শাহনাজ নাসরীনের একগুচ্ছ অণুগল্প

দুই আকাশ

কথা ছিল আংটি-টি পাহাড়ে রেখে আসবো। আঙুল থেকে খুলতে খুলতে পাহাড়ের খাঁজে জমে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে মনে হলো তুমি সেখানেই আছ সিগারেটের ধোঁয়ায় লুকিয়ে। এরকম সময়ে আংটি পরে নিয়ে আমি তোমাকে ধরতে ছুটি।

আমরা বলেছিলাম সৌন্দর্যের কথা বলবো না আর। কিন্তু একটা বৃষ্টিভেজা ভোরে পাহাড়ী ফুলের সোঁদাগন্ধ বুকে নিয়ে আমার সব ওলটপালট হয়ে গেল। পাহাড়ের বুকে নেমে আসা পাখীদের মতো আমার বুক খুঁটে খেতে লাগলো তোমার তীব্র ঠোঁট।

পাহাড়ে না গেলে পাহাড়ের সুন্দরতা তুমি কিছুতেই বুঝবে না। ধরো পাহাড়চূড়ায় সুর্যোদয় দেখতে দেখতে আমি দু’টো আকাশ দেখেছি বললে তুমি কি বুঝবে? না বুঝতে পেরে হো হো করে হাসবে আর মনে মনে বলবে, পাগলি।

অথচ কোজাগরী পূর্ণিমায় সারারাত পাহাড়ে বসে থাকতে থাকতে আর ভীষণভাবে তোমাকে চাইতে চাইতে দেখলাম দুধের মতো সাদা একটি আকাশ ডানা নেড়ে নেড়ে নেমে এসে চরাচর ঢেকে দিলো।

 

বিচারক

আষাঢ়ের কালিমাখা আকাশের মতো মুখ করে সে বললো, সে নাকি শুধু চরিত্র বিশ্লেষণ করেছিল মেয়েটির। মেয়েটির তা ভালো লাগেনি, গালি দিয়েছে। স্যাডিস্ট বলেছে তাকে।

রাগে গনগন করতে করতে সে বললো, ফালতু একটা। মুরুব্বি আর বাচ্চা বুদ্ধিজীবীদের সাথে আড্ডা, লাইভে ঘন ঘন মুখদর্শনের প্রেক্ষিতে ‘যোগাযোগ পটিয়সী’র চেয়ে সুন্দর শব্দবন্ধ কী হতে পারে? অভিশাপ নয় লাঞ্ছনা নয়, সে শুধু সেইসব মেষপালকের অন্ধ-অনুগমনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছিল।

বিষণন বিলাসিনী সত্যটা সইতে পারেনি। তারপর একটু ভেবে বললো আসলে এরা খুব প্রশংসালোভী হয়। সেজন্য প্রকৃতিই শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। তাইতো ডিপ্রেশন হলো, স্ট্রেস বেড়ে রক্তে চিনি থইথই করতে লাগলো! হাসপাতালে নিয়ে গেছে নাকি। এসব ঝামেলা হার্ট না কিডনিতে কামড় বসিয়েছে।

গর্বিত ঠোঁট চেপে সে বললো, ঠিকই আছে যার যা পাওনা।

 

স্বেচ্ছাচার আর স্বৈরাচার

আমি স্বেচ্ছাচারী আর তুমি স্বৈরাচারী। প্রায় একইরকম স্বভাব। হাতেহাত রেখে চলতে পারতাম। হতে পারতো গভীর ভাব।
রসিক বন্ধুরা যেমন স্বভাবের মিলের কারণে আমাদের সার্ত্র-বেভোয়া বলে। সম্পর্কটা অবশ্য মান্টো আর ইসমান চুঘতাইয়ের সাথে বেশি মেলে মনে হয় আমার। কী কঠিন ঝগড়া করি! বেশ একটা মারদাঙ্গা ফাটাফাটি মারামারি।

আমরা পরস্পরকে কী ভীষণ গালাগাল দিই! তুমি আমাকে বলো কুঁচুটে নারীবাদী। আমি তোমাকে বলি হিংসুক পুরুষতান্ত্রিক। কথায় না কুলোলে তীব্র আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ি পারস্পরিক। তৈজসপত্র ছোটখাটো আসবাবগুলি ধকল সইতে সইতে নাই হয়ে যায় আমরা তবু থামি না।

আমি বলি তোমার জিভ একটা বিষধর সাপ। আমাকে ছোবলানোর জন্য সারাক্ষণ লকলক করছে। তুমি বলো আমার আলজিভে ঝুলে আছে বরশির মতো বাঁকা ডিপ্রেশান। সারাক্ষণ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত বাড়াচ্ছে।

অথচ স্বেচ্ছাচার আর স্বৈরাচার একই তো প্রায়। সকল স্বৈরাচারীই স্বেচ্ছাচার করে। আমরা থাকতে পারতাম মিলেমিশে হাত ধরাধরি করে। তা না করে স্বভাবের দোষে দু’জনেই শাঁখের করাতের মতো ধুন্ধুমার মারামারি বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ি…

 

অন্তরীণ

আনন্দ খুব চায় রিকশা করে সদরঘাট যেতে, চুল উড়িয়ে নৌকা চড়তে বুড়িগঙ্গায়।
বৃষ্টিতে রাজপথ ভেসে গেলে ছুটে বেড়িয়ে মাছ মাছ খেলতে ভালোবাসে।
পাগলা হাওয়ায় ছাতাটাকে প্যারাসুটের মতো উড়িয়ে দিয়ে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যেতে চায়।
যাপনটাকে উৎসব করে তুলতে তার খুব যতœ।

আমার খুব রাগ হয়। বের হলেই বাস ট্রাক বা যে কোন একটা গাড়ি ভর্তা বানিয়ে দেবে বা উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
ক্রসফায়ারেও প্রাণ যেতে পারে ভুলক্রমে ।
ও কেন বোঝে না এই অস্পষ্ট সময়ে ভালোলাগা, মন্দলাগা, কান্না, বুদ্ধি, প্রেম সব লুকিয়ে রাখতে হয়।

আনন্দ যতই রাগ করুক আর বিমর্ষ হোক আমি ছোঁয়াছুঁয়ি লুকাই ছাতার তলায়।
কম্পিউটার সাবধানে চালাই। সাতচল্লিশ ধারা জাতীয় বেপরোয়া বন্ধুদের তাই ব্লক করে দিয়েছি।
আনন্দকেও তাই আমি কেবলই লুকাই। ঠিকঠাক লুকোতে পেরে আমার দারুণ ফুর্তি।
অলৌকিক এক শিহরণে স্তন কাঁপে।

অথচ গভীর রাতে আমরা নিদ্রাহীন থাকি।
অভিমানে মলিন আনন্দ গুটিয়ে থাকে নিজস্ব কোটরে।
আমি অপেক্ষা করি একটি সকালের
যদিও ঘরবন্দী থেকে থেকে এখন আর আলো সইতে পারি না।

 

শাহনাজ নাসরীন

জন্ম  ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লায় ।

দেয়াল পত্রিকায় ছড়া লেখা দিয়ে লেখালেখির শুরু। গল্প ও কবিতা দুটোই লিখে থাকেন। চল্লিশটির মতো গল্প একটি উপন্যাস অল্প কিছু কবিতা আর  প্রবন্ধ লেখা হয়েছে এ যাবৎ।

এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি কবিতা, তিনটি গল্প, একটি উপন্যাস ও দুটি জীবনী গ্রন্থ।

Email: [email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।