অতীতের সাথে
বাবা মারা গেছেন কুড়ি বছর আগে। পুরো এক বছর বিছানায় পড়ে থেকে চলে যাবার দিন তিনেক আগে একদিন কাছে ডেকে বলেছিলেন, ‘সুমন, বাড়িটা যেনো বিক্রি করে দিস না বাবা।’ ‘এ সব কথা বলার সময় এখন নয়। তা ছাড়া বাবা, তোমার রেখে যাওয়া এই বাড়ি বিক্রি করে দেবো, এমনটা ভাবলেই বা কেমন করে!’
কথা বলতে বাবার কষ্ট হচ্ছিলো, তারপরেও থেমে থেমে বললেন, ‘শুধু বেচে দেওয়া নয়, বাড়িটা ভেঙে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং তোলার কথাও ভাবিস না কখনো।’ আমি চমকে উঠলাম। আমার মনের কথা বাবা টের পেয়ে গেলেন কি করে! বাবা বললেন, ‘মাথা উঁচু করা ঝাঁ চকচকে বাড়িগুলো বড় বেশি উদ্ধত। এর ভেতরে বাইরে কোনো আন্তরিকতা নেই। সুযোগ পেলেই মানুষকে চোখ রাঙায়।’
আমার ইচ্ছে ছিল বাড়িটা কোনো ডেভেলপারকে দিয়ে তিন ইউনিটের ছয় তলা এ্যাপার্টমেন্ট করে ফেলতে পারলে সারা জীবনের জন্য নিশ্চিন্ত। একই ফ্লোরে দুই ভাই বোনকে দুটো দিয়ে নিজেদের জন্যে একটা রেখে দিলেও সহজ হিসাবে ছয়টা থেকে যায়। বহুতল ভবনের নির্মাতারা বুঝিয়েছে সিদ্ধেশ্বরীর মতো যায়গায় সাড়ে সাত কাঠার কর্নার প্লট এ ভাবে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। প্রতিবেশিদের মধ্যেও কেউ কেউ যেচে উপদেশ দিয়েছেন, ‘বাড়িটা ফেলে না রেখে ডেভলপারকে দিয়ে দিলেই তো পারেন।’ আমার মনে হয় বাড়ির পেছনে কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল রঙ প্রতিবেশিদের মনে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পরে বছর গড়াতে না গড়াতেই মাও তাঁর সঙ্গী হলেন। হঠাৎ করেই পরপারে পাড়ি জমাবার আগের দিন কি মনে করে বলেছিলেন, ‘যদি তেমন দরকার না হয়, তাহলে পুরোনো ফার্নিচারগুলো বেচে দিস না বাবা।’ আমি মাকে কোনো কথা দিই নি। শুধু অবাক হয়ে ভাবলাম, বাড়িটার রঙ ফেরাবার আর নতুন ফার্নিচার কেনার কথা কিছু দিন অগেই ভেবে রেখেছি। আমার কাছে থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে মা বললেন, ‘যখন পুরোপুরি একা হয়ে যাবি তখন এই আসবাবগুলো, পুরোনো সোফাসেট, বইয়ের আলমারি, পড়ার টেবিল তোর সাথে কথা বলবে।’
বছর তিনেক আগে ছেলে মেয়ে দুজনেই বিদেশে চলে যাবার পরপরই আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে গেছে। চলে যাবার কার্যকারণ কিছুই সে যেমন বলেনি, আমিও জানতে চাইনি। শুধু জেনেছি, ছেলে মেয়ে দুটো না থাকলে আরও আগেই সে চলে যেতো। এখন কমলাপুরের দিকে একটা ছোট্ট এ্যাপার্টমেন্টে সে একাই থাকে শুনেছি। আমাদের প্রথাসিদ্ধভাবে ছাড়াছাড়ি হয়নি। দুজনেই একা থাকি অথবা থাকতে পছন্দ করি— এই আর কি!
গতকাল ছিল বাবার কুড়িতম মৃত্যু বার্ষিকী। কোনো আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করিনি। অনেক রাত পর্যন্ত পড়ার টেবিলে ছিলাম। বই পুস্তক বন্ধ করে উঠে বুক শেলফের কাছে যেতেই কে যেনো বলে উঠলো, ‘সুমন ভালো আছো তো?’ মনে হলো শোনার ভুল। হাতের বইটা শেলফে রেখে অন্য একটা বই নিয়ে টেবিলে এসে বসতেই স্পষ্ট শুনলাম, ‘অনেক রাত হয়েছে এবারে ঘুমোতে যাও।’
বাতিটা বন্ধ করে বিছানায় গড়িয়ে পড়ার প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে গেছি। ভোরবেলা যখন জানালার ওপারে আলো ফুটতে শুরু করেছে, কে যেনো ফিসফিস করে বলে উঠলো, ‘সুমন, এবারে উঠে পড়ো। সারাদিনের অনেক কাজ এখন তোমার সামনে।’
আমি বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আমাদের পুরোনো বাড়ি পুরোনো আসবাবপত্র আর বারান্দা বাগানের গাছগুলোর পাতায় পাতায় ভোরের হাওয়া আহির ভৈরোঁ রাগে আলাপ শুরু করলো।
দেবদূত
গ্রিসের পিরগস শহরটা ছোট। এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই, পুরো শহর পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা যায়। পিরগসে পৌঁছবার পরদিন সন্ধ্যায় শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে এক চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমি স্থানীয় একজন মানুষের খোঁজ করছিলাম। নভেম্বরের শেষে শীতের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে, সন্ধ্যাও নেমেছে অনেক আগে। পথটা একেবারেই জনমানব শূন্য। যখন কারো সাক্ষাৎ পাবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি ঠিক সেই সময় বাঁ দিকের অন্ধকার গলিপথ থেকে কালো ওভারকোট এবং মাথায় কালো টুপি পরা দীর্ঘদেহী একজন যেনো হাওয়ায় ভেসে সামনে এসে উপস্থিত হলেন।
আমার গ্রিক জানা নেই। ইংরেজিতে শুরু করবো কিনা ভাবছি এমন সময় ভদ্রলোক পরিস্কার ইংরেজিতে বললেন, ‘ইউ আর পসিবলি লুকিং ফর সামথিং! মে বি এ প্লেস অর এ পারসন?’
‘রাইট ইউ আর। আই এ্যাম এ্যাকচুয়ালি লুকিং ফর দ্য গ্রেভইয়ার্ড।’
‘রিয়েলি?’ হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। মাথার কালো ক্যাপটা টেনে একটু নিচে নামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কবরস্থান তো মৃতদের জন্য। আপনার নিজের নিশ্চয়ই এখনও কবরে যাবার সময় হয়নি।’
‘বলা তো যায় না কার কখন কবরস্থানে যেতে হয়!’ গোরস্তানের কাছে আমার এক পুরোনো বন্ধুর খেঁাজে বেরিয়েছি তাকে সে কথা না বলে আমিও একটু রসিকতা করলাম।
‘মৃত্যুর পরে কবরস্থানে পৌঁছানো থেকে শুরু করে শেষকৃত্যের যাবতীয় দায় জীবিতদের। তুমি ইচ্ছে করলেও পা বাড়িয়ে কবরে ঢুকে পড়তে পারবে না।’
‘আসলে আমি এই শহরে নতুন এসেছি, গ্রেভইয়ার্ডের কাছে একটা ঠিকানায় পৌঁছাতে চাই।’
এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘মিনিট তিনেক সোজা হেঁটে প্রথম ডাইনে যে পথটা বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সেই রাস্তা ধরে সামান্য এগোলে বাঁ দিকে পাবে এ্যাঞ্জেলিকান চার্চ আর তার সাথেই গ্রেভইয়ার্ড। আর যদি রোমান ক্যাথলিকদের কবরখানায় যেতে চাও তাহলে পেছনে ফিরে শহরের দিকে পাঁচ সাত মিনিট হাঁটলে দেয়াল দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা জুড়ে যে সমাধিক্ষেত্র সেটি শহরের সবচেয়ে বড় গ্রেভইয়ার্ড।’ আমার একটু কৌতূহল হল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে মুসলিম বা ইহুদিদের কোনো কবরস্থান নেই?’ ‘ইহুদি সিনাগগের সাথে একটা কবরস্থানও আছে। কিন্তু এই শহরে কোনো মুসলিম গ্রেভইয়ার্ড নেই।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘সিনাগগ, প্যাগোডা, গির্জা কিংবা মসজিদ—মন্দির এ সবই জীবিতদের সমস্যা। কাউকে কবরস্থানে সমাহিত করো, চিতায় তুলে পুড়িয়ে দাও কিংবা জৈনদের মতো মরদেহ পাখিদের দিয়ে খাইয়ে দাও, তাতে সেই মৃত মানুষটার কিছুই এসে যায় না।’
‘বাট স্যালভেশন অব দ্য সোল, আত্মার মুক্তি বলে যদি কিছু থাকে তার জন্যে প্রার্থনা বা আনুষ্ঠানিকতার কোনো প্রয়োজন নেই?’ আমি জানতে চাই?
‘মৃতদেহ পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেলে কিংবা পচে গেলে মাটিতে মিশে গেলে তার সাথে বিমূর্ত আত্মার কী সম্পর্ক? অবশ্য আত্মা বলে যদি সত্যিই কিছু থাকে!’ কণ্ঠের গাঢ় আওয়াজের সাথে একটা রহস্যময় হাসি খেলে যায় কালো ওভারকোটের কালো ক্যাপের নিচের ঠোঁটে।
ঠাণ্ডার ভেতরেই হঠাৎ ভয়ে আমার হাত পা আরো ঠাণ্ডা হয়ে আসে। যার সাথে এতোক্ষণ কথা বলছি তার পরিচয়ই তো জানা হয়নি। কণ্ঠের ভীতি লুকিয়ে আমি স্বাভাবিক গলায় বলে উঠি, ‘আপনার পরিচয়টা কিন্তু এখনো জানা হয়নি।’
‘আই এ্যাম এ্যান এ্যঞ্জেল, দেবদূত!’
আমি বিস্ময়ের সাথে তার দিকে তাকাই। সম্ভবত আমার চোখের অবিশ্বাস তিনি পাঠ করতে পেরেছিলেন। মৃদু হেসে বলেন, ‘আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।’
পরমুহূর্তে দুই হাত প্রসারিত করে তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। দেবদূত প্রকৃতপক্ষে কোন ধর্মে বিশ্বাসী তা আর জানবার সুযোগ হলো না।
কারাবাস
বাড়িটা ছাড়া দরকার হয়ে পড়েছিল। মেয়ের স্কুল কাছে বলে এতোদিন ছাড়ার কথা ভাবিনি। এখন আর নিচের তলায় স্যাঁতসেঁতে আলো বাতাসহীন অন্ধকারে থাকতে চাই না। মেয়ের পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথেই অফিসের কবির হোসেনকে বলে রেখেছি। কবির চাকরির সাথে বাড়ির দালালিও করে। সে দুটো বাড়ি দেখিয়েছে, একটাও পছন্দ হয়নি।
নতুন বাসা পুরোনো ঢাকার দিকে হলেই ভালো। আমার অফিস একটু দূরে হলেও স্ত্রী যে কলেজে পড়ায় সেটা কাছে হবে। এবারে কবির নতুন যে বাড়ির খবর এনেছে সেটি নাজিমউদ্দিন রোডে জেলখানার কাছাকাছি। ছয়তলা আধুনিক ফ্লাট, লিফট আছে। কবিরের টেলিফোন পেয়েও ইতস্তত করছিলাম। সখ করে কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে থাকা মানে প্রতিদিন চোর—ছঁ্যাচ্চড় বা দাগি আসামিদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে। গাড়ি ভরে বন্দীদের আদালতে নিয়ে যাওয়া আসা তো চলতেই থাকে প্রতিদিন। মাঝে মধ্যে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হলে জেলখানার রাস্তার ভিড় লেগে যায়।
আমার আপত্তি থাকলেও স্ত্রী বললো, ‘দেখে আসতে তো ক্ষতি নেই, পছন্দ হয়েও যেতে পারে।’
অফিসের গাড়ি নিয়ে জ্যাম ঠেলে ঠিকানা মতো পৌঁছলাম। ড্রাইভার পথে বিরক্ত হলেও নতুন বাড়িতে গাড়ি রাখার জায়গা আছে দেখে খুশি হলো। আগে বাসায় গাড়ি রাখতে হতো রাস্তায়।
বাড়ির মালিক ঢাকার আদি বাসিন্দা। পৈত্রিক একতলা বাড়ি ভেঙে নতুন এ্যাপার্টমেন্ট তুলেছেন সম্প্রতি। তাঁর নাম সফর আলী হলেও জীবনে সফর তো দূরে থাক, ঢাকা শহরের বাইরে কখনো যাননি। এমন মানুষ এখনো এই শহরে আছে ভাবতে কষ্ট হচ্ছিলো। প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না?’ ‘নিয়ত করছি একবার আল্লা রাসুলের দেশ থিকা ঘুইর্যা আসুম। দেখি হালায় আল্লায় যুদি নেয়।’ সফর আলীর উত্তর।
বাড়ির শুধু ঘর দরজা নয়, ছাদে উঠে দেখলাম অসংখ্য দালান কোঠার ফাঁকে বুড়িগঙ্গা দেখা যায়। ইচ্ছে করলে হেঁটেই যাওয়া যাবে নদীর তীরে। জেলাখানার ভেতরটাও বেশ চোখে পড়ে। দূর থেকে পোশাকের পার্থক্য ছাড়া বন্দীদের চলাফেরায় সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করা যায় না। আমার মনে হলো. ভালোই তো! বিকেলে তেমন কাজ না থাকলে সন্ধ্যায় লক—আপের আগে পর্যন্ত কয়েদিদের জীবন যাপনের খানিকটা দেখে নেয়া যাবে। আর সকালে দিন শুরুর আগে দেখা যাবে প্রবহমান নদীর দৃশ্যাবলী।
‘নতুন বাড়ি, ভাড়া বহুত কম রাখছি। তাও দেহেন দুই মাস পইড়া রইছে, মাইনষে লইতে চায় না।’ ‘কেন সমস্যাটা কি? আপনার বাড়ি তো মোটেও খারাপ বলা যাবে না।’ ‘ডরায়, বোঝলেন না জেলখানার কাছে থাকবার সাহসে কুলায় না। কি জানি হালায় কে কুনদিন আবার ধইরা জেলখানায় ভইরা দেয়।’ ‘না না অকারণে কাউকে ধরে জেলখানায় ভরে দেবে কেন!’ ‘মাইনষে যেমতে বোঝে আর কি, আমারে কয় বাড়িয়ালা! আবে হালায়, আমি কিয়ের বাড়িয়ালা! আইজ বাদে কাল আজিমপুরে ফালাইয়া থুইয়া আইলে হাড়হাড্ডির খবর থাকবো না।’
আমি তাঁর কথার কোনো উত্তর দিই না। সফর আলী বলতে থাকেন, ‘আসল বাড়িয়ালা হইলো গিয়া সেই একজন। হের লগে কুনু ভোগলাবাজি চলতো না।’ সফর আলী কথার সাথে উপরের দিকে আঙুল তুলে দেখান। ছাদ থেকে নেমে আমরা ছয়তলায় লিফটের সামনে এসে দাঁড়াই। সফর আলী তাঁর শেষ কথাটা বলেন নিচে নেমে।
‘ডরাইয়া লাভ নাই, আসলে আমরা ভী একখান জেলখানার মইধ্যে আছি। এই দুইন্যাডাই হালায় বড় এউগগা জেলখানা।’
পুরোনো ঢাকার সফর আলীর মুখে দার্শনিকের মতো কথা শুনে আমি চমৎকৃত হই। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। গাড়িতে উঠেই কবির হোসেনকে ফোন করে জানিয়ে দিই, বাড়িটা পছন্দ হয়েছে।
ফরিদুর রহমান

ফরিদুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ফিল্ম এ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া, পুণে থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা লাভ করেছেন। তিন দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। গল্প উপন্যাস ভ্রমণ কাহিনী ও অনুবাদ মিলিয়ে ফরিদুর রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একুশটি। বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে। তাঁর প্রামাণ্যচিত্র ‘অশ্বারোহী তাসমিনা ত্রিশটি দেশে চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এবং বেশ কয়েকটি উৎসবে পুরষ্কৃত হয়েছে।
