স্নিগ্ধা বাউলের পাঁচটি কবিতা

দূরাভিলাষী মৃত্যু

পৃথিবী মরে যাচ্ছে মরীচিকার ঘ্রাণে
সন্ধ্যার হলুদ তারা
তীব্র সারস অথবা
লালচে শকুন মিলে
নিয়েছে গ্লানি তার মরীচিকার ভার;

পৃথিবী মরে যাক আমারও আগে
সূর্যের মতো ডুবে যাক
আমায় একা ফেলে সন্ধ্যার ছাদে
নায়াগ্রা ভেবে ভেতরের ধারায়
বন্য অরন্য সমস্ত
শতবর্ষের বট
ছেড়ে দিয়ে চলে যায় পৃথিবীরে, হায়!

শব্দহীন হয়ে গেছে তার নাম
কান্নায় ভরা বেদুইন আকাশে
উড়েছিল মুখ যেন একটা মেঘের ফসিল
পৃথিবীর আরও আগে আমায় নিয়ে ভেসে ভেসে।

 

পরিভ্রমণের সূত্র

যেন মরে যাচ্ছে রাতের ফুল, ঝরঝরে পাপড়িতে কুয়াশার মতো জলের ঢিবি, টলতে শুরু করে আমাদের রাতের পথ। যেখানে ভোরের আলোই আরাধ্য দেবতাদের কবাট।

আরও অনেক মৃত্যুর পর হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস বলে যাবে, মৃতদের করুণ হৃদয় হয়ে।কেউ তো থাকলো মৃত্যুর পর শেষ মাটি খেলার মতো উড়িয়ে দিতে। অসংখ্য আশঙ্কার এমন নামই হয়তো জীবন,নিশ্চিত দাহ কার্যের প্রাগভাব মানেই হয়তো জীবন,,

পৃথিবীর এমন পরিভ্রমণের সূত্রের সাথে আমার বৃত্তান্ত খোলাসা করা যায়, আকর্ষণ করে উঁচুতে ঝুলতে থাকা ফ্যান, রাত গভীর হলে খুঁজে বেড়াই আর কিছু সাহস যেন আপাতত তীর্থেই মৃত্যুর আনন্দ; অথবা ছাদের কার্নিশ অকারণে ডাকে আকাশে জমাট দুঃখ বলি দেয়ার তাড়নায়,, রাতারাতি নতুন করে আসে আরও দুঃসময়, কেবল বেঁচে থাকার কারণেই মরে যাচ্ছি এমন প্রতিদিন,,,

 

যে জীবন উন্নাসিকের

যে দুঃস্বপ্ন কেবল কাটছেই না; হুরমুরায়ে আসে বৃষ্টি। ট্রেনের কামরা নিয়ে যে রোমান্টিক আবহ মনে বয়ে চলছিল তার বাইরে আপাতত ঝিকঝিক কিংবা রেললাইন আতঙ্ক তৈরি করে রাখছে! গতকাল দেখলাম ট্রেনের কামরায় একজনকে গনধর্ষণ করা হয়েছে! কী অবাক তাই না! যা খুশি করা যায়!

পথে বসে গেছি কেননা সমূহ সম্পদ তো তাদেরই যারা যারপর নাই ক্ষুধার্ত! আপাতত এই উন্নাসিক শ্রেণিটাকেই বিলুপ্ত করা উচিত…

মানুষ কেবল একটা শব্দ, মৃতপ্রায় অর্থহীন প্রলাপকাল। অনেককিছুর আগে মানে এর আগে অনেকগুলো শব্দ মরে গিয়ে এখন এই শব্দ এবং এর বাহক সমস্তই মরে যাচ্ছে!

 

নির্বাসনে বৈকুন্ঠ পাখি

চোখের পাতার সাথে সন্ধির ব্যথায়
ঘুমের দেশে-যেন কেউ জেগে থাকে
অপ্রত্যাশিত পরাজয়; বাঁচিয়ে রাখে
গোপনের এতগুলো রাত, জেনে গেছি
ভালোবাসা নির্বিকার নির্বাসনে জড়ায়
-যেতে চাই অবসরের আঙিন।।
মরাডিঙায়-ভেজা গামছায় উদলা করে
ঘুমের লোভে;

আড়িয়াল খাঁ ছুঁয়ে গেছে যে চোখ
তারেও বেচে দিবো আমি
জলের ভার অন্ধকার হয়ে পূর্নিমার রাতে
নিয়ে যাবে নির্বাসনে বৈকুন্ঠ পাখি—
নরম কুচক্রী সন্ধ্যায় আমিও পৃথিবী ফুঁড়ে আসবো
অন্ধকার জমিয়ে জমিয়ে।

প্রয়োজনই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় করে
গাছ থেকে পাতা খসে
সমুদ্র থেকে দ্বীপ
কিংবা বাতিঘর থেকে জাহাজ
সমূহের দিকে তাকালে মনে হয় বিচ্ছিন্ন হচ্ছে শব
মাটি খড়ি কিংবা ভূমিজ আমি
এখন আর কাউকে প্রয়োজন হয় না
প্রশ্রয়ের অভাব নাই
নাই ভাগাভাগি বিমর্ষ অনুভব
যে যেমন আছি তাই অনিবার্য!

 

হলুদ ঘাসের বুক

পৃথিবীর ইতিহাস আমায় জানে
দেখে রাখে তোমার খবর
পৃথিবী থেকে তোমার শুরু
কাকের ডানা থেকে হলুদ টমেটোর বন
পাটের সোঁদা গন্ধ পথ ধরে
আমার হয়ে তোমায় দেখেছে—
বিষন্ন দুপুর আমায় ছুঁয়ে যায় পৃথিবীর ঘরে
চালায় টুপটাপ দীর্ঘ নদীর পাশে
ডেকেছে মৃত্যুর ইশারায়—
পৃথিবীতে সব আমার সয়ে গেছে তার জন্য
নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে নিঃসঙ্গ ট্রেনলাইন হয়েছি
আমাদের সমান্তরাল ব্যবধানে—
পৃথিবী মনে রাখে তারে আমার হয়ে

আমায় কে মনে করে
পৃথিবীর বুকে;
ঘাস যে জন্মে আজন্ম রূপান্তরের আশায়
তারে পা দিয়ে মাড়ায়
হলুদ বুকে জন্মের আগে আগে—

কাছাকাছি এসে জেনে গেছি
দূরত্ব দূর থেকে শুরু হয়
পৃথিবী ডুবে যায় মানুষের মনের ভিতর।

 

স্নিগ্ধা বাউল

স্নিগ্ধা বাউল কবি ও শিক্ষক। জন্ম নরসিংদী জেলায়, বাউল পরিবারে। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্য তার অনুরাগের বিষয়। পড়তে ভালোবাসেন লিখতে ভালোবাসেন। চারটি কাব্যগ্রন্হ প্রকাশিত হয়েছে স্নিগ্ধা বাউলের—রাঙতা কাগজ [২০১৭], শীতের পুরাণ চাদর [২০১৮], মনোলগ জলজ ফুল [২০২২] এবং প্রেমের কবিতা [২০২৩]। এছাড়াও অভিযান পাবলিশার্স প্রকাশ করেছে স্নিগ্ধার সিরিজ কবিতা জখমি ফুলার ঘ্রাণ এবং জখমি ফুলের ঘ্রাণ নগরের রাতে। কবিতার জন্য তিনি ‘মাহবুবুল হক সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেছেন। পেশাগত জীবনে স্নিগ্ধা বাউল একজন শিক্ষক।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top