ফরিদুর রহমানের দুটি ছোটগল্প

ঘুষখোর

বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা এলোমেলো চেহারার লোকটাকে আমি প্রথম লক্ষ করেছিলাম এক বর্ষার দিনে। সারারাতের তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমেছিল, ফলে অফিসের গাড়িটা এসেছে পনের মিনিট পরে। সাত সকালে প্রায় জনমানবহীন বাসস্ট্যান্ডে চত্বর ঘেষে দাঁড়াবার ফলে শাড়ি বাঁচিয়ে নোংরা পানিতে পা না ভিজিয়ে গাড়িতে উঠতে পেরেছি। গাড়ির গায়ে আমাদের সংস্থার লোগো অথবা নামটা দেখে লোকটা সম্ভবত বিস্মিত হয়েছিল। এর ঠিক তিন দিন পরে সে আমাকে জিঞ্জেস করেছিল, ‘আপনি কি ইন্সটিটিউট অব ইকোনোমিক্স রিসার্চ এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট কমিউনিকেশেনে কাজ করেন?’

একজন এলোমেলো লোকের মুখে চমৎকার ইংরেজি উচ্চারণে আমার অফিসের সঠিক নামটা শুনে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে জানতে চাইলাম, ‘কেন বলুন তো?’ ‘আমার বাবা এক সময় আপনাদের অফিসে ছিলেন।’ হয়তো আরো কিছু জিজ্ঞেস করা যেতো, কিন্তু তার আগেই গাড়ি এসে পড়ায় আমি শুধু ‘ওহ্’ বলে গাড়িতে উঠে গেলাম।’

ঢাকার বাইরে বন্ধুদের সাথে একটা পুণর্মিলনীতে যোগ দিতে তিন দিন ছুটি নিয়েছিলাম। পরের দুদিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। লোকটি সম্ভবত প্রতিদিনই আমার অপেক্ষায় ছিল। পাঁচ দিন পরে আমাকে বাসস্ট্যান্ডে পেয়ে এক নাগাড়ে সে অনেক কথা বলে গেল। এক ফাঁকে জেনে নিলাম তার বাবার নাম ও পদবী। হয়তো সে আরো অনেক কথা কথা বলতো। কিন্তু আমাদের গাড়ি চলে আসায় একটু হতাশ হয়েই বললো, ‘আপনাতে তো সব কথা বলা হলো না। আমরা কিন্তু বাবার পেনশন এবং গ্রাচ্যুইটির কোনো টাকা এখনো পাইনি।’
‘ঠিক আছে, একদিন অফিসে আসুন কথা বলা যাবে।’
‘সত্যিই আসবো? আপনার কাছে?’ ‘নিশ্চয়ই।’
আমি লোকটির হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসি। আমার জন্যে গাড়িটা মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে ছিল। এরই মধ্যে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সহকর্মীদের অনেকেই এলোমেলো লোকটির সাথে আমার কথা বলা লক্ষ করেছেন। তবে অবধারিতভাবে প্রথম কথাটি বলেন খোরশেদ খান।
‘লোকটা কি আপনার পরিচিত? ‘না ঠিক পরিচতি নয়, এই বাসস্ট্যান্ডেই আলাপ হয়েছে। ওর বাবা নাকি আমাদের অফিসে এক সময় কাজ করতেন।’
‘ওদের এ সব কথা মোটেও বিশ্বাস করবেন না। আপনাকে মেয়ে মানুষ পেয়ে হয়তো কিছু সুবিধা আদায় করতে চেয়েছে।’
খোরশেদ খান লোকটিকে আমি মোটেও পছন্দ করি না। সহকর্মী নারীদের মেয়ে মানুষ সম্বোধন করা, গায়ে পড়ে কথা বলা এবং বিশেষ করে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা আদায়ে ফন্দি ফিকির তার মাথায় ঘুরতে থাকে। ফাইল আটকে রেখে উৎকোচ আদায়ের কোনো সুযোগই সে হাত ছাড়া করে না। সেই কারণে তার নামই হয়ে গেছে ঘুষখোরশেদ। ঘুষ খোর এবং খোরশেদ-এর খোর দুবার ব্যবহার না করে একবারেই চমৎকার দাঁড়িয়েছে নামটা।
প্রশাসন শাখায় খোঁজ নিয়ে জানলাম এলোমেলো লোকটির বাবা এগারো বছর আগে অবসর নিয়েছেন। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাঁর পেনশনের ফাইল এখনো ছাড়পত্র পায়নি। বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোবারক সাহেব একই পদে দশ বছর আগে যিনি ছিলেন সেই খোরশেদ খানের সাথে কথা বলতে বললেন। আমার সব কথা শুনে খোরশেদ খানের চেহারা বদলে গেল। গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘ওই লোকটা তাহলে এ জন্যেই আপনাকে বিরক্ত করছে?’
‘আপনি তাহলে লোকটাকে চিনেছেন তাই না? সে কিন্তু মোটেও বিরক্ত করেনি।’ খোরশেদ খান কথা ঘুরিয়ে বললেন, ‘আপনার পেছনে পেছনে যেদিন অফিসে এসে হাজির হবে সেদিন বুঝবেন।’
‘কিন্তু ওর বাবার পেনশন কেসটা আটকে আছে কেন বলতে পারেন?’
‘দুর্নীতি, জানেনই তো অনেক লোকই প্রতিষ্ঠানের টাকা নয়ছয় করে অবসরে চলে যায়। তাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা সুদে আসলে আদায় না করা পর্যন্ত পেনশন গ্রাচ্যুইটির ছাড়পত্র দেয়া কী করে সম্ভব!’

ঘুষখোরশেদের মুখে নীতি নৈতিকতার কথা শুনে হাসি পায়। অতি কষ্টে হাসি সম্বরণ করে মোবারক সাহেবের কাছে ফিরে এলাম। প্রশাসনে নতুন হলেও অল্প সময়েই তাঁর আন্তরিকতা ও সততার কথা সকলেকই জেনে গেছে। এগারো বছর আগের ফাইল খুঁজে বের করে পেনশন কেসটা নিষ্পত্তি করতে অনুরোধ জানালাম। তিনি কথা দিয়েছেন যতো শিগগির সম্ভব কাজটা শেষ করে আমাকে জানাবেন।

পরদিন নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলাম। আমাকে দেখেই গুটিশুটি মেরে বসে থাকা লোকটি তার অবস্থান ছেড়ে এগিয়ে এলো। তার চোখে মুখে এক রাজ্যের জিজ্ঞাসা। সে কোনো প্রশ্ন করার আগেই আমি জানতে চাইলাম, ‘আপনার বাবার কেসটা এতোদিন পড়ে আছে কেন, আপনি নিজে কিছু জানেন?’
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে অনেক দ্বিধা নিয়ে লোকটি বলে, ‘আপনাদের অফিসেরই একজন দু লাখ টাকা চেয়েছিল। আমরা নগদ এতো টাকা কোথায় পাবো বলুন?’
আমি বললাম, ‘ঠিকই তো। তাছাড়া নায্য পাওনা পাবার জন্যে ঘুষ দেবেন কেন!’ ‘তা ঠিক। কিন্তু এই প্রাপ্য টাকা আদায়ের আর কোনো পথ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।’ ‘যে লোকটা টাকা চেয়েছিল তার নাম জানেন?’
‘নাম তো বলতে পারবো না।’ অসহায়ের মতো বলে লোকটি। গাড়ি এসে যাওয়ায় হঠাৎ আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। মাইক্রোবাসটা থামলে দরজা খুলে দিয়ে আমি বললাম, ‘আপনি তাকে চিনতে পারবেন?’
এগিয়ে এসে ভেতরটা দেখে নিয়ে এলোমেলো চেহারার লোকটি মুহূর্তে আঙুল তুলে বলে ওঠে, ‘ওই তো বসে আছেন।’
অবধারিতভাবে লোকটি খোরশেদ খান।

*** *** *** *** ***

সুখবর-১৯

লাবনী দুপুরের পর থেকেই তার বিছানায় শুয়ে আছে। মাঝে মাঝেই খুক খুক করে কাশছে। বিকেলের দিকে মা ঘরে ঢুকে মেয়ের দিকে এগিয়ে যেতেই লাবনী হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে।

‘স্টপ! তুমি আর কাছে এসো না মা।’
হঠাৎ এই চিৎকারে থেমে গিয়ে অবাক চোখে তাকান লাবনীর মা।
‘তোর হয়েছে কী? এই অবেলায় শুয়ে আছিস কেন?’
লাবনী কথা বলে না। মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। মা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘রিপোর্ট এসেছে?’
‘পজিটিভ!’ নিরাসক্তভাবে বলেই লাবনী বিছানায় উঠে বসে। মা আঁৎকে ওঠেন, তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে আতঙ্ক। ‘তাহলে এখন কী হবে? কেমন করে এই সর্বনাশ হলো রে মা?’
লাবনী মায়ের চিৎকারে বিরক্ত হয়। ‘থামো! এখনই হৈ চৈ বাধিয়ে লোকজন জড়ো করার দরকার নেই। আমার কিচ্ছু হবে না।’
মা আবার পায়ে পায়ে লাবনীর কাছাকাছি এগিয়ে যেতে থাকেন।
‘আহ! বললাম না, কাছে এসো না।’
মা আবারও থমকে দাঁড়িয়ে যান। ‘তুই তো গত দুই মাস, না তারও বেশি… প্রায় আড়াই মাস বের বাইরে যাসনি। বাসাতেও কেউ আসেনি!’
লাবনীর ঠোঁটে এক ধরনের রহস্যের হাসি এসেই মিলিয়ে যায়। সে কি যেনো ভাবতে থাকে। মুখে শুধু একটা অস্ফুট আওয়াজ করে।
দিন কুড়ি আগে সন্ধ্যেবেলা ফোনে কথা হয়েছিল শাবাবের সাথে। দু মাস ধরে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ। কথাবার্তা বলার জন্যেও সময়ের ফাঁক ফোকর খুঁজতে হয়। সেদিন বাসার ছাদে যখন দাঁড়িয়ে যে কথা হয়েছিল বলছিল তা তো ভুলে যাবার নয়।
‘অসম্ভব। আমি পারবো না। কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’ লাবনীকে কথা বলতে হচ্ছিল এদিক সেদিক তাকিয়ে নিচু স্বরে। কিন্তু ওদিকে শাবাব নাছোড় বান্দা।
‘প্লিজ একটি বার শুধু দু-তিন মিনিটের জন্যে রাতে একবার ছাদে এসো।’
‘ছাদে! তাও আবার রাতের বেলা! না শাবাব, তুমি একটু পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করো।’
‘আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু কতোদিন তোমার সাথে দেখা হয় না, দু মাসের বেশি। সেটা ভেবেছো?’

লাবনী একটু সময় নেয়। সে এদিক সেদিক সতর্কতার সাথে তাকায়, তারপরে বলে, ‘তুমি বরং আগামীকাল বিকেলে পেছন দিকের জানালায় এসো। এক মিনিটের জন্যে। ঠিক আসরের নামাজের আজানের পর… বুঝতে পারছো?’
‘বুঝেছি। পাঁচটা কুড়ি মিনিটে। তোমার ঘরের পেছন দিকের জানালায়। থ্যাঙ্ক ইউ.., থ্যাঙ্কস এ লট ডিয়ার!’
লাবনীদের বাড়ির পেছনে অযতেœ বেড়ে ওঠা গাছপালার জঙ্গলে ঘেরা একটা পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়ি । পরদিন বিকেলে আজানের সাথে সাথেই লাবনী তার ঘরের ভেতরে জানালার পাশে লাবনী এসে দাঁড়ায়। একটু পরেই খোলা জানালার বাইরে সতর্কতার সাথে জায়গা করে নেয় শাবাব এসে। লাবনী জানালার বাইরে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে সুমনের মুখ স্পর্শ করে।
‘এই তোমার শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কোভিড বাধিয়ে বসোনি তো?’
‘সেই জন্যেই তো তোমাকে দেখতে ছুটে এসেছি। কে জানে আর যদি দেখা না হয়!’
‘কি সাংঘাতিক! তুমি কি টেস্ট করিয়েছো?’ লাবনীর চোখে মুখে উদ্বেগ।
আজ সকালে নমুনা দিয়ে এসেছি। রেজাল্ট পেতে হয়তো কয়েকদিন দেরি হবে।’
শাবাবের হাত দুটো নিজের হাতে নেয় লাবনী। ‘প্লিজ তুমি রেজাল্টের জন্যে দেরি করো না। আজই একজন ডাক্তারের সাথে দেখা করো।’ করেছি। অষুধও খেতে শুরু করেছি।’
দূরে থেকে মার কণ্ঠ শোনা যায়। ‘লাবনী … এদিকে একটু আয় তো মা।’
লাবনী জোরে বলে, ‘আসছি মা।’ শাবাবের হাত ছেড়ে দিয়ে ফিস ফিন করে বলে, ‘এই মা ডাকছে। রাতে ফোনে কথা হবে।’
মা উদভ্রান্তের মতো লাবনীর দিকে তাকিয়ে আছেন। লাবনীর হাতে মোবাইল ফোন।
‘এতো চিন্তা করো না তো মা। ডাক্তার মামার সাথে কথা বলেছি। অষুধগুলো লিখে দিচ্ছি, ভাইয়াকে দিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো। আর তোমরা কয়েকটা দিন আমার কাছে থেকে দূরে থাকো।’
লাবনী মোবাইল স্ক্রিন দেখে কাগজে লিখে হাতের কাগজটা টেবিলে রাখে। মা কাগজটা নিতে যান, লাবনী ধমকে ওঠে।
‘ওটা ওখানেই থাক। ভাইয়া যখন অষুধের দোকানে যাবে, তখন যেনো এসে নিয়ে যায়।’
মা ধীরে ধীরে পেছনে হাঁটতে থাকেন। ‘এখন কি যে হবে, আল্লাহই জানে!’
মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই লাবনী মোবাইলের বোতাম টিপতে শুরু করে।
‘হ্যালো শাবাব! হ্যাঁ শোনো, একটা সুখবর আছে…’

 

ফরিদুর রহমান

ফরিদুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ফিল্ম এ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া, পুণে থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা লাভ করেছেন। তিন দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে।   গল্প উপন্যাস ভ্রমণ কাহিনী ও অনুবাদ মিলিয়ে ফরিদুর রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একুশটি। বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে। তাঁর প্রামাণ্যচিত্র ‘অশ্বারোহী তাসমিনা ত্রিশটি দেশে চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এবং বেশ কয়েকটি উৎসবে পুরষ্কৃত হয়েছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।