জুয়েল মাজহার-এর কবিতা


রুবিকন

 

আমার সামনে এক রুবিকন, পুলসিরাত, ভয়ানক ক্রুর অমানিশা
এর সামনে একা আমি;

কিস্তিহীন, নিরশ্ব, রসদহীন
পিগমিদের চেয়ে ছোটো আমি!

আর আমার ভাঙা হাড়, থ্যাঁতলানো খর্বকায় দেহের ভেতরে যতো
রক্ত-পিত্ত-কফ-থুথু-বীর্য-লালা সবই
অসীম বরফে-হিমে গ্রানিটের মতো ক্রমে হতেছে জমাট;

আর ওই থেকে-থেকে ফুঁসন্ত ব্লিজার্ড এক,
আর এক আনক্যানি করাল হিমানী
আমাকে আদ্যন্ত ঘিরে আছে।

সান্নিপাতিক হেতু নাসিকার ছিদ্র বেয়ে
চোখ বেয়ে যে-জল গড়ায়– তা মাটিতে পড়ে না;

শূন্য থেকে বর্শা হয়ে সিগ্নি ঝুলে রয় যেন নর্স দেবতার!

সারি সারি শতশত বল্মীকূট পেছনে আমার।
তাদের আড়াল হ’তে জুলজুল চেয়ে থাকে লোম-কর্ণ শিবা।
লোলজিভ, অভ্রংলিহ জিভ নাড়ে মেদুসা-মনসা আর কালী।

আমার তরবারি নাই। তাই
দু’হাতে নখর আমার তরবারি!

আমি কি ডরাবো?
না, আমি ডরাবো না।

অসীম হিম্মত লয়ে এক পায়ে হয়ে আছি খাড়া ।
কিস্তিহীন,শস্ত্রহীন, নিরশ্ব, রসদহীন— আমি একা;
পিগমিদের চেয়ে ছোটো আমি।

আমি ফুঁ দিচ্ছি হাপরে আমার।
আমি আমাকে বলছি: ওঠো, জাগো!
আমার অশ্ব নাই।
এক দুর্বিনীতাশ্ব জন্ম নিচ্ছে ভেতরে আমার।

থ্যাঁতলানো ভাঙা পায়ে আমি লাফ দিচ্ছি। আমি সাঁতরে চলেছি
আমার আয়ুর চেয়ে দীর্ঘ এক গন্ধকের নদী।

আমি ভেদ ক’রে যাবো ক্রুর অমানিশা
আমি জয়ী হবো,
আমি পার হবো রুবিকন!!

 

[২৬জুলাই রাত, ২০১২
মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, ঢাকা]

 

বীতশোক ফিরে এসো


১.
বিকেলের করোটিতে সন্ধ্যারাগ ঢেলেছে আগুন;
জ্যোতিরথে চোখ রেখে চেনা পথ শান্ত পায়ে হেঁটে
নিজেকে শুনিয়ে কোনো গূঢ়কথা, গোপন মর্মর
বীতশোক, চলে গেছে। পশ্চিমের প্রত্যন্ত প্রদেশে।

আমার ‘সামান্য ক্ষতি’?– বিপর্যয়! খসে পড়ে ফল!
বহুঘুম-রাত্রিব্যেপে অনৃত ঢেউয়েরা!— তরী ডোবে!

২.
পুরাতন বিষন্নতা, গোপনে যে আঙুরলতায়
ফল রূপে পেকে ওঠে, সারারাত তস্করের ভয়ে,
শুষ্কতৃণে ঢেকে তারে সযতনে দিয়েছে প্রহরা।

৩.
প্রত্যহের দুঃখ-দৈন্য-বেদনা ও ক্লেশে– হয়তো সে–
বসন্ত-রুধির এনে চেয়েছিল কিছুটা মেশাতে;
–যেন নীল প্রজাপতি এসে তার কাছে চায় মদ;

অধীর মক্ষিকা শুধু দ্রাক্ষা মেগে, উড়ে উড়ে, চলে।

৪.
সন্তর্পণে একা বসে পানপাত্রে দিল সে চুমুক;
লম্বা ঢোঁক গিলে নিয়ে স্তনলোভী শিশুর নিয়মে
আলগোছে মৃগনাভী ভরেছে উদকে– স্বার্থপর!!

‘শিশির-চোঁয়ানো রাতে, মধ্যদিনে দহনের শেষে’
অন্যরা ঘুমিয়ে ছিলো?— এ-সুযোগে হলো সে কর্পুর?

৫.
হেমন্তের মঞ্চ থেকে গরুড়ের ছড়ানো ডানায়
অতর্কিতে চড়ে বসে শরীর সারাতে গেছে– দূরে।
কত দূরে? কাউকে বলেনি; শুধু উপশমহীন
অনন্ত গোধূলিপথ ছেয়ে আছে হলদে পাতায়!

–এই তবে গূঢ়লেখ? বৃথা তব নর্তকী ও মদ ?

৬.
বীতশোক, তুমি আছো! অনন্ত পশ্চিমে নাকি পূবে?
অসম্ভব ভুলে থাকা; লিথিজলও স্মৃতিসমুজ্জ্বল!
অফুরান দ্রাক্ষা থেকে অন্ধকার প্রশীর্ণ আঙুলে
নিজের ভিতরে, চুপে, শমদায়ী পেড়ে আনো ফল?

৭.
বিকেলের করোটিতে সন্ধ্যারাগ! জ্বলছে আগুন!
ফিরে এসো সেই পথে;– ঝরাপাতা-মুখর সরণি–
কিছুটা যবের মোহে, কিছু প্রেমে, শর্করার টানে।
৮.
উপশম হলো ব্যথা? পিঞ্জিরার ভেতরে পাখির?
দ্রুত তবে চলে এসো, পরিত্যক্ত আঙুরের বনে;

অনন্ত গোধুলিপথ ভরে দিয়ে পাতায়, মর্মরে।

 

[৩০ জুলাই, ২০১২ মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, ঢাকা]

 

নোঙ্গরের পাশে

 

নোঙ্গরের পাশে তুমি, মনে হলো, ফেলেছো নোঙ্গর!
সূর্য থেকে দূরতম পশ্চিমের এলানো বিকেলে;

বিষন্ন ও একা ছিলে।
ডুবন্ত জাহাজ থেকে
জেগে ওঠা বুদ্বুদের মতো।

রাত্রি এখানে, তবে, অগোচরে
হলো কি গোচর?

 

[২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১২, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, ঢাকা]

Facebook Comments

3 Comments:

  1. ratnadipa de ghosh

    কবিকে অভিনন্দন ।অনবদ্য কবিতা তিনটি ছুঁয়ে গেলো বিশেষ করে বীতশোক ফিরে এসো কবিতাটি

  2. aha! ki veeshon je valo!

  3. Kalyani Rama এবং ratnadipa de ghosh আপনাদের সেলাম জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *