লুনা রাহনুমার কল্পগল্প: সন্তান স্নেহ 

১ .

“তোমার ছেলেকে একটু শাসন করো বুঝলে, এমন আদরের বাঁদর হলে

জীবনে কিছু করে খেতে পারবে না।” 

মিমের কথায় একটুও কান দেয়না রকিব। মা হিসেবে মিম চায় ছেলেটি ব্যাটারি দেয়া পুতুলের মতো সকালে ঘুম থেকে উঠবে, পড়তে বসবে, পরীক্ষায় সবার চেয়ে বেশি নাম্বার পাবে, বাইরের মানুষের সামনে গুড-বয় ব্যবহার করবে, যখন হাসার কথা তখন হাসবে ঠিক অতটুকু শব্দ করে যতটুকু সেই পরিবেশে মানানসই। 

রকিব ছেলের ভবিষৎ নিয়ে অতো ভাবেনা। আসলে মিম এতো বেশি ভাবনা ভাবে যে রকিবের জন্য কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। 

তাই নির্ভারচিত্ত্বে রকিবের একমাত্র কাজ হচ্ছে ছেলেটাকে সময় দেয়া, ইংরেজিতে যাকে বলে কোয়ালিটি টাইম। ছেলের জন্য কিছু আনন্দঘন স্মৃতি সমেত শৈশব তৈরি করা রকিবের মূল লক্ষ্য। বাবা মা যখন থাকবেনা পাশে তখন ছেলেটির মনে যেন বাবা মায়ের আদরের কোনো কমতি অনুভূত না হয়।

 

২ .

মিম ও রকিবের একমাত্র ছেলে ইশাক। ইশাক নামটি আরবি ভাষার শব্দ, যার অর্থ হাসি। মিম ও রকিবের কাছে জীবনের সেরা উপহার এই ইশাকের মুখের হাসি। 

ইশাক এখন তেরো প্লাস। দুমাস পর চৌদ্দ হবে। স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ছে। নাকের নিচে কালো গোঁফের আভাস দেখা যায় দূর থেকে তাকালে। তাই নিয়ে রকিব মজা করে ছেলের সাথে, “কিরে বেটা, শেভ করে দিবো নাকি?” 

খুব লজ্জা পায় ইশাক, “বাবা !”

এই ছেলেটি মিম আর রকিবের পুরো পৃথিবী। সমস্ত পৃথিবী একদিকে আর ওদের কাছে ওদের ছেলে একদিকে, আরো বেশি প্রিয়। 

 

৩ .

বাড়িতে তারা তিনজন ছাড়াও দুজন কাজের লোক আছে। কোনুফা আর ফ্লিস, ওদেরকে লোক বলা ঠিক হচ্ছে না কারণ তারা মানুষের মতো দেখতে হলেও নিম্নস্তরের লজিকে তৈরি মানবিক রোবট। মূলত ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয় এদের। বিশেষ অবস্থাসম্পন্ন লোকেরা ঘরের কাজ করানোর জন্য এইরকম রোবট কিনছে আজকাল। 

একুশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এসে তারা স্বামী-স্ত্রী অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করছে স্থায়ীভাবে। রকিব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, চাকরি করে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি রোবট অ্যাসেম্বলি কোম্পানিতে। কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটি রোবট বেশি পেয়েছে ঘরের কাজ করানোর জন্য। 

জি গ্রেডের এই রোবটগুলির বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ, রকিব নিজে তাদের সিস্টেম লজিকে কিছুটা আপগ্রেড করে দিয়েছে যাতে তারা এলাকার অফ লাইসেন্স দোকানে গিয়ে বিয়ার বা এলকোহলের বোতল কিনতে গেলে দোকানদারের জেরার মুখে প্রাপ্তবয়স্কের মতন তর্ক করে বেরিয়ে আসতে পারে। 

 

৪ .

কোনুফা আর ফ্লিসকে দিয়ে ঘরের সব কাজ করালেও মিম ছেলের আশেপাশে ওদেরকে যেতে দেয়না একেবারেই। কঠিনভাবে নিষেধ করা আছে তারা যেন ইশাকের সাথে কখনো কথা বলার চেষ্টা না করে।

ছেলের সব কাজ মিম নিজের হাতে করতে ভালোবাসে। চোখের সামনে ছেলেটি কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা ছেলেটি বড় হতে হতে হতে কেমন বিশালাকার পুরুষ বনে যাচ্ছে। 

মিমের ইচ্ছে করে ইশাক যদি আর বড় না হতো, ঠিক এইখানেই আটকে থাকতো। মায়ের ছেলে হয়ে মায়ের পাশে গুডিবয় হয়েই থাকতো, অন্তত যতদিন মিম বেঁচে থাকে ততদিন। 

ভাবতে ভাবতে চোখে পানি চলে আসে মিমের। চার্জে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠে এমন সময়। 

মিম, তোমার প্রিন্টারটা চেক করো, ইশাকের গত জন্মদিনের ছবিগুলো প্রিন্ট দিয়েছি,” অফিস থেকে কথা বলছে রকিব। 

আচ্ছা, দেখছি।

আবার কাঁদছিলে নাকি!”

এমনি, ছেলেটা কেমন জলদি বড় হয়ে যাচ্ছে তাই না!”

সবার বাচ্চা বড় হচ্ছে মিম, আমাদের ছেলেকেও তো বড় হতে হবে।

 

৫ .

ফোনের লাইন কেটে মিম প্রিন্টার থেকে ছবিগুলো তুলে নিয়ে স্টাডি রুমে রকিং চেয়ারে বসলো। এখন সে অনেকক্ষণ ধরে একেকটি ছবি দেখবে, ছবির সাথে কথা বলবে আর তাদের এলবামে সাজিয়ে রাখবে পরম মমতায়। 

রকিবের চেয়ে মিমের সাথে চেহারার বেশি মিল ইশাকের মুখের। ঠিক যেন মায়ের মুখটি কেটে লাগানো হয়েছে ছেলের মুখে। ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে মায়ের হৃদয়ে গুপ্ত ফল্গুধারার প্রবাহ বয়ে চলে শিরায় উপশিরায়।

মা, বড় হয়ে আমি যদি প্লেনে করে অনেক দূরে চলে যাই, তুমি কি মরে যাবে কষ্ট পেয়ে?” — কিছু না ভেবে এইরকমই একটি কথা বলেছিলো একদিন সাত বছরের ছেলেটা। 

এতদিন পরেও ক্ষণে ক্ষণে মিমের কানে বাজে সেই কথাটি। সত্যি যদি চলে যায়! সত্যি যদি আর থাকতে না চায় বুড়ো বাবা মায়ের কাছে! তাহলে কি হবে মিমের? ব্যাকুল আবেগে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে মিম। কিছুই চিন্তা করতে পারে না আর। 

 

৬ . 

ফ্লিস এককাপ চা নামিয়ে রাখলো মিমের টেবিলে, যাবার আগে ঘুরে তাকিয়ে বললো, “ইউ আর লুকিং আপসেট, ক্যান আই ডু এনিথিং টু মেইক ইউ হ্যাপি?”

“বাংলায় কথা বলো ফ্লিস, বাংলা বলতে আরাম লাগে আমার।” 

“কোনো অসুবিধা নেই, আমার বাংলা সফটওয়্যারও আপডেটেড আছে। “

“ফ্লিস তোমার মন খারাপ হয় কখনো?”

“তোমাদের কাউকে আপসেট দেখলে আমি কি করে তোমাদের মন ভালো করা যায় তাই নিয়ে চিন্তা করতে থাকি, তখন মনে হয় আমার মন খারাপ লাগে।”

“তোমার বাবা মায়ের কথা মনে পড়ে?”, মিম জানে ফ্লিসকে এই প্রশ্নটা করা কতোটা অবান্তর, তবুও মাঝে মাঝে কোনুফা ও ফ্লিসের সাথে সে এইসব প্রশ্ন-উত্তর খেলা খেলে। 

“আমার বাবা ও মা দুই জনই মরে গেছে। তোমাদের সাথে আছি, এখন তোমরা আমার বাবা ও মা।”

এইভাবে আরো কিছুক্ষণ কথা চালাচালির পর ক্লান্তিবোধ করে মিম, “আচ্ছা, এখন যাও ফ্লিস, একটু একা থাকতে চাই। “

ফ্লিসের চলে যাওয়া দেখে মিম, একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক থেকে। মানুষের জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করার চেষ্টায় বিজ্ঞানীরা নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ নামের মহামারীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত ও লক্ষাধিক মানুষ মারা যাবার পর পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীরা তাদের মেধা এক করে ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছে দিনের পর দিন। শতকের সেই মরণঘাতী মহামারীর সময় গিয়েছে চল্লিশ বছর আগে। এখন আবিষ্কৃত হয়েছে অত্যাধুনিক মেশিনপত্র, যা মানুষের জীবনকে অনেক বেশি নিরাপত্তা দিয়েছে । 

এখন রোবট মিশে গিয়েছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে। কোনুফা আর ফ্লিসের অবয়ব দেখে বা তাদের সাথে কথা বলে সহজে কেউ বুঝতে পারবেনা ওরা আসলে যন্ত্র বা মানবিক রোবট। রোবট সনাক্তকরণের বিশেষ একটি মেশিনের রেডিয়েশনের মাধ্যমেই শুধু ধরা পড়ে কে রোবট আর কে প্রকৃত মানুষ।

 

৭ .

বিয়ের পর থেকেই মিম উদগ্রীব হয়েছিল একটি সন্তানের জন্য। প্রতিমাসের বিশেষ সময়ে বিশেষ করে অপেক্ষা করেছে প্রিয় রকিবকে একটি সুসংবাদ দিতে। প্রতিবারই প্রত্যাশার মহেন্দ্র সেইক্ষণ ভেসে গিয়েছে তাজা রক্তের প্রবাহে। মিমের চোখে তখন যে জল ঝরতো তার রংও ছিল আংশিক লাল। 

সুদীর্ঘ বারোটি বছর বাঁজা, আইবুড়ি, পোড়ামুখী, অযাত্রা, মইল্যা – আরো নানা কদর্য নামে ভূষিত হবার পর মিম কোলে পেয়েছে এই সন্তান। এতো অপেক্ষার পর যে ধন মিমের মতো রক্ত মাংসের নারীকে দিয়েছে সর্বজয়ের আনন্দ, মাতার চোখে দিয়েছে পরিতৃপ্তির উজ্জ্বলতা, সম্রাজ্ঞীর ললাটে অহংকারের মুকুট হয়ে হীরার দ্যুতি ছড়াচ্ছে যে রত্ন, তাকে হারানোর কথা মনে হলে ভয়ে বুক কেঁপে উঠবারই কথা। মিমেরও বুকে ব্যথা হয় চিনচিনে।

 

৮ . 

“ইশাকের জন্মদিন চলে আসছে। ওকে সারপ্রাইস গিফট কি দিবো এইবার!”, রাতে ঘুমানোর আগে খাটে শুয়ে রকিবকে প্রশ্ন করে মিম। 

“একটা গাড়ি কিনে দেই!”, রকিবের উত্তর না পেয়ে নিজেই বলে মিম। 

“অগাস্টে স্কুল ছুটি থাকতে থাকতে কানাডায় তোমার ভাইয়ের বাড়ি যাই চলো। ওখানে আমরা সবাই মিলে কেক কাটবো, ইশাক খুব খুশি হবে!”

“নাকি আমরা তিনজন বাড়ি থাকবো সারাদিন, ইশাকের ছোটবেলার ছবি ও ভিডিও দেখবো একসাথে বসে!”

কথা বলে না রকিব, চুপচাপ শুয়ে থাকে। 

“কি হলো, তুমি কি আজ টায়ার্ড নাকি, কোনো কথাই বলছো না!”, মিম হাত রাখে রকিবের গালে। 

ভারী কণ্ঠস্বরে রকিব বলে, “প্রতি বছর জুলাই মাসে ইশাকের চেকআপ থাকে ল্যাবরেটরিতে, আর তুমি প্রতি বছরই এই কথাটা ভুলে থাকতে চাও মিম।”

“চিঠি পাঠিয়েছে তারা?” 

“হ্যাঁ, অটোমেটিক্যালি একমাস আগে চিঠি পাঠায় ল্যাব থেকে। এই মাসেও পাঠিয়েছে। আজ সকালে পেয়েছি। “

মিম আর কোনো কথা খুঁজে পায়না। সবকিছু যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র পাড়ে দাঁড়ালে ঢেউ আসলে যেমন পায়ের তলা থেকে সর-সর করে বালি নেমে যায়, তেমন করে মিমের মাথার ভেতরটা খালি হয়ে যাচ্ছে।

 

৯ .

পনেরো বছর আগে সেইদিনটাও ঠিক এমন একটি নির্ঘুম রাতের দরোজায় এসে থমকে গিয়েছিলো। বুকের ভেতর খাঁ খাঁ শূন্যতা নিয়ে মিম তখন উন্মাদপ্রায়। হাসপাতালের মেন্টাল হেলথ বিভাগের নিয়মিত রোগী। মানসিক বিপর্যতায় মিমের মস্তিষ্কের বিবিধ রাসায়নিকের সামঞ্জস্যতায়  ঘাটতি দেখা দেয়।  মনোবিশেষজ্ঞের কাউন্সিলিং, এন্টিডিপ্রেসেন্ট ট্যাবলেট, মুড-স্টেবিলিয়েজিং মেডিকেশন, সাইকোথেরাপি, সিবিটি, আইপিটি – চেষ্টার সবকিছুই বিফল হতে চলেছিল যখন তখন রকিব বলেছে, “চলো আমরা একটি বাচ্চা এডপ্ট করি।”

কিন্তু রোবটের পাশাপাশি থাকতে থাকে মানুষও রোবটের মতো হয়ে গিয়েছে অনেকটা। কমে গেছে নারী ও পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা। কোথাও সত্যিকার মানুষের বাচ্চা পাওয়া যায়না এখন আর আগের মতো। 

মিমের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকলে মিমের মেডিক্যাল কন্ডিশন ও হিউম্যান রাইটসের বেইসে আপিল করে রকিব তার বসের কাছে বিশেষ অনুমতি নেয়, অত্যাধুনিক মেকানিজমে তৈরি করে অবিকল মানুষের ছোট্ট শিশুর মতো দেখতে একটি মানবিক রোবট। মিথ্যে করে স্ত্রীকে বলেছিলো “আমাদের সন্তান, রক্ত-মাংসের মানব শিশু,” রকিব একটি সুস্থ জীবন উপহার দিয়েছিলো সেদিন মিমকে।

সন্তান তৃষ্ণায় কাতর মিম টি২২ রেঞ্জের মানবিক রোবটটিকে সত্যিকারের মানুষের মতো ভালোবেসে ফেললো। নিজের পছন্দে নামকরণ করে, তাকে পরিবার ও বাইরে সবার কাছে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দেয়। বছর দুই পর মিম যখন পুরোপুরি সুস্থ, তখন রকিব জানিয়েছিল ইশাকের জন্ম-বৃত্তান্ত। ভালোবাসার জালে আটকা পড়ে গিয়েছে ততদিনে মিম। কিছুতেই কিচ্ছু যায় আসে না আর। ইশাকই ওর ছেলে তখন। একসময় মিম নিজেই ভুলে যায় ইশাক যে ওর গর্ভজাত সন্তান নয়। 

বয়সের সাথে শারীরিক পরিবর্তনের সামঞ্জস্য আনতে প্রতি বছর ইশাককে ল্যাবরেটরিতে যেতে হয় একদিনের জন্য। সেখানে ওর বডির গ্রোথ বাড়ানো হয় অল্প করে। আর বয়স অনুযায়ী মানব মস্তিকের যা যা পরিবর্তন হবার কথা সেই মতো সফটওয়্যার ও সেন্সর আপগ্রেড করা হয় মেমোরিতে। আগামী মাসের দুই তারিখে এপয়েন্টমেন্ট আছে ল্যাবরেটরিতে। 

লুনা রাহনুমা

কলেজে পড়ার সময় থেকে লেখা শুরু। বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকীতে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন বছর খানেক। তারপর একটি দৈনিকে ছয় মাস কাজ করার পর স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে বসবাস আরম্ভ করেন ২০০৬সাল থেকে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুইটি। “ভালোবেসে এঁকে দিলাম অবহেলার মানচিত্র”(১৯৯৮), “ফুঁ”(২০২০)। লেখার শুরু কবিতা দিয়ে হলেও বর্তমানে বেশ কিছু অণুগল্প, গল্প, ও ধারাবাহিক গল্প প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি অনলাইন সাহিত্য ম্যাগাজিনে। কর্মজীবনে তিনি একজন পে-রোল একাউন্টেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।