সাহিত্য সংবাদ: আলোহাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

১.

টিভি সারাক্ষণ অনেককিছু বলে যায়। তৃণভূমির উপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া খেঁকুড়ে প্রাণী, মুসলিম হবার সুবাদে আমাদের অবশ্যকরণীয়, ডিমসিদ্ধ করবার সময় জলে কেন নেভানো দেয়াশলাই দেয়া উচিত, সাদা কাপড় আরো তিনগুণ সাদা কি করে হবে-  অন্তহীন এই উপাত্ত-প্রলয় (এলিয়ট ‘উইজডম লস্ট ইন নলেজ’ আর ‘নলেজ লস্ট ইন ইনফর্মেশন’ নিয়ে কপাল চাপড়াচ্ছেন বইয়ের দেরাজে) দেখবার জন্যে আছি আমি, আমার ছোট্ট ছেলে কুশান আর দেয়ালে সুতায় সেলাই করে ঝোলানো পপিফুলের গোছা। এইসবের ভিতরে আমার চোখ আটকে যায় একটা নৌকায়– আমাজনের তপনহীন ঘন তমসায় ঘোলা নদী বেয়ে কাঠের নৌকায় করে পাচার হচ্ছে কুতকুতে চোখের বাঁদর, টিয়ার বাচ্চা আর একখানা রঙিন ম্যাকাও, প্রত্যেকের মুখে বেদনা, ভয় আর বাঁদরের শূণ্যচোখে আশংকা। কেবল ম্যাকাও এর বিহ্বল হবার সময় নেই, সে তার ঈশ্বরদত্ত শক্ত চঞ্চুতে খাঁচার আগল খুলতে চেষ্টা করে চলেছে। একটু একটু করে সেই আগল খুলে এলো,  একসময় একটু ঠেলে দিয়ে দরজা খুলে ফেললো ম্যাকাও, তারপর একবিন্দু অবকাশ না দিয়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়ে সে উড়ে গেল নিজবাসভূমে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি তার আশ্চর্য প্রয়াস, তার নিরন্তর প্রচেষ্টা, তার মুক্তির প্রেষণা।

২.

শামীম আপা (কবি শামীম আজাদ) জানিয়ে রেখেছিলেন জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়টা ফ্রি রেখো, লন্ডনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ১০ বছর পূর্তি উদযাপিত হবে, সমরেশ মজুমদার আসবেন, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আসবেন। অনুষ্ঠানের আগেপরে আরো দু’একবার দেখা হয়েছে আমার শামীম আপার সাথে, লন্ডনের বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে তাঁর আদরের-প্রশ্রয়ের ছেলেমেয়েদের সাথে, তাদের আড্ডায়-দুষ্টুমিতে-তর্কের ‘ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিসাধনে’ আমি বহিরাগতও শামিল হয়েছি,  কারো স্ত্রীর ‘সাধ’ এর দাওয়াত খেয়েছি, কারো গান শুনেছি, বাজি ধরেছি, আত্তীকরণ ঘটেছে অত্যন্ত সরল পথে। নির্দিষ্ট দিনে সেজেগুজে ব্র্যাডি আর্ট সেন্টারে গেছি, শামীম আপা সেদিন মহাব্যস্ত, এরই ভেতর একবার এসে বললেন- হুমায়ুন আহমেদের শরীর খুব খারাপ রে, ওঁকে একবার মনে করতে চাই অনুষ্ঠানের শুরুতে।” তাই হলো, অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি আধমিনিট সমবেত নীরব প্রার্থনায় স্মরণ করলেন বাংলা সাহিত্যের এই অলঙ্ঘ্য নামকে, তাঁর আশু রোগমুক্তি কামনা করলেন। আমরা যে যার মতন করে মনে মনে স্মরণ করলাম তাঁকে, কেউ ‘নন্দিত নরকে’, কেউ ‘নির্বাসন’এ। তখন কি আর জানি, এই রোগমুক্তিকামনার সনির্বন্ধ ডোর কেটে তিনি চলে যাবেন,  এত তাড়াতাড়ি।

প্রথমদিনের শুরুতে ছিল বইমেলা, ছিল ছোলামুড়ি আর গরম চায়ের সাথে গরমাগরম আড্ডা, আব্দুল গাফফার চৌধুরি চলে এসেছেন, সালেহা চৌধুরি এসেছেন,  সমরেশ মজুমদার আর আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এসে যোগ দিয়েছেন, মঞ্জু (ফাহমিদা) আপাকে আপা ডেকে ধমক খেয়েছি– হয় আমাকে খালা ডাকবে, নয় নানী”  (না, আমার অপুষ্টির মেছতার মেঘে ঢাকা নানীকে দেয়া ডাক আমি আর কাউকে ডাকব না)!

বইমেলাকে কেন্দ্র করে আড্ডা জমে ওঠে,  সমরেশ মজুমদার আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে বলেন- আমাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটা অবৈতনিক চাকরি দেন, শুধু মেয়েদের পড়াব, আমার ক্লাসে সব মেয়ে থাকবে।” আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ জিজ্ঞেস করেন- ছেলেরা সব যাবে কই?” সমরেশ মজুমদার অবলীলায় বলে বসেন- কেন, আপনার ক্লাসে?” হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করি, স্যার আপনি কি তাতে রাজি হলেন?” স্যার তার এলাচরঙ নির্লিপ্ত চোখ তুলে বলেন– দেখাই যাক না, মেয়েরা ওঁর ক্লাসে যায় না আমার ক্লাসে!” এরপর প্রদীপ প্রজ্জ্বলন আর গান- আলোর স্রোতে হাজার প্রজাপতির পাল তুলবার গান।

শামীম আপার সঞ্চালনায় আড্ডায় বসেন তিনজন, আব্দুল গাফফার চৌধুরি,  আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আর সমরেশ মজুমদার। আব্দুল গাফফার চৌধুরি স্মৃতিচারণ করেন, তাঁর চাচা তাঁকে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি লিখবার পরে বলেছিলেন– মৃত মানুষরে নিয়া লিখসো গান, ক্যান, নারী নয় প্রকৃতি নিয়া লিখতে পার নাই?” পরে সেই চাচাই লোকজনকে বুক ঠুকে বলতেন– এই গান আমার ভাতিজার লেখা গান!” আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর কবি হিসেবে শুরু করে সংগঠক হিসেবে শেষ করবার  গল্প শোনালেন। সমরেশ মজুমদার শোনালেন তাঁর লেখকজীবনের খুঁটিনাটি। ‘মুসলিম সাহিত্য’ বলে আদৌ কোন সাহিত্য আছে কি না, নাকি এই শব্দগুচ্ছ আদতে কোনো অর্থভার বহন করে না- এই নিয়ে প্রশ্নোত্তর চল্লো কিছুক্ষণ। অল্পবয়েসের ফ্যান্টাসিতে ভুগে ভুগে আমরা সবাই জয়িতা হতে চাইতাম, হতে চাইতাম দীপাবলী। ‘সাতকাহন’ এর সুত্র ধরে প্রশ্ন এলো সমরেশ মজুমদারের কাছে, ‘দেশ’ এ যখন তিনি ধারাবাহিকভাবে সাতকাহন ছাপালেন তখন তাতে দীপাবলী অসুস্থ অবস্থায় স্বামীর সাথে পুনর্মিলিত হয়, অথচ বই আকারে যখন সাতকাহন বেরুলো, তখন দীপাবলী– ‘এলাম’ বলে পথে নেমে যায়, এই বদল কেন। তিনি স্মরণ করলেন তাঁর এক অশীতিপর পাঠিকাকে, প্রবঞ্চনার কারণে স্বামীকে পরিত্যাগ করেছিলেন তিনি, তিনি এসে লেখককে প্রশ্ন করেছিলেন- এত কষ্টস্বীকারের পর মেয়েটাকে হেরে যেতে দিলেন?” লেখক অতএব বইয়ের শেষটা বদলাতে বাধ্য হন।

এরপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অবাধ রবীন্দ্র-নজরুল তর্পণ। একদিকে ‘গাহি সাম্যের গান’ আরেকদিকে ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’। বাইরে অঝোর বৃষ্টি ছিল সেদিন সন্ধ্যাবেলা, মেয়েদের পরনে ছিল জামের রসের রঙ শাড়ি, খোঁপায় নয় হাতে বেলফুলের মালা।

ভিড় ভাঙবার সময় কে একজন গাফফারভাইকে বলেন–  আমার স্ত্রীর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ আর ‘আমার কৈফিয়ত’ মুখস্ত, কি সুন্দর আবৃত্তি করেন উনি গাফফারভাই!” স্ত্রীভাগ্যে সমুজ্জ্বল লোকটির মুখ দেখতে পেলামনা ভিড় ঠেলে। বাইরের বৃষ্টি থামবার অবসরে সমরেশ মজুমদার সিগারেট ধরান, আমি জিজ্ঞেস করি– আপনার লেখায় মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানোর পাপ এত বেশি কেন? কেন এত তিক্ততা আজকাল? উত্তরাধিকারের মিষ্টি কলম আর খুঁজে পাই না আমি!” তিনি বলেন– উত্তরাধিকারকে তিনি আর কখনও ছাপিয়ে যেতে পারেন নি, আর প্রখর বাস্তবতার সূর্য যেখানে জ্বালাচ্ছেন, সেখানে মাধুর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পরের দিন অক্সফোর্ড হাউজে আবার আড্ডা, প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে কথোপকথন আর ‘শেষপাতের দই’ রবীন্দ্রনজরুলের অতিপঠিত চরিত্রাবলীর ফ্যাশনভাবনা নিয়ে ফ্যাশন শো। একে একে মঞ্চে আসে রবিঠাকুরের বিমলা, নিখিলেশ, সন্দ্বীপ, লাবণ্য, অমিত, নন্দিনী। নজরুলের সাম্যবাদী, বিদ্রোহী, হারানো প্রিয়া আর পূজারিণী। শেষ হবার পরে অনেকক্ষণ চল্লো ছবি তোলা, ‘আলোর পথযাত্রী’দের নিয়ে সকলেই ছবি তুলতে ইচ্ছুক।

৩.

আবার বাড়িতে শুনশান দুপুরবেলা আমি-কুশান আর পপিফুলের গোছা। থেকে থেকে আমার ম্যাকাওটার কথা মনে পড়ে,  তার দুর্নিবার মুক্তির আকাঙ্খা, তার ডানায় আলোর পিপাসা। ‘যার যথা স্থান’, সেখানে দাঁড়িয়েই কত অদ্ভুত লড়াই আমাদের, জীবকূলের– কারো চলবার, কারো বলবার, কারো বোল ফুটাবার।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।