কাব্যনাটক: পদস্খলনের পর

যোবায়ের শাওন

দরজা খোলা ও বন্ধ হওয়ার মতো শব্দ হতে থাকবে। কিছু শ্লোগান ভেসে আসবে। জিকিরের মতো শব্দ শ্লোগানের শব্দ ছাপিয়ে যাবে। যে কোনো খেলায় সমর্থকরা যেমন চিৎকার করে তেমন শব্দ সব ছাপিয়ে প্রকট হবে। আবার’ দরজা খোলা ও বন্ধ হওয়ার মতো শব্দ হতে থাকবে।
জনান্তিকে কেউ একজন দৃঢ় কন্ঠে বলতে থাকে–

কোনো সময় নেই স্থানের কোনো অবকাশ থাকে না তাই
সময় ছাড়া স্থানের অস্তিত্ব ভাবা বৃথা
বৃথা কারণ খোঁজা ভেতরের মূল বিষয় কী, বা
কী বলা এর উদ্দেশ্য হতে পারে।
গ্রীষ্ম কিংবা শীত ছিল কিনা? না কি আকাশে ভাসতো কাশের
মতোন শরতের মেঘ; অথবা মাদী কুকুরগুলোর পেট
কেবল ভারী হতে শুরু করেছে কি তখন
সে সম্পর্কে কোনো আঁচ না পাওয়া গেলে
আশাহত হওয়ার কোনো কারণ নেই; কিংবা আশাই বা কিসের?
উত্তর-পুরুষের দোষ তখন প্রজন্মের দোষে দুষ্ট
ভোরের শিশির সতেজ শিউলির মতোন যুবতীরা
হারিয়ে ফেলেছে কী সজীবতা সমস্ত নাকি
মোরগজবার আদলে রক্তিম যুবাদের গায়ে
লেপটে আছে শীতল রক্তের কালচে দাগ?
অথবা তারা ক্লান্তও হতে পারে।
আর সে ক্লান্তির আস্বাদে একখণ্ড ভারী হওয়া মেঘ
পর্বত-চূড়ায় নিশ্চিত ধাক্কা লাগার অপেক্ষায়।
তখন অপেক্ষা, অপেক্ষা আর অপেক্ষার পালা চলছিল মনে হয়।

( দরজা খোলা আর বন্ধ হওয়ার শব্দ ক্রমে নিঃশব্দে চলে যায়; মঞ্চে প্রবেশ করে ব্যক্তি দুই। ব্যক্তি দুই মঞ্চে ঢুকেই বের হবার পথ ঠিক করতে পারে না, ঠায় দাঁড়ায়; পথ পেয়েছে ভেবে এগিয়ে যায় আবার পেছায় আবার এগিয়ে যায় প্রবেশ করে ব্যক্তি এক)

ব্যক্তি এক : এই তো পেয়ে গেছি ভীষণ রকম খুঁজে
অবশেষে আপনাকে। সেই সেদিন থেকে
আপনার দেখা পাবার ইচ্ছা প্রবল হয়ে আসছিল
আমি খুঁজছি, খুঁজে যাচ্ছি অথচ আপনার পদচ্ছাপের কোনো চিহ্ন
রাখতে পারে নি পথের কোনো ধুলো।

ব্যক্তি দুই : আপনি যেমন ছুটছেন আমার সন্ধানে
এবং বলা যায় পেয়েও গেছেন। কিন্তু আমিও খুঁজছি
কাউকে এবং নিশ্চিত করে বলতে পারি সে আপনি নন।

ব্যক্তি এক : দেখুন সেই ব্যক্তিটি আমি হতেও পারি
আপনার নিশ্চয়তার ধারণা
আরেকবার ভেবে দেখার অবসর রাখতে বলব।
সেই সেদিন যা ঘটেছিল তা কি আছে মনে
নাকি প্রবাহিত স্রোতের মতো কিনারায় আঘাত করেই
ভুলে বসে আছেন সহায়ক বাতাসের ভূমিকা।

ব্যক্তি দুই : আপনার সাথে এই প্রথম দেখা হলো
এর আগে কোথাও যাই নি আমি
কিংবা আমার কাছে আসে নি কেউ;
আর কেন আসবে বলুন?
আমিই বা অন্য কোথাও কেন যাবো?

ব্যক্তি এক : আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছিল এবং আপনি বরং যেচেই
পরিচিত হয়েছিলেন আমার সাথে।
কিংবা একে পরিচিত হওয়া বলছি কেন!
কেননা সেই ঘটনার সময়ে আমরা বাধ্য ছিলাম
প্রতিবেশের কাছে, একই সিদ্ধান্তে আসতে।

ব্যক্তি দুই : দেখুন আমি মানে ব্যক্তি দুই কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নই
এবং আমার জীবন শেষপর্যন্ত ঘটনাহীন থেকে যাবে,
যাতে আমি সন্তুষ্ট বলতে পারেন।
আর যেচে পরিচিত হওয়ার কথা বলছেন
হতে পারে এমন কারুর না কারুর সাথে;
কিন্তু আমার মনে হয়, সে আমি ছিলাম না
আর যদি আপনার মনে হয় সে আমি
তাতেও কোন অসংগতি নেই!
কেননা আপনার কাছে হয়তো সেই ব্যক্তি আমি
কিন্তু আমার কাছে আমি সবসময়ই নতুন
এই যেমন এখন।

ব্যক্তি এক : তাই বলে কিছুদিন আগের যে পরিচিত জন
কয়েক দিনের ব্যবধানে সে ভিন্ন হয়ে যাবে
তা কেমন করে মানবো বলুন?
তাছাড়া এমন ঘটনার ভেতর দিয়ে আপনাকে পাওয়া
সেই মহান ঘটনার পবিত্রতা হেতু আপনি
অভিন্ন থাকবেন এমনটাই বিশ্বাসযোগ্য।

ব্যক্তি দুই : বিশ্বাস করার কথা বলছেন, সে আপনারা পারেন
কিন্তু দেখুন ও আমার একদম ধাতে নেই
তারচেয়ে আমার সন্ধান ছেড়ে আপনি দল গোছানোর চিন্তা
অথবা তাদের যথাযথ ব্যবহার করার নতুন কৌশল আত্মস্থ করতে পারেন।
পবিত্রতার জলপাত্রে প্রত্যহ করতে পারেন চুম্বন হাজার
তবে জল যেন তৃষ্ণা না মেটায় সেটাও রাখবেন মাথায়!
আর কবে কোথায় কখন ঘটেছিল কী দেখেছিলেন কাকে হঠাৎ
সে সব কিছু ভুলে যান; না হলে অপ্রাপ্তিতে বিশ্বাস বাড়বে
মনে ভাববেন হারাচ্ছেন পবিত্রতাই বোধহয়!
আমি বরং এবার পথ খুঁজতে থাকি…

ব্যক্তি এক : এই যে শোনেন যাবেন না আর সেদিনের ঘটনার কথা…

(ব্যক্তি দুই চলে যায়, পিছন পিছন চলে যায় ব্যক্তি এক। ব্যক্তি তিন ও ব্যক্তি চার এর প্রবেশ; কথা বলছেন পরস্পর)

ব্যক্তি চার : তো আপনাদের সন্তুষ্টির কথা বললেন
কিন্তু জানেন কি আমরা কেবল এই সন্তুষ্টি নিয়ে থাকতে পারছি না
আদারওয়াইজ আমরা জীবনের কথা ভাবি কিনা। আর এই
জীবন ভাবনায় আমাদের বেশ নামডাক
না নামডাক ঠিক না, কি যে বলে প দিয়ে শব্দটা শুরু
কী যেন কী যেন…

ব্যক্তি তিন : প্রসিদ্ধ কি!

ব্যক্তি চার : ও হ্যাঁ প্রসিদ্ধ। মানে আমাদের বেশ প্রসিদ্ধি আছে
আফটারওল এই জীবন নিয়ে কাজ তো আর কম হলো না।
তো আপনি যেন কী বলছিলেন?

ব্যক্তি তিন : মানে আমি বলছিলাম আমাদের আরো কিছু …

( ব্যক্তি এক ফিরে আসে। ব্যক্তি তিন এককে দেখে; চিন্তিত হয়। ব্যক্তি এক এগিয়ে আসে ব্যক্তি চার এর দিকে;আগে থেকে পরিচিত হতে পারে )

ব্যক্তি চার : আরো কিছু সজীব সতেজ জীবনের প্রয়োজন
ইচ্ছে মতোন গড়বেন ভাঙবেন এই তো
তো সেটা কী আমরা জানি না মনে করেন
একেবারে ভোরের শিশির ভেজা শিউলি আছে বেশ কিছু
আরে আপনারা আছেন বলেই তো নিত্য
শিউলি কিংবা মোরগজবার এত সমৃদ্ধ সংরক্ষণ।
(ব্যক্তি এককে দেখে উদ্বেলিত হয়)
এভাবে দেখা হয়ে যাবে আপনার সাথে ভাবি নি, কী অদ্ভুত!
আজ ভোরেই মনে পড়েছিল আপনার কথা খুউব
সেই কবে থেকে আর যান না সংরক্ষণাগারে
তার পরে কি খবর বলেন মোরগজবা আর
শিউলিগুলো কেমন উদ্দমে কাজ করে যাচ্ছে আপনার ইচ্ছায়
জন্মের শুভ্রতা অবশ্যই তাদের আর নেই অবশিষ্ট

ব্যক্তি এক : আমিও আপনার কথাই ভাবছিলাম;
সেই সেবারের চালানটা নিয়ে কথা ছিল।
(ব্যক্তি তিন কে দেখে; তিন বিব্রত হয়ে নিজেকে সামলে নেয়)
ওনাকে পরিচিত মনে হচ্ছে দেখেছি যেন কোথায়, কোথায়
কবে কথা হয়েছিল যেন…

ব্যক্তি তিন : ওই সে বছর যেবার নবীন বেয়াদপরা
আমাদের বিরুদ্ধে এক হয়ে গেল, শ্লোগান পর্যন্ত তুললো
আমাদের মানে আপনাদের এবং আমাদের সবার…

ব্যক্তি এক : হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদের বলাটাই ঠিক ছিল
কেন যে আবার পার্থক্য করছেন আপনি
সে বছর যে বেগ পেতে হয়েছিল ওফ
মনে হলেই গা ঘেমে ওঠে। থাক
তারপর কী খবর বলুন নবীন বেয়াদপরা তো এখন পর্যন্ত
দিলো না নিস্তার।

ব্যক্তি তিন : আমরাও গুছিয়ে নিচ্ছি নিজেদের এবার
শেষপর্যন্ত ওদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে তো!

ব্যক্তি এক : টিকবার কথা আসছে কেন? বলেন পরাজিত করে
রাখতে হবে পূর্বপুরুষের মান। আপনি কি বলেন?

ব্যক্তি চার : আমি তো বলার জন্যই বসে আছি শুধু কি
বলার জন্য? বরং করবার জন্য। আমি মানে আমরা
চালিয়ে যাচ্ছি সংরক্ষণাগারের আধুনিকায়ন
যাতে শিউলি আর মোরগজবা পাওয়া যায় বছর বারোমাস
যাতে ভোরের শিশির পড়ে গেলেও শিউলিগুলো সতেজ থাকে
মোরগজবা না হারায় তার রক্তিম দীপ্তি।

ব্যক্তি এক : আরে ভাই বুঝতে পারছেন না কেন?
ওই সতেজতা আর রক্তিমতাই যত নষ্টের মূল
তারচেয়ে এক কাজ করেন, সতেজতা সব নিংড়ে ফেলেন
রক্তিম আভার বিচ্ছুরণ লাগবে না একদম
লাল করে দেন কালো খয়েরি কিংবা কালচে

ব্যক্তি তিন : সত্যি, উনি ঠিক বলেছেন। ঐ রক্তিমতার উদ্ধততাটুকু
আর সজীবতার কোমলতা না থাকলে
নবীন বেয়াদপদের নিয়ে এত ঘাম ঝরে না।

ব্যক্তি চার : কিন্তু ভাই এই আপনারাই তো বাগড়া বসাবেন
বলবেন টাটকা নয়, দাম কমবে; আর
শিকায় তুলে ব্যবসা আমি ঘুরে ফিরবো পথে পথে…

ব্যক্তি এক : চিন্তা করবেন না শিকায় তুলতে হবে না ব্যবসা
আরে ভাই যুগ পাল্টেছে না, বিশ্ববাজারে যে দাম
সে দামই পাবেন খালি রংটা পাল্টান।

ব্যক্তি তিন : অবশ্যই অবশ্যই যুগের হাওয়া লাগান এবার
আরে আপনার সাথে যাকে দেখলাম
ঐ তো ওদিকটায় ছিলেন কোথায় গেলেন তিনি?

ব্যক্তি এক : আরে ভাই বলবেন না ভীষণ বদ লোক
এতো খুঁজে বের করলাম অবশেষে
কিন্তু নিজের একগুঁয়েমির জোরে চলে গেলেন
ওকে কাজে নিতে পারলে নবীন বেয়াদপও মেনে যেত পোষ
কিন্তু…

ব্যক্তি চার : কিন্তু কী? আচ্ছা থাক পরেও শোনা যাবে।
আমাকে আবার এখুনি যেতে হবে সংরক্ষণাগারে
সময় মতো খাবার না দিলে অর্ধেকের হয়ে যাবে গ্যাস্টিক
আর তা থেকেই যে কতকিছু
একটা এসি আবার নষ্ট হয়ে পড়ে আছে
ঠিক না করলে গরমে সব হাঁসফাঁস করবে
অবস্থা খুব খারাপ হতে পারে।
তাহলে ঐ কথাই থাকলো, আসবেন
আসবেন আপনারা খুউব শিঘ্রই

ব্যক্তি এক ও তিন : অবশ্যই যাবো, শিঘ্রই;
সংরক্ষণাগারের কাজে সহায়তা লাগলে বলবেন
বলবেন কিন্তু।

( ব্যক্তি চার চলে যায়; বেরুবার সময় ধাক্কা খায় ব্যক্তি পাঁচ এর সাথে। ব্যক্তি পাঁচ হাসতে হাসতে প্রবেশ করে মঞ্চে )

ব্যক্তি পাঁচ : উনি কি আপনাদের সাথেই ছিলেন নাকি
একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলাম
অথচ ভদ্রলোক গেলেন ক্ষেপে
ব্যক্তি তিন : আরে না, না হয়তো আপনাকে তিনি চিনতে পারেন নি
আর আমাদের সাথে যদিও আপনি পরিচিত নন
তবু আপনার মনে হলে বলতে পারেন
নিজেদের সামর্থের প্রায় সবটুকু দিয়েই চেষ্টা করব
চেষ্টা করব যথার্থ পরামর্শ দিতে

ব্যক্তি এক : হ্যাঁ হ্যাঁ  বলুন, কী করতে পারি আপনার জন্য

ব্যক্তি পাঁচ : না না তেমন কিছু করতে হবে না আপনাদের
যা করার আমিই করব
আপনারা শুধু বললেই হবে

ব্যক্তি এক তিন : হ্যাঁ বলুন

ব্যক্তি পাঁচ : পাবলিক টয়লেট কোন দিকে?

ব্যক্তি তিন : জি, কী লিফলেট!
ও মানে আপনি কোন দলের সাথে আছেন
কাদের জন্য তৈরী করতে চাচ্ছেন বলুন
আর বিষয়টা কি জানতে পারি

ব্যক্তি এক : দেখুন উনি লিফলেট বানাতে চান না
উনি টয়লেট করতে চান তাই খুঁজছেন এদিকে
(ব্যক্তি তিন বিব্রত হয়, ছি-ছি করতে থাকে)
তা এই ভর দুপুরে টয়লেট খুঁজছেন?

ব্যক্তি পাঁচ : কেন, দুপুরে টয়লেটের প্রয়োজন হতে পারে না!

ব্যক্তি তিন : না তা পারে বইকি; কিন্তু ব্যাপারটা শুনতে কেমন অশ্লীল লাগে
দুপুর বেলা রাস্তায় রাস্তায় একজন খুঁজে বেড়াচ্ছে টয়লেট!

ব্যক্তি পাঁচ : আচ্ছা ভাই শ্লীল-অশ্লীল পরেও ভাবা যাবে
এখন ব্যাপারটার নিস্পত্তি না করলেই না

ব্যক্তি এক ও তিন: আরে আরে এ কী…

ব্যক্তি তিন : কেমন রুচিবোধ দেখেছেন এ তো রীতিমত সভ্যতা বর্হিভূত কর্ম

ব্যক্তি এক : আমি নিশ্চিত নবীন বেয়দপদের একজন হবে
আমাদের ছেলেরা বেশ নিয়মানুগ
অথচ এরা ছি ছি ছি…

( পাঁচ বেশ উঁচু স্বরে আহ্ শব্দ করে। এক ও তিন একে অপরের দিকে তাকায়)

ব্যক্তি তিন : আমার তাই মনে হচ্ছে, আর চেহারাটাও
একদম ওদেরই মতো।
যেন এই মাত্র দৌঁড়ে আসলো মাইল দুই
আর অসভ্যতার যে নমুনা!

ব্যক্তি পাঁচ : তাই বলুন। আপনারাতো একেকজন সভ্যতার ধারক বাহক
আর আপনাদের চেলা-চামুণ্ডারা… থাক সে কথা…

ব্যক্তি তিন : না থাকবে কেন বলুন, বলুন

ব্যক্তি পাঁচ : যা বলবো সে সব আপনারা জানেন
তবু শুনতে যখন চাইলেন তখন কী আর করা, বলি;
না হলে আবার বেয়াদপি হয় যদি!

ব্যক্তি এক : দেখ কথা বলছো বলে ভেবো না
তুমি যা তা বলবে আর আমরা তা সহ্য করবো
আদর্শের জায়গায় তো একেবারে ছ্যাড়াব্যাড়া, নিজস্ব চিন্তার সৌকর্য
নেই, আছে কতগুলো অসভ্যতা আর অশ্লীলতার সমন্বয়হীন সমন্বয়তা

ব্যক্তি তিন : আর তার বদৌলতে নাম জুটেছে নবীন বেয়াদপ।
বাহ্ বেশ বেশ। ভালোই শোনায় নাকি?

ব্যক্তি পাঁচ : দেখুন, আমাদের ভাবনার নিজস্বতা আছে বলেই
আপনাদের এত গায়ে লাগছে।
আর শ্লীল-অশ্লীল সে তো আপেক্ষিক।
নবীন বেয়াদপের কথা বলছেন? হাসালেন, আচ্ছা আপনারা এখন’ যাদের মহাপুরুষ স্বীকার করে বসে আছেন
মানছেন তাদের কথা ধ্রুব সত্য বলে সেই তারাও
তাদের নিজ নিজ সময়ে বেয়াদপই ছিলেন!

(হঠাৎ মঞ্চে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রবেশ করে একদল যুবক যুবতী। অনেকটা দূর থেকে তারা আসছে; অনেকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। ক্রমে কমতে থাকবে তাদের হাঁপানোর মাত্রা। দূর থেকে আসা তাদের হৈ চৈ শুনে ব্যক্তি দুই ও তিন তটস্থ হয় চলে যায় মঞ্চের একপাশ ঘেঁষে)

ব্যক্তি পাঁচ : আপনারা?
মুখাবয়বের ভীতি আর একধরনের দীপ্তি দেখে
স্থির হতে ইচ্ছে করে
ভাবতে ইচ্ছে করে, এমন কিছু হয়েছে মঞ্চের বাইরে
যাতে আপনারা গর্বিত যা শৃঙ্খল মুক্তির বার্তা দিতে চান
বলুন বলুন চুপ করে থাকবেন না
বলুন,বলুন

প্রথমা যুবতী : আমার সঙ্গীরা সবাই ক্লান্ত; অন্তত
এখন এই মুহূর্তে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত
কিন্তু আমরা এমন ঘটনার ভেতর দিয়ে এসেছি
যা এই মুহূর্তে না বললেই নয়।
তবুও ঘটনা বর্ণনের আগে
কিছু ভূমিকার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।
তার আগে বলুন জায়গাটা কতটা নিরাপদ?

ব্যক্তি পাঁচ : নির্দ্বিধায় বসতে পারেন
তবে নিরাপত্তা কোথাও আছে কি, সত্যি?

প্রথম যুবক : কেন আছে তো, সংরক্ষণাগারে!
নিরাপত্তা আছে জীবনের,
নিশ্চয়তা আছে অন্ন, বস্ত্র আর
বাসস্থানের মতো হাতে গোনা মৌলিক অধিকারের
শিক্ষাটাও আছে তবে তা কেবল
নিজেকে বিক্রি করবার উপযোগী করে তোলার মতো
নিজেকে জানবার মতো নয় কখন’।

ব্যক্তি পাঁচ : সংরক্ষণাগার! হ্যাঁ তা তো বটেই
তবে তার আজ অঢেল ব্যবসা
দল ভারী করতে চান তো কিচ্ছু করতে হবে না
কে কি কেন কীইবা তার আদর্শ
সে সব জানবার কোনো কারণ নেই
মুঠোভরে টাকা নিয়ে যান বগল দাবা করে নিয়ে আসুন
ঘামে যদিও বগল জবজব করে তবু তাদের কোনো রা নেই
যেন রাস্তার পাশের নেড়িকুত্তা
সকালে চা খেতে খেতে দিন ছুঁড়ে আধ-খাওয়া বিস্কুট
ঠিক চিনে নেবে আপনাকে আর ঘুরতে থাকবে পিছু পিছু।

( যুবক-যুবতীদের ভেতর একজনের আর্তনাদ শোনা যায়; প্রথম যুবক সহ মঞ্চের সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় তার দিকে। সে কিছু বলতে চায় কিন্তু প্রথমা যুবতী তাকে থামিয়ে দেয় )

ব্যক্তি পাঁচ : মনে হচ্ছে আপনি কিছু বলতে চান
নির্দ্বিধায় বলতে পারেন

প্রথমা যুবতী : না না তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়
যেমনটা ভাবছেন তেমন কিছু বলার নেই তার
অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছে তো
অতিক্রান্ত পথের মায়ায় তার এই আর্তচিৎকার
জানেন তো মায়া কাটানো সহজ নয় খুব।

ব্যক্তি পাঁচ : অবশ্যই জানি, তবে তাকে আজ বলতে দিন
কিংবা করতে দিন বিলাপের কিছুটা বহিঃপ্রকাশ
বাধ সাধবেন না দয়া করে; মানেন তো
উদগিরিত খাদ্য না আটকানোটাই স্বাভাবিকতা, সুন্দর।

প্রথম যুবক : হ্যাঁ সে বলতে পারে তবে
পুরোটা না জেনে তার প্রকাশিত কথায় থাকতে পারে
অন্ধত্বের ছাপ
এবং যা হয়তো অর্জিত হয়েছে তার বিশ্বাসে আর
একরোখা বন্ধুত্বের অনিবার্যতায়।
তারচেয়ে আমরাই করি ঘটনার বর্ণন আর এতে করে
প্রয়াস পাবো সঙ্গী তরুণের অন্তর্জালা নির্বাপিত করার।

ব্যক্তি পাঁচ : (প্রথমা যুবতীর দিকে তাকিয়ে)
আপনার ভূমিকা যা বলতে চেয়েছিলেন
মূল ঘটনা বর্ণনার আগে তা কি ইতিমধ্যেই
হয়ে গেছে বলা? অন্তত কিছুটা?

প্রথমা যুবতী : না। কোনো রকম ভণিতার কাছ দিয়ে আমরা যাবো না
সংক্ষেপে করবো বর্ণনা এই এতোদূর পৌঁছানোর পথ পরিক্রমা
আর আমি নিশ্চিত তাতে আমাদের তরুণ সঙ্গীর সমস্ত কাতরতা
সব রকমের ক্ষোভ দূরে সরে যাবে
আবার পথ খুঁজে ফিরবো সাধারণ কোনো জীবনের;
পোশাকি ভাষায় যাকে আপনারা বলেন কল্যাণ আর
মঙ্গলের পথ।

প্রথম যুবক : তার আগে সেই নবীন বেয়াদপদের কথা বলতে হয়
যাদের আহবানে সংরক্ষণাগারের দেয়াল ভেঙেছিলাম আমরা
পেয়েছিলাম কিংবা বলা যায় পেতে চেয়েছিলাম
মুক্ত কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণের কাছে
দায়বদ্ধতার জীবন অন্তত একবার।

প্রথমা যুবতী : কিন্তু একটা সময় আসে যখন আমরা বাধ্য হলাম
নিজেদের মতো করে ভাবতে, চিন্তা করতে
আর সেই ভাবনার বাস্তবায়নে কিছু কৌশল নিয়েছিলাম আমরা
যে কৌশলগুলোর একটির ব্যর্থতায়
আমরা বাধ্য হলাম নিজেদের একজনকে হারাতে

প্রথম তরুণ: দয়া করে হারিয়ে ফেলার বাধ্যবাধকতা
বলবেন না। তার চেয়ে বলুন নিজেরাই বাধ্য করেছেন তাকে
হ্যাঁ হ্যাঁ বাধ্য করেছেন আপনারা

( তরুণ আপ্লুত হয় গুমরে ওঠে। প্রথম যুবক এগিয়ে আসে সাথে আরেকজন তরুণ। যুবক-যুবতীদের প্রবেশের পর থেকেই ব্যক্তি তিন ও চার মঞ্চের একপাশে সরে ছিল। তাদের কথা শুনছিল; তরুণের কথা শুনে চুপ করে থাকা অসহ্য হয়ে উঠলো তাদের )

ব্যক্তি তিন : তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এরা সবাই সংরক্ষণাগার থেকে
পালিয়েছিল; বোকার দল এর বাইরে আর কি করতে পারে!
নাহ্ কিচ্ছু হবে না; সৌন্দর্য না বুঝলে
না বুঝলে কল্যাণ, তাদের নিয়ে
আর কি করা যেতে পারে বলুন?
না হয় পালালো কিন্তু এর অনিবার্য ফল
আনবে না বয়ে সার্বিক সমাজের কোনো কল্যাণ
বরং অসুস্থ এই প্রজন্মের সারিতে
আরো কিছু অপদার্থের যোগ হলো বলতে পারেন

ব্যক্তি এক : এতো কথা বলার কোন কারণ দেখছি না!
মূল কথাটা হল এরা এই বিপথগামীরা
নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে
কিংবা বলা যায় দলীয় কোন্দলে
ফেলেছে মেরে নিজেদেরই লোক আর…

ব্যক্তি পাঁচ : আর আপনারা যারা কন্ঠের উচ্চস্বরে ভয় পান, পড়েন লুকিয়ে ভীতস্বরের আর্তচিৎকারে
সেই আপনারাই মানুষের কল্যাণের কথা ভাবেন,
মঙ্গল চিন্তায় ঘুম হারাম অথচ
ঘটনার পেছনের ঘটনা যে আছে
এবং তা দৃশ্যত ফলাফল থেকে আরো বেশি
ডাল-পালা নিয়ে সংগঠিত হতে পারে তা মনে করেন না।
আর নবীন বেয়াদপদের দল ভারী হবার কথা বলছেন তো
তবে শুনে রাখুন, এই এরাই যুগে যুগে পথ করে দিয়েছে
একমুখী প্রবাহিত স্রোতের ধারা দিক-বিদিক।

প্রথমা যুবতী : মাফ করবেন চিনতে পারি নি আপনাকে
যদিও উচিৎ ছিল চেনার

ব্যক্তি পাঁচ : আরে না না; আপনি বরং বলুন যা শুনবার অপেক্ষায় আছি

প্রথমা যুবতী : অবশ্যই। (বাইরে দেখে আসার ইশারা করে প্রথম যুবককে)
আমরা কয়েকজন মিলে এই নতুন জীবনের ধারণা তৈরি করেছিলাম
আর নির্যাস নিয়েছিলাম অতীত সমস্ত মঙ্গল আর কল্যাণ থেকে।
সবাই মিলে একটা ইউনিট
আদর্শেও একই বোধ কাজ করেছে।

দ্বিতীয় যুবক : দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন ভোগের
আর সুবিধা বিনিময়ের
অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে যে কৃষি
তার পিস্টনই আজ ভেঙে যাবার জোগাড়
কিংবা ভেঙেই গেছে বলা যায়
কৃষকের হাতে বীজ নেই
এর থেকে বড় আশংকার আর কী হতে পারে! তবু
নাগরিকদের ভেতর কোনো অসন্তুষ্টি নেই সে আমরা জানতাম
আফ্রিকার ইতিহাস আমাদের জানা ছিল
কাজেই ভূগহ্বরের সম্পদ কোথায় যেতে পারে
আর সেই সব অমূল্য সম্পদ পাবার লোভে
কী হচ্ছে খাদক রাষ্ট্রগুলোর উর্ধ্বতন পর্যায়ে
সে খোঁজ রাখছিলাম আমরা।

প্রথম যুবক : এমন সময় রাষ্ট্র ঘোষণা করলো নতুন খনি খননের।
কার্যক্রম শুরু হবার আগেই
আমরা ঘুরে এলাম কয়েকটি খনি এলাকা। চলে গেলাম
নতুন এলাকায় যেখানে খনন শুরু হতে মাসখানেক বাকী।
ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের কাছে
সেখানেই আমাদের তরুণ সঙ্গী
মানে যাকে আমরা হারিয়েছি কিংবা নিজের দোষেই…

প্রথমা যুবতী : হ্যাঁ সেখানেই সে প্রথম মাঠ পর্যায়ে
কাজ করছিল।
(প্রথম যুবককে আলতো করে ছুঁয়ে যায়)

দ্বিতীয় যুবক : কয়েকটা গ্রামে তিনজনের একেকটা টিম
কাজ করছিল; আমরা চারটা টিম সব মিলে।
একটা টিমের দায়িত্বে ছিল সে।

প্রথমা যুবতী : তারপর একদিন চারিদিকে অন্ধকার করে
প্রচণ্ড এক ঝড় হয়ে যায়। ওই এলাকায় সমস্ত রকমের
নেটওয়ার্ক ভিত্তিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তখন।
সেদিন আমরা সার্বিক কার্যক্রমের ফিরিস্তি চেয়েছিলাম
টিম লিডারদের কাছ থেকে। সে আসতে বেশ খানিক
দেরি করেছিল এবং সেটা স্বাভাবিক ছিল
যদিও অন্যরা পৌঁছে ছিল যথা সময়ে।

(মঞ্চের কাঠামো বদলে যায়; ব্যক্তি এক, তিন, পাঁচ, আর তৃতীয় তরুণ একেকটি টিমের লিডারের ভূমিকা নেয়। প্রথমা যুবতী এবং দ্বিতীয় যুবক মঞ্চে উপবিষ্ট)

দ্বিতীয় যুবক : আমরা জানতে পেরেছি খুউব শীঘ্রই শুরু হবে ভূমি অধিগ্রহণ
রাষ্ট্রের ইচ্ছায় কেউ বাধ সাধতে পারবে না আর সেটাই আইন
তবে আমরা যদি স্থানীয় অধিবাসীদের
জাগাতে পারি, বলতে পারি তাদের যথার্থ ক্ষতির কথা
আর তারা যদি আন্দোলন অবরোধে রাজি হয়
তবেই একমাত্র সম্ভব হতে পারে
আমাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।

টিমলিডার দুই : আমার মনে হয় প্রথমেই তাদের উর্বরা জমির কথা বলা উচিৎ
স্বর্ণগর্ভা এই জমি হারাবে তারা
হারাবে পূর্বপ্রজন্মের স্মৃতি, পায়ের চিহ্ন;

টিমলিডার এক : ওদের অধিকারের বোধ জাগানো জরুরি
সবার আগে বোঝাতে হবে
এখানে তাঁরা ভালো আছে আর এর চাইতে
সুখের জীবন হঠাৎ নগদ কিছু টাকার বিনিময়ে সম্ভব নয়।

টিমলিডার চার : আপনি ঠিক বলেছেন। অধিকারের বোধ জাগানো জরুরি।
আর সেই সাথে আবশ্যক কি ক্ষতি হতে যাচ্ছে
খনির বাস্তবায়ন হলে;

প্রথমা যুবতী : এই উর্বরা কয়েকশ একর জমি
দশ বছরে যে পরিমাণ শস্য উৎপাদন করবে
সেই তুলনায় উত্তোলনযোগ্য খনিজের পরিমাণ একেবারেই নগন্য।
আর খনির বাস্তবায়ন হলে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে
পরবর্তী কয়েকবছর জমি থাকবে পতিত

দ্বিতীয় যুবক : আর যখন থেকে জমিগুলো হবে ফসলি
তখন থেকে আরো বেশ কয়েকবছর লাগবে তার
এই বর্তমান উর্বরা-ক্ষমতা পেতে;
তবে আমরা খনির পুরোপুরি বিপক্ষে নই কিন্তু তা যদি
মানে খনি থেকে প্রাপ্ত সম্পদ যদি রাষ্ট্র পেতো তাহলে
আমরা এখানে আসতাম কিনা বলতে পারছি না।
সমষ্টির মঙ্গল যদি খনি বাস্তবায়নের ফলে হয়
তাহলে তো কোনো কথাই নেই।

(টিম তিন এর দায়িত্বে থাকা তরুণ তখনও নির্বিকার কোনো কথা নেই তার মুখে; বিষণ্ন হয়ে সে বসে আছে। দ্বিতীয় যুবক তার দিকে তাকায় আবার বলতে শুরু করে)

আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। আপনারা যে যার মতো
সবাইকে করতে থাকেন উদ্বুদ্ধ, তবে সাবধান
দেখবেন কারো কোনো দায়িত্ব অবহেলার কারণে
আন্দোলন বান-চাল যেন না হয়।

প্রথমা যুবতী : সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থেকে আপনাদের কি মনে হচ্ছে
আদৌ কী সম্ভব হতে পারে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
খনির বাস্তবায়ন রোধ করা?
কেননা রাষ্ট্র এবং কোম্পানির লোকেরা
খুব স্বাভাবিক ভাবেই খনির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখে।

টিমলিডার চার : অনেকেই বিনিময়ে যে অর্থ পাচ্ছেন
তাকে বেশ বড় মনে করছেন
কেননা তাদের বোঝানো হচ্ছে ওই সমস্ত জমি রাষ্ট্রের
রাষ্ট্র বিনিময়ে যে টাকা দিচ্ছেন
তা কেবল জনগনের মঙ্গল চিন্তা থেকেই
আর কর্মসংস্থানের মুলোতো আছেই।
তবু শেষ পর্যন্ত অনেকেই ইতিবাচক মনোভঙ্গি দেখিয়েছেন
আমার টিম অন্তত এ ব্যাপারে আস্বস্ত করতে পারে
মাঠে থাকলে সাধারণের কাছে খনির খোলস অনাবৃত হয়ে যাবে
আর তারা এক প্রবল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
সমস্ত স্বার্থবাদীদের পরাজয় ঘটাতে সক্ষম হবে।

টিমলিডার দুই : আমার তেমনটাই মনে হয়।

টিমলিডার এক : আমি ব্যক্তিগত ভাবে এতটা ইতিবাচকতা দেখছি না
এই কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা যা দেখেছি
তার সারমর্ম অনেকটা এমন: স্বাভাবিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
তাদের পতন শেষ পর্যন্ত সম্ভব নয়।
কারণ আন্দোলন দানা বাঁধবে কিনা সে ব্যপারেই সংশয়; তবে
আন্দোলনে গণমানুষের প্রবাহ প্রকট হলে
কিছু হতেই পারে ব্যতিক্রম।

টিমলিডার তিন : শেষ পর্যন্ত কি হতে যাচ্ছে তার থেকে এই মুহূর্তে
আমরা কি করছি তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু
এবং আমাদের উচিৎ ছিল আরো আগে থেকে কাজ করা।

প্রথমা যুবতী : অবশ্যই আন্দোলন সফল করতে হবে;
আর এ ব্যাপারে আমাদেরই রাখতে হবে মূল ভূমিকা।
জয় হোক কল্যাণ চিন্তার।

সবাই : জয়, জয় হোক কল্যাণ চিন্তার।

(এটা ছিল ভূমিকা যা বলতে চেয়েছিল প্রথমা যুবতী; প্রথমাবস্থায় ফিরে যাবে সার্বিক মঞ্চ )

ব্যক্তি পাঁচ : মূল ঘটনা বর্ণনের আগে যে ভুমিকা চেয়েছিলেন বলতে
হয়তো তার থেকে কিছু বেশিই জানা হয়ে গেলো
আন্দোলনের পথে যাকে হারিয়েছেন
কিছুটা আন্দাজ হয়তো করা গেল তার সম্পর্কে
কিন্তু পুরোপুরি জানার আগে বলতে চাই
টিম তিনের দায়িত্বে থাকা তরুণ কী
মাঝপথে বাধ সেধেছিলো
নাকি অন্য কিছু?

প্রথম যুবক : না সে বাধ সাধে নি, কিংবা পথবিমুখও হয় নি;
গ্রামের মানুষদের সাথে তার যেমন সখ্যতা বেড়েছিল
তেমন আমাদের আর কারো হয় নি।
আন্দোলন সফল হতে পারে এমন ধারণা দানা বাঁধতে
শুরু করেছিল; আর সেই সময়ই সে ভুলটা করে বসলো
ভুল কিংবা সঠিকও হতে পারতো
কিন্তু আমরা একে ভুল বলছি।

প্রথমা যুবতী : সেদিন সে আমাদের সাথে শেষবারের মতো বসেছিল
বাইরে ছিল সাধারণ মানুষের অনিরুদ্ধ স্রোত
তবে আমরা আরো কিছু সময় চেয়েছিলাম
আন্দোলনের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত ছিল
কিন্তু সে তরুণ সেদিন কোনো কারণ শুনতে রাজি ছিল না
তার ভেতর কাজ করছিল সাধারণ আবেগ
আর যা দিয়ে মিছিলে স্লোগান দেয়া গেলেও
আন্দোলন করে অধিকার আদায় করা যায় না।
সেদিন সে শুধু বলছিল আর আমরা সবাই শ্রোতা হয়ে উঠলাম।

(মঞ্চের চেহারা পাল্টে যাবে আরেকবার। মাঝখানে উত্তেজিত তরুণ চারপাশে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে অন্য সবাই)

তরুণ : এখন এই এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে পিছু হটবেন
পিছু হটবেন সবাই। বাইরে
তারা কেবল আপনাদেরই অপেক্ষা করছে; যাদের জন্য অভিযাত্রা
করেছিলেন শুরু। একবার তাকান কিংবা
কান খাড়া করে শুনুন; কি বলছি কাদের আমি, হাহ্!
যারা আজ হয়ে গেছে শারীরিক, মানসিক প্রতিবন্ধী
যাদের চোখ হয়ে গেছে অন্ধ আর যারা হয়ে গেছে বধির
স্লোগানের তীব্রতায়।
আন্দোলনের কৌশল নিয়ে আপনারা থাকেন এখানে
আমি চললাম
সাধারণ মানুষের এই স্বতস্ফূর্ততা হয়তো আর কোনোদিন
আসবে না। আন্দোলনের সফলতার মুখ দেখে তবে ফিরবো;
আর যদি বলেন আমি বিদ্রোহী তবে তা বলতে পারেন
কিন্তু সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য যে সংগ্রাম অন্তহীন
সেই সাধারণদের থেকে পারবো না মুখ ফেরাতে।
জয়, জয় হোক কল্যাণ চিন্তার।

(পিছু ফিরে তাকাবে না তরুণ। প্রথমাবস্থায় ফিরে আসবে মঞ্চ)

প্রথম যুবক : আমরা তাকে সে সময় কোনোভাবেই পারতাম না বোঝাতে
কেননা হাজার কন্ঠের স্লোগানে সে তখন দিশেহারা ছিল
তাই আন্দোলনের নিশ্চিত ব্যর্থতা মেনে নিয়ে
আমরা শেষ এবং একমাত্র পথ খুঁজছিলাম
অপেক্ষা করছিলাম তার।

প্রথমা যুবতী : কিন্ত তার জন্য অপেক্ষা যখন বৃথা মনে হল
আর সেখানে অবস্থান করাটা হয়ে উঠলো ক্রমেই বিপদজনক
তখন আমরা ফিরতে বাধ্য হলাম

দ্বিতীয় যুবক : পথ অতিক্রমের সময়ে লোকে বলাবলি করছিল
তাদের প্রিয় মানুষটির গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা
এবং শেষ পর্যন্ত
খনিতে কাজে যাবার কথা; হাহ্
শেষ হয়ে গেলো একটা জীবন অদূরদর্শীতায় অথবা
বলা ভালো শেষ হয়ে গেলো একটি আন্দোলন, সাধারণের অধিকার।

ব্যক্তি তিন : কি এমন দক্ষতা তবে অর্জন করলেন এতদিনে
আর কেমন ধারার আন্দোলনই ছিল তা
যেখানে গণজোয়ার বাধ ভাঙার অপেক্ষায়
আর আপনারা বসে আছেন সঠিক সময় হয় নি বলে।

প্রথমা যুবতী : দেখুন বাইরে থেকে দেখা যায় সাধারণ মানুষের সংখ্যা
কিন্তু আমরা বাইরের সংখ্যাটাকে প্রাধান্য দিতে চাই নি।
গণ-আন্দোলন গুলোর ব্যর্থতার দিকে তাকান
সেখানে আপনি গণমানুষের সংখ্যার কোন ঘাটতি পাবেন না, তাহলে শেষ পর্যন্ত তা মুখ থুবড়ে পড়ে যায় কেন কিংবা গেছে কেন তাসের ঘরের মতো হঠাৎ ভেঙে অনেক আন্দোলনকারীর শ্রমে তৈরী
অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম? বলুন কেন?
(প্রথমা যুবতী ব্যক্তি তিনের দিকে এগিয়ে যায়)
আন্দোলনের সাফল্য কেবল সংখ্যা বিচারে হয় না
তার জন্য প্রয়োজন সময় এবং সময়।
তরুণ যে ভুল করেছিল
সেই একই ভুল আপনিও করতেন দেখছি!
আমরা সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম
কেননা আমরা জানি সাধারণের বোধে অধিকার চিন্তা
তখনও কিছু কুয়াশার আড়ালে ছিল
আর সেই কুয়াশা কাটার অপেক্ষায়
আরো কিছুদিন কাজ করতে চেয়েছিলাম
কারণ আন্দোলন মানেই ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া লক্ষ্যের দিকে
হঠাৎ করে ফুঁসে ওঠা নয়।

(যে তরুণ গুমরে উঠেছিল কান্নায়; সে এবার এগিয়ে আসে, হাত ধরে প্রথমা যুবতীর )

ব্যক্তি এক : কথায় তোমরা হারবেনা কখনও
সে যাই হোক, দেখো কিছু পারো কিনা করতে
তবে তাঁর মানে সেই তরুণের মতো মাথা যেন বিগড়ে না যায়
আর তাতে আন্দোলনের উন্মত্ততায় দিয়ে দেবে ঝাপ আগুনে
পতঙ্গের মতো অনেকটা।
ওদিকটায় আবার বেশ কাজ জমা হয়ে আছে।
দলের সবাইকে নিয়ে যাবো পার্কে, পৃথিবীটাতো চেনাতে হবে নাকি?

প্রথম যুবক : দেখবেন হারিয়ে যেন না যায় আর আইসক্রিম চাইলে
বলবেন ওটা কিন্তু ঠাণ্ডা! (সবাই হাসতে থাকে)

ব্যক্তি পাঁচ : কী আপনারও নিশ্চয়ই প্রচুর কাজ? (ব্যক্তি তিন কে)

(অনেকটা রেগেই মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যায় ব্যক্তি এক ও ব্যক্তি তিন। হঠাৎ বাইরে শোরগোল শোনা যায়, যাচ্ছিল অনেক সময় ধরেই কিন্তু হাসির শব্দে শুনতে পায় নি কেউ)

তৃতীয় তরুণ : শুনতে পাচ্ছেন, পাচ্ছেন শুনতে আপনারা
ঐ ওদিকটায় হ্যাঁ ওদিক থেকেই আসছে ভেসে
জনস্রোতের গর্জন
কিংবা আর্তনাদও হতে পারে
তবে আর বসে আছেন কেন, চলুন
চলুন মিশে যাই স্রোতের সাথে
আর্তনাদ হলে আমরা করবো আর্তনাদ
যেমন এসেছি ফিরে আস্ফালন করতে করতে
ফেলে রেখে অধিকার কিংবা সঙ্গী
আর যদি অধিকার আদায়ে তাদের কন্ঠ উঁচুতে মিলিত হয়
তবে আমরাও মিলাবো কন্ঠস্বর তাদের সাথে একসাথে
কই চলুন নির্বিকার বসে থাকবেন না সবাই
বসে থাকা উচিৎ মনে হয় না আর

(দৌঁড়ে প্রবেশ করে পুনরায় ব্যক্তি এক ও তিন। পিছু পিছু প্রবেশ করে ব্যক্তি দুই;পথ সন্ধানকারী)

ব্যক্তি পাঁচ : কী শুনতে পাচ্ছো না তোমরা, পাচ্ছো না শুনতে
যদি বাঁচাটাকে মনে কর মুখ্য
যদি চাও জীবন ধারণ করতে এবার
তবে এখানে আর একমুহূর্তও কাটিয়ো না সময়
ছোট ছুটে যাও যেদিকে নিরাপদ মনে হয় যেদিকে চোখ যায়।

(ব্যক্তি এক ও তিন এবার পিছনে রেখে সবাইকে, চলে যেতে উদ্যত হয়; কিন্তু ফিরে আসে।)

ব্যক্তি তিন : তবে আর ছুটে যাওয়া কেন যখন এমন ঘোরতর বিপদ
যখন চোখ চেয়ে দেখে না সামনে সুদূর পথ
অনিরাপদ মনে হয় যখন প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি সময়

ব্যক্তি দুই : নির্দিষ্ট করে বলতে পারো কোন দিক থেকে আসছে ভেসে
সম্মিলিত কন্ঠস্বর সম্মিলিত কন্ঠ মানুষের

(সবাই কান খাড়া করে শুনতে থাকে। পরস্পরের দিকে তাকায়; চোখের ভাষা যে বুঝতে পারে তাকে আর বলে দিতে হয় না, চতুর্দিক থেকেই সমান তালে আসছে ভেসে মিলিত মানুষের কাতর কিন্তু বিরুদ্ধ কন্ঠস্বর। ব্যক্তি এক ও তিন ভীত হয়; কুঁকড়ে যায় তাঁরা।)

ব্যক্তি দুই : জলস্রোতের গর্জন যেমন সমুদ্রের কুলবরাবর ঠিক তেমন
ঠিক তেমন মনে হয় একে; যেন জনস্রোত আজ ভাসিয়ে নেবে
সমস্তটুকু আলগা বালুকণার মত বেড়ে যাওয়া অসংগতি
মুর্খতা আর স্বার্থের কর্কট। আর তবে পথ খোঁজা নয়
আর নয় বৃথা কালযাপন; এবার এসেছে সময়
সময় এসেছে পথ খুঁজে পাবার। অগ্রপথিক তো আপনারাই
তবে আর চিন্তা কিসের ভাবনারই বা কী থাকে অবকাশ!
চলুন হে কল্যাণপথযাত্রী চলুন সম্মুখে

ব্যক্তি পাঁচ : না। কোনোদিকেই যাবো না আমরা
(সবাই ফিরে তাকায় তার দিকে; হয় আশ্চর্যান্বিত)
আরো একটু বোধকরি আছে সময়ের প্রয়োজন, এই শেষমুহূর্তেও
ভাববার আছে অবসর
কেননা সময় বড় চতুর মনে হয়।

প্রথমা যুবতী : যখন পা ফসকে গেলেই নিশ্চিত মৃত্যু জেনেছি
তখন আবার ভেবে পা ফেলাই বিবেচনা করি নিয়ম বলে
যদিও বিবেচনা-বোধের সত্যিকারে নেই কোনো অবশেষ

প্রথম যুবক : তবু একটা সময় এসে থেমে যায়, যায় থেমে
থেমে যাওয়া সময় ধরেই বাড়াতে হয় পা যদিও পথ চেনা নয়

ব্যক্তি পাঁচ : আসুন তবে নিবিড় হয়ে, সকলে এবার
আসুন, এসে একহয়ে দাঁড়ান
চোখে চোখ রেখে দেখুন সবার ভেতর, সবাই যেন আপনি নিজে
আর এই নিজের সাথেই অন্তহীন করে গেছেন দূরত্বের বিস্তার
সত্যি কী অদ্ভূত! হায়!
নিবিড় হয়ে আসুন তবে
আসুন আরেকবার;
সম্মিলিত শ্লোগানের বেড়ে যাক তীব্রতা আরো
প্রতীক্ষা হোক তবে অতঃপর পা ফেলবার।

(দৃঢ় কন্ঠস্বর ক্রমে নিকটে আসতে থাকবে, অনেক উপরে উঠে আবার মিলিয়ে যাবে। পুনরায় দরজা খোলা ও বন্ধ হওয়ার মতো শব্দ হতে থাকবে তবে শুরুর বিপরীত, তার লয় দ্রুত থেকে ধীর লয়ের হবে)

চরিত্র:

ব্যক্তি এক
ব্যক্তি দুই
ব্যক্তি চার
ব্যক্তি তিন
ব্যক্তি পাঁচ
প্রথমা যুবতী
প্রথম যুবক
প্রথম তরুণ
দ্বিতীয় যুবক

টিম লিডার
এক
দুই
তিন
চার

তরুণ
তৃতীয় তরুণ

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।