ফুয়াদ হাসানের ৫টি কবিতা

অনির্বাণ

মাটির নিচের সরাইখানায় বসেছে সকলে
মাতাল জুয়ারি যত বেইমান জাতে বেজন্মা
বজ্জাত কালা লুলা খোঁড়া খোজা নির্লজ্জের
সাথে অসভ্য ইতর বেহায়া হারামির দল

পাশার টেবিলে কেউ দান চুরি করে, বাইজির
হাত ধরে গালি দিয়ে বলে— নাচো, টেনে নিয়ে যায়
অন্দরে, শেষ না করে ছুড়ে মদের পেয়ালা
শিস দিয়ে ফিরে, খামোখা চেচায়, বাজায় বগল

আখরার রকে ঠকবাজ ঠকে রংবাজে রূপ
নেয়, একটুতে হামকো-তোমকো, এত দিনকার
রক্তগোসলে ধুয়েমুছে ছাই পাপের বর্ম

অপ্সরা এলে নিলামের ডাক ওঠে, মোহরের
আলপনা মেখে রঙিন হারেম, একজন জিতে
পরাজিত যারা শাস্তি কি জানা—পুনর্জন্ম

 

ট্রেকিং

গোছানো আছে বেকপ্যাক, মশারি, লাইফ জ্যাকেট
দড়ি, ছুরি, স্লিপিং ব্যাগ, জলবিশুদ্ধকরণ
বড়ি, ফাস্ট এইড বক্স, রেইনকোট, এইটুকু
ছোট তাবু, টর্চলাইট, চকমকি পাথর, পাত্র
শুকনা খাবার…,কিছু কি বাকি, সামনে ডেথজোন
ফিরে যাবে বেসক্যাম্প–অপার অপারগতায়!

এখানে এসবের কিছু প্রয়োজন হবে না জেনে
নেমে যেতে চেয়েছিলাম, কঠিনশীলা ছেদ করে
সকলে যখন উঠছে কৃত্রিম সিঁড়ি ডিঙিয়ে,
পতনই সহজতম? শেখরে ওঠা মানে চূড়া
নয়, পূর্ণতা আনতে পুনরায় শিকড়ে ফিরে
যেতে হয়, এই নিয়ম পর্বত আরোহনের।

নব অভিযাত্রীরূপে মাটির নিচের অন্য
এক হিমালয় মাড়ানো, সেও কম কি অনন্য!

 

ভাড়াটেরা চলে গেলে

ভাড়াটেরা চলে গেলে ভোরের গণিকা হয়ে পড়ে
থাকে সুনসান ঘর, অপরিচ্ছন্ন মেঝে, সাদা
প্রাচীরে পেরেক ঠোকা দাগ, ঝুলে ঝুল একগাদা,
বাচ্চারা এঁকেছে এলোমেলো বর্ণমালা, শোকে ঝরে
পলেস্তারা যেন কোন বয়েসী গাছের পাতা। শুচি
নামে বুঝি কোন দাম্পত্য কলহ নেই বলে! ইঁদুরের
স্বভাব বাতিল শিশি ভাঙে, ফেলে যাওয়া মানুষের
বিগত ক্যালেন্ডারের বুকে অবহেলা সূচি

নতুন কেউ বা এসে ফের মুছে দেয় ‘ঘরভাড়া
দেওয়া হইবে’ ফলক। শিশুর কান্নায় মুছে যায়
নৈঃশব্দ্য, কলতলায় আড্ডা জমে, ভোরস্নান সাড়া
হলে দ্রুত ঘরে ফেরে কেউ, হাসে…, পরশ্রীকাতরতা!
আগের ভাড়াটে মেয়ে উঠতো ছাদে মধ্যরাতে, কথা
বলতো আঁধারে, এখন ওঠে না কেউ পূর্ণিমায়!

 

সব লেখা হয় যদি

তবে সব লেখা হয় যদি এমনই কাল্পনিক
আদতে কেমন হবে? জীবনী অযুত পাশবিক!
বাস্তবতার নেশা কাঁদে মূঢ় সাজানো ভাগাড়ে
ঝাঁপিখোলা মন হাজারদুয়ারী বোবা কড়া নাড়ে,
যুবতী ধানের নৃত্য শুধু কি ধন— বৈষয়িক।

সব কথা হয় যদি এমনই বাঁচলিক
পঙক্তি বুননে ভাঙে আদিকথা কাব্য-রসিক,
ট্যাবু ও টোটেম দেহকলা খোঁজে আঁধারের জলে
বর্ণচোরা সে চেহারা লুকায় লজ্জা আঁচলে
বাৎস্যায়ণের বৈভব মাগে প্রত্ন-নাগরিক।

এই বেঁচে থাকা তত্ত্বের মানে কি বাণিজ্যিক
নাকি শুধু রতিক্রিয়া, মোহ, আত্মজৈবনিক!

সবটুকু আদি রস, মনে কর যত কল্পনা
মিছে কেন এতো পরাজয়, বিরহের আলপনা।

 

গ্রীক ট্র্যাজেডি

একদিন এই এথেন্সই ছিল সমগ্র পৃথিবী।
হোমারের পাণ্ডুলিপি হতে জীবনের শিলালিপি
গলিত ধ্রুপদী নদী, হেলেনীয় দিন পরজীবী
ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষে খুঁজেছে ব্যথার স্বরলিপি।
হেলেন, বলবে–আর কত রক্ত দেখতে চাও তুমি!
মুক্তির প্রথম সুর তুলে কোথায় প্রমিথিউস,
একা বসে কাঁদে শিল্পসাহিত্যের অনাবাদি ভূমি,
আলেকজান্ডার ফিরে এসো বিশ্বে শোষক জিউস।

এখন ইডিপাসের মতো মারাত্মক ভবিষ্যৎ
আমাদের, জেনে-বুঝে সামনে যাচ্ছি নষ্ট কৌতূহলে
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র উপহাস করে, হয় রদ
মানবতা, মাছ ধরে বুর্জোয়া সমাজ ঘোলাজলে।

হেমলক পান করে, পান করে জীবনের বিষ
উঠে দাঁড়াবে না আর, আজ নেই কোন সক্রেটিস!

ফুয়াদ হাসান

ন্ম: ২ নভেম্বর ১৯৭৯ সাল; ধূরুং, বিবিরহাট, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
মোবাইল : ০১৮১৯৬২৩৯৮৬।
ই-মেইল : [email protected]
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর। পেশা: শিক্ষকতা।
বাংলা বিভাগ, পতেঙ্গা সিটি কর্পোরেশন মহিলা ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
মানুষ মানুষ নয় হোমোসেপিয়ানস (২০০৪), রাফখাতার কাটাকুটি (২০১০),
অ্যা জার্নি বাই অ্যাম্বুলেন্স (২০১৮)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।