সেলিম জাহানের মুক্তগদ্য: রাষ্ট্রের ধর্ম বনাম ধর্মের রাষ্ট্র

‘ধর্ম’ শব্দটির দু’টো মাত্রিকতা আছে – একটি হচ্ছে ‘বৈশিষ্ট্য’ এবং অন্যটি হচ্ছে ‘বিশ্বাস’।ধর্ম শব্দটি যেমন বৈশিষ্ট্য বোঝায়, তেমনি বোঝায় বিশ্বাস।

এই যেমন, পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকে, ‘জলের ধর্ম হচ্ছে যে পাত্রে রাখা হয়, তার আকার ধারন করা’, কিংবা ‘আগুনের ধর্ম হচ্ছে জ্বালানো’। অথবা আমরাও কথা প্রসঙ্গেই বলি,’গাছের ধর্ম হচ্ছে ছায়া প্রদান’ কিংবা ‘বিড়ালের ধর্ম হচ্ছে চুরি করে খাওয়া’।

এ সমস্ত কথাগুলোতেই ধর্ম শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ‘বৈশিষ্ট্য’ অর্থে, এর সঙ্গে ‘বিশ্বাসের’ কোন সম্পর্ক নেই। তাই আমরা যখন বলি, ‘আগুনের ধর্ম হচ্ছে জ্বালানো’ এর মানে হচ্ছে আগুনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রজ্জ্বলিত করা। এ কাজটি আগুনের বিশ্বাস-উদ্ভূত নয়। জল, আগুন, গাছ কিংবা বিড়ালের কোন ‘বিশ্বাস’ থাকতে পারে না। আসলে মানুষ-বহির্ভূত প্রানীর কিংবা বস্তুর ধর্ম বলতে শুধু তাদের বৈশিষ্ট্যই বোঝায়।

কেবলমাত্র মানুষের ক্ষেত্রেই ধর্ম শব্দটির দু’টো মাত্রিকতাই কাজ করে – ‘বৈশিষ্ট্য’ ও ‘বিশ্বাস’। তাই যখন বলি, ‘শিক্ষকের ধর্ম হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদান’, কিংবা ‘চিকিৎসকের ধর্ম হচ্ছে মানুষকে সেবা দান’, তখন আমরা বোঝাতে চাই যে এ গুলো হচ্ছে তাঁদের পেশার বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু পেশার বৈশিষ্ট্যের বাইরেও মানুষের বিধাতা, জীবনবোধ, পরলোক বিষয়ে একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকে। সেটাও মানুষের ধর্ম – তবে ‘বৈশিষ্ট্য-উদ্ভূত’ নয়, সেটা ‘বিশ্বাস-উৎসারিত’। সেই ব্যক্তিগত বিশ্বাস-উৎসারিত ধর্মের নানান বিভাজনের ভিত্তিতে কেউ খৃষ্টান, কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বাস-উৎসারিত ধর্ম শুধু মানুষেরই থাকতে পারে।

এ সব কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটা সুস্পষ্ট যে, সংজ্ঞাগত কাঠামোগত দিক থেকে রাষ্ট্র স্বত্ত্বা:টির ‘বৈশিষ্ট্য-উদ্ভূত’ ধর্ম থাকে, কিন্তু কেমন করে তার ‘বিশ্বাস-উদ্ভূত’ ধর্ম থাকে? প্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের ধর্ম হচ্ছে তার ‘ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করা, তার ‘নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সমানাধিকার সুনিশ্চিত করা’ ইত্যাদি। এগুলো রাষ্ট্রের সাংগঠনিক কাঠামো-উৎসারিত।

মানুষের মতো রাষ্ট্রের কোন বিশ্বাস-উদ্ভূত অপ্রাসঙ্গিক, কারন নানান জনগোষ্ঠী একটি রাষ্ট্রে বাস করলেও রাষ্ট্র কোন মানুষ নয়। রাষ্ট্র যদি মানুষের মতো ধর্ম বিশ্বাসী হয়, তখন রাষ্ট্রের মতো স্বত্ত্বা:টির পক্ষে ধর্মীয় অনুশাসনে আবদ্ধ হওয়া ভিন্ন আর কোন যৌক্তিক পথ খোলা থাকে না।

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।