের দিনে এসে চলচ্চিত্রের নানা ধারা, উপধারা থাকতে পারে সেসব নিয়ে হয়তো চলচ্চিত্র-শিল্পবোদ্ধারা আলোচনা করবেন কিন্তু একজন আম দর্শকের কাছে সে-সব দর্শনের চেয়ে মূহুর্তের ভালোলাগাটুকু অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র অপু-দূর্গার মাঠ,কাশবনের পেরিয়ে ছুটন্ত ট্রেন দেখার দৃশ্য রীতিমতো আমাদের শৈশবের বিজ্ঞাপন হয়ে গেছে আর বড় হওয়া সেই অপুর বাসে দাঁড়িয়ে বা রাস্তায় হেঁটে যেতে-যেতে স্ত্রীর পত্রখানা পড়ার অংশটুকু যেন অপরাজিত যৌবনের প্রতীক।

উঠোনে কাপড় শুকাতে দিচ্ছে মা, তার আঁচলের আড়ালে ছোটবোন, মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে আনু মেলা থেকে বোনের জন্যে একটি মাটির ময়না নিয়ে আসে এবং বাবা যেন না জানে সেই মত হাতে গুজে দেয়। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যটাও অনেকখানি আলোড়িত করে। খুব বেশি সংলাপ নেই কিন্তু সবকিছু মিলে সময় ও সমাজের ছবিটাকে তুলে আনার এই দক্ষতা সকলের থাকে না। ছোটখাটো এইসব বিষয়গুলো একটি সিনেমাকে আলাদা করে তোলে। গল্প তো প্রায় সব একই কিন্তু দেখা বা দেখানোরই যত পার্থক্য।

অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘জাপানিজ ওয়াইফ’ আপাত দৃষ্টিতে বিরক্তিকর, একঘেয়ে প্রেমকাহিনী কিন্তু না-দেখা প্রেমিকের মৃত্যুর পরে জাপানি মহিলাটি যখন শাদাশাড়ি পরে সেই অজপাড়াগাঁয়ে এসে উপস্থিত হয় তখন তা অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায় দর্শককে বা আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের ‘আসা যাওয়ার মাঝে’র নাগরিক জীবনের টানাপোড়েনে চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীর খুব অল্প সময়ের প্রেমের খুনসুটি।

অনেক সময় কোন সংলাপ নেই শুধু দৃশ্যায়ন, সেই সিনোমোগ্রাফি বলে দেয় অনেককিছু। একটু আলো-অন্ধকার, হয়তো কোন সুর বা দৃশ্য বা একটি মুখ। প্রসঙ্গত মনেপড়ছে, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’র একটি দৃশ্য; যেখানে কমবয়েসি বিধবা ঐশ্বরিয়া রাইয়ের যৌবন বোঝাতে সাদাশাড়ি পরে বসতে গিয়ে রক্তিম দাগ রেখে পলায়ন এবং এক মূহুর্তে বৃষ্টির জলে তা বিলিন হয়ে যাওয়া! ঋতুবতী হওয়ার দৃশ্য কী নিপুনভাবে, কতটা যত্নের সাথে তুলে এনেছেন ঋতুপর্ণ।

এই যোগ্যতা, এমন চোখই একজন নির্মাতাকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করে। সেই কারণে একই কাহিনী নিয়ে চিত্রিত হলেও ভিন্ন ভিন্ন নির্মাতার কাছে তা আলাদা রূপ ধারণ করে। তাই কী–‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ চলচ্চিত্রটির পরিচালক ভিত্তোরিও ডি সিকা বলেছিলেন, ‘Take the camera out into the streets’। অর্থাৎ একজন বড় মাপের চলচ্চিত্রকার অনেক দিকে চোখ রাখতে হয়, বড় করতে হয় চোখের ক্যামেরা, চিন্তার ল্যান্স। লংশটে থাকলেও বাজপাখির মতো দূর থেকে শিকারের দিকে মনোযোগী দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হয় প্রতিটি ক্ষণে বা ক্লোজশটে হতে হয় পিঁপড়ের চেয়েও যত্নবান।

‘মাস্টার অফ সাসপেন্স’ খ্যাত হিচককের সাদাকালো ‘সাইকো’র স্নানের দৃশ্যটা এখনও কী রঙিন। দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা ধরে রাখতে কত কীই না করেছেন তিনি। রবার্ট ব্লখের উপন্যাসের স্বত্ত্ব কেনার পর বাজারে এই উপন্যাসের যতো কপি ছিলো তা-ও কিনে নেন হিচকক। কারণ তিনি চেয়েছিলেন, ছবির গল্প যেন কেউ জানতে না-পারে। হিচকক এই ছবি চলার সময় নিয়ম করে দিয়েছিলেন, কেউ ছবি শুরু হওয়ার পর হলে ঢুকতে পারবে না। সে সময় ছবিঘরে যে কেউ যে কোন সময় ঢুকে পড়তো। ছবিতে যেহেতু অন্যতম তারকা জেনেট লেই ছবি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই মারা যায় – তাই এই নিয়ম করেছিলেন। অন্যদিকে গল্পের ক্লাইমেক্স ধরে রাখতেও নিয়মটি বেশ কাজ দিয়েছিল; অথবা তাঁর এই অতি বাড়াবাড়ি দর্শকদের আরও বেশি হলমুখো করেছিল!
আবার অনেক সময় এমন কোন দৃশ্য নয় শব্দই চলচ্চিত্রটাকে অনন্য করে তোলে।

পথের পাঁচালীতে ভাই-বোনের বৃষ্টিতে ভেজার চিরায়ত বাঙালিআনার সময় সুরটা যেন কোথায় গেঁথে যায় তখনই মনে পড়ে ছবিটার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন, রবিশঙ্কর। বৃষ্টির এমন এক আলাদা মেজাজ দেখা যায় ‘লগন’ ছবির একটি গানেও। এ আর রাহমানের সুরে মনে হয় যেন মেঘ ভেঙে পড়বে; বৃষ্টিধারায় ধরা শুচি হওয়ার পাশাপাশি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব অন্যায়-অবিচার।

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘তিতলি’ ছবির শুরুতে ঋতুপর্ণেরই কথায়, দেবজ্যোতি মিশ্রের সুরে, শ্রীকান্ত আচার্যের গাওয়া ‘মেঘপিয়নের ব্যাগের ভিতর’ গানটা আবহকেই অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’র সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে ধীরে ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশনাটা, তখনও কিন্তু গানটি জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠেনি!

তাই বলছি, একটি সুরও অনেকসময় ছবিকে প্রতিনিধিত্ব করে। মগজের ভেতর একদম ঢুকে যায়, আঘাত করে আবেগানুভূতির দেয়ালে। যেমনটি হয়েছিল ওং কার-ওয়াই-এর ‘ইন দ্যা মুড ফর লাভ’ ছবি দেখার অভিজ্ঞান। সিনেমা শেষ হওয়ার পরও কোথায় যেন সেই মিউজিক বাজে, বাজতেই থাকে! তাকে থামানো যায় না কিছুতে।

সেজন্যে এটা এতো শক্তিশালী মাধ্যম। যেন কবিতার মতো, কখনও বা ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। কেউ কেউ হয়তো সেই প্রশান্তিটুকু খুঁজে বেড়ায় এই বিনোদন মাধ্যমে। কারণ এতো কিছুর মিশেল আর কোন শিল্পমাধ্যমে পাওয়া যায় না। কবি ও নির্মাতা বুদ্ধদেব দাসগুপ্তকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কবি হওয়ার কারণে কী তাঁর সিনেমায় এমন কাব্যময়তা খুঁজে পাই আমরা? উত্তরে তিনি যাই বলুক না কেন, কবি হওয়ার কারণে তাঁর ছবির চিত্রকল্পগুলো যে অন্য মাত্রা পেয়েছে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

আব্বাস কিয়ারোস্তামী নিজের চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি কখনই আমার দর্শকদের ঘুমের প্রশান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি। আমি সেই সিনেমাগুলোকে পছন্দ করি যেগুলো সিনেমা হলে দর্শকদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না, আবার সেই সিনেমাই হয়তো হঠাৎ করে রাতে জাগিয়ে তোলে কিংবা সকালবেলা ঘুমটা ভাঙ্গায়।’
অথচ কিং কি-দুকের ‘ত্রি-আয়রন’ দেখার সময় একটা মূহুর্তের জন্যেও চোখ সরাতে পারিনি, এ কেমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি! রোলার কোস্টারের মত এমন গতিময়, বাঁধভাঙা প্রেম খুব একটা দেখা যায় না।

কোরিয়ান চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ কিম কি-দুকের প্রসঙ্গ আসতেই মনে হলো,’দ্যা বোঁও’ ছবির কথাও। দোলনায় নায়িকা দুলছে আর বুড়ো নায়ক নিখুঁত গন্তব্যে তীর ছুড়ছে কিংবা, ‘পিয়েতা’র মাতৃত্বের আকূতি, ‘দ্যা ইস্লে’র মাছ ধরার বড়শির বহুমাত্রিক ব্যবহার অবাক করে কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মনে বেশি দাগ এঁকেছে, –’স্পিং, সামার, ফল,উইন্টার… এন্ড স্পিং’ ছবির বেশকিছু দৃশ্য, এমনকি সিনেমাটার সেটও! লেকের ওপর যেই সেট বানাতে গিয়ে কোরিয়ান সরকারের অনুমতি নিতে হয়েছিল পরিচালককে। কাহিনী নয় শুধু ঋতু পরিবর্তন ভেদে জীবনকে দেখার দার্শনিকতা কোথায় যেন নিয়ে যায় আমাদের।

ঋত্বিকের ‘অযান্ত্রিক’ ও বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের ‘চরাচর’ও আলাদা ভাবনার জগতে ডুবিয়ে রাখে দর্শককে, যা দেখার সময়টুকুর বাইরে গিয়ে চিরন্তন আবেগের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। যেখান থেকে কোনভাবেই বের হতে পারি না আমরা। একজন নির্মাতার এর থেকে বড় সফলতা আর কী হতে পারে,ললং সিনেমাটা শেষ হওয়ার পরও যদি তাকে নিয়ে ভাবতে হয়, আগলে রাখতে হয় সেই অনুভূতি।

‘অযান্ত্রিক’ সত্যিকার অর্থে ভাবনার স্বতন্ত্র ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রে। এভাবে কেউ এর আগে ছবি নির্মাণ করতে পারেনি বা পারবেও না। যন্ত্রকে এমন মানবিক রূপে চিত্রায়ণ করা একমাত্র ঋত্বিক ঘটকের পক্ষেই সম্ভব। যখন নায়ক অবশেষে রাগ করে তার জীবনের চেয়ে প্রিয় গাড়ির সবটুকু ভেঙে ফেলে, একটি বাচ্চা ভেঁপুটা নিয়ে ছুটে চলে যায়। এতো মননের ঘরে বাঁধিয়ে রাখার মতো দৃশ্য। ‘সূবর্ণরেখা’র খদ্দের দাদার সামনে যখন বোনটি এসে দাঁড়ায় বা ‘মেঘে ডাকা তারা’য় দাদাকে জড়িয়ে ধরে নীতার কান্না–
“দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমি যে বাঁচতে বড় ভালবাসি। দাদা, আমি বাঁচব। দাদা, আমি বাঁচব।” দৃশ্যগুলোকে কীভাবে উপেক্ষা করি!
তাঁর কথাগুলোকেও বাতিল করি কী করে!
“আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, It is not an imaginary story, বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসি নি। …যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েনেট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টকে যদি আপনার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।”

ফেদ্রিকো ফেলিনির ‘এইট এন্ড হাফ’ ছবির শুরুর দিকের তিন-চার মিনিটের কথা অনেকে বলেন। এ যেন কাচের ব্রিজ দিয়ে হাঁটার উত্তেজনা। কিন্তু ইতালীয় পরিচালক রবার্তো বেনিইনি নির্মিত ও কেন্দ্রীয় চরিত্রে তাঁকেই দেখতে পাওয়া ‘লাইফ ইজ বিউটিফুলে’র শেষদিককার দৃশ্যটা নিয়ে কী বলা যাবে! বন্দি শিবিরে আটক পরিবারের কর্তাকে মেরে ফেলবে বলে নিয়ে যাচ্ছে সৈন্যদল, সবকিছু জেনেও যুদ্ধ না বোঝা সন্তানের সঙ্গে পিতা খেলছেন, মজা করছেন… দৃশ্যটি চোখ থেকে মুছে গেলেও মন থেকে মুছে ফেলার সাধ্য কই!

ইসাও তাকাহাতার ‘গ্রেভ অব দ্যা ফায়ারফ্লাই’ জাপানের পারমানবিক হামলার ধ্বংশযজ্ঞ ছাপিয়ে দুটি শিশুর জীবন সংগ্রামই বড় হয়ে ওঠে। তবে বেশি আকর্ষণীয় ছিল, ভাইবোনের জোনাকি ধরার দৃশ্যেরা। মৃত জোনাকিদের কবরে এপিটাফ লেখা এবং দিনদিন সেই সংখ্যা বাড়তেই থাকে, পারমানবিক তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে একসময় সেই দলে ছোট বোনটিও যুক্ত হয়। জোনাকিদের পাশে বোনটিকেও কবর দিয়ে এপিটাফ লেখা। আসলে নির্মাতা এখানে সব মানুষকে জোনাকি বানিয়ে দিয়েছেন, না জোনাকিকে মানুষ!

আবার ফার্নান্দো মেইরেল্লেসের ‘সিটি অফ গডে’ যখন শিশু থেকে শহরের সবচেয়ে বড় ডন হয়ে ওঠা মাস্তানটিকে খেলার ছলে আরেক উঠতি গুন্ডাশিশু গুলি করে মেরে ফেলে–তা আমাদের অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই শিশু তো আর মাজিদ মাজিদির ‘চিলড্রেন অব হেভেনে’র নালায় পতিত ছোটবোনের মলিন জুতার পিছু ছোটা বালকটি নয়, নয় ‘দ্যা কালার অভ প্যারাডাইজে’র প্রকৃতির বুকে প্রতিবন্ধী শিশুটির নির্মল আনন্দ অথবা খুব স্বচ্ছ হর্ষে নিজেদের তৈরি ককসিটের গিটার দিয়ে রক এন্ড রোল হওয়া রিমা দাসের অসমীয়া ছবি ‘দ্যা ভিলেজ রকস্টারে’র রকস্টার। এসবের বাইরে উঁকি দেয় তুর্কী পরিচালক মাহসুন কিরমিজিগুলের ‘মুজিজে'(দ্যা মিরাকল)-এ ক্লাসরুমে শিশুদের সাথে প্রতিবন্ধী মানুষটির কাগজের প্লেন উড়ানোর দৃশ্য বা রবার্ট জেমেকিসের ‘ফরেস্ট গাম্প’ ছবির প্রায় একই রকমভাবে সমাজের চোখে প্রতিবন্ধী নায়ককে স্কুলের দুষ্ট ছেলেদের কাছ থেকে পালানোর সময়ে বান্ধবীর, ‘গো ফরেস্ট গো…’ উদ্দীপক বাণী।

ইতালীয় পরিচালক জুসেপ্পে তোর্নাতোরের ‘মালিনা’ পুরো সিনেমা জুড়ে নানা কল্পনা ও চেষ্টার পর বালকটি যখন শেষপর্যন্ত মালিনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়, তা নিশ্চয়ই মনেরাখার মত ঘটনা। সেই দৃশ্যের পাশে রাখা যেতে পারে ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর ‘ফড়িং’কেও। বয়ঃসন্ধির একইরকম ফ্যান্টাসি এই ছবিরও মূল উপজীব্য। বিশেষ করে জেলখানায় শিক্ষিকা দোয়েল মানে সোহিনী সরকারের মুখোমুখি হয় যখন সেই ফেল্টুমার্কা ছাত্রটি, তখন তো সে অন্য এক কিশোর! কাছাকাছি স্তেফেন দালদ্রির ‘দ্যা রিডার্স’-এ কিশোরটির বাথরুমে, বিছানায় নানা ভঙ্গিতে কেট উইন্সলেটকে বই পড়ে শোনানোর দৃশ্যায়ন। এ ধরনের ঘটনাপ্রবাহ ও নির্মাণশৈলী নিশ্চয়ই সাহসী ও আলাদা আলোচনার দাবি রাখে।

নিক ক্যাটাভিটসের ‘দ্যা নোটবুক’ বা কোয়াক জে-ইয়ং-এর ‘দ্যা ক্লাসিকে’র কপোত-কপোতীর জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে ছুটে বেড়ানোর পাশাপাশি কী করে ভুলি রোমান্টিক ঘরানার ইরানি চলচ্চিত্র ‘বারানে’র কথা। অন্তত এর শেষ দৃশ্য বারান মানে বৃষ্টি হচ্ছে, সব ছেড়ে অজানায় পথে চলে যাচ্ছে প্রিয়তমা তথাপি কিছু বলার সুযোগ নেই, শুধু কাদায় আটকে যাওয়া পাদুকা বুকে আগলে গাড়িতে তুলে দেওয়া ছাড়া, ময়লা জলে লেগে থাকা জুতার ছাপ সেও মিলিয়ে যায় ক্ষণিকের বর্ষণে। কী করুণ দৃশ্যকল্প, অথচ, আমাদের দেখা সেরা প্রেমের সিনেমার সাথে মাজিদ মাজিদির এই সিনেমার একবিন্দুও মিল নেই। এখানে নায়ক-নায়িকার মাঝে আবেগপূর্ণ স্পর্শ বা গতানুগতিক প্রেমদৃশ্য দূরে থাক নেই পরস্পরের মধ্যে একটি সংলাপও।

আবার চেটে নিচ্ছি, আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অব চেরি’র স্বাদ, যার সাধ ছিল নিজে-নিজে মরার কিন্তু বেচারা মৃতদেহটাকে কবরে শুইয়ে দেয়ার মতো একজন লোককেও খুঁজে পেলেন না, তাই… কিংবা, মোহসেন মাখমালবাফের ‘দ্যা প্রেসিডেন্ট’ ছবির শুরুর বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট ও তার পৌত্রের কথোপকথনের দৃশ্য। নিজের ক্ষমতা বোঝাতে বুড়ো বিদ্যুৎবিভাগকে ফোন করে প্রাসাদ ছাড়া পুরো শহর অন্ধকার করে দিতে বলে, তারপর আলোকিত, নাতি মজা পেয়ে নিজেই রিসিভার নিয়ে খেলাটি শুরু করে–অন্ধকার-আলো, অন্ধকার…, আর আলোকিত হয় না। সেখান থেকেই গল্পের শুরু। একই পরিচালকের

‘কান্দাহার’ চলচ্চিত্রের বিমান থেকে কৃত্রিম পা ফেলার দৃশ্য এবং যুদ্ধে পা-হারা মানুষের সেই সব পা খুঁজে নিতে পাথুরে উপত্যকায় সংশপ্তক ছুটোছুটি দেখার পর বহুবার তাড়া করে ফিরেছে! একইভাবে তাড়া করেছে দেশভাগ নিয়ে তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’র পরিবারটির সর্বস্ব হারিয়ে বাসে করে কলকাতায় পথে চলে যাওয়ার দৃশ্যটা।

জার্মান লেখক প্যাট্রিক সাসকাইন্ডের ‘পারফিউম’ উপন্যাস অবলম্বনে টম টাইকারের পরিচালনায় ‘পারফিউম: দ্য স্টোরি অফ অ্যা মার্ডারার’ ছবির নায়কের সেই ঘ্রাণ মেখে ভেনিস হয়ে যাওয়ার আগের মূহুর্তটা অনেকের মতো মুহূর্তের জন্য থমকে দিয়েছিল!

বং জুন-হো পরিচালিত ‘প্যারাসাইট’ ছবির দরিদ্র পরিবারের প্রতিটি সদস্যের টিকে থাকার নতুন-নতুন পদক্ষেপ সম্মোহিত করে রাখে, এই বুঝি ধরা পরে গেল কেউ একজন! তাঁর ‘মেমোরিজ অফ মার্ডারে’র সিরিয়াল কিলারকে ধরতে না পারার হতাশাও নায়কদ্বয়ের মত তাড়িয়ে বেড়ায়।

উইলিয়াম ওয়াইলারের ‘রোমান হলিডে’র জমকালো অনুষ্ঠানে রাজকন্যার অতিথিদের সামনে জুতা খুলে যাওয়ার ঘটনা; আকিরা কুরাসাওয়ার ‘দেরসু ওজালা’র খরকুটো তোলা এবং বাঘের মুখোমুখি হওয়া; আন্দ্রেই তার্কভস্কির ‘মিরর’ বা ‘নস্টালজিয়া’র কিছু পরাবাস্তব কাব্যময় দৃশ্য স্থিরচিত্র হয়ে যায় মানসপটে।

জামিএ উয়সের ‘দ্যা গড মাস্ট বি ক্রেজি’ ছবির নায়ক নসাউ টোমা যখন বিমান থেকে পতিত একটি কোকাকোলার বোতল কুড়িয়ে পায় এবং তা নিয়ে বুশম্যানদের ভেতর শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব– হাস্যরস ছাপিয়ে জীবনের গল্পই হয়ে ওঠে কিংবা সাদাকালো যুগের চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্যা কিডে’র ঝগড়ার কাহিনীটা মনের মেমোরি কার্ড থেকে কী করে মুছে দেই!

এ সবের ভেতর অনেক ফিল্ম মোটাদাগে খুব বেশি প্রিয় নয় কিন্তু বিশেষ দৃশ্যগুলোর কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আলোচনায়, অনুরূপভাবে অনেক প্রিয় সিনেমা আছে আলাদা করে যার একটি দৃশ্যও হয়তো সেই অর্থে মনে দাগ কাটেনি কিন্তু পুরোটা মিলে অন্য এক অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে, সে-সব গল্প হয়তো প্রকাশ করা বা বলার মতও নয়। সব কথা কি বলে বোঝানো যায়, না বোঝানো সম্ভব!

++++

ফুয়াদ হাসান

জন্ম: ২ নভেম্বর ১৯৭৯ সাল; ধূরুং, বিবিরহাট, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
মোবাইল : ০১৮১৯৬২৩৯৮৬।
ই-মেইল : [email protected]
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর। পেশা: শিক্ষকতা।
বাংলা বিভাগ, পতেঙ্গা সিটি কর্পোরেশন মহিলা ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
মানুষ মানুষ নয় হোমোসেপিয়ানস (২০০৪), রাফখাতার কাটাকুটি (২০১০),
অ্যা জার্নি বাই অ্যাম্বুলেন্স (২০১৮)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।