শাহনাজ নাসরীনের ছোটোগল্প: অর্ফিয়ুস

কতোদিন দেখি না অর্ফি! কাছেই থাকো কিন্তু এ পথ মাড়াও না পাছে দেখে ফেলি। খুব রাগ করেছ তোমার কথা মানতে পারিনি বলে। কতোবার বললে একটা কিছু ছুতো করে বের হতে। কিন্তু আমি পারলামই না ঠিকঠাক ছুতোর মালা গাঁথতে আর তোমার মনে হলো আমারই ইচ্ছে নেই। রাধার গল্প বললে কেমন করে পানি ফেলে দিয়ে জল আনার ছলে বৃন্দাবন যেতো। আমার হাসি সামলানো দায় হলে মুখে হাত চাপা দেই, তাতে তোমার আরো রাগ। আচ্ছা তুমিই বলো এখন তেমন পারা যায়? জগতের সবাই এসব গল্প পড়ে বুদ্ধিমান হয়ে গিয়েছে যে!

অথচ আমি অনলাইনে গল্প করতে চাইলে তুমি পাত্তাই দাও না। এভাবে তোমার সমস্যা হয়। এভাবে গল্প হয়ই না। আজকাল খুব রেগে যাচ্ছ তুমি। আমার ওপর ভীষণ বিরক্ত। কথায় কথায় ছ্যাংছ্যাং করে ওঠ। বললে, আমি সবসময় নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। নার্সিসাস একটা। এই আত্মকেন্দ্রিকতার জন্য লজ্জা করা উচিৎ আমার। লাগবে না ছুতা বানানো, লাগবে না দেখা করা। তোমার অনেক কাজ আছে।

ঠিক আছে বলে আমি মুখ বন্ধ রাখি। চুপ থাকলে দেখি কথাগুলো চোখ দিয়ে ঝরতে শুরু করে। তাই আমি চোখও বন্ধ করে ফেলি। চোখ বন্ধ করে আমি তোমার ভেতর ডুব দেই। এই-ই ভালো। এখানে আমরা সারাক্ষণ গল্প করি, গুনগুন খুনসুটি করি, কবিতা পড়ি, হাতে হাত রেখে হেঁটে বেড়াই। এখানে তোমার দেয়া ধিক্কারগুলি নেই। বিষন্নতা, মন খারাপ নেই। শুধু বাস্তবে মাঝে মাঝে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে অনেক্ষণ অর্ফি অর্ফি জপ করে নেই।

কিন্তু আমি যে হঠাৎ অন্ধ হয়ে গেলাম! সব পড়ে যাচ্ছে ভেঙে যাচ্ছে। গ্লাস ভাঙে প্লেট ভাঙে শখের ফুলদানি ভেঙে যায় হাত লেগে। বর মায়া করে সরিয়ে নিয়ে যায় যেন পা না কাটে, জিজ্ঞেস করে লাগেনি তো? কপাল কেটে যায় একদিন। বর বলে অন্ধ নাকি তুমি? রেশম খালা বলে আপনে বইসা থাকেন তো আম্মা। আমি করতেছি সব। তবু আমি দিনেদুপুরে শুকনো খটখটে ঘরে হোঁচট খেলাম। বর খেঁকিয়ে উঠল উফ আবার! কিন্তু উঠল না কতো আর ছুটবে। দৌড়ে এলো রেশম খালা। আহারে আবার উষ্টা খাইছেন? আল্লাগো আপনের নউখ তো উল্টায় গেছে, রক্ত পড়তাছে। ওর কথা শুনে আমি পায়ের দিকে তাকাই। বুড়ো আঙুলের নখটা হা হয়ে আছে। কোণ বেয়ে অল্প রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। কালই আমি স্বপ্ন দেখেছি আমার হাত-পায়ের সবগুলো নখের ফাঁক দিয়ে জলপ্রপাতের মতো উজিয়ে রক্ত বের হচ্ছে কলকল ছলছল। আর আমি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলছি আমি মরে যাচ্ছি অর্ফি জানতেও পারছে না। ওকে কী করে জানানো যায় তা ভেবে ছটফট করতে করতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।

স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে অভিমানে চোখমুখ শক্ত হয়ে ওঠে। রেশম খালা আমাকে বসিয়ে দিয়ে ছুটোছুটি করে পানি গরম করে। বর স্যাভলন গজ এসব আনতে থাকে। আমি শুশ্রুসার সব আয়োজন পায়ে ঠেলে উঠে বাথরুমে ঢুকি। খালি বালতির ওপর খুব জোরে ট্যাপ ছেড়ে দিলে আর কোন শব্দ বাইরে আসে না। যদিও এখন আমার চোখে পানি নেই। ট্যাপ আর শাওয়ার একসাথে ছেড়ে দিয়ে শাওয়ারের নিচে দাড়িয়ে সব ধুয়েমুছে ফেলার চেষ্টা করতে করতে বলি, অর্ফি অর্ফি আমি মরে যাচ্ছি। অর্ফি অর্ফি আমি চুপচাপ মরে যাব তোমাকে জানতেও দেব না।

 

শাহনাজ নাসরীন

জন্ম  ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লায় ।

দেয়াল পত্রিকায় ছড়া লেখা দিয়ে লেখালেখির শুরু। গল্প ও কবিতা দুটোই লিখে থাকেন। চল্লিশটির মতো গল্প একটি উপন্যাস অল্প কিছু কবিতা আর  প্রবন্ধ লেখা হয়েছে এ যাবৎ।

এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি কবিতা, তিনটি গল্প, একটি উপন্যাস ও দুটি জীবনী গ্রন্থ।

Email: [email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।