রওশন হাসানের একগুচ্ছ কবিতা

অণুজীবকাল

দিনের প্রারম্ভে সকাল বেজে ওঠে মুহুর্মুহু
জানালা কেঁপে ওঠে নিজস্ব দিনলিপিতে
জনশূন্য স্ট্রীট, অ্যাভেন্যু, কফিনের যান
ক্ষিপ্র গতিতে তীব্র সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্সগুলো
কিছুক্ষণ পর পর জানান দেয় জরুরী অসুস্থতা
পৃথিবীর আকাশে নবঋতুর আগমন
চুইয়ে চুইয়ে জল ঝরছে বসন্তের কচি পাতায়
বৃক্ষ-পাখিদের আতঙ্কহীন দিন
অবাধ বিচরণে যে মানুষেরা লিখেছিল মৃত্যুহীন আমলনামা
আজ তারা নিয়েছে ঠায় অন্তরীণ শোকের আগুনে
চিরবিচ্ছেদে নিঃশ্বাস বিষদাহে পৃথিবী থেকে নিয়েছে বিদায়
সব কথা হারিয়ে সনদে মৃত্তিকার কালোফুল
প্রিয় কেউ হাসপাতাল ঘরে চেতন-অচেতনে
করছে আহাজারি
আমি জলমগ্ন, আমি নিমজ্জিত হচ্ছি ক্রমাগত না l
আমার নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে l
আমি বাঁচতে চাই l বাঁচতে চাই l
এইসব মর্মান্তিক খবরগুলো জমা হবে ইতিহাসের কোষে
কাঁদে পরাভূত আশা, অণুজীব ফুসে ওঠে
অপেক্ষারা ক্লান্ত দিয়েছে উড়াল অনির্দিষ্টকালের পথে
বেদনারা বড় হতে থাকে জ্যামিতিক হারে
বন্দী থেকো ঘরে l দেখা হতেও পারে l
কেটে গেলে মহামারী উত্তাল l বিদায় নিলে জীবাণুকাল ।

কনফেশন ওডস

পাতায় ঘেরা ফুলের ম্লান মুখ, মেঘহীন মেলানকোলি l
চিবুক ছুঁয়ে অনুষ্ণ বাতাস, জলে উপুড় আকাশের ছায়া
চোখের তারায় বিবরা মৌসুম, ধ্রুব আনমনা
কোথাও শব্দহীন ভাঙচুর হচ্ছে l কনফেশন ওডস l
অন্তর খুলে শুনি প্রার্থনা সঙ্গীত, উইদাউট ট্রাম্পেটস্ l

বিরামহীন শহর, কোলাজ কোলাহল, বর্ণিল শপিংমল
আভিন্যু, স্ট্রিট পার হয়ে পাথরের অট্টালিকা
শোকবাহী দাঁড়িয়ে সুদর্শন ভাস্কর্য
শৌর্য নিঃসঙ্গতায় হেলান দিয়ে উন্নত শির
দীর্ঘ পথ সংকল্পবদ্ধ, তৃণঠোঁটে উপবাসী অভিলাষ
বৃক্ষশাখায় আশ্রিত পাখি সদ্য ঘনীভূত আঁধারে
অতঃপর কিচমিচ করে বলে ওঠে ‘আমি নিরাপদ’ ‘এ পৃথিবী নিরাপদগৃহ’ l
তোমাদের কাছে যারা অভিশাপ, পৃথিবীর কাছে অনিবার্য অস্তি l
বিদ্বেষ-বিষে বাজে ক্রুর অন্ধকার, ছদ্মবেশী রন্ধ্রহীন
মাটির শেকড়ে পর্বত আগামীকাল আশ্লেষ উদগ্রীব
সমুখবর্তী নরপিশাচের তাণ্ডব নৃত্যে ক্রোধ বেজে চলে
জন্ম-মৃত্যুর সরল কাহিনী অগোচরে মহাকালে ঝরে যায় l

রোদ রমণী পুষ্পগান

দগ্ধ দিনের চৌকাঠে পুষ্পরাজির রঙিন মদিরা
বোগেনভিলা, টিউলিপে প্রজাপতি, ঘাসের ফড়িং
জলোচ্ছ্বাসের নদীর ছুঁই ছুঁই আকাশ
বিহঙ্গ-ডানায় উড়াল আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ
এক গ্রীষ্মপথ দৃশ্য খোলে, গুচ্ছ গুচ্ছ রোদের মেঘে
দূরের আকাশে কেমন সাঁতার তোলে বহুবিধ প্রশ্নস্বর l

হাওয়ার শেকল ভেঙে উড়ে গেছে দ্রোহী পাখি
শোকার্ত গল্পগুলো বৃক্ষের চোখে স্থির দাঁড়িয়ে
ছায়া ভর করে অবাক চোখে, মৃদঙ্গ হাওয়া শিল্প,
মুঠো মুঠো প্রসন্নতায় খেলা করে ইনডিগো বোধি l
তোমার কণ্ঠে ধ্বনিত মধুরতম কথাগুলো লুব্ধসুধা হয়ে
ফিরে আসে কানে কানে
আমি আজন্ম নতজানু পার্বণ-বিলাসী প্রাচীন সুখে
প্রদক্ষিণরত অতিনবতারা প্রেম আমার জগৎজান্নাত l

ইঙ্গিতপ্রসূত কার্নিভাল

একপশলা নেশাতুর রোদে পাখিরা পোহায় উত্তাপ
খুব বেশী মনে পড়ে। বর্ণবিভা হলুদ ঝরাপাতার পথে
জ্বেলেছিলে দু’চোখের মায়া-জ্যোতি আগুন l
প্রলোভিত হাওয়ায় বেজেছিল যতিচিহ্ন স্পর্শকাতরতা
হয়তোবা নেমেছিল বৃষ্টি নিভৃত কথার জীবনে
গুচ্ছ মৌসুম-রমণ বেদনায় ফুটেছিল নিবিড় উচ্ছ্বাসে
বড় বিলাসী চাওয়ার এ যোগাযোগ অনাহুত আবৃত্তিক
তথাপি দৃশ্যগুলো দেয়ালে আড়াল হলো ; ইঙ্গিতপ্রসূত সন্তাপে
পৃথিবী রঙে সাজে, মেতে ওঠে উৎসব-সমাজ ঈর্ষামগ্ন
নদীর ধার ঘেঁষে নির্জনতার ভাঁজ খুলে অধিকৃত আঁধার থেকে
বিন্দু সন্ন্যাস বিষাদের কণা কুড়িয়ে জমিয়ে রাখি ললাটের পর্বভাগে
এমন বিস্ময় দৃষ্টি মেলে হিম-ক্রন্দনে জেনেছি যাপনহেতু কার্নিভাল
এই সামান্য ভ্রমের দিন, নদী-মেঘলায় জীর্ণ ধ্বনিতে কবিতা হয়ে নাচে
হায় একাকীবোধ, নতমুখী উপসনারত দৈব-প্রণোদনায় বাঁচো
বিপুল আকর্ষে ছুটে আসে মন্দির শরীরে মর্মার্থ প্রেম -সঙ্গীত
বোঝোনি ? প্রাচীন নৈঃশব্দ্যরা গন্তব্য ছুঁয়ে আছে
কতটুকু উপশম ? শূন্যবৃত্তে সাজানো বিনাশীবিজয় ?
অনন্তের উপেক্ষা, তৃষ্ণার্ত অপেক্ষার ভ্রূণে l

ইনডিগো ফুল

দুলে উঠে খসখসে পেলব পাতায় হলুদ কুঁড়ি, নির্ভরপ্রবণ লতাগুল্ম l
কিশোরী সীমফুল কর্ণদুল l
পাখিদের প্রপাত। পাতার আড়ালে ঘুঘু, কার্ডিনাল কার্নিভাল l
নয়নতারায় লুকিয়ে থাকা অবুঝবেলার হৃদয়গাঁথা গল্প l
রোদের বেহালায় নাচে ইনডিগো ফুল l
এসব দেখা-অদেখা নতুন নয়, নতুন করে গার্হস্থ্য আবিষ্কার l
আলোর মাঝে ঘূর্ণিত পুনরুত্থান l
ঢলে পড়া বোধে ঝুলে থাকা নির্মম নিঃশ্বাস l আয়ুর ভ্রমর পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে
বিচলিত ফুসফুসে যোগায় বেঁচে থাকার উপলব্ধি l
বিধির শেকলে পরাস্ত চেতনার দেয়াল l প্রসূন ছায়াখেলা কর্পূর l
আততায়ী বাতাস জানান দেয় বাণীর মতন
ভীষণ বদলে গেছি আমি ও আমার মতো বিপর্যস্ত মানুষেরা l
বিকেল অবসাদে ঘনীভূত সন্ধ্যার নিস্তেজ সূর্য
অতি নিকটবর্তী ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে’ যপযাপন l
মর্মপতন অনিবার্য আশ্রয় l

রওশন হাসান

রওশন হাসানের জন্ম ১৭ই জানুয়ারী, কুষ্টিয়া জেলায় l ইংরেজী সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর l নব্বই দশক থেকে নিয়মিত লিখতে শুরু করেন l ইংরেজি ও বাংলায় দুই ভাষাতেই লিখে থাকেন। এযাবৎ পনেরটি কাব্যগ্রন্থ ও বেশ কয়েকটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৪ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় l
বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করছেন, এবং দুই পুত্র সন্তানের জননীl লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আছেন।

সাহিত্য সম্মাননা :
বাসাপ বর্ণবিন্যাস সাহিত্য সম্মাননা (২০১৭)
বেগম লুৎফুন্নেসা আব্বাস ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা (২০১৯)

প্রকাশিত বই :
স্বপ্নের অভিলাষে; নন্দিত সায়রে; মেঘ তুমি কতদূরে; অনুভবে অনুক্ষণ; সবুজ ঘাসের পৃথিবী; জলের রঙ বদলে যায়; বাতাসে দোঁহের সংকেত ভেসে আসে; অণূদিত বর্ণমালা; Over The Horizon; গন্তব্যপথ ও কিছু সঙ্গী; হৃদয় জমিনে বৈরী বসন্ত

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।