অঞ্জন আচার্যের কবিতা: ভোর ও সন্ধ্যার কথা

অঞ্জন আচার্য

“নির্লিপ্ত প্রতিকূল বিশ্বে মানুষ এক অনন্য নিঃসঙ্গ প্রাণী, যে নিজ কর্মের জন্য দায়ী এবং নিজ নিয়তি নির্ধারণের ব্যাপারে স্বাধীন।”
—কিয়র্কেগার্ড (১৮১৩-১৮৫৫), ড্যানিশ দার্শনিক

রাতজাগানিয়া হাঁপানি রোগীর চোখের মতো নিষ্প্রভ আজ
আমার ফেলে আসা কৈশোর দিনলিপি।
জানি, মানুষ তো কেবলই আকড়ে থাকে তার শৈশব-কৈশোরের দিনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে
আমৃত্যু-জীবন।
আমিও মানুষ বলেই হয়ত…

একঘেয়েমি নাগরিক উদ্বাস্তু প্রাণীজ দেহে, যেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি—
অনেক কষ্টেসৃষ্টে অলিগলি দালানের নালা বেয়ে আকাশ দেখা যায়;
কবে শেষ এই পথে রেখেছিল পা সূর্যের আলো
ভুলে গেছে তা মাটির স্মৃতিকোষ।

ধোঁয়ার ঘরে ধুলার চাদর গায়ে তস্কর সাজে গোপন সুড়ঙ্গ কেটে—
ক্রমাগত ফাটা বাঁশের ভেতর দিয়ে মাঝেমধ্যে গলে যায় চিকন বাতাস;
বাতাসের গায়ে তার কখনও বৃথাই খুঁজে ফিরি ছেলেবেলার বিস্মৃত
কচি লেবুপাতার ঘ্রাণ।

এই শহরের তাড়া খাওয়া হরিণীর মতো ছুটন্ত মানুষের দল
বাদুড়ের কসরত শিখেছে বেশ
আমরা যারা সনাতনী স্কুলের পেছন সারির পড়া না-পারা অভ্যস্ত ছাত্র
গণিত মাস্টারের বেতের সাঁইসাঁই শব্দাঘাত সয়ে যাই প্রতিদিন।

সেদিন পত্রিকায় রক্তিম শিরোনাম হলো—
‘চিনির বদলে লাল পিঁপড়ের দল খুঁটে খেয়েছে পত্ররন্ধ্রের জমানো জলকণিকা’।

তবুও কেটে যায় দিন কৈর্বতের ছেঁড়াখোঁড়া মেরামতি পুরানো জালে লেগে থাকা
আঁষ্টে গন্ধে-গন্ধে সারাদিন,
আর আমাদের স্বপ্নসংসারে অনাগত শিশুর দুধের জলে
ক্রমশ অগোচরে মিশে যায় চুনাজল।

তার পরও বলে যাই, আমাদেরও কতিপয় জলজ দিন ছিল মাছের মতো
আমাদেরও মায়াময় ঘর ছিল তালপাতা তলে বাবুইয়ের ঝোলার মতোন,
ভোর ও সন্ধ্যায় আজও বাস করি যেখানে বসবাস করে তোমাদের নগরী।

দগদগে যুদ্ধদাগ অথবা নিক্রপলিস কথা

গেরিলা ক্রোলিংয়ের দাগ জন্মদাগের মতো সেঁটে আছে দুই কনুইয়ের তলে
এখন লেগেছে গোপন তালুতে ক্রমে ক্রমে রিকশার হাতলের গাঢ় মরিচা,
তেলচিটে মাথায় লাঙ্গল-চিরুনি দিলে টনটন করে কাঁধ;
বাম হাতে লেগেছিল গুলি।

অতীতের টগবগে মাহবুব আজ হাঁপানির টানে বৃদ্ধ
জীবিকা নিয়েছে শুষে জীবনের সবটুকু স্বাদ।

ছেঁড়া তমসুক বুকে জড়িয়ে পাগলি আরতি সাহাও
বেঁচে আছে প্রতিদিন প্রতিক্ষাহীন চোখে।
রুপার ঘুঙুর দুটো তার রক্তের দাগে খর্সান হয়ে গেছে
হায়েনার দাঁতের ঘষায়—সেইসব উত্তাল দিনে,
শামরী দেহটি যেন আজ অঙ্গার হয়ে ভাসে; শিকস্তি চরের পাশে উজানের বানে।
হাড়গুলো গুনে গুনে—কাক ও কুকুর নিয়েছে শিখে নামতার ঘর;
কাগুজে নৌকায় ভাসমান পাড়হীন নির্লেপ জীবন।

অথচ একদিন মাহবুব-আরতির স্বপ্ন জমা ছিল শিকায় ঝোলানো
মাটির হাঁড়িতে লুকানো
তারা জানে না আজও
দুজনেই বেঁচে আছে এক পৃথিবীর দুই পাশে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখে…

‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে বুকে করে যাঁরা নিয়ে এল ঘরে—
আজ তাঁরা বহুকাল এমনই গৃহবন্দি।

এদিকে বেয়োনেটে ঝুলে আছে স্বদেশের ম্যাপ ফালানির মতো। আর—
নিক্রপলিস ঘিরে একদল ঘাই ডেকে যায় দিনের অন্ধকারে,
অশনিসংকেত জানিয়ে…

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।