আহমেদ নকীবের তিনটি কবিতা

জন্মান্তর 

৭০০ বছর বয়সী গাছের
চা পান করবো আর
সেই খবর পেয়ে আমার
চৈনিক বন্ধু আমাকে
জীবিত করার জন্য
পৃথিবীতে ফিরে আসছেন
বাঁশের তৈরি বাষ্পযানে চড়ে;

প্রায় চাঁদের কাছাকাছি
চলে গিয়েছিলেন তিনি, ঠিক
ততদূর থেকে একটা ইউটার্ন
নিয়ে পতপত শব্দ করতে
করতে ফিরে আসছেন
ছোট-ছোট চোখের বন্ধু জিমি

আমাদের দেখা হয়েছিলো
রোবোটদের দুনিয়ায়;
একটা মেয়ে রোবোটকে
দেখেছিলাম একটা ছেলে
রোবটকে জড়িয়ে ধরে চুমু
খেতে আর আমরা দুইবন্ধু
তখন সাঁতরে পার হচ্ছিলাম
জেলির সমুদ্র; জেলি ফিস,
জেলি ফিস, তুমি কি আমাদের
সাথে বেরাইদ-এ বেড়াতে যাবে?

আমরা কাঠের সিঁড়িতে
বসে পা দোলাতে দোলাতে
সেই অমৃতের চা পান করবো?

তখন খুশিতে চকচক করতে
থাকা চোখগুলি সবুজ কুঁড়িতে
ছেয়ে যাবে। শুনেন মি: জিমি,
আমি কিন্তু আরেকবার ফিরে
আসবো অবারিত চায়ের বাগানে

একটা ছোট্ট চা-গাছ হয়ে জন্ম
নিবো আর সেই  রোবট-যুগল
সবুজ চোখের সংকেত পেয়ে
নেমে আসবে এই লোকালয়ে;

তেমন-ই একদিন কেতলির গরম
পানিতে পাতায় বিবর্তিত আমার
নির্যাস পান করতে করতে
ঘটাংঘট শব্দে বড়বড় পা ফেলে
ওরা ঘুরে বেড়াবে আর হঠাৎ
সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখবে তাদের
চামড়ার নিচে তিরতির ক’রে
বয়ে যাচ্ছে সবুজাভ রক্ত!

তারা একজন আরেকজনকে
স্পর্শ  করবে আর বিস্ময়ে
তাকিয়ে থাকবে তাদের কাঁপতে
থাকা মাংসপেশীর দিকে

৭০০ বছর বয়সী গাছের চা
পান করবো আর সেই খবর
পেয়ে আমার চৈনিক বন্ধু
আমাকে জীবিত করার জন্য
পৃথিবীতে ফিরে আসছেন বাঁশের
তৈরি বাষ্পযানে চড়ে

মাথা-মুণ্ডু 

কে কার মাথা খেলো
এই বিষয়ে  যখন
আমরা কানাঘুষা করি
তখন কি অজান্তেই
আমাদের দাঁতগুলি
বেরিয়ে আসে

কি নিয়মে মাথা খাওয়া
যায়, যেমন খায় মাছের
নিস্পন্দ মুড়া?

কিছু চিবিয়ে খেলে মচমচ
কটকট আওয়াজ হয়

আবার নিঃশব্দে ঘটে
তেমন অনেক কিছুই

সেভাবে চিবিয়ে কেউ
খায় একটা গোটা মাথা

একজন আরেকজনের?

আর একদিন আম্মা ত্যক্ত
হয়ে বলেই ফেললেন:
ওরে, ওরে, ছেলেটা মাথা
খেয়ে ফেললো-রে আমার

তবে কি আম্মারা মাথা
ছাড়াই হেঁটে যান আর
তারপরও ধরেন হাত তাদের
মাথা খাওয়া ছেলেটার?

যেদিন নির্বিকার বাঘ এসে
ছাগলের মাথা চিবিয়ে খেলো
তার হায়ের ভিতর হাড়
চুরমার হয়ে ভেঙে পড়তে
থাকে আর গোঙানিও
তদ্রূপ নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে

রাষ্ট্রও বুঝি নানাভাবে খেয়ে
নিলো মাথা আমজনতার

নুন আর মশলা মাখিয়ে

কি আছে স্কন্ধে মাথা-মুণ্ডু
আমাদের প্রত্যেকের তবে

ঘুম থেকে ধড়ফড় ক’রে
জেগে উঠে বলি : কে নিলো
কে নিলো মাথা
আমার একমাত্র ধড়ের

অকল্পনা

যখন আমি সবজি খাই
একটা ছুরির কাছে
আমার যাওয়া লাগে

খুব মনোযোগ দিয়ে
টুকরা করি সবজি
আর সেই নিমগ্ন ছুরি
একসময় পানি হয়ে যায়

ধ্যানমগ্ন হবো আর
পানির ছুরি দিয়ে
পাতলা ক’রে টমাটো
শশা কাটবো

কুচি কুচি করবো মরিচ
ধনিয়া পাতা
এমনকি গাজরও

এমনভাবে কমলা
কালারের প্রেমে অন্ধ হবো
এমনভাবে সবুজকে
মনেপ্রাণে আত্মস্থ করবো

যেনো একদম মনে
না পড়ে তোমার কথা

তবে তুমি যে খরগোশ
আর মিষ্টি একপাটি
দাঁত দিয়ে আস্ত একটা
গাজর আমার আত্মা
ভেবে একদিন হাসতে
হাসতে খেয়ে ফেললে
এরকম কিছু ঘটতে
ঘটতেও আর ঘটে নি

তুমি যে একটা পাখি
আর আমাদের পেঁপে
গাছের পাকা পেঁপে
ঠুকরে ঠুকরে খাও
তেমন ঘটনা সত্যিই
কি ঘটেছে কোনোদিন?

তুমি যে সেদিন বৃষ্টি
আর আরেকদিন গর্তে
জমা পানি হয়ে আমার
মুখের প্রতিবিম্ব শুষে নিলে
এগুলো সব কাল্পনিক

আমি সবজি কাটবো
এটা অকল্পনা
আমি সবজি কাটবো

খুব মনোযোগ দিয়ে
টুকরা করবো সবজি

যেনো একদম মনে
না পড়ে তোমার কথা

 

 

 

 

 

আহমেদ নকীব

জন্ম :  ২৭ জুন ১৯৬৫।  প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ

‘শিশু ও হারানো বিড়ালের কথা’ (১৯৯৬)। কবিতা, গল্প, মুক্ত-গদ্য ও স্কেচ সব মিলিয়ে এ-পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। অনুবাদ এবং আঁকাআঁকিও করে থাকেন।

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top